Robbar

মেলোড্রামা-মুক্ত যাত্রাশিল্প কি ব্যবসা বাড়াবে?

Published by: Robbar Digital
  • Posted:February 27, 2026 8:51 pm
  • Updated:February 27, 2026 8:52 pm  

যাত্রাশিল্প ফের গ্রামবাংলার মাঠে-ময়দানে ‘সগৌরবে চলিতেছে’। অন্তত সংখ্যাতত্ত্বের হিসেবে। এটি বড় আনন্দের কথা হলেও প্রশান্তির নয়। অনীক ব্যানার্জী, সেই সংখ্যালঘু পালা লিখিয়েদের মধ্যে একজন, যিনি চেষ্টা করছেন যাত্রাকে মুনাফা ও চটুল বিনোদনের ফাঁদ থেকে বের করে এনে দর্শককে একটু ভিন্নতার সাক্ষী করাতে। যাত্রাশিল্পীদের খানিক ‘অন্যরকমের প্রচেষ্টা’-র টানেই, দলে দলে যাত্রা-প্যান্ডেল ভরাচ্ছে দর্শক। অনীক ব্যানার্জী রচিত, নির্দেশিত, অভিনীত যাত্রাপালা– ‘আমি ভিনদেশী বহুরূপী’ সেই এগিয়ে থাকা গল্প, যা সমাজের সম্ভাবনা, বাস্তব, উচিত, অনুচিত প্রতিটি দিকই ফুটিয়ে তোলে পরিমিত অনুভূতি ও দরদ দিয়ে।

সৌম্য মিশ্র

‘যাত্রা এখন আর চলে না’– কথাটার মধ্যে যেমন আছে একধরনের উন্নাসিকতা, তেমনই আছে বেশ অনেকটা পরিমাণ হতাশা। দ্বিতীয় ভাবনাটা খানিক আলোচনাসাপেক্ষ হলেও প্রথম ভাবনাটি একেবারেই কুঠুরিবদ্ধ, বড়ই ইনসুলেটেড। আসলে শহরের মঞ্চে কিংবা মূলধারার মিডিয়ার দৃশ্যপটে যাত্রার উপস্থিতি নেই বলে অনেকেই ভাবেন, যাত্রা নামক শিল্পটি… শুধু যাত্রা বলছি কেন, বাংলার বৈচিত্রময় লোকশিল্পের সবগুলোই বুঝি মরতে বসেছে। হ্যাঁ, মাঝে একটু ভাটা এলেও যাত্রাশিল্প ফের গ্রামবাংলার মাঠে-ময়দানে ‘সগৌরবে চলিতেছে’। অন্তত সংখ্যাতত্ত্বের হিসেবে। এটি বড় আনন্দের কথা হলেও প্রশান্তির নয়। গ্রামবাংলার বিভিন্ন মাঠে যেভাবে আসর পড়ছে যাত্রার, তা কিন্তু কোনও রূপকথার গল্পের মতো সোনার কাঠি রুপোর কাঠির ছোঁয়ায় নয়। ডেইলি সোপের ওই চর্বিতচর্বণের প্রতি খানিক বীতশ্রদ্ধ হয়েই হোক, কিংবা যাত্রাশিল্পীদের খানিক ‘অন্যরকমের প্রচেষ্টা’-র টানেই, দলে দলে যাত্রা-প্যান্ডেল ভরাচ্ছে দর্শক। একথা সত্য যে, মানুষ যেসব কাহিনির সঙ্গে নিজেদের মেলাতে পেরেছে তাকেই ‘সুপারহিট’ তকমা দিয়েছে।

চিরাচরিত যাত্রাভিনয়

তবে সমস্যাটা তৈরি হয় এখানেই। ‘জোয়ার এসেছে’ বা ‘মানুষ খাচ্ছে’ জাতীয় ইন্ধনগুলো স্রেফ মনোরঞ্জনী বিনোদনের জন্ম দিচ্ছে। সেইসব ‘পালা’ না কাটে ধারে, না ভারে। তবে সিজন রেভিনিউ দেখিয়ে বলাই যায়, ব্যবসা তো হচ্ছে, ভাঁড়ে পয়সা না থাকলে কোনও আঙ্গিক, নতুনত্ব, গবেষণা কিছুই টিকবে না। জাতের আগে জান। নিঃসন্দেহে ব্যবসা হচ্ছে। দেড়শো-দু’শো রজনীও হচ্ছে। এই বিপুল গৌরব মাথায় নিয়েও সেই ব্যবসাসফল প্রযোজনাটি কি জনমানসে দাগ কাটতে পারছে? গুণের বিচারে বা উপাদানের ভিত্তিতে ভাবনার খোরাক জোগাতে সে কি সফল? সবটাই আসলে উপরপৃষ্ঠের কৃত্রিম বাহুল্য, আকর্ষণ করানোর মোহিনী মায়া। যাত্রা কি শুধুই ব্যবসায়িক মাধ্যম? যাঁরা এই মতবাদে বিশ্বাসী তাঁরা যাত্রার বহুমাত্রিক ক্ষমতাকে অস্বীকার করেন।

এই প্রেক্ষিতে সমসাময়িক যাত্রায় একটি বিকল্প ধারার উদ্ভব লক্ষ করা যায়, যেখানে কিছু পালাকার সচেতনভাবে গবেষণাভিত্তিক ও ভাবনানির্ভর নাট্যভাষা নির্মাণের চেষ্টা করছেন। তাঁরা সফল হচ্ছেন ঠিকই, তবে তাঁদের কৃচ্ছ্রসাধন করতে হচ্ছে অবিরত। অনীক ব্যানার্জী, সেই সংখ্যালঘু পালা লিখিয়েদের মধ্যে একজন, যিনি চেষ্টা করছেন মুনাফা ও চটুল বিনোদনের বিষাক্ত চক্রব্যূহ থেকে যাত্রাকে বের করে এনে তার অসীম মাধ্যমগত ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে দর্শককে একটু ভিন্নতার সাক্ষী করাতে।

‘আমি ভিনদেশী বহুরূপী’ যাত্রাপালায় অভিনেতা অনীক ব্যানার্জী

মননে আন্তর্জাতিকতা না এলে, সময়ের থেকে এগিয়ে গিয়ে ঘটমান বর্তমানকে উপস্থাপন করা যায় না, বা তার ঠিক-ভুলের দিকে আঙুল তোলা যায় না। অনীক ব্যানার্জী রচিত, নির্দেশিত, অভিনীত ও প্রভাস অপেরা কর্তৃক পরিবেশিত যাত্রাপালা– ‘আমি ভিনদেশী বহুরূপী’ সেই এগিয়ে থাকা গল্প, যা সমাজের সম্ভাবনা, বাস্তব, উচিত, অনুচিত প্রতিটি দিকই ফুটিয়ে তোলে পরিমিত অনুভূতি ও দরদ দিয়ে।

অনীকবাবু বাংলার সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখার স্বপ্ন দেখেন। বর্তমানের আধুনিকতা ও বিশ্বায়নের বিপ্লবে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, লৌকিক সংস্কৃতির মতো বিষয়গুলো জাদুঘরের প্রদর্শনীতে তুলে রাখার মতো উপাদানে পরিণত হয়েছে। নস্টালজিয়া আজকের বাঙালির কাছে বেশ পীড়াদায়ক। এহেন ‘নব্য বাস্তবতায়’ পালাকারের শিল্পীমন কতটা রক্তাক্ত! তা তাঁর পালা-রচনাতেই পরিষ্কার, তবে সমগ্র পালাতেই, ‘ওগো এ আমাদের কী হয়ে গেল গো’-সুলভ বিলাপ নেই, আছে আধুনিকতা ও লোক-ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ, সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতার যথাযথ উপস্থাপনা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক চেতনার সংযোগ। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করলে ‘আমি ভিনদেশী বহুরূপী’ পালাটি নিছক বিনোদনসর্বস্ব পালা নয়, বরং একটি সমন্বয়মূলক অভিনয়ভাষা। এক বহুরূপী শিল্পীর পরিবারের কাহিনি এই পালার মূল থিম। এই ধরনের ছকভাঙা গল্প নিয়েই হাজির হতে চান অনীকবাবু, কারন তিনি নিজের শিল্পকে কেবল বাণিজ্যের নিক্তিতে মাপতে চাননি।

‘আমি ভিনদেশী বহুরূপী’ যাত্রাপালায় ভিন্নসাজে অনীক ব্যানার্জী

পালার কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে বহুরূপী শিল্পীর উপস্থাপনা এখানে একটি শক্তিশালী রূপক। তাঁর বহু রূপ-ধারণের ক্ষমতা আসলে বহুত্বপূর্ণ পরিচয়ের প্রতীক। ‘পলাশ ফুল’, ওরফে ‘বলহরি’ চরিত্রটি (অনীক ব্যানার্জী) একাধারে অভিনেতা, ইতিহাসের বাহক ও বহুরূপী সমাজের উত্থান-পতনের সাক্ষী এবং একাধিক লোকশিল্পের পারদর্শী উপস্থাপক, তৎসহ কত্থক নৃত্যেও পটু। এই বহুরূপী চরিত্রটি একটি ‘নব মানব’-এর ধারণা নির্মাণ করে, যার আত্মপ্রকাশ সমকালীন সমাজব্যবস্থার সংকটে বিলম্বিত হলেও অনিবার্য। কেন্দ্রীয় চরিত্রের একাধিক লোকশিল্পের জ্ঞান ও উপস্থাপনা দক্ষতা একটি সচেতন সমন্বয়মূলক প্রয়াস, যার ফলে বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি নতুন, সমন্বিত ও বহুমাত্রিক রূপ সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি একাধিক শিল্প-মাধ্যমের মধ্যে সংঘাতের পরিবর্তে সহাবস্থান ও মেলবন্ধনের দর্শন উন্মোচিত হয়। লোকশিল্প বাঙালি সংস্কৃতির শেকড়, তাকে অবজ্ঞা করা মানে আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া, এই নিগূঢ় সত্যটি পরিবেশন করতে যে দীর্ঘ গবেষণা ও ফিল্ডওয়ার্ক করেছেন লেখক তার ফলাফল যাত্রার সংলাপ এবং অভিনয়েই পরিষ্কার। বহুরূপী সমাজের অনগ্রসরতার কারণ, রাষ্ট্র কর্তৃক তাদের অপব্যবহারের করুণ কাহিনি উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে পালাকার আসলে সেই বিকল্প ইতিহাসের রচনা করেছেন, যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চোখ দিয়ে সমাজকে দেখে। হিন্দু পুরাণের ওপর শ্রদ্ধাশীল পালাকার, বহুরূপী শিল্পীদের নিয়ে প্রচলিত কিংবদন্তির সৃজনশীল উপস্থাপনায় নিজের সিগনেচার স্টাইল রেখেছেন।

পুরনো দিনের যাত্রাপালা

অনীক ব্যানার্জী ভালোই জানেন, এই প্যারালাল যাত্রা নির্মাণের অনিমিখ বিস্তার সম্ভব নয়, তবুও তিনি তাঁর পালায় কাহিনির থেকে বেশি জোর দেন কাহিনির নির্মাণে, সেই কারণেই পূর্বের যাত্রাপালার নিজের সৃষ্ট একাধিক চরিত্রের (শিবা, বারুদ) প্রসঙ্গ টেনে তিনি গল্পের মূল থিমের সঙ্গে মিলিয়ে দেন। দর্শককে বুঝিয়ে দেন, এই যে এত চরিত্রের জন্ম তিনি দিচ্ছেন, এটাও ওই বহু রূপেরই সৃষ্টি। ‘রক্তকরবী’-র প্রসঙ্গ এনে স্মরণ করিয়ে দেন, অচলায়তনের প্রাকার ভাঙতে ‘বিশু পাগলের’ মতো প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার অনুশীলন কতটা প্রয়োজন! যে অনুশীলনের আভাস তাঁর সমগ্র পালা-তে মেলে।

অপসংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে ‘লল্লন কুমার’ চরিত্র (রাহুল ঘোষ) ও বাঁকুড়াকে না চিনে বাল্টিমোরকে চিনতে শেখা, হাল আমলের অতি আধুনিক সমাজের প্রতীক হিসেবে ‘পপস’ (পারুল থেকে পপস) চরিত্রের (অনুস্মিতা সিং) সৃষ্টি আদতে পালার মধ্যে রিয়েলিটি প্রতিষ্ঠার প্রয়াস। সমগ্র কাহিনি বিন্যাসে বাঙালির আত্মপরাজয়, ও চরিত্র বিচ্যুতিকেই তীব্র শ্লেষে বিদ্ধ করেছেন পালাকার।

বর্তমান চিৎপুর। ছবি: সুতীর্থ দাস

বাংলার অন্যতম লোকশিল্প যাত্রা। সেই শিল্পের এভাবে অন্যান্য লোকশিল্পের মৌলিক কাহিনি ও উপাদান নিয়ে আসরে নামার উদাহরণ বিরল না হলেও বহুল প্রচলিত নয়, ফলে এক বিরাট সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে ক্রস কালচারাল প্রমোশন-এর। সেক্ষেত্রে সত্যিই এক নতুন ইতিহাস রচনার সাক্ষী থাকতে পারে বাংলার লোকশিল্পী সমাজ। প্রথাগত প্রচার ধারা থেকে বেরিয়ে আসার এবং পারস্পরিক সংরক্ষণ ও পুনর্জীবনের এ এক মোক্ষম সুযোগ। উত্তরণের পথ দেখিয়ে দেওয়াটা যেমন কর্তব্য, তেমনই এই ভাবনা জনপরিসরে প্রবেশ করাতে গেলে ব্যাপক প্রচার আশু প্রয়োজন।

চিৎপুরের যাত্রাপাড়া

প্রচলিত ইঁদুর দৌড়ের বাইরে নতুন মাপকাঠি তৈরি করাটা খুব জরুরি। স্থূল বাণিজ্যিক যাত্রার বদলে সম্পূর্ণ গবেষণাধর্মী বিষয় নিয়ে যাত্রা রচনার যে প্রয়াস অনীকবাবু নিয়েছেন তাকে মান্যতা অর্জনের মহাসড়কে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হবে। যেখানে হতাশ্বাসের কোনও স্থান নেই, স্থান নেই সীমিত দৃষ্টির।