Robbar

সত্যজিতের সিনেমায় একচোখের ব্যবহার

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 3, 2026 5:37 pm
  • Updated:January 3, 2026 5:37 pm  

‘কিনো আই’ প্রতীকের সেই একটি চোখ, যে চোখটি পাশের চোখ এবং গাল, কপাল ও নাক থেকেও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন– সেই রকম একটি বিচ্ছিন্ন চোখ দিয়েই সত্যজিৎ রায় প্রথমবার অপুকে পরিচয় করিয়ে দিলেন আমাদের সঙ্গে। পৃথিবীর সঙ্গেও। অপুর এক চোখ বেরিয়ে আছে তার গায়ের কাঁথার একটি ফুটো দিয়ে। সমস্ত পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন সেই চোখ। জিগা ভের্তভ-এর কিনো আই-এর প্রতীকের মতো দেখতে ‘একক নয়ন’ দেখিয়ে কেন অপুকে পরিচয় করিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়?

সুদেষ্ণা গোস্বামী

সত্যজিৎ রায় অপুকে সমগ্র পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করেছিলেন কোন টুকরো ছবির মাধ্যমে?

পাঠশালায় যাওয়ার প্রথম দিন অপুর ভেজা চুল যখন দুর্গা আঁচড়ে দিচ্ছে? নাকি, পায়ে চলা মেঠো পথ দিয়ে দিদির সঙ্গে অপু হেঁটে চলেছে পাঠশালার দিকে? না, কোলে স্লেট নিয়ে পাঠশালায় বসে মুচকি মুচকি হাসছে অপু?

না, এগুলোর কোনওটাই নয়। অপুর সঙ্গে আমাদের প্রথমবার পরিচয় ঘটে কাঁথার ফাঁক দিয়ে দেখা এক চোখের মাধ্যমে। কেন এক চোখ?

সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালী’, অপুর প্রথম সাক্ষাৎ

তবে, সত্যজিৎ রায় কি কোনও বিশেষ কারণে ‘একক-নয়ন তত্ত্ব’ ব্যবহার করেছিলেন ‘পথের পাঁচালী’তে?

শুরুতেই কেন একটি মাত্র চোখ হয়ে উঠল অপুর প্রতীক? এর উত্তর পেতে হলে আমাদের পৌঁছে যেতে হবে সিনেমায় প্রতীক ব্যবহারের আদি পর্বে।

শুধুই কাহিনির মধ্যেই নয়– প্রতীকের প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন প্রযোজকরাও। কীভাবে? তাঁরা ঠিক করলেন, প্রতীকের মধ্যে গেঁথে দেওয়া হবে একটা ছবি। সেই ছবিটাই  মানুষের মনে থাকবে। আর সেই ছবির সূত্রেই জনগণের মনে বারবার ফিরে আসবে প্রযোজনা সংস্থার নাম।

কয়েকটা প্রতীক ছিল প্রচণ্ড জনপ্রিয়। যেমন মেট্রো গোল্ডউইন মেয়ারের সেই গর্জনরত, কেশর ফাঁপানো সিংহ! কলাম্বিয়া ট্রাইস্টার-এর পেগ্যাসাস– বিশাল দু’টি ডানা মেলা ধপধপে সাদা পক্ষীরাজ। আর স্টিভেন স্পিলবার্গের প্রোডাকশন কোম্পানি ‘ড্রিম ওয়ার্কস’-এর প্রতীকে আমাদের চেনা সেই ১০ বছরের ছেলেটা– একফালি চাঁদের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে, মহাকাশে ছিপ ফেলে মাছ ধরার তাল করছে।

মেট্রো গোল্ডউইন মেয়ারের সেই গর্জনরত সিংহ

ভারতের দুই প্রযোজনা সংস্থার প্রতীক এখনও অম্লান আমাদের স্মৃতিতে।

তার মধ্যে একটিতে দেখছি দুই শিশু আকাশের দিকে মুখ তুলে বিউগল বাজাচ্ছে। ওটা ছিল রাজ কাপুরের প্রযোজনা সংস্থা আর.কে. স্টুডিও-র প্রতীক। কলকাতার অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রযোজক নিউ থিয়েটার্সের লোগোয় দেখা যেত একটা হাতির মুখের প্রোফাইল– শুঁড় তুলে যে সেলাম করছে।

ওপরের সবকটা লোগোতে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। যাকে বলে,‌ একই প্যাটার্ন ফিরে আসছে বারবার। সব ক’টা লোগোই মাত্রাতিরিক্ত প্রচারধর্মী। কখনও সিংহের গর্জন শুনিয়ে, কখনও বিউগল বাজিয়ে, কখনও হাতির বৃংহতি শুনিয়ে। আবার কখনও পক্ষীরাজ ঘোড়ার মতো বিরাট পাখনা আকাশে মেলে। প্রতিটি প্রতীকেই ফেটে বেরচ্ছে উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর বাণিজ্যিক সাফল্যের সুখস্বপ্ন। সিনেমা যে একটি আর্ট, সেই আর্টের যে একটি ফিলোজফি আছে– এই সমস্ত প্রতীক দেখে সে-কথা বোঝার কোনও উপায় নেই।

শুধু একটাই প্রতীক মনে পড়ছে, যা সিনেমার ফিলোজফিকে ব্যঞ্জনা দিয়েছিল। সেই প্রতীক অবশ্য হলিউডে তৈরি করা হয়নি। সেটা তৈরি হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নে। তখন ভিআই লেনিন বুঝতে পেরেছেন– সামাজিক উন্নয়নের মার্কসবাদী নীতির প্রচারে সিনেমা হয়ে উঠতে পারে জোরালো হাতিয়ার। সুতরাং, সেই সময় সিনেমার উদ্দেশ্য হয়ে উঠল বাণিজ্যের অতীত এবং অনেকটাই ফিলোজফিক্যাল। সেই ভাবনা-চিন্তা ফুটে উঠল একটি লোগোতে।

এই লোগো ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের পরিচালক জিগা ভের্তভ-এর ভাবনা প্রসূত। লোগোর নাম ‘কিনো আই’। অর্থাৎ, ক্যামেরার চোখ। ক্যামেরার দেখা।

এই লোগোতে কী দেখি আমরা? একটি লেন্সের পিছনে ঝলমল করছে একটি মাত্র চোখ। সেই চোখটা আবার বিস্ময়ে বিস্ফারিত! কীসের বিস্ময়? পৃথিবীকে নতুন করে দেখার বিস্ময়!

পরিচালক জিগা ভের্তভ-এর ‘কিনো আই’

একক নয়ন তত্ত্ব 

কেন এই চোখ পৃথিবীকে নতুন করে দেখে? কারণ, জিগা ভের্তভ অনুভব করেছিলেন, ক্যামেরা এমন অনেক কিছুই দেখতে পায়– মানুষের চোখে সেই সব ধরা পড়েই না। অর্থাৎ, মানুষের দৃষ্টি প্রচুর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ডিটেলকে অবহেলা করে। তাই দেখতে পায় না। মনেও রাখতে পারে না।  

সেই দিক থেকে ভাবলে, আমাদের বিশুদ্ধ ও বিশিষ্ট দৃষ্টি উপহার দিয়েছে ক্যামেরার চোখ– যেটা সৃষ্টি হয়েছে লেন্স, শাটার আর চলমান ফিল্মের সম্মিলিত কার্যকলাপে। এই তিনের নিখুঁত অর্কেস্ট্রেশনে।

জিগা ভের্তভ তাঁর ‘ম্যান উইথ আ মুভি ক্যামেরা’ (১৯২৯) ছবিটি নির্মাণ করেছিলেন সম্পূর্ণভাবে তাঁর ঘোষিত তাত্ত্বিক ধারণা ‘কিনো-আই (Kino-Eye)’-এর ভিত্তিতে। এই পদ্ধতির মূল বিশ্বাস ছিল, ক্যামেরা মানুষের চোখের চেয়েও বেশি সত্য দেখতে পারে। তাই তিনি ছবির শুটিংয়ে কোনও চিত্রনাট্য, কোনও অভিনেতা, কোনও সেট, কোনও আলোকসজ্জা বা পুনর্নির্মিত দৃশ্য ব্যবহার করেননি।

জিগা ভের্তভের ‘ম্যান উইথ আ মুভি ক্যামেরা’র দৃশ্য

ভের্তভ শহরের রাস্তায়, কলকারখানায়, ট্রামে, বিয়ে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, শ্রমিকের কাজ, অবসর– এই সব দৈনন্দিন বাস্তব জীবনের ঘটনাকে সরাসরি ক্যামেরায় ধরেন। সেই দৃশ্যপট থেকে ভের্তভ গল্প বলার চেষ্টা করেছেন। কাজেই সেখানে ক্যামেরা হয়ে ওঠে একজন সচেতন পর্যবেক্ষক।

আমরা জানি, আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি তত্ত্বের দু’টি ভাগ পৃথিবী কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ১৯০৫ সালে ‘স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটি’ এবং ১৯১৫ সালে ‘জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি’।

জিগা ভের্তভ কাজ শুরু করেছিলেন আইনস্টাইনের দ্বিতীয় তত্ত্বেরও দীর্ঘ ১২ বছর পর। সুতরাং, আইনস্টাইনের তত্ত্ব ভের্তভের চলচ্চিত্র-ভাষাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তাই তিনি জানতেন, পর্যবেক্ষক (অবজার্ভার)-এর অবস্থান অতি সামান্য পাল্টে গেলেও সত্য (ট্রুথ) পাল্টে যায়। এক চোখ থেকে অন্য চোখের দূরত্ব আছেই। এই দূরত্ব অনিবার্য। তাই দুই চোখ দু’-রকমের ট্রুথকে পর্যবেক্ষণ করে। তাই এক চোখের দৃষ্টিকে এত গুরুত্ব দিয়েছেন জিগা ভের্তভ। তিনি বলেছেন, “From the viewpoint of the ordinary eye you see untruth. From the viewpoint of the cinematic eye you see the truth. If it’s a question of reading someone’s thoughts at a distance, then you have that opportunity right here. It has been revealed by the kino-eye.”

‘পথের পাচালী’-তে এই ‘একক নয়ন’ আসলে ক্যামেরার চোখ ও অপুর চোখের মিলনবিন্দু। এখানে দর্শক আর চরিত্র আলাদা থাকে না। আমরা অপুকে শুধুমাত্র দেখি না– অপুর সঙ্গে দেখার অভ্যাস গড়ে তুলি। সে আমাদের দেখতে শেখায়।

একক নয়ন: ক্য়ামেরার চোখ এবং অপুর চোখ

আসলে, ডেপ্থ অব ফিল্ড আমাদের চোখে দূরত্বের অনুভূতি তৈরি করে। আমরা যখন দুই চোখে দেখি, তখন জগতের গভীরতা, পারিপার্শ্বিকতা ও বহুস্তর একসঙ্গে ধরা পড়ে। কিন্তু এক চোখে দেখলে সেই ডেপ্থ অব ফিল্ড অনেকটাই উধাও হয়ে যায়। তখন দর্শন একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত হয়। যে বিষয়টি দেখা হচ্ছে, সেটিকেই আমরা মন দিয়ে দেখতে শুরু করি, ব্যাকগ্রাউন্ডের গুরুত্ব কমিয়ে।

এই একই কারণেই জলদস্যুরা একচোখা দূরবিন ব্যবহার করত। যদি তারা দুইচোখা বাইনোকুলার দিয়ে দেখত, তাহলে শত্রু জাহাজের সঙ্গে সঙ্গে আকাশ, বাতাস, জল– অসংখ্য অপ্রাসঙ্গিক উপাদান চোখে পড়ত। কিন্তু একচোখা দূরবিন তাদের দৃষ্টি সংকুচিত করে দিত, মনোনিবেশ ঘটাত। অতএব, দুই চোখে দেখা মানে উপভোগ করা, আর এক চোখে দেখা মানে মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করা।

মানুষ খালি চোখে সব ডিটেল দেখতে পারে না, তাই মনেও ধরে রাখতে পারে না। কিন্তু ক্যামেরা পারে। ক্যামেরা তার একচোখা ভিউ-ফাইন্ডারের মাধ্যমে এমন সব সূক্ষ্মতা ধরে ফেলে, যা মানুষের স্বাভাবিক দৃষ্টির বাইরে থেকে যায়। এই কারণেই ক্যামেরার চোখ দিয়ে মানুষ বেশি দেখতে শেখে এবং সেই দেখা থেকে দার্শনিক তাৎপর্য ছেঁকে নিতে পারে।

ভের্তভ বিশ্বাস করতেন, পুনর্নির্মিত বা অভিনীত ঘটনা বাস্তবকে বিকৃত করে। তাঁর মতে, মঞ্চস্থ করা মানেই সত্যকে সাজিয়ে তোলা। তাই তিনি অভিনেতা, সংলাপ ও নাটকীয়তার সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন। তাঁর সিনেমা হল, জীবন যেমন আছে, ঠিক তেমন– কোনও অলংকার বা আতিশয্য ছাড়া। এইভাবেই তিনি বাস্তব জীবনের ছন্দ ও গতিকে প্রকাশ করেছেন।

জিগা ভের্তভ

ঘটনা পুনর্নির্মাণ না করলে পরিচালক ও অভিনেতার নিয়ন্ত্রণ কমে যায়, আর বাস্তব মুহূর্ত ধরার দায়িত্ব পুরোপুরি এসে পড়ে সিনেমাটোগ্রাফারের ওপর। কোন মুহূর্ত ধরতে হবে, কোন অ্যাঙ্গেল থেকে, ঠিক কত দূরত্বে– এই সিদ্ধান্তগুলোই ছবির অর্থ নির্মাণ করে। তখন সিনেমাটোগ্রাফার হয়ে ওঠেন সিনেমা দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ বাহক ও সমাজ পর্যবেক্ষক। বাস্তবকে দেখার দায়িত্ব তাঁর চোখেই ন্যস্ত হয়। ফলে, ভের্তভ এমন একটি ঘরানার ফিল্ম-মেকিং প্রচলন করেছিলেন– যে ঘরানায় সিনেমাটোগ্রাফারের ভূমিকাই মুখ্য। পরিচালকের ভূমিকা গৌণ। চিত্রনাট্যকারের কোনও অস্তিত্ব নেই।

ভের্তভ তাঁর প্রবন্ধসংকলন ‘We: Variant of a Manifesto’ এবং ‘Kino-Eye’-তে বলেছিলেন,The cinema of actors is replaced by the cinema of facts.’ তাঁর মতে, বাস্তব সময়, বাস্তব স্থান, বাস্তব ঘটনাই সিনেমার নৈতিক ভিত্তি। তাই পুনর্নির্মাণ-বিহীন সিনেমায় ক্যামেরার অবস্থান, ফ্রেম ও সময় নির্বাচন-ই প্রকৃত দর্শনের বাহক। ফলে সিনেমাটোগ্রাফার হয়ে ওঠেন অচেতন বাস্তবতার অনুবাদক, শিল্পী, দার্শনিক ও সমাজ বিশ্লেষক।

‘কিনো আই’ প্রতীকের সেই একটি চোখ, যে চোখটি পাশের চোখ এবং গাল, কপাল ও নাক থেকেও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন– সেই রকম একটি বিচ্ছিন্ন চোখ দিয়েই সত্যজিৎ রায় প্রথমবার অপুকে পরিচয় করিয়ে দিলেন আমাদের সঙ্গে। পৃথিবীর সঙ্গেও। অপুর এক চোখ বেরিয়ে আছে তার গায়ের কাঁথার একটি ফুটো দিয়ে। সমস্ত পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন সেই চোখ।

জিগা ভের্তভ-এর কিনো আই-এর প্রতীকের মতো দেখতে ‘একক নয়ন’ দেখিয়ে কেন অপুকে পরিচয় করিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়?

 

ভের্তভ-এর এক চোখ = অপুর এক চোখ 

অপু যখন প্রথম আমাদের সামনে আসে, সে তখনও কোনও সমাজে প্রবেশ করেনি। সে পুত্র, ছাত্র, নাগরিক– কিছুই নয়। সে কেবল এক জিজ্ঞাসু সত্তা। কাঁথার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসা চোখটি অপর আরেকটি চোখ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছে। এই দৃষ্টি নিষ্কলুষ ও নিরপেক্ষ।

এখানেই ভের্তভের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের গভীর মিল। ভের্তভ যেমন বিশ্বাস করতেন, সত্য ধরা পড়ে তখনই, যখন ক্যামেরা মঞ্চ ছেড়ে বাস্তবে আসে। তেমনই সত্যজিৎ রায় বিশ্বাস করেন, মানুষের সত্য আত্মপ্রকাশ ঘটে তখনই, যখন সে সামাজিক মুখোশের বাইরে থাকে। অপুকে তাই তিনি কোনও নাটকীয় প্রবেশে পরিচয় করাননি। কেবল একটি মাত্র চোখই যথার্থ সেখানে।

‘পথের পাঁচালী’-তে অপু তার সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে দেখার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই বড় হয়। সে বারবার তাকিয়ে দেখে– ইন্দিরা ঠাকরুণের মৃত্যু, অপু ঘুম থেকে উঠে দেখে দুর্গার মৃত্যু। ‘অপরাজিত’তে হরিহরের মৃত্যু। তারপর শহর কলকাতাকে দেখে অপার বিস্ময়ে। ‘অপুর সংসার’-এর শেষ দৃশ্যে কাজলের দৌড়ে আসাটাকেও সে দীর্ঘক্ষণ ধরে তাকিয়ে দেখে। অপু কেবল ঘটনাগুলো প্রত্যক্ষ করে না– তার এই ‘দেখা’টাই তৈরি করে জীবন দর্শন।

১৯৮১ সালে অ্যাকাডেমিতে অধ্যাপক অমল ভট্টাচার্য স্মৃতি বক্তৃতায় সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন,
‘আমাদের বাঙালীদের মন যে সংবেদনশীল, সেটা আমরা জানি। কিন্তু আমি আবেদন করছি– মনটাকে একটু কমিয়ে চোখটাকে তৈরি করতে হবে। দেখতে শিখতে হবে। চোখের গুরুত্ব বাড়াতে হবে।’

এই দর্শন শুধু অপু ট্রিলজিতে নয়, ফেলুদার চরিত্রেও বারবার ফিরে এসেছে। ফেলুদাকে দিয়েও সত্যজিৎ রায় আমাদের বলেন– অবজার্ভ করতে হবে, ভালো করে দেখতে জানতে হবে। কারণ দেখা মানেই জানা নয়, সঠিকভাবে দেখা মানেই বোঝা।

ভের্তভের ‘ম্যান উইথ আ মুভি ক্যামেরা’– এ কোনও গল্প নেই, তবু সমাজ আছে। শ্রমিকের হাত, শহরের যান্ত্রিক গতি, মানুষের দৈনন্দিন জীবন– এই সব মিলিয়ে সমাজ নিজেই কাহিনি হয়ে ওঠে। সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ থেকে ‘মহানগর’ পর্যন্ত ছবিগুলিতেও গল্পের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে জীবনের প্রবাহ। ঘটনা ঘটে, কিন্তু ঘটনার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে ঘটনার মধ্যবর্তী নীরবতা। এই নীরবতা ভের্তভীয়। 

‘চারুলতা’ ছবির শুরুতে চারু এ-জানলা থেকে ও-জানলা খড়খড়ি সরিয়ে বাইরের জগৎ– রাস্তাঘাট, মানুষ, তাদের ভিন্ন কাজ, চলাচল ইত্যাদি দেখে। চারু যখন ভাবে তখন সে দেখে। চারু পরে দোলনায় বসে ভাবছিল নদী, পালতোলা নৌকা, মায়ের কথা, চরকা কাটার কথা, নাগরদোলা, আতশবাজি, শিবের গাঁজন, গ্রামের কথা, তার পিছনে ডিজলভ্‌-এ চারুর চোখের ক্লোজ আপ দেখা যাচ্ছে। অতএব চারুর শৈশবের ভাবনা ও স্মৃতির পিছনে কিন্তু সর্বদা চোখটা খোলা আছে। এইটাই সত্যজিতীয় দর্শন–আগে দেখো তারপর ভাবো বা দেখতে-দেখতে ভাবো।

‘টু’ ছবিতে বিত্তবান ছেলেটি উঁচু থেকে সবটা দেখছে বলে তাই সে পৃথিবীকে নিচু চোখে দেখছে।

ক্যামেরার চোখ প্রসঙ্গে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, ‘ক্যামেরা এক চোখ দিয়ে দেখে এবং ক্যামেরা চোখের পাতা না-ফেলে দেখে। দেখতেই থাকে।’

এই দু’টি কারণেই ক্যামেরার দেখা আর মানুষের দেখা একরকম নয়। এই কথা সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর কাস্টিং প্রসঙ্গে। এটি ‘সন্দেশ’-এ ধারাবাহিক রচনায়, বৈশাখ থেকে শ্রাবণ সংখ্যায় ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধের নাম– ‘ফেলুদার সঙ্গে কাশীতে’।

ভের্তভ ও সত্যজিতের সাদৃশ্য– তিনটি স্পষ্ট বৈশিষ্ট্য  

জিগা ভের্তভের চলচ্চিত্র-দর্শনের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র-দর্শনের কয়েকটি সাদৃশ্য আছে। এখন প্রশ্ন জিগা ভের্তভের শিল্প দৃষ্টির সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের শিল্প দৃষ্টির সাদৃশ্য কোথায় কোথায়? 

সত্যজিৎ রায় অবশ্যই ঘটনার পুনর্নির্মাণ করতে বাধ্য হতেন। কিন্তু পুনর্নির্মাণ করা সত্ত্বেও, সত্যজিতের ছবির বাস্তবতা এবং ভের্তভের ছবির বাস্তবতা ৭৫% একই রকম। অন্তত তাঁর জীবনের প্রথম ১১টি ছবিতে। অর্থাৎ, ‘পথের পাঁচালী’ থেকে শুরু করে ‘মহানগর’ পর্যন্ত। 

দুই শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গির অন্তর্লীন আত্মীয়তা উন্মোচন করা যাক। আশ্চর্যজনকভাবে, তাঁদের দৃষ্টির গভীরে একটি অভিন্ন সত্য কাজ করছে। বাস্তবতার প্রতি এক নৈতিক আনুগত্য।

জিগা ভের্তভের শট কম্পোজিশনের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের প্রথম ১১টা ছবির শট কম্পোজিশনের তিনটে সাদৃশ্য খুবই স্পষ্ট। সত্যজিৎ রায় যে জিগা ভের্তভের চলচ্চিত্র-দর্শন থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন– তার অজস্র প্রমাণ ছড়িয়ে আছে ‘পথের পাঁচালী’ থেকে ‘মহানগর’ পর্যন্ত সব ক’টি ছবিতেই।

তিন গোত্রের সাদৃশ্য আছে এই দুই পরিচালকের কম্পোজিশনে। এখনও যাঁরা মনোযোগ দিয়ে সিনেমা দেখেন, তাঁদের সবারই চোখ এবং মস্তিষ্ক এই তিনটি সাদৃশ্য ধরতে পারবেন। এক এক করে বলছি–

প্রথম সাদৃশ্য

জিগা ভের্তভ নিজের ছবিতে এমন কোনও ক্লোজ আপ কখনও-ই রাখতেন না, যা পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। সোজা কথায়, ভের্তভ যখন কোনও মানুষের মুখের ফোটোগ্রাফি করতেন, তখন সেই মানুষটির মুখের আশপাশে অন্যান্য বহু এলিমেন্ট দেখা যেত। হয়তো অন্যান্য মানুষ বা নানা যন্ত্রপাতি। কারণ, ভের্তভ বিশ্বাস করতেন, যে কোনও মানুষেরই মুখের ব্যঞ্জনা তাকে ঘিরে সামাজিক টানাপোড়েনের ফল। যে সমস্ত বস্তু বা ব্যক্তি সেই টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে মানুষটিকে ঘিরে– তাদেরও ভের্তভ অন্তর্ভুক্ত করতেন ক্লোজ আপ শটের মধ্যেও।

এর কারণ কী? 

১৯১৭ সালে রাশিয়ায় বিস্ফোরক ও বৈপ্লবিক গণ অভ্যুত্থানের সময় জিগা ভের্তভ ছিলেন ২১ বছর বয়সি টগবগে তরুণ। সুতরা তাঁর মস্তিষ্কে ও হৃদয়ে উন্মাদ ঝড় বইয়ে দিলেন ভিআই লেনিন। সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্ম তাঁর চেতনাকে স্বভাবতই আলোড়িত করেছিল। এবং লেনিন বিশ্বাস করতেন, কোনও মানুষই বিচ্ছিন্ন কোনও মনস্তাত্ত্বিক দ্বীপের নিঃসঙ্গ অধিবাসী নন, ব্যক্তিমানুষ আসলে বিভিন্ন পরস্পরবিরোধী সামাজিক শক্তির ফল। লেনিনের এই অভিমতকে অনুসরণ করেই গড়ে উঠেছিল জিগা ভের্তভের চলচ্চিত্র-দর্শন। তাই তিনি সামাজিক শক্তিগুলোকেও জায়গা করে দিতেন তাঁর ছবির ক্লোজ আপে।

এখানেই সত্যজিৎ রায়ের ক্লোজ আপ ভের্তভের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। কারণটা প্রায় একই রকম। সত্যজিৎ রায়ও কৈশোরে বিভিন্ন গণ আন্দোলনের ফোটোগ্রাফ দেখতে দেখতে বড় হয়েছেন। সরাসরি যোগ দেওয়ার বয়স হয়তো হয়নি, এবং সেই সব আন্দোলনের অধিকাংশই হয়েছিল কলকাতা থেকে অনেক দূরে, কিন্তু খবরের কাগজে গান্ধীজির গণমিছিলের ছবি ছাপা হত নিয়মিত। কোনও ছবিতেই গান্ধীজি বা নেহরুকে সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দেখা যায়নি। সুতরাং, ভের্তভের জীবনে সোভিয়েত গণ-উত্থান যে ভূমিকা পালন করেছিল, সত্যজিতের জীবনে সেই একই ভূমিকা পালন করেছিল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ফোটোগ্রাফিক ডকুমেন্টেশন। সেই কারণেই ‘মহানগর’ পর্যন্ত কোনও ছবিতেই পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন ক্লোজ আপ নেই বললেই চলে।

‘অপরাজিত’র শুটিং-এ

দ্বিতীয় সাদৃশ্য

রাজপথের সিনেমাটোগ্রাফি করার সময় জিগা ভের্তভ সব সময় একই পথের উপর দু’টি আলাদা বিপরীতমুখী জনস্রোত অথবা যানবাহনের স্রোত ব্যবহার করতেন। যেমন পাশাপাশি ট্র্যাকে বিপরীতমুখী দু’টি ট্রাম। পরশপাথর ছবিতেও, ডালহৌসি স্কোয়ারে রাজপথের ছবি তোলার সময় এই একই কৌশল প্রয়োগ করেছেন সত্যজিৎ রায়। অফিস ফেরত মানুষের ভিড় তুলেছিলেন তিনি। সত্যজিৎ রায় স্পষ্ট বিভাজন করে নিয়েছিলেন রাজপথকে। কালো রঙের জাঁদরেল গাড়ির সারি যেদিকে চলেছে, সাদা রঙের ধুতি শার্ট পরা অগণিত ক্লান্ত করণিকের স্রোত এগিয়ে চলেছে জাঁদরেল গাড়ির সারিকে ৯০ ডিগ্রিতে কেটে দিয়ে। এই যে কাটাকুটি খেলা– এটাই ছিল জিগা ভের্তভ ও সত্যজিৎ রায়ের রাজপথের সিনেমাটোগ্রাফিক কম্পোজিশনের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

তৃতীয় সাদৃশ্য

আরও একটি বৈশিষ্ট্যের কথা না-বললেই নয়। 

ভের্তভের রাজপথের সিনেমাটোগ্রাফির প্রধান একটি চিহ্ন, উনি পথচলতি মানুষ ও মানুষের হাতে টানা কোনও যানবাহনের ছবি তুলতেন ক্যামেরাকে নিজের হাঁটুর উচ্চতায় রেখে। এই শিক্ষাও তিনি পেয়েছিলেন তাঁর মার্কসবাদী শিক্ষা থেকেই। কেন? কারণ, মানুষকে উঁচু থেকে থেকে দেখাটা নীতিবিরুদ্ধ। মানুষের সামনে নতজানু হতে হবে। তবেই ক্যামেরায় ধরা পড়বে উত্তুঙ্গ উদ্দীপ্ত মানবসত্তা।

ভের্তভের সিনেমাটোগ্রাফি

সত্যজিৎ রায়ও ছিলেন এই দৃষ্টিভঙ্গির অনুসারী। হ্যাঁ, একেবারেই তাঁর শেষ ছবির শেষ শট পর্যন্ত। সত্যজিতের ক্যামেরা কদাচিৎ মানুষকে পর্যবেক্ষণ করেছে ওপর থেকে।

ভের্তভ ও সত্যজিতের এই সকল সাদৃশ্য কোনও কাকতালীয় নয়, বরং একই রকম যৌথ দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির ফল।

…………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন সুদেষ্ণা গোস্বামী-র অন্যান্য লেখা

…………………….