Robbar

চক্ষে আমার তৃষ্ণা

Published by: Robbar Digital
  • Posted:February 14, 2026 3:07 pm
  • Updated:February 14, 2026 3:07 pm  

যোগেন চৌধুরীর ছবির নারীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের ‘দামিনী’ বা ‘বিনোদিনী’র এক গোপন যোগসূত্র পেয়ে যাই! রবীন্দ্র-চিত্রকলার নারীরা আপন শক্তিতে বলীয়ান হলেও ধূসর, রহসাচ্ছন্ন কিংবা মায়াময়, তাঁদের যৌনতা বা ফিজিকালিটি স্পষ্ট নয়! যোগেন‌ চৌধুরীর নারীরা রহস্যময়ী হয়েও প্রবল যৌনতার মাদকতায় প্যাশনেট এবং জোরালো যৌন আবেদনপূর্ণ। যোগেন চৌধুরী তাঁর ছবিতে কবিতার স্পর্শ নিয়ে এলেও, বিশেষত নারীদের চোখে, এইসব নারীচরিত্র সৃষ্টিতে অনেক বেশি বাস্তব ও প্রাণবন্ত। তাঁর নারীরা রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলার নারীদের চেয়ে অনেক বেশি ‘রক্তমাংস’-এর!

সঞ্জয় ঘোষ

যোগেন চৌধুরী দীর্ঘ সময় ধরে ছবি এঁকে চলেছেন! সেই ছবির ধারাবাহিকতা অনুসরণ করে চলেছি যারা, তারা অনুভব করতে পারি তাঁর শিল্পযাত্রার ক্রমিক উত্তরণ, উপলব্ধি করতে পারি তাঁর শিল্পপথের বাঁকবদলের হদিশ! একেবারে সম্প্রতি শুরু হওয়া ‘দেবভাষা’য় তাঁর সাম্প্রতিকতম ছবির প্রদর্শনী ‘সুন্দরী’তে যেন‌ তাঁর এতদিনের ছবি আঁকার জীবনের এক ‘রেসারেকশান’ ঘটে গেল অতর্কিতে! এই বয়সে এসে এক গভীর মগ্নতায় তিনি এঁকে ফেললেন যেসব ছবি, তা যেন ছাপিয়ে গেল তাঁর এতদিনের সব উজ্জ্বল সৃষ্টিকেও! এবং এইসব ছবিতে তিনি তাঁর পূর্ববর্তী কাজের সারাৎসার ঢেলে দিয়েও তার মধ্যে চারিয়ে দিলেন এক নতুন শিল্পসম্ভাবনার বীজ!

‘সুন্দরী’ শিরোনামে যোগেন চৌধুরী আগেও ছবি এঁকেছেন! কিন্তু এইবারের সিরিজে তিনি সেইসব ছবি পেরিয়ে এক অপরূপ নতুন মাত্রা যোগ করলেন প্রকাশভঙ্গি ও বিষয়ে! নারীর সৌন্দর্য অবলোকন এইসব চিত্রের পটভূমি হলেও আমরা মনে রাখব যে, এইসব ছবি ‘চিত্রগত সৌন্দর্য ‘ বা ‘pictorial beauty’-রও এক অসামান্য দ্যোতক! এইসব ছবিতে চিত্রকলার প্লাস্টিক ধর্ম এক অসাধারণ উচ্চতা স্পর্শ করে ফেলেছে! সব ছবিই খুব স্বল্প কারুকার্যে আঁকা, খয়েরি কন্টির নিবিড় সংবেদনশীল আকুল রেখা আর কোথাও কোথাও তারই হালকা শেড এইসব ছবির রিক্ত পটকে এক অভাবনীয় বৈভব দান করেছে! রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘নেই আয়োজন,… নেই আভরণ, নেই আবরণ–’! ছবির রেখার তীব্র সর্পিল আলোড়ন, কম্পোজিশনের ‘অধরা মাধুরী’ স্পেশ বিভাজনের অস্ফুট ফিসফাস, টেক্সচারের মৃদু ভৈরবী রাগ– এইসব মিলে রচিত হয়েছে এই সিরিজের ছবির ‘pictorial beauty’, যা নারীর বাহ্যিক রূপকে করে তুলেছে ‘চিরকালীন’ বা ‘ক্লাসিকাল’! ‘ডেকরেটিভ’ ডিজাইনও যে ছবির আত্মায় এক বিমূর্ত প্রাণ সঞ্চার করে দিতে পারে– এ নিয়ে যোগেন চৌধুরীর দীর্ঘ পরীক্ষা-নীরিক্ষা এইসব ছবিতে যেন চরম উৎকর্ষের ডানা মেলে ধরল!

দ্বিমাত্রিক ফর্মে, মূলতঃ প্রাচ্য পদ্ধতিতে আঁকা এইসব ছবিতে একেকজন নারীর মুখের এক্সপ্রেশনে ও  মোডে তিনি প্রত্যেকবার যে পৃথক পৃথক ভঙ্গিমা এনেছেন ও নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা তাঁর পাশ্চাত্য পদ্ধতিতে শিল্পশিক্ষার এক জোরালো লিগাসির ইঙ্গিত দেয়! এইভাবে যোগেন চৌধুরীর এইসব ছবি হয়ে দাঁড়ায় ‘সবপথ শেষে মিলে গেল এসে তোমারি দুখানি নয়নে’র মধ্যে দিয়ে শিল্পের পথ আর জীবনের পথের একাকার হয়ে যাবার এক মর্মস্পর্শী চিত্রভাষ্য!

নারীর ছবিতে রেখা আর ফর্মের ভাঙচুর এবং বিকৃতির মধ্যেও যোগেন‌ চৌধুরীর তাঁদের দিঘল চোখ এঁকে রাখেন! আর সে চোখ পাশ্চাত্য ‘পারস্পেকটিভ’ না মেনে হয়ে যায় এক পূর্ণ আয়তনের দিঘল চোখ! তাঁর নিজের কবিতার লাইনে লেখা থাকে ‘দেখো কী সজল চক্ষু তোমার, দীঘির জলের মতো গভীর’। নারীদের প্রতি সহমর্মিতায় তাঁদের সমস্ত সীমাবদ্ধতা জেনেও তিনি তাঁর ছবিতে নারীদের এক অপার্থিব জগতে পৌঁছে দেন! তিনি বলেছিলেন, ‘পুরুষকে বিকৃত করেছি, নারীদের বিকৃত করলেও তাঁদের চোখকে কখনও বিকৃত করতে পারিনি! কারণ ছোটবেলায় বাড়িতে দূর্গাপূজার মূর্তি তৈরীর সময় দেখতাম চক্ষুদান পর্ব…তারপর থেকে আমি মহিলাদের চোখের মধ্যে আমি সবসময়ই সেই দেবীরূপ দেখতে পাই…তাঁদের অবনমিত করার কথা ভাবতে পারি না…নারীদের।’

রবীন্দ্রনাথের ছবির প্রভাব যোগেন চৌধুরীর ছবিতে অমোঘভাবে আছে! সেকথা তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন! কিন্তু কোথায় তাঁর ছবি রবীন্দ্রনাথের ছবির থেকে পৃথক হয়ে যায় তার এক বুদ্ধিদীপ্ত বিশ্লেষণ করেছেন তাঁর অগ্রজ শিল্পী পরিতোষ সেন! তিনি লিখেছেন, ‘The writer (Paritosh Sen) has an occasion been struck by a close resemblance (in characterization) between some Rabindranath Tagore’s heads and those of Jogen’s. In both cases the loves for the use of black ink and a pechant for texture is quite strong except that Tagore’s textural effect is accidental whereas Jogen’s is deliberate.’ যোগেন চৌধুরীর এবারের প্রদর্শনীর ছবি দেখতে দেখতেও আমাদের এইসব উচ্চারণ কানে ভাসে! যদিও‌ এইবারে যোগেন চৌধুরী তাঁর স্বভাবসিদ্ধ অন্ধকারলালিত কালোকালি ছেড়ে খয়েরি কন্টি ব্যবহার করে তাঁর ছবির নারীদের মুখেদের করে তুলেছেন এক বিষাদক্লান্ত প্রাচীন ‘শ্রাবস্তীর কারুকার্য’-এর মতো!

যোগেন চৌধুরীর ছবিতে নারীদের দেখে আমরা যেন তাঁদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের ‘দামিনী’ বা ‘বিনোদিনী’র এক গোপন যোগসূত্র পেয়ে যাই! রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলার নারীরা আপন শক্তিতে বলীয়ান হলেও অনেকটা ধূসর, রহসাচ্ছন্ন কিংবা মায়াময়, তাঁদের যৌনতা বা ফিজিকালিটি একেবারেই স্পষ্ট নয়! যোগেন‌ চৌধুরীর নারীরা রহস্যময়ী হয়েও প্রবল যৌনতার মাদকতায় প্যাশনেট এবং জোরালো যৌন আবেদনপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ তাঁর চিত্রকলার এই জায়গাতে তাঁর লিরিকাল কবিসত্তা বিসর্জন দিতে পারেননি! যোগেন চৌধুরী তাঁর ছবিতে কবিতার স্পর্শ নিয়ে এলেও, বিশেষত নারীদের চোখে, এইসব নারীচরিত্র সৃষ্টিতে অনেক বেশি বাস্তব ও প্রাণবন্ত। তাঁর নারীরা রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলার নারীদের চেয়ে অনেক বেশি ‘রক্তমাংস’-এর! রবীন্দ্রনাথের গদ্যের নারীরা হয়তো অনেকটা সেই জায়গায় পৌঁছতে পেরেছে।

‘সুন্দরী’ ছবির প্রদর্শনীতে যোগেন চৌধুরী তাঁর শিল্পীজীবনের একবারে তুঙ্গ মুহূর্তে পৌঁছে গিয়েছেন! এইসব ছবি আকারে একটু বড় হলেও নন্দলাল বসুর শেষজীবনের পোস্টকার্ডে আঁকা ছোট ছোট ছবিদের সমগোত্রীয়! শিল্পীর সারাজীবনের সাধনার এক চরম বোধিলাভ, এক নির্ভার লীলাখেলা!

এই প্রদর্শনী শুধু যোগেন চৌধুরীর ছবির দৃশ্যকাব্য নয়, সমগ্র ভারতীয় ছবির যাত্রাপথের নির্যাস ও মর্মকথা যেন এইসব ছবির মধ্যে দিয়ে নিঃশব্দ সংলাপের মতো ধরা আছে!