Robbar

রঙের উৎসবে বিচ্ছেদের ধুলো

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 4, 2026 8:50 pm
  • Updated:March 4, 2026 9:11 pm  

২০২৬-এ সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিং চলছে এই ‘ডিভোর্স ডাস্ট’। কতদূর যেতে পারে এই ডিভোর্স ডাস্ট? প্রতারণা হাতেনাতে ধরিয়ে দিতে পারে? প্রতারণার কথা কি জানতাম না আমরা? পৃথিবী জুড়ে তো আজকাল সবাই সবাইকে ঠকিয়ে চলেছে। আমি তোমাকে, তুমি আমাকে, বন্ধু শত্রুকে, শত্রু তার মিত্রকে, সুসংবাদ তার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে থাকা দুঃসংবাদকে, বদলে যাওয়া টপোগ্রাফিতে মেঘ তার নিজস্ব বৃষ্টিকে। প্রতারণা তো আমাদের ছায়াসঙ্গী আজ।

প্রচ্ছদের ছবি: এডভার্ড মুঙ্খ

 

পারমিতা মুন্সী

রেড এলার্ট! পরকীয়া বা বহুগামিতায় হাতেনাতে ধরা পড়ার অশনি সংকেত! ২০২৬-এ সোশাল মিডিয়া ট্রেন্ড– ডিভোর্স ডাস্ট! বিচ্ছেদের ধুলো! যার চক্করে স্থায়ী বা আপাতস্থায়ী সম্পর্কগুলো ধপ করে ধুলোয় পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে। বছরের মেগা ইভেন্ট দোল সদ্য চলে গেল। সন্দেহ হয়– রঙের উৎসবে, রকমারি বাহারি রঙের সঙ্গে ডিভোর্স ডাস্ট ঢুকে গিয়ে, বদলে দিয়েছে কি চালু সম্পর্কের হিসেব? সম্ভাবনাময়, আসন্ন বেহিসাবি মনের তাই খানিক লাগাম টানতে বিধিসম্মত সতর্কীকরণ!

সাবধান! সাবধান! সাবধান! কী বস্তু এই ডিভোর্স ডাস্ট?

 

‘ডিভোর্স ডাস্ট’ হিসেবে মূলত ব্যবহার করা হয় গ্লিটার বা বডি গ্লিটার লোশন বা বডি গ্লিটার অয়েল। হাই কন্ট্যাক্ট বডি এরিয়া যেন কাঁধের কলার বোন, ঘাড়ের কাছে, হাতের পাতার ওপর এটা স্প্রে বা লোশনের মতো মেখে ডেটে যেতে হয়। বডি প্রোডাক্ট ছাড়াও, হেয়ার স্প্রের ব্যবহারও হয়। এর কোনও একটা মেখে ডেটে যায় মেয়েরা। এই ডিভোর্স ডাস্টের খদ্দের এবং ব্যবহারকারী মূলত মেয়েরা বা কোনও সম্পর্কের ফিমেল ফ্যাক্টর। ডিভোর্স ডাস্ট মেখে তারা সেই সম্পর্কে যায়, যে-সম্পর্কে ‘সন্দেহ’ আছে, অবিশ্বাস আছে। হাতে হাত ছুঁয়ে যায়, আশ্লেষে জড়িয়ে ধরে ধরে বসন্ত বিকেলে তার কাঙ্ক্ষিত ‘পুরুষ’ চরিত্রটিকে। ‘হৃদয় জুড়ে বিস্ফোরণ’-এর পাশাপাশি, বিস্ফোটক ডিভোর্স ডাস্ট পুরুষটির শরীরে লেগে যায়। গুগল বলছে, এইসব ডিভোর্স ডাস্ট প্রোডাক্ট এমনভাবেই তৈরি হয়, যা কিনা ‘নটরিয়াসলি হার্ড টু রিমুভ’, অর্থাৎ অনেক সাধ্যসাধনা করেও পরকীয়ার চিহ্ন তোলা যায় না। স্ত্রী, প্রেমিকা বা সেই সময়ের স্থায়ী বা আপাতস্থায়ী সঙ্গীর কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে, সম্পর্কের ‘পুরুষ’-কে যারপরনাই হেনস্তা হতে হয়। সে যদি অতি বড় ‘পুরুষ’ হয়, তাহলে ‘বেশ করেছি’ বলে দাবড়ে রাখে সঙ্গীকে। আর মেজাজের দিক থেকে ততটা ‘দরের না-হলে’, আপাত নিরীহ পুরুষটির মধ্যে তৈরি হয় একটা অপরাধবোধ। আর সম্পর্কে বিশ্বাসের দেওয়ালে ফাটল ধরে।  যে সম্পর্কে একজন অন্যজনকে ‘সম্পত্তি’ ভেবে অধিকার ফলায়, যে-সম্পর্কে ‘মনোগ্যামি’-কে রিলিজিয়াসলি প্র্যাকটিস করতে হয়– সে সম্পর্ক কি অচলায়তন? যে-সম্পর্কে সামান্য বডি গ্লিটার বিচ্ছেদের মূল ভূমিকা নেয়, সে সম্পর্কে কি অনেক আগেই অলিখিত ছাড়াছাড়ি হয়নি? আর যে-তৃতীয় ব্যক্তি ডিভোর্স ডাস্ট মেখে ডেটে গেল, সে-ও কি সম্পর্কে আবেগের জায়গায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে না? না, এসব জটিল প্রশ্নে ঢুকব না। আমরা পিছিয়ে যাব ফ্ল্যাশব্যাকে। বাঙালির সম্পর্কচর্চার খানিক অতীতে।

তখন দোলের সময় লাল আবিরের মধ্যে সিঁদুর মিশিয়ে দেওয়া ছিল ‘কমন’ ডিভোর্স ডাস্ট। ভুল বললাম, ওটা ভাবা হত ‘লাভ ডাস্ট’। সেই সময় কারও ডিভোর্স হলে, পাড়ায় ‘খবর’ হত। প্রেমের সম্পর্ক বিয়ে অবধি না-গড়ালে, রেলে গলা দিয়ে লোকে মরত তখন। সেই সময়, অল্পবয়সি ছেলেমেয়েরা অপেক্ষা করত দোলের জন্য। লাল আবিরের মধ্যে সিঁদুর মিশিয়ে সিঁথি বরাবর অনেকটা সিঁদুরদানের ঢঙে সেই আবির মাখানো হত। গ্রাম-মফসসলে এমন ঘটলেও, শহরে এমনটা বিশেষ হত না বোধহয়।

একজন নামী মানুষকে জানতাম। তিনি সম্পর্ক বিষয়ে শৌখিন ছিলেন। তাঁর স্ত্রী বিলক্ষণ সেসব জানতেন। কিন্তু ওই যে, নামী মানুষ অনেকটা প্রতিষ্ঠানের মতো। তাই বৈবাহিক সম্পর্কের শ্যাওলাধরা দিকটা অকুপেশনাল হ্যাজার্ডের মতোই দেখতেন ওঁর স্ত্রী। তাই সেই নামী মানুষের জীবনে পরনারীর আনাগোনা দেখেও তার স্ত্রী চোখ উল্টে থাকতেন। একবার তিনি এক অল্পবয়সি মেয়ের প্রেমে পড়েন। স্ত্রীকে লুকিয়ে-চুরিয়ে বাড়িতেই সেই প্রেমিকার আনাগোনা ছিল। মেয়েটি কেবল কালো সাদা রং ব্যবহার করত। যেমন সাদা শাড়ি, কালো ব্লাউজ, কালো টিপ– সেই মেয়েটি, নামী লোকটির বাড়িতে যত্রতত্র দেওয়ালে, আয়নার কাচে, বইয়ের পাতায়, এমনকী, বিস্কুটের কৌটোর গায়ে কপালের কালো টিপ সাঁটিয়ে রাখত। যতই সহনশীল হোন সেই নামী লোকের স্ত্রী, কালো ভেলভেটের টিপের এত নিঃশব্দ উপস্থিতির দাপট সহ্য করতে না-পেরে ঘর ছাড়লেন। আর সেই সম্পর্ক জোড়া লাগেনি কোনও দিন। এক্ষেত্রে কালো ভেলভেটের ডিভোর্স ডাস্টের ভূমিকা নিয়েছিল। তাছাড়া পকেটে মেয়েদের রুমাল পাওয়া, জামায় মেয়েদের পারফিউমের গন্ধ, শার্টের কলারে লিপ্সটিকের দাগ, শার্টের বোতামে আটকে থাকা লম্বা কালো কেশ– এসব ছিল অবধারিত ‘ডিভোর্স ডাস্ট’। অন্তত বাঙালি জীবনে। সময় যত বদলেছে, মেয়ে-বউদের জীবনযাত্রায় বদল ঘটেছে। এখন তাদের সময় বা ইচ্ছে কোনওটাই নেই বরের পকেট বা শার্টের কলার চেক করার। তাই সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ডিভোর্স ডাস্টও রকম বদলে হয়েছে গ্লিটার বডি লোশন, গ্লিটার বডি অয়েল, গ্লিটার বডি স্প্রে, গ্লিটার বডি পাউডার ইত্যাদি– বডি। বডি। বডি। শরীরে শরীর খেলা। গুগল বলছে, এসব মাখার আগে শরীরের উদ্দিষ্ট স্থানে সাধারণ বডি লোশন বা ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে নিলে দীর্ঘস্থায়ী হয়।

Holi in Kolkata: A Festival of Colors, Culture, and Celebration - The Kolkata Buzz

২০২৬-এ সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিং চলছে এই ‘ডিভোর্স ডাস্ট’। কতদূর যেতে পারে এই ডিভোর্স ডাস্ট? প্রতারণা হাতেনাতে ধরিয়ে দিতে পারে? প্রতারণার কথা কি জানতাম না আমরা? পৃথিবী জুড়ে তো আজকাল সবাই সবাইকে ঠকিয়ে চলেছে। আমি তোমাকে, তুমি আমাকে, বন্ধু শত্রুকে, শত্রু তার মিত্রকে, সুসংবাদ তার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে থাকা দুঃসংবাদকে, বদলে যাওয়া টপোগ্রাফিতে মেঘ তার নিজস্ব বৃষ্টিকে। প্রতারণা তো আমাদের ছায়াসঙ্গী আজ। ভালো না-থেকেও, ভালো থাকার ভানে যারা নিজেরাই নিজেদের প্রতারিত করে চলেছি, তারা আর প্রতারণাকে হাতেনাতে ধরে ফেলে কী করব? কাউকে পেড়ে ফেলার সুখ? আর যারা ডিভোর্স ডাস্ট মেখে যাচ্ছে প্রতারণার ফাঁদ পেতে, তারা কী পাবে? অনিশ্চিত সম্পর্কে, সম্পর্কের উল্টোদিকে থাকা মানুষকে জব্দ করার সুখ?

ডিভোর্স ডাস্ট

‘এইখানে, মূর্খ এক তার/অসুখী জীবন নিয়ে খেলা করেছিল’– ভাস্কর চক্রবর্তী লিখেছিলেন। আমরা সবাই কি সেই অসুখী মানুষ নই, যারা প্রত্যহ সুখের আশ্বাসে নিজেদের ঠকিয়ে চলেছি। তাহলে খেলায় জিতল কে, হারল কে? বোঝা মুশকিল। মাঝখান থেকে তালেগোলে মন্ত্রীমশাই রাজকন্যের গুলিসুতো খেয়ে ফেলেছে। আমাদের আর নতুন করে হারানোর কিছু আছে কি?

আমাদের সর্বহারার এই বসন্তে ডিভোর্স ডাস্ট নয়, রং লাগুক মনে। ডিভোর্স ডাস্ট চোখে ঢুকলে তাকে চোখের বালি না করে, সপাটে জল দিয়ে ধুয়ে ফেলো। হাতের মুঠোয় নাও রঙিন আবির– ফাগ ওড়ানো ম্যাজিক আওয়ার বিকেলে অপেক্ষা করো তার জন্য, যাকে স্বপ্নে দেখেছিলে– ডিভোর্স ডাস্টকে ৬-০ গোলে হারিয়ে ভালোবাসা জিতে যাক এই রঙের উৎসবে– ‘যে ছেলেটি শান্ত বড়, আর যে মেয়েটি আছাড়ি পিছাড়ি/ উহাদের দেখা হোক শালিখ ঠাকুর’।