Robbar

বাংলায় ইসলামি গান এবং নজরুল-আব্বাসউদ্দিন যুগলবন্দি

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 21, 2026 9:41 pm
  • Updated:March 21, 2026 9:42 pm  

প্রথমদিকে আব্বাসউদ্দিন ও কাজী নজরুল ইসলাম-সহ সকলেই বাঙালি সমাজে গানটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সন্দিহান ও চিন্তায় ছিলেন। বাংলা গানের বাজারে তখন শ্যামা সংগীতের মোটামুটি একচ্ছত্র আধিপত্য। স্বয়ং নজরুলও শ্যামা সংগীত লেখেন, সুর করেন। ইসলামি ধারার গানের বাজারই গড়ে ওঠেনি। এই অবস্থায় স্রোতের বিপরীতে গিয়ে নজরুল গানটি লেখেন। প্রকাশিত হলে বাঙালি মুসলিম সমাজে গানটি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, গ্রামোফোন কোম্পানির রেকর্ডের জনপ্রিয়তার মূল হয়ে দাঁড়ায় ইসলামি গান।

সুমন সেনগুপ্ত

‘রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ’– কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত গানটি বাঙালি মুসলমান সমাজে ইদের আবহ গান হিসেবে পরিচিত এবং বাঙালির ইদ আনন্দের এক আবশ্যকীয় অংশ হয়ে উঠেছে। কাজী নজরুল ইসলামের শিষ্য ও বিশেষ বন্ধু শিল্পী আব্বাসউদ্দিন আহমেদের অনুরোধে ১৯৩১ সালে কবি নজরুল এই গান রচনা ও সুরারোপ করেন।

কাজী নজরুল ইসলাম

একটা সময়ে যেমন বাঙালি হিন্দু সমাজে পুজোর গানের প্রচলন ছিল, তেমনই বাঙালি মুসলমান সমাজেও ইদের গান ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আজ যেমন আর পুজোর গান হিসেবে কোনও গান তেমনভাবে তৈরি হয় না, ঠিক তেমনই ইদের গান হিসেবেও নতুন কোনও গান শোনা যায় না। বেশ কয়েক বছর আগে, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার একটি গ্রামে কাজের সূত্রে গিয়ে কানে এসেছিল ওই গানটি। একটু দূরে একটি রিকশা-স্ট্যান্ডে বিশ্বকর্মা পুজোর তোড়জোড় চলছে। বক্স নিয়ে আসা হয়েছে গান চালানো হবে। একজন রিকশাচালক গান চালিয়ে দিয়েছে। তখনও এত মোবাইল ফোন আসেনি, তখনও সিডি প্লেয়ার ভাড়া পাওয়া যেত। কোনও একজন হিন্দু-রিকশা চালকই এই গানটি চালিয়ে দেন। কোথাও কিন্তু অসুবিধা হয়নি। কোথায় কে গান চালাচ্ছে, জানা নেই কিন্তু দূর থেকে ভেসে আসা সেই গান এবং তার সুর সেদিন মুগ্ধ করেছিল আমার মতো হয়তো অনেককেই। তারপরেই এই গান এবং তার ইতিহাস সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া।

তিনের দশকের দিকে বাংলা ভাষায় ইসলামি গান তেমন প্রচলিত ছিল না, তখন উর্দু ভাষার অন্যান্য গান বেশ জনপ্রিয় ছিল। এই পরিস্থিতি খেয়াল করে সেই সময়ে জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী আব্বাসউদ্দিন আহমেদ বাংলা ভাষায় ইসলামি গানের ব্যাপারে ভাবলেন। তিনি তাঁর ভাবনার কথা কাজী নজরুল ইসলামকে জানান। বিষয়টা কাজী নজরুল ইসলামের বেশ মনে ধরে। সেই সময়ে কাজী নজরুল ইসলাম ও আব্বাসউদ্দিন আহমেদ ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ অর্থাৎ, সেই সময়ের সবার পরিচিত গ্রামাফোন কোম্পানির জন্য গান রচনা করতেন এবং গাইতেন।

কাজী নজরুল ইসলাম আব্বাসউদ্দিনের এই ভাবনার কথা গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সাল ইনচার্জ ভগবতী ভট্টাচার্যকে জানাতে বলেন। আব্বাসউদ্দিন আহমেদ ভগবতীবাবুকে বিষয়টা জানালে, তৎকালীন বাঙালি সঙ্গীতাঙ্গনে ইসলামি সংগীতের গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে চিন্তা করে তিনি প্রথমে রাজি হননি। এককথায় না করে দিলেন ইসলামি ধারার গান করার প্রস্তাব। চলতি স্রোতের বিরুদ্ধে গিয়ে গান করে ব্যবসায় লালবাতি জ্বালাতে রাজি নন তিনি। কিন্তু সময়টা এখনকার মতো না-হওয়ায়, আব্বাসউদ্দিনের কয়েক-দফা অনুরোধের পর ভগবতীবাবু ইসলামি গান রেকর্ড করতে রাজি হন। ভগবতীবাবুর কাছে সম্মতি পাওয়ার পর আব্বাসউদ্দিন কাজী নজরুল ইসলামকে ব্যাপারটা জানান। বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গেই কাজী নজরুল ইসলাম গান রচনা করতে বসে যান। তারপরেই তৈরি হয় ওই বিখ্যাত গান।

আব্বাসউদ্দিন আহমেদ

প্রথমদিকে আব্বাসউদ্দিন ও কাজী নজরুল ইসলাম-সহ সকলেই বাঙালি সমাজে গানটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সন্দিহান ও চিন্তায় ছিলেন। বাংলা গানের বাজারে তখন শ্যামা সংগীতের মোটামুটি একচ্ছত্র আধিপত্য। স্বয়ং নজরুলও শ্যামা সংগীত লেখেন, সুর করেন। ইসলামি ধারার গানের বাজারই গড়ে ওঠেনি তখন। এই অবস্থায় স্রোতের বিপরীতে গিয়ে কাজ করে সফল হতে না-পারলে ক্যারিয়ারই বরবাদ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি গানটি লেখেন। প্রকাশিত হলে বাঙালি মুসলিম সমাজে গানটি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, গ্রামোফোন কোম্পানির রেকর্ডের জনপ্রিয়তার মূল হয়ে দাঁড়ায় ইসলামি গান। এরপর থেকেই ইসলামি গান বাংলা ভাষায় ভীষণভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে। ইসলামি গানের জনপ্রিয়তার জন্য অনেক হিন্দু সংগীতশিল্পীও মুসলিম ছদ্মনামে ইসলামি গান গাইতে শুরু করেন।

পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি মুসলমান ৯০ শতাংশের বেশি। তাঁদের বড় অংশ গ্রামের মানুষ। কৃষক বা ছোট ব্যবসায়ী। যে-সময়ে এই রাজ্যের বাঙালি-মুসলমানদের একটা অংশ নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর ফলে আজ নাগরিকত্ব হারানোর ভয়ে শঙ্কিত, তখন তার নিজস্ব সংস্কৃতিও যদি রাজনৈতিক কারণে হারিয়ে যায়, তখন সত্যিই এই ভুক্তভোগীরা আরও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন বইকি। তখনই মনে হয়, আমরা আসলে কাজী নজরুলকেও হয়তো বাঙালি ভাবি না, বেশিরভাগ মানুষের যেভাবে ভাবেন, ‘ও তুমি মুসলমান, আমি ভাবলাম তুমি বাঙালি’– তাই ভাবি। সেই জন্যেই হয়তো মনে করি, তিনি আগে মুসলমান, পরে বাঙালি। আমরা দুটো ইদের তফাত জানি না, আমরা মুসলমানদের ‘অপর’ মনে করি, সেই জন্যই হয়তো এত দূরত্ব, এত ভুল বোঝাবুঝি। আমরা কোনওদিনই ওই গানটার কথাগুলোও হয়তো অনুধাবন করার চেষ্টা করিনি। মানুষকে ভালোবাসার কথাই তিনি বলে গিয়েছেন–

তোরে মারল ছুঁড়ে জীবন জুড়ে ইট পাথর যারা,
সেই পাথর দিয়ে তোলরে গড়ে প্রেমেরই মসজিদ।
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ,
আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাগিদ।

কী অদ্ভুত সমাপতন! ঠিক যা যা ঘটছে আজকের সময়ে, তারই যেন বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে প্রায় ১০০ বছরের পুরনো ১৯৩১ সালের ওই গানের মধ্যে দিয়ে। এই লেখা যখন শেষের পথে, তখনই চোখ পড়ল রাজস্থানের একটি ভিডিওর দিকে। একদল হিন্দু-মানুষ ইদের নামাজে অংশ নেওয়া মুসলমানদের দিকে ফুল ছুড়ছেন! মনে হল, সব হিংসা বিদ্বেষের শেষ হয়, থেকে যায় ভালোবাসা। ঐক্য ও সম্প্রীতির এক সাধারণ দৃশ্য, যা আজ বিরল হয়ে গিয়েছে। মনে হল, এটাই তো আমাদের ভারত। যে দেশে আমরা বড় হয়ে উঠেছি, সেই ভারতবর্ষ।