Robbar

বিভেদের বিরিয়ানি

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 8, 2026 7:22 pm
  • Updated:January 9, 2026 2:51 pm  

ভাইরাল এক ভিডিও-তে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলের নেতার মন্তব্য ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। হিন্দুদের মুসলিম মালিকানাধীন দোকান থেকে খাবার না কেনার আহ্বান ধর্মভিত্তিক অর্থনীতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। খাদ্যাভ্যাসের পরিচয়কে রাজনীতির অস্ত্রে পরিণত করার এই প্রবণতা বাংলার বহুত্ববাদী সংস্কৃতির জন্য বিপজ্জনক। ইতিহাস বলছে, বাঙালির খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে বরাবরই উদারমনা। এ ধরনের বক্তব্য মুক্ত-সমাজে অবিশ্বাস ও বিভাজন বাড়ায়। রাজনৈতিক লাভের খোঁজে বাঙালির দৈনন্দিন সহাবস্থানের ভিত ক্রমেই নড়বড়ে হচ্ছে। এই বিতর্ক তাই নিছক খাবার নয়, ভারতের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন তুলে দেয়।

রোববার ডিজিটাল ডেস্ক

রাজনৈতিক মেরুকরণের হাত থেকে বিরিয়ানিরও রেহাই নেই। হালে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও-তে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলের এক নেতা ও বিশিষ্ট আইনজীবী দাবি করেছেন, হিন্দুদের উচিত অবিলম্বে মুসলিম মালিকানাধীন দোকান থেকে মাংস বা বিরিয়ানি কেনা বন্ধ করা! তাঁর নিদান: এই ধরনের কেনাবেচা শুধুমাত্র ‘হিন্দু’ দোকানেই সীমাবদ্ধ থাকা বিধেয়।

এই মন্তব্য ঘিরে স্বভাবতই গড়ে উঠছে বিস্ময় থেকে তীব্র প্রতিবাদ। এই প্রতিক্রিয়ার ঢেউ থেকে ভারতীয় রাজনীতির বাঁকবদলের কাঠামোটি স্পষ্ট। গণতন্ত্রের জমিতে ক্রমশ প্রকট হচ্ছে ধর্ম বা পরিচয়ভিত্তিক বিভাজনের আস্ফালন।

ভিডিওটি-তে দেখা যাচ্ছে, রাজ্যের বিরোধী দলের সেই নেতা হিন্দুদের আহ্বান জানাচ্ছেন, হালাল মাংস ত্যাগ করে, কেবল সহধর্মীদের মধ্যেই বাণিজ্যিক লেনদেন সীমাবদ্ধ রাখতে। এ নিছক খাদ্যরুচি সংক্রান্ত হালকা মন্তব্য নয়, বরং ধর্মভিত্তিক ভেদাভেদের পোশাক পরানো অর্থনৈতিক প্রেসক্রিপশন। উৎসব বা সম্মেলনের সঙ্গে ধর্মীয় আচার-বিচারকে গুলিয়ে ফেলার বিষয়টি কোনও দিনই সেভাবে ছিলই না বাংলায়। খাওয়াদাওয়ার পরিসরে তো নয়ই। বাঙালির খাদ্য-সংস্কৃতিতে সমানভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে হিন্দু-মুসলিম, এমনকী, বহু বিজাতীয় খাদ্যসম্ভারের নানা পদ। দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল-সংলগ্ন মেলায় যেমন কাবাবের স্টল, তেমনই ইদের উদযাপনে জাকারিয়া স্ট্রিটে ফি-বছর ভিড় জমান বহু ধর্মের খাদ্যপ্রেমী বাঙালি। দৈনন্দিন সহাবস্থানের এমন ছবি বাংলায় শ্বাস-প্রশ্বাসের মতোই স্বাভাবিক। নেতা কাম আইনজীবীর মন্তব্য এই চিরন্তন স্বাভাবিকতাকেই ধর্মের ছাঁচে কেটে বসানোর এক ফিকির। নানা জরুরি সমস্যার থেকে নজর ঘুরিয়ে মধ্যযুগীয় মানসিকতা ফিরিয়ে আনতে এ এক উসকানিমূলক প্ররোচনা।

চিরাচরিত ‘কলকাতা’ বিরিয়ানি

রাজনীতি এবং অর্থনীতি– দু’-দিক থেকেই এই বক্তব্য সম্পূর্ণ স্বধর্মচ্যুত! স্বাধীন গণতন্ত্রে ভোটাররা বিভাজনমূলক স্লোগানে প্রভাবিত হবেনই, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। তেমনই অর্থনীতি আদৌ এমন সহজ সরল খেলা নয়, যাতে একটি সম্প্রদায়ের ব্যবসায়িক লাভ মানেই আরেক দলের লোকসান। ফলে এমন ভ্রান্ত ধারণাকে উসকে দেওয়া মানে, দৈনন্দিন নানা সমস্যার মধ্যে সামাজিক স্থিতিশীলতা লোপ পাওয়ার পথ প্রশস্ত করে দেওয়া। ‘চোখের বদলে চোখ’ নীতি মেনে নিলে গোটা দেশই যে একদিন অন্ধ হয়ে যাবে, এই সহজ সত্যিটা আজ এঁরা বিস্মৃত।

জাকারিয়া স্ট্রিটে হরেকরকম কাবাবের সম্ভার

রাজ্যের শাসকদল স্বভাবতই এ মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে বলেছেন, খাদ্যাভ্যাস ধর্ম দিয়ে কখনওই নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়। কারণ, বাঙালির দৈনন্দিন জীবন বহুদিন ধরেই বিভিন্ন সংস্কৃতি ও পরিচয়ের সুতোয় বোনা হয়েছে। তাই সামাজিক মাধ্যমে এ-জাতীয় প্ররোচনা বা উসকানিমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে পড়লে তা যে শুধু ক্ষণিকের বিতর্ক তৈরি করে থিতিয়ে যাবে, এমন নয়। বরং ধীরে ধীরে মানুষের মনে এই ধারণাই ছড়িয়ে পড়বে যে, ধর্মীয় পরিচয়ই অর্থনৈতিক কাঠামোকে একদিন নির্ধারণ করতে প্রস্তুত। এ এক এমন গূঢ় অভিসন্ধি, যা সরাসরি ভারতের সংবিধানের সমতা ও ধর্মনিরপেক্ষ সহাবস্থানের মূল ভাবনায় আঘাত করতে উদ্যত।

অবিশ্বাস এবং ঘৃণাই যদি রাজনীতির বাজারে প্রধান পণ্য হয়ে ওঠে, তবে অচিরেই একদিন সে পণ্য দেশের খাবারের পাতেও পৌঁছে যাবে। এখনই সিঁদুরে মেঘ না দেখলে অদূর ভবিষ্যতে দেশবাসীর জন্য আফসোস ছাড়া কিছুই আর করার থাকবে না।