
বাংলার মাটিতে ‘বিপ্লব’ কোনও আকাশ থেকে পড়া বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ নয়। তা সে পঞ্চদশ শতাব্দীর উত্তাল ‘ভক্তি আন্দোলন’ হোক বা বিংশ শতাব্দীর নকশালবাড়ি-পরবর্তী ‘তৃতীয় থিয়েটার’– এগুলি আসলে একই দেশজ, লৌকিক মানবতাবাদী (Folk Humanist) ঐতিহ্যের ভিন্ন ভিন্ন সময়ের, ভিন্ন ভিন্ন ভাষার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। শ্রীচৈতন্যদেব যে সাম্য ও মুক্তির বীজ এই পলিমাটিতে রোপণ করেছিলেন, বাদল সরকার তাকেই আধুনিক রাজনৈতিক মনন ও মার্কসীয় দ্বান্দ্বিকতার জলসিঞ্চনে এক মহীরুহে পরিণত করেছেন।
গত ৩ মার্চ ২০২৬ চলে গেল পুণ্যতোয়া গৌরপূর্ণিমা। শ্রীচৈতন্যদেবের ৫৪০-তম আবির্ভাব তিথি। ঠিক এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই, আমরা উদ্যাপন করেছি আধুনিক বাংলা থিয়েটারের অন্যতম পথিকৃৎ বাদল সরকারের জন্মশতবর্ষ। ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে পাঁচ শতাব্দীরও বেশি সময়ের এক দীর্ঘ ব্যবধান এই দুই যুগান্তকারী ব্যক্তিত্বের মধ্যে। পঞ্চদশ শতাব্দীর শ্রীচৈতন্যের ভক্তি আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল নিষ্কাম ঈশ্বরপ্রেম ও পারলৌকিক ‘মুক্তি’; বিংশ শতাব্দীর উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতের তীক্ষ্ণধী, নাস্তিক মার্কসবাদী নাট্যকার বাদলবাবু দেখতেন সমাজবদলের স্বপ্ন, ইহজাগতিক ‘মুক্তি’। আপাতদৃষ্টিতে এই দুই মহামানব সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই মেরুর বাসিন্দা। কিন্তু বাংলার সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক ভূগোলে কান পাতলে স্পষ্টভাবে শোনা যায়, এই দু’জনের কাজের পদ্ধতি, ব্যাকরণ এবং দর্শনের মধ্যে নিরন্তর বয়ে চলেছে এক আশ্চর্য, অন্তঃসলিলা অভিন্ন স্রোত। যা বাংলার একান্ত আপন আটপৌরে যাপন।

আজকের এই কর্পোরেট-শাসিত এআই-এর যুগে দাঁড়িয়ে এই দুই দর্শনের তুলনামূলক পাঠ হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের রাজনৈতিক ও মানবিক প্রয়োজন। আজকের ভারতে যখন ধর্ম তার আধ্যাত্মিক সারবত্তা হারিয়ে পর্যবসিত হয়েছে অসহিষ্ণু আচারে ও রাজনৈতিক হাতিয়ারে; এবং শিল্প-সংস্কৃতি পরিণত হয়েছে নিছক বিপণনযোগ্য পণ্যে– তখন শ্রীচৈতন্য এবং বাদল সরকারের দর্শন আমাদের এক বিকল্প ‘আটপৌরে’ বা সহজ, আড়ম্বরহীন প্রতিরোধের রাস্তা দেখায়। তাঁরা দু’জনেই শিখিয়েছিলেন যে, সত্যিকারের রূপান্তর কোনও শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বা সুরক্ষিত দুর্গে ঘটে না; তা ঘটে জনপরিসরে, মানুষের সাথে মানুষের সরাসরি ও শর্তহীন সংযোগে।
উভয়েরই ঐতিহাসিক যাত্রাপথের সূচনা হয়েছিল এক প্রবল প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা বা ‘কাউন্টার-কালচার’-এর মধ্য দিয়ে। পঞ্চদশ শতাব্দীর নবদ্বীপে যখন শুষ্ক নব্যন্যায় আর স্মার্ত পণ্ডিতদের প্রবল দাপট, সাধারণ নিম্নবর্গের মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে ব্রাহ্মণ্যবাদের জাতপাতের জাঁতাকলে, তখন চৈতন্যদেব শাস্ত্রের বদ্ধ ঘর থেকে ধর্মকে মুক্ত করে নামিয়ে আনলেন ধুলোমাখা রাস্তায়। নবদ্বীপের কাজীর নিষেধাজ্ঞাকে অমান্য করে তিনি প্রবর্তন করলেন ঐতিহাসিক ‘নগর সংকীর্তন’– যা ছিল একাধারে ভক্তির উচ্ছ্বাস এবং ভারতের ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন অহিংস আইন অমান্য আন্দোলন। অন্যদিকে, বিংশ শতাব্দীর ছয়ের দশকে যখন বাংলা থিয়েটার মূলত শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সুরক্ষিত ‘ড্রয়িংরুম’ ড্রামায় বন্দি, প্রসেনিয়াম মঞ্চের মায়াবী আলো ও জাঁকজমকে যখন হারিয়ে যাচ্ছে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের রুক্ষ কণ্ঠস্বর, তখন বাদল সরকারও থিয়েটারকে এলিটদের অডিটোরিয়াম থেকে মুক্ত করে নিয়ে গেলেন সোজা কার্জন পার্কে, সুরেন্দ্রনাথ পার্কে, কারখানার গেটে বা প্রত্যন্ত গ্রামের মাঠে। জন্ম নিল তাঁর বৈপ্লবিক ‘তৃতীয় থিয়েটার’। চৈতন্যদেব যেমন ভেঙেছিলেন মন্দিরের ‘বর্ণবাদী দেওয়াল’, বাদল সরকার ঠিক তেমনই তীব্রতায় ভাঙলেন থিয়েটারের ‘চতুর্থ দেওয়াল’। উভয়ের কাছেই ‘স্পেস’ বা স্থান কেবল কোনও ভৌগোলিক ঠিকানা বা অভিনয়ের জায়গা ছিল না; ছিল ক্ষমতা দখলের, প্রান্তিক মানুষকে মূল স্রোতে আনার এবং এক প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিসর নির্মাণের অব্যর্থ হাতিয়ার।

এই গণতান্ত্রিক পরিসর নির্মাণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ছিল মানুষের ‘শরীর’ (দেহজ জ্ঞানতত্ত্ব)। গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনে ‘অচিন্ত্য ভেদাভেদ’ তত্ত্ব অনুযায়ী, জীব ঈশ্বরের চেয়ে ভিন্ন হয়েও গুণগতভাবে এক। চৈতন্যদেব বিমূর্ত ঈশ্বরের নিষ্প্রাণ মূর্তিপূজার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন ভক্তের জীবন্ত উপস্থিতিকে। কীর্তনের আসরে ভক্তের উদ্দাম নৃত্য, অবিরল অশ্রু, ঘাম, এবং ধুলায় লুণ্ঠিত হওয়া– এসবই ছিল সত্য উপলব্ধির প্রধান মাধ্যম। শুষ্ক যুক্তি বা শাস্ত্রজ্ঞানের চেয়ে ‘আস্বাদন’ (Rasa) ছিল অনেক বড়। আশ্চর্যের বিষয় হল, এক ধর্মনিরপেক্ষ বলয়ে অবস্থান করেও বাদল সরকার তাঁর ‘পুওর থিয়েটার’ বা দরিদ্র থিয়েটারে ঠিক এই ‘দেহজ জ্ঞানতত্ত্ব’-রই এক বিস্ময়কর সেকুলার অনুশীলন করেছিলেন। তিনি দামি সেট, মায়াবী আলো, মেক-আপ বা জমকালো কস্টিউম সম্পূর্ণ বর্জন করে অভিনেতার নগ্নপ্রায়, ঘর্মাক্ত শরীরকে করলেন নাটকের একমাত্র রাজনৈতিক হাতিয়ার। ‘ভোমা’ বা ‘স্পার্টাকাস’-এর মতো নাটকে অভিনেতারা যখন একে অপরের ওপর শরীর রেখে একটি যন্ত্র বা জঙ্গল তৈরি করেন, যখন তাঁদের পেশির টান আর সমবেত নিঃশ্বাসের শব্দে শ্রমজীবী মানুষের যন্ত্রণার রূপক তৈরি হয়, তখন তা চৈতন্য-প্রবর্তিত উদ্দাম কীর্তনের মতোই দর্শকের মনে এক গভীর ‘আচরণাত্মক সাম্য’ (Performative Affinity) তৈরি করে। দু’জনেই গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, সত্যকে কেবল মস্তিষ্কে ধারণ করলে বা বইয়ের পাতায় পড়লে চলে না, তাকে স্নায়ু দিয়ে, পেশি দিয়ে, শরীর দিয়ে যাপন করতে হয়।

এই দুই মহামানবের মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং বৈপ্লবিক মিলটি লক্ষ করা যায় তাঁদের অর্থনৈতিক দর্শনে– যাকে সমাজতাত্ত্বিক ভাষায় আমরা ‘নৈতিক অর্থনীতি’ (Moral Economy) বলতে পারি। চৈতন্যদেব বিশ্বাস করতেন, ভক্তি বা ঈশ্বরের নাম কোনও পণ্য (Commodity) নয়। কীর্তনীয়া যখন আসরে গান করেন, তিনি টাকার বিনিময়ে কোনও ‘সার্ভিস’ বা পরিষেবা দেন না। বৈষ্ণব দর্শনে ঈশ্বরের নাম বিক্রি করাকে ‘নাম-অপরাধ’ বলা হয়েছে। সমাজ কীর্তনীয়ার ‘মাধুকরী’ বা গ্রাসাচ্ছাদনের দায়িত্ব নেয় সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়– মৌমাছি যেমন ফুলের ক্ষতি না করে মধু সংগ্রহ করে, ঠিক তেমনই। পাঁচ শতাব্দী পর বাদল সরকারও ঠিক এই একই অকাট্য যুক্তিতে থিয়েটারকে ‘ব্যবসা’ বা জীবিকা হিসেবে দেখতে অস্বীকার করেন। তিনি বাণিজ্যিক থিয়েটারের টিকিট-প্রথাকে বুর্জোয়া সংস্কৃতির পাহারাদার আখ্যা দিয়ে তা সম্পূর্ণ বাতিল করেন এবং ‘ফ্রি থিয়েটার’ চালু করেন। নাটকের শেষে পাতা গামছা বা টুপিতে দর্শক যা স্বেচ্ছায় দিতেন, তাতেই চলত তাঁর দল ‘শতাব্দী’। এটি কোনওভাবেই ভিখারীবৃত্তি বা অনুকম্পা ছিল না, ছিল বিশ্বগ্রাসী পুঁজিবাদের ‘এক্সচেঞ্জ ভ্যালু’ বা বিনিময় মূল্যের মুখে এক সপাটে চড়। বাদল সরকার একে বলতেন ‘থিয়েটার অফ অবলিগেশন’ বা দায়বদ্ধতার থিয়েটার– যেখানে দর্শক ও অভিনেতার সম্পর্ক ক্রেতা-বিক্রেতার নয়, বরং এক মানবিক চুক্তির। দু’জনেই নিজ নিজ যুগে প্রমাণ করে গেছেন, মানুষের অন্তরের সৃজনশীলতা আর আত্মিক ক্ষুধা কোনওভাবেই বাজারের স্থূল কেনাবেচার নিয়মে বাঁধা পড়তে পারে না। বাদল সরকারের এই ‘সেকুলার বৈরাগ্য’ (Secular Asceticism) আসলে চৈতন্যের সেই প্রাতিষ্ঠানিক ত্যাগেরই এক আধুনিক, রাজনৈতিক রূপান্তর– যেখানে যাবতীয় বাহ্যিক আড়ম্বর বর্জন করে জীবনের অকৃত্রিম সারবত্তাকে বুকে টেনে নেওয়া হয়।
আজকের দিনে যখন আমরা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে মুখ গুঁজে ভার্চুয়াল জগতে সারাক্ষণ ‘কানেক্টেড’ থাকার এক মারাত্মক ভ্রম নিয়ে বেঁচে আছি, যখন আমাদের সমস্ত মানবিক সম্পর্কগুলো অ্যালগরিদমের হাতে বন্দি, তখন চৈতন্য আর বাদল সরকারের এই ‘সরাসরি সংযোগ’, সামনাসামনি চোখের দিকে তাকানো বা স্পর্শের দর্শন বড় বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাঁরা দু’জনেই চেয়েছিলেন মানুষে মানুষে তৈরি হওয়া অদৃশ্য বর্ণবাদী, শ্রেণিগত ও অর্থনৈতিক দেওয়ালগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে। ভিআইপি সংস্কৃতি যখন সাধারণের দিকে মুখ বেঁকিয়ে বলে, ‘মেরে অঙ্গনা মে তুমহারা ক্যায়া কাম হ্যায়’, তখন বাদল সরকারের ‘অঙ্গনে’ দর্শক ও অভিনেতার মধ্যবর্তী দূরত্ব ঘুচে গিয়ে তৈরি হয় স্পন্দমান ‘কমিউনিটি’ বোধ।

শ্রীচৈতন্যদেবের ৫৪০তম জন্মতিথি এবং বাদল সরকারের শতবর্ষ– ইতিহাসের এই দুই যুগান্তকারী মাইলফলকের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা আজ এক নতুন আলোকে উপলব্ধি করি যে, বাংলার মাটিতে ‘বিপ্লব’ কোনও আকাশ থেকে পড়া বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ নয়। তা সে পঞ্চদশ শতাব্দীর উত্তাল ‘ভক্তি আন্দোলন’ হোক বা বিংশ শতাব্দীর নকশালবাড়ি-পরবর্তী ‘তৃতীয় থিয়েটার’– এগুলি আসলে একই দেশজ, লৌকিক মানবতাবাদী (Folk Humanist) ঐতিহ্যের ভিন্ন ভিন্ন সময়ের, ভিন্ন ভিন্ন ভাষার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। শ্রীচৈতন্যদেব যে সাম্য ও মুক্তির বীজ এই পলিমাটিতে রোপণ করেছিলেন, বাদল সরকার তাকেই আধুনিক রাজনৈতিক মনন ও মার্কসীয় দ্বান্দ্বিকতার জলসিঞ্চনে এক মহীরুহে পরিণত করেছেন।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved