Robbar

অলকানন্দার ভাস্কর্যে মূর্ত নারীর আত্মস্বর

Published by: Robbar Digital
  • Posted:February 24, 2026 5:32 pm
  • Updated:February 24, 2026 6:26 pm  
philosophy behind the sculptures of Alakananda Sengupta | Robbar

এই প্রদর্শনী প্রমাণ করে– ভাস্কর্য কেবলমাত্র বাগান বা গৃহসজ্জার উপাদান নয়। আবার ভাস্কর্য রাজনৈতিক ব্যাক্তিদের আত্মগরিমা তুলে ধরারও শিল্প নয়; বরং আজকের দিনে ভাস্কর্য হল সময়ের দলিল, প্রতিবাদের ভাষা এবং গভীর মানবিক সংলাপের এক শক্তিশালী মাধ্যম। তাই আকাদেমি অফ ফাইন আর্টসে অলকানন্দার এই প্রদর্শনী আমাদের ভাবনায়, দৃষ্টিতে এবং বিবেকবোধে নতুন নতুন প্রশ্নের উত্থাপন করে।

আলোক নূর ইভানা

‘আকাদেমি অফ ফাইন আর্টস’-এ কিছুদিন আগেই হয়ে গেল অলকানন্দা সেনগুপ্তের একক প্রদর্শনী। এই প্রদর্শনী শুধুমাত্র একটি শিল্প নির্মাণ দেখানোর আয়োজন ছিল না, বরং বলা যায়– এই প্রদর্শনী ছিল এই সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিঘাতের এক গভীর নন্দনতাত্ত্বিক পাঠ। এখানে প্রদর্শিত ভাস্কর্য ও ছবি উপস্থাপনায় সংহত ও শাণিত শিল্পভাষাতেই উচ্চারিত। ১৯৬৩ সালে জন্ম অলকানন্দা সেনগুপ্তর। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার অফ ভিজুয়াল আর্টস পাঠক্রম শেষ করেন ভাস্কর্য বিভাগ থেকে। এই বিষয়ে পাঠ নিতে আসার যে সাহসী সিদ্ধান্ত সেদিন নিয়েছিলেন অলকানন্দা, তারই এক পূর্ণ চিন্তাশীল প্রকাশ এই প্রদর্শনীতে প্রত্যক্ষ করা গেল। তাঁর কাজে, ভাবনায় ও কথায় পরিচয় মেলে বিজ্ঞানমনস্ক বিশ্লেষণী দৃষ্টি ও শৈল্পিক সংবেদনশীলতার। এই দুইয়ের মিশ্রণ তাঁর কাজকে দিয়েছে এক অনন্য চরিত্র।

অলকানন্দা সেনগুপ্ত

অলকানন্দার কাজকে মোটামুটি দু’টি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। একদিকে প্রবলভাবে উচ্চারিত হয়েছে ক্ষমতার নগ্ন, ক্রূর, পাশবিক রূপের সঙ্গে পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য, ফ্যাসিবাদী দম্ভ এবং পুঁজিবাদী নির্মমতার কথা। অন্যদিকে রয়েছে সাধারণ মানুষের আর্তি, খিদে, বেদনা ও প্রতিরোধের নানা কথা ও প্রসঙ্গ। বিশেষ করে তার একটা বড় অংশের ভাস্কর্য ও ছবি জুড়ে উঠে এসেছে নারীর শরীর, মন ও নানা সময়ে মুখোমুখি হওয়া বিবিধ চরিত্রের অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার অন্তর্লিখন। ভাস্কর্য ও ছবিতে তিনি তুলে ধরেছেন ক্ষমতা ও প্রতিরোধের এক দ্বান্দ্বিক ভাষা। ক্ষমতা এখানে রূপকের সচেতন ব্যবহারে মূর্ত হয়েছে। একটি ভাস্কর্যে মানুষের শরীরে গাধার মস্তক শুধু মাত্র একটি ভাস্কর্য নয় এটি হল ক্ষমতার পৌরুষ আর অহমিকাকে তীব্রভাবে ব্যঙ্গ করার এক উচ্চারিত প্রয়াস। যেখানে শিল্পী সরাসরি আক্রমণ করেন সেই মানসিকতাকে, যা নারীকে আজ দীর্ঘ সময় ধরে কেবল ভোগ্যবস্তুতে পর্যবসিত করেছে। আবার চুরুট ধরা ছাগলরূপী ভাস্কর্যের ফ্যাসিবাদী চরিত্রটিও বিদ্রুপের ভঙ্গিতেই নির্মিত। এই ভাস্কর্য রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও ক্ষমতার আস্ফালনকে ব্যঙ্গের ভাষাতেই মূর্ত করে তোলে।

এই রূপক প্রয়োগের রয়েছে নানা ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত। যা মনে করিয়ে দেয় ইউরোপীয় আধুনিক শিল্পের রাজনৈতিক ভাষ্যকে– যেখানে গোইয়া যুদ্ধ ও হিংসার বর্বরতাকে চিত্রিত করেছিলেন, অথবা যেখানে পিকাসো তাঁর ‘গুয়ের্নিকা’য় যুদ্ধের অসহায় আর্তি মূর্ত করেছিলেন। অলকানন্দার কাজেও সেই ঐতিহ্যের এক ভারতীয়, নারীবাদী ও তৃতীয় বিশ্বের অভিজ্ঞতালব্ধ পুনর্নির্মাণ লক্ষ করা যায়। সমসাময়িক বিশ্ব-রাজনীতির প্রতি শিল্পীর সংবেদনশীল নির্মাণ এই প্রদর্শনীর অন্যতম শক্তি। গাজার যুদ্ধের অভিঘাতে সর্বস্বহারা শিশুর প্রতিমূর্তি অথবা ‘প্যালেস্তাইনের মেয়ে’– এই কাজগুলিতে ভূগোল ভেঙে গিয়ে মানবিকতাই হয়ে ওঠে শিল্পের প্রধান সুর। হাতে পতাকা-ধরা প্রতিবাদী নারীমূর্তি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যুদ্ধের প্রথম ও গভীরতম আঘাত নেমে আসে নারী ও শিশুর উপর। যুদ্ধের ইতিহাসে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে সমকালীন নানা আঞ্চলিক সংঘাত, বলতে গেলে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অলকানন্দা সেই ইতিহাসকে বর্তমানের প্রেক্ষিতে পুনর্পাঠ করেন। ফলে তাঁর ভাস্কর্যে শিশুর হাতে পুতুল কেবল বস্তু নয়; তা শৈশবচ্যুত সময়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।

‘লজ্জা’ শিরোনামের একটি ভাস্কর্যে অলকানন্দা দেবী কালীকে মূর্ত করেছেন এমনভাবে, যাতে মনে হয় স্বয়ং দেবীও আজ ব্যস্ত সমাজের কুদৃষ্টির বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার প্রয়াসে। এ হল শিল্পীর এক তীব্র মন্তব্য। এখানে পুরাণের পুনর্নির্মাণ ঘটে সমকালীন নারীবাদী চেতনায়। একটি সাদা-কালো ছবিতে ইতালীয় প্রাক-রেনেসাঁ শিল্পী মাসাচ্চো-র ‘এক্সপালসান ফ্রম দি গার্ডেন অব ইডেন’-এর কথা স্মরণ করা যায়, যেখানে আদম ও ইভ উভয়েই লজ্জিত; কিন্তু অলকানন্দার পুনর্নির্মাণে লজ্জা কেবল নারীর ভাগ্যেই ন্যস্ত। এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই শিল্পী ইতিহাসের অন্তর্লিখিত পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করান। দেবীও এখানে নারী, এবং সেই নারীও সামাজিক হিংসা ও নজরদারির শিকার হতে পারেন– এই মন্তব্য তাঁর ভাস্কর্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এভাবেই অলকানন্দা পুরাণ, ইতিহাস ও বর্তমানকে একসূত্রে গেঁথে নারীর আত্মস্বরকে উচ্চারণ করেন তাঁর ভাস্কর্যে ও ছবিতে।

অলকানন্দা প্রধানত পোড়ামাটি, চিনামাটি, কাঠ ও ব্রোঞ্জে কাজ করেন। তবু পোড়ামাটিই যেন তাঁর প্রকৃত আত্মীয়। বাংলার টেরাকোটা ঐতিহ্য, গ্রামীণ মাটির পুতুলের সরলীকৃত গড়ন অথবা মাটির কাজে রং প্রয়োগ তাঁর নির্মাণকে নতুন মাত্রা এনে দেয়। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা একসময় তাঁকে মাটির দিকে টেনে এনেছিল, কিন্তু আজ সেই সীমাবদ্ধতাই পরিণত হয়েছে তাঁর ভাষার শক্তিতে। মাটির রুক্ষ তলে রঙের ব্যবহার, আকারের সরলীকরণ, এবং স্পর্শযোগ্য ত্রিমাত্রিকতা– সব মিলিয়ে তাঁর কাজ একইসঙ্গে যেন লোকশিল্পের চরিত্র ও আধুনিকতার দৃষ্টিভঙ্গিকে বহন করে। একইসঙ্গে আধুনিক ভাস্কর্যের অনুসন্ধিৎসু মনোভাবও সেখানে সক্রিয়। এই প্রসঙ্গে রামকিঙ্কর বেইজ-এর উপাদান-নির্ভর আধুনিকতার কথা স্মরণ করা যায়, যিনি ভারতীয় ভাস্কর্যে শুধুমাত্র গড়নের নয়, স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন নতুন উপাদান ব্যবহার করে। আবার সোমনাথ হোরের ক্ষতবিক্ষত মানবদেহ আমাদের যে সামাজিক ট্র্যাজেডির মুখোমুখি দাঁড় করায়, অলকানন্দার কাজেও সেই ক্ষতের ভাষা এক ভিন্ন শৈলীতে নারীমনস্ক দৃষ্টিকোণ পায়।

ভারতে ভাস্কর্যচর্চা অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত দিক থেকে সহজ নয়। জায়গা, উপকরণ, কারিগরি দক্ষতা– সবই প্রয়োজন। মধ্যবিত্ত পরিসরে দাঁড়িয়ে এই মাধ্যমের সঙ্গে থাকা মানেই হল এক দীর্ঘ সংগ্রাম। অলকানন্দা সেই সংগ্রামের ভিতর দিয়েই নিজের ভাষা নির্মাণ করেছেন। বাজারের চাহিদা বা সংগ্রাহকের রুচির কাছে আত্মসমর্পণ না করে স্বাধীন শিল্পচর্চা বজায় রাখা তাঁর গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।
অলকানন্দা সেনগুপ্তের এই একক প্রদর্শনী আমাদের সময়ের এক দর্পণ। এখানে ক্ষমতার বর্বরতা যেমন উন্মোচিত, তেমনি মানুষের আর্তি ও প্রতিবাদও স্পষ্ট। তাঁর নারীমূর্তিগুলির বিস্তৃত চোখে আমরা একসঙ্গে দেখি কাতরতা, ক্ষোভ, প্রেম ও ব্যঙ্গ। এই প্রদর্শনী প্রমাণ করে– ভাস্কর্য কেবলমাত্র বাগান বা গৃহসজ্জার উপাদান নয়। আবার ভাস্কর্য রাজনৈতিক ব্যাক্তিদের আত্মগরিমা তুলে ধরারও শিল্প নয়; বরং আজকের দিনে ভাস্কর্য হল সময়ের দলিল, প্রতিবাদের ভাষা এবং গভীর মানবিক সংলাপের এক শক্তিশালী মাধ্যম। তাই আকাদেমি অফ ফাইন আর্টসে অলকানন্দার এই প্রদর্শনী আমাদের ভাবনায়, দৃষ্টিতে এবং বিবেকবোধে নতুন নতুন প্রশ্নের উত্থাপন করে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দাঁড়িয়ে অলকানন্দার শিল্পভাষা একদিকে উত্তরাধিকার বহন করে, অন্যদিকে সমকালীনতার এক স্বতন্ত্র ও প্রাসঙ্গিক অধ্যায় নির্মাণ করে।