
ক’বছর আগে একটি রান্নার বইয়ের সঙ্গে সর্ষের তেল ফ্রি দিয়ে চমকে দিয়েছিল একটি স্টল। গৌতমকুমার দে লিখেছিলেন, ‘পাঠক, না অন্য কারও উদ্দেশ্যে এই তৈলমর্দন– কে জানে!’ অনেকেই জানেন, বাইবেল পৃথিবীর সর্বাধিক বিক্রিত বই! দ্বিতীয় স্থানে কোন বইটি রয়েছে জানেন কি? বলে দিচ্ছি– মাও-সে-তুং-এর বাছাই করা উদ্ধৃতি। বইমেলায় ফ্রি-তে বাইবেল বিলি করার চল ছিল একসময়। রোজ রোজ সেই বাইবেল মুঠো মুঠো সংগ্রহ করার লোকও ছিল। ১৪ বছর পর বইমেলায় চিনের স্টল দেখে ভাবলাম, ফ্রি-তে মাও-সে-তুং মিলবে কি না! সে গুড়ে বালি। বরং একটি স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে ‘ফ্রি-তে বই! ফ্রি-তে বই!’ বলে পাঠক আকর্ষণ করছিলেন এক বিক্রেতা। সামনে যেতে যা তিনি ফ্রি-তে হাতে ধরিয়ে দিলেন, তা একখানা ব্যাকডেটেড পুস্তকতালিকা।
কড়চার পাঁচ নম্বর কিস্তি। প্রতিবেদকের যা হাতযশ, সম্পাদক দুশ্চিন্তায়– আক্ষরিক অর্থেই কড়চার পঞ্চত্বপ্রাপ্তি না ঘটে। সেই চিন্তার দায়ভার বোঁচকার মতো পিঠে ঝুলিয়েই মেলায় আসা।

প্রজাতন্ত্র দিবস বলেই বোধহয়, বইমেলায় নিরাপত্তার কড়াকড়ি একটু বেশি। ৯ নম্বর গেটের সামনে আকস্মিক জটলা দেখে খানিক এগিয়ে যেতে হল। কী ব্যাপার? ব্যাপার বোঁচকা নিয়েই। লিটল ম্যাগের একটি ছেলেকে ধরেছে সিকিওরিটি গার্ডরা। কাগজে সিল করা বেশ ক’টি বইয়ের প্যাকেট নিয়ে সে প্রেস থেকে সোজা মেলায় এসেছে। কিন্তু সিল কেটে, দেখে, নিশ্চিন্ত না হয়ে গার্ডরা সেই প্যাকেট তাকে নিয়ে যেতে দেবে না। অগত্যা সিল কাটতেই যখন হল, ছেলেটির বক্তব্য– নতুন বই, দু’ পাতা পড়ে দেখুন!
মুজতবা আলির প্লেনে করে কে সি দাসের রসগোল্লা নিয়ে যাওয়ার গপ্পোখানা মনে পড়ল। মনে পড়ল ওঁর বিখ্যাত বরাভয়বাণী: বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না। পড়িয়েও হয় কি?

মাসের শেষ। পকেটে টান। তবু এই একখানা কথা ছাপাখানার নোনা দেওয়াল থেকে ছলছল চোখে বাঙালি পাঠককে এখনও আশ্বাস দেয়। সিনা টানটান করে বইমেলার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আজও সকাল থেকেই মেলায় উপচে পড়া ভিড়। যদিও এক প্রকাশক জানালেন, গত দু’ দিনের ভিড়ই না কি ক্রেতার নয়, দর্শনার্থীর। খানিক ব্যাজার মুখে বলে গেলেন, ‘বইমেলা, না দেশপ্রিয় পার্ক– ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।’
বোঝা-না-বোঝা নিয়েই মেলা। কেউ বুঝতে পারছেন না কোন বই কিনবেন। কেউ বুঝতে পারছেন না খাবারের স্টল রাখা উচিত কি না। কেউ আবার ম্যাপ কোথায় পাওয়া যাবে তা-ই বুঝতে পারছেন না। একজন, শুনলাম, গম্ভীর গলায় ফোনে কাকে যেন বলছেন– ‘রবীন্দ্রনাথ পেরিয়ে শঙ্খবাবুর দিকে এগচ্ছি’। অর্থাৎ পাঁচ নম্বর দিয়ে ঢুকে, বাঁ দিকে দ্বিতীয় গলি।

লোকমুখে জানা গেল, লিটল ম্যাগের উল্টোদিকের রাস্তাটার নাম হয়েছে ‘দক্ষিণের বারান্দা’। কারণ সে-গলিখানা অবন ঠাকুরের নামে। আর যদি, পাঠক, আপনি ৪ নম্বর গেট দিয়ে ঢোকেন, তাহলে আপনার চোখে পড়বে সেই অমোঘ সাইনবোর্ড– যেখানে বাঁ দিকে তিরচিহ্ন দিয়ে লেখা ‘পশ্চিমবঙ্গ’, আর ডানদিকে তিরচিহ্ন দিয়ে ‘ফরেন’।
অবশ্য ‘ফরেন’ বলতে অধিকাংশ বাঙালি যাকে বোঝে, সেই আমেরিকা এবার নেই। নেই বাংলাদেশও। গতবারের মতোই। দুই বাংলার সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের এই ক্ষেত্রটি এ বছরেও মৌন রইল– এ নিঃসন্দেহে দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু বাংলাদেশের বই রয়েছে। পুরাতন বইয়ের একটি স্টলে দেখা মিলল এস এম সুলতানের ছবি নিয়ে চমৎকার একটি বইয়ের। বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত।

আগে ছিল একা সুবর্ণরেখা। এখন সারা বইমেলা জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বেশ কয়েকটি পুরনো বইয়ের দোকান। প্রায় সবক’টা দোকানের বাইরেই নোটিশ সাঁটা: ‘দুষ্প্রাপ্য বই’। অথচ স্টক কমবেশি একই। তবু ‘পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন’। যে পাওয়ার ঠিকই পায়। খুঁজে খুঁজে কানকো টিপে বেছে নেয় রত্নটিকে। তারপর চলে দরদাম। ভবিষ্যতে এমন স্টলওয়ার্ডদের নিয়ে আলাদা স্টল করার কথা ভাবতে পারেন বইমেলা কর্তৃপক্ষ। বাইরে লেখা থাকবে– ‘দুষ্প্রাপ্য পাঠক’। তেমন একজন, উৎফুল্ল– কারণ ডিসপ্লে টেবিলের তলা থেকে তিনি খুঁজে বের করেছেন জাপানি পোস্টকার্ডে ওয়াশ পেইন্টিং-এর একখানা চমৎকার সংকলন। হাঁকা দামের প্রায় অর্ধেকে বইখানা কিনে মাঠ ছাড়লেন তিনি। সুবর্ণরেখা থেকে সুবিমল মিশ্র-র ৬ খণ্ড বইসংগ্রহ প্রায় জলের দরে কিনে নিয়ে গেলেন আরেক পাঠক। বেশ কয়েক বছর ধরেই বাজারে দুর্লভ প্রকাশ দাস সম্পাদিত ‘গণেশ হালুই: নৈঃশব্দ্যের চিত্রকর’ বইটি। সে বইয়ের একখানা প্রায়-নতুন কপি পাওয়া গেল আরেকটি পুরাতন বইয়ের স্টলে।

ভালো বই আদপে ভাবায়। ভুলতে দেয় না। ভালো স্টলও। পথকুকুরদের বিলোপ করার যে সাম্প্রতিক রায় আমরা প্রায় ভুলতে বসেছিলাম, সেকথা আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিল তৃতীয় পরিসরের স্টল। ছোট্ট একফালি মানবিক স্টলটিকে তাঁরা সাজিয়েছেন এ সংক্রান্ত ছবি এবং পেপার কাটিং দিয়ে। নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য।

গতবার অবধি যে রাহুল পুরকায়স্থকে লিটল ম্যাগের আশেপাশে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে, এ বছর তাঁর নামেই প্যাভিলিয়ন। বাঁ দিকের লেন দুর্দমনীয় জ্যোতির্ময় দত্ত-র নামে। ডানদিক ধরে একটু এগলে পরিচিত গাধার লোগো। কৌরবের গেটের একপাশে যেখানটাতে দাঁড়িয়ে কমল চক্রবর্তী একসময় ‘হে বৃক্ষনাথ’ বলে চেঁচিয়ে উঠতেন, সেখানে এখন তাঁর ছবি– আশরীর জড়িয়ে রয়েছেন একখানা গাছকে। বইমেলা, ভুলতে দেয় না।

দিলীপকুমার সেনগুপ্ত-র বহুদিন অলভ্য ‘রেডিও কার্টুন’ বইটির ফ্যাক্সিমিলি কেউ একজন নিজের গরজে ছেপে কিছু কিছু অনামা স্টলে রেখে গিয়েছেন। বইটিতে দাম অবধি লেখা নেই। আজকালের মিনিবুক এসে পৌঁছেছে গতকাল; কিন্তু গাঙচিলে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, রঘুনাথ গোস্বামীর মিনিবুক এখনও এসে পৌঁছয়নি। তবুও প্রয়াস থেকে প্রকাশিতব্য অমিতাভ মৈত্রের ‘রিলকেচর্চা’ বইটির ফাইনাল প্রুফ ক’দিন আগেই হাসপাতালের বেডে শুয়ে সংশোধন করে পাঠিয়েছেন সম্পাদক। সে বইটিও এখনও মেলার মুখ দেখেনি। প্রকাশক জানালেন, আজকালের মধ্যেই এসে পড়বে। রবি-সোম দু’ দিনের ভিড়টুকু পেতে কেউ কেউ একরকম জোর করেই নিয়ে এসেছেন সদ্য বাঁধানো, কাঁচা বই। তেমন একজনকে দেখা গেল, দুপুরের রোদে বই শুকোতে দিচ্ছেন।

হুমায়ুন আজাদের ‘নারী’ প্রকাশের সময়ে এরকম হয়েছিল। প্রচ্ছদ ছাপা না-হওয়ায় ন্যাড়া বই কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন অনেকে। হুমায়ুনকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি না কি রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘নারী তো প্রচ্ছদ ছাড়াই ভালো।’
একথা জানালেন যে রসিকপ্রবর, এ বইমেলায় তাঁর বইটি আপাতত ছেপে এসেছে। টিপ্পনি সেরে তিনি গেলেন পাঠিকার অনুরোধে সেলফি তুলতে। এখন সইয়ের চেয়ে সেলফির দাম বেশি। বিজ্ঞাপনে মুখ ঢাকে না, বরং মুখই, স্বয়ং বিজ্ঞাপন। এ বইমেলার সবচেয়ে জনপ্রিয় সেলফি জোনটির থেকে কোনাকুনি বাঁ দিকে খানিক গেলেই পাবেন সেলফি নিয়ে ভারতীয় ডাকবিভাগের অভিনব আয়োজন। আপনার মুখের ডাকটিকিট– ছবি দিলেই হাতেগরম। ৩০০ টাকায় ১২ পিস।

হুঁ হুঁ বাওয়া, দেখলে হবে? খরচা আছে! থুড়ি, কড়চা আছে। শুনছি, বহু পাঠক নিয়মিত পড়ছেন রোববার.ইন-এর বইমেলার কড়চা। কেউ কেউ লিখিতভাবে ভালো লাগার কথা জানিয়েছেন। এ বড় আনন্দের। আনন্দের, কারণ আপনাদের মতো আমরাও বইমেলাকে ভালোবাসি।
ভালোবাসি, কারণ বইমেলার নিজস্ব শব্দ রয়েছে। রয়েছে নিজস্ব গন্ধও। সদ্য ছাপা বইয়ের গন্ধ। ঘামের গন্ধ। ধোঁয়া ওঠা চায়ের গন্ধ। লিটল ম্যাগ পেরলেই চিরাচরিত ফিশফ্রাইয়ের গন্ধ। এ বছর মেলায় রয়েছেন ‘সোঁদা’-র গন্ধব্যাপারীরাও, তাঁদের বানানো চমৎকার সব আতরের পসরা নিয়ে।

তবে এ বছর সব গন্ধকে মাত দিয়েছে ধূপধুনোর গন্ধ। এ গন্ধটা কিন্তু বেশ সন্দেহজনক। বেশ কিছু ধর্মীয় স্টল এবার ম-ম করছে ধূপধুনোঅগুরুচন্দনের গন্ধে। কেউ কেউ সঙ্গে রেখেছেন ঘি-মধু। চাইলে মিলতে পারে চা-চুরন-চবনপ্রাশ-হেয়ার অয়েল-ম্যাসাজ অয়েল থেকে প্লাস্টিকের বোতলে ভরা মহামৃত্যুঞ্জয় প্রসাদ। ‘বিশেষ আকর্ষণ: প্রাকৃতিক ভারসাম্য, শরীর নিরোগ ও মানসিক সুস্থতার জন্য– গো-ধূপ এবং গোবর থেকে তৈরী বিভিন্ন সামগ্রী’। বিজ্ঞাপনের উপরে একটি দণ্ডায়মান বলীবর্দ।


সম্ভবত আনিসুল হকের লেখায় পড়েছিলাম– একাত্তরের আগে, নারায়ণগঞ্জে যখন প্রথম বইমেলার আয়োজন হয়, সেখানে একটা গরু বেঁধে রাখা হয়েছিল। তার গায়ে লেখা ছিল, ‘আমি বই পড়ি না’। থাক সেকথা। তারাপদ রায় সহায়। ‘আমারে বাচাল যদি করেছ মাধব, বন্ধুদের করে দিও কালা।’ (পড়ুন, পাঠকেরে করে দিও অন্ধ)।

ক’বছর আগে একটি রান্নার বইয়ের সঙ্গে সর্ষের তেল ফ্রি দিয়ে চমকে দিয়েছিল একটি স্টল। গৌতমকুমার দে লিখেছিলেন, ‘পাঠক, না অন্য কারও উদ্দেশ্যে এই তৈলমর্দন– কে জানে!’ অনেকেই জানেন, বাইবেল পৃথিবীর সর্বাধিক বিক্রিত বই! দ্বিতীয় স্থানে কোন বইটি রয়েছে জানেন কি? বলে দিচ্ছি– মাও-সে-তুং-এর বাছাই করা উদ্ধৃতি। বইমেলায় ফ্রি-তে বাইবেল বিলি করার চল ছিল একসময়। রোজ রোজ সেই বাইবেল মুঠো মুঠো সংগ্রহ করার লোকও ছিল। ১৪ বছর পর বইমেলায় চিনের স্টল দেখে ভাবলাম, ফ্রি-তে মাও-সে-তুং মিলবে কি না! সে গুড়ে বালি। বরং একটি স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে ‘ফ্রি-তে বই! ফ্রি-তে বই!’ বলে পাঠক আকর্ষণ করছিলেন এক বিক্রেতা। সামনে যেতে যা তিনি ফ্রি-তে হাতে ধরিয়ে দিলেন, তা একখানা ব্যাকডেটেড পুস্তকতালিকা। তবে ফ্রি-তে বই রয়েছে এই বইমেলাতেই। রয়েছে দৈনিক লটারি– ‘বইমেলায় রোজ বই পুরস্কার’। আকর্ষণীয় ক্যুপন।

আর রয়েছে মুহূর্তকথা!
নতুন কাগজ। প্রথম বইমেলার টেবিল। তরুণ লেখকের প্রথম কাব্যগ্রন্থ। বই-করিয়েদের ধুলোঘামখিদেস্বপ্নময় মুখ। স্টলের দায়দায়িত্ব। না-আসা বইয়ের জন্য কপালে ভাঁজ। শেষ মুহূর্তে স্টক ফুরিয়ে না-পাওয়া বইয়ের জন্য আফসোস। হারানো প্রাপ্তি সংবাদ। রয়েছে মফস্সল থেকে আসা প্রথমবার মেলা। রয়েছে হাতখরচের টাকা বাঁচিয়ে প্রিয় উপন্যাস। রয়েছে হঠাৎ চেনামুখ, কুশল বিনিময়। রয়েছে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গিয়ে প্রথম হাতে হাত। রয়েছে প্রাণ। রয়েছে শ্বাস। অবাধ গতিধারা। মেলা প্রাঙ্গণের ভেতর হপ্তা দুয়েকের জন্য গড়ে ওঠা আস্ত একখানা দেশ। সে দেশের নাম, পাঠক, আপনি জানেন– বই।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved