Robbar

পারস্যের ‘অনাথ মুক্তো’ কেন যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তু?

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 2, 2026 7:22 pm
  • Updated:April 2, 2026 7:22 pm  

যুদ্ধের এক মাস অতিক্রান্ত হলেও ইরানকে বেকায়দায় ফেলতে না পেরে উন্মাদ ট্রাম্প এখন সেই দেশের অর্থনৈতিক শিরাটি কেটে দিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করার দিকে ঝুঁকছেন। ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি খার্গ দ্বীপ কেবল তেলের একটি প্রধান টার্মিনাল নয়– এটি ইরানের অর্থনীতি সচল রাখার প্রধান ফটক। কাজেই মার্কিন সেনারা খার্গ দ্বীপের ‘প্রতিটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু পুরোপুরি ধূলিসাৎ’ করে দিয়েছে বলে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট দেওয়ার পর ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালী খুলে না দেয় তাহলে খার্গ দ্বীপে তেলের অবকাঠামো বা অয়েল ইনফ্রাস্ট্রাকচারকেও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।

দীপঙ্কর দাশগুপ্ত

বিশাল পারস্য উপসাগরের বুকে জেগে থাকা যেন এক টুকরো প্রবাল খণ্ড। খার্গ দ্বীপ। ক্রমাগত সামরিক আঘাতের পর ইরানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড একেবারে গুঁড়িয়ে দিতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ছোট্ট এই প্রবাল দ্বীপটি দখল করে নিতে চান। বুশেহর বন্দর থেকে ৩৪ মাইল (৫৫ কিমি) উত্তর-পশ্চিমে এবং ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র ১৫ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ২৮ কিমি) দূরে রয়েছে এই খার্গ দ্বীপ। আয়তনে ছোট হলেও এই দ্বীপটি ইরানের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, কারণ দেশটির মোট অপরিশোধিত তেল রফতানির প্রায় ৯০ শতাংশ একমাত্র এই টার্মিনাল দিয়েই পরিচালিত হয়। ইরানের বৈদেশিক মুদ্রার আয়, সরকারি বাজেট, সামরিক ব্যয় থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি– সব কিছু সরাসরি এই দ্বীপের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি তাই এই খার্গ দ্বীপও এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক নজরের কেন্দ্রবিন্দুতে।

মোটামুটি ৮.৫ বর্গ মাইল (২২ বর্গ কিমি) আয়তনের এই প্রবাল দ্বীপটি আজ ইরানিদের কাছে মূলত ‘নিষিদ্ধ দ্বীপ’ (ফরবিডেন আইল্যান্ড) নামেই পরিচিত। অত্যন্ত গোপনীয়তায় ঘেরা এবং ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর (আইআরজিসি) কড়া পাহারায় থাকা এই দ্বীপে সাধারণের প্রবেশাধিকার নেই; কেবল নিরাপত্তা সংক্রান্ত ছাড়পত্র থাকলেই এখানে ঢোকা সম্ভব। তবে এই দুর্ভেদ্য ইস্পাত আর সামরিক নজর মিনারের ওপাশেই লুকিয়ে আছে এক আদিম নিসর্গ। সেখানে হাজার বছরের বিচিত্র মানব-ইতিহাস আর আধুনিক ইরানের জ্বালানি শক্তির স্পন্দন এখনও নিঃশব্দে সহাবস্থান করছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের তপ্ত বালুর নিচে মাটির গভীর থেকে পাইপলাইন দিয়ে বয়ে চলা অপরিশোধিত তেলের অফুরান প্রবাহের কম্পন যেন সমুদ্রতলের প্রাচীন প্রবাল শিলাখণ্ডেও ছড়িয়ে পড়ে। এই নির্জন তটরেখায় দাঁড়িয়েই একদা ইরানের প্রখ্যাত লেখক জালাল আল-ই-আহমদ সমুদ্রের বুকে জেগে থাকা এই ভূখণ্ডকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। আর তখনই তিনি একে তাঁর বিখ্যাত বিশেষণে ভূষিত করে নাম দিয়েছিলেন– পারস্য উপসাগরের ‘অনাথ মুক্তো’।

‘অনাথ মুক্তো’: পারস্য উপসাগরের খার্গ আইল্যান্ড

উপসাগরীয় এই অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য প্রাণকেন্দ্র। খার্গ দ্বীপ বা আল-ই-আহমদের সেই ‘অনাথ মুক্তো’ এখন কেবল একটি শান্ত তটরেখা নয়, বরং এটি বিশালাকার তেলের ট্যাঙ্কার আর আধুনিক প্রযুক্তির এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। তবে এই প্রগতি আর ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের আড়ালে এক ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটও দানা বাঁধছে। চলতি যুদ্ধের অশান্তির বাইরেও রয়েছে অন্য আশঙ্কা। বিভিন্ন সময়ে সমুদ্রতলের পাইপলাইন ফেটে যাওয়া বা তেলের ট্যাঙ্কার থেকে চুঁইয়ে পড়া অপরিশোধিত তেল এই অঞ্চলের বিরল প্রজাতির প্রবাল প্রাচীর এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্রকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। একদিকে খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য আর বিশ্ব রাজনীতির মারপ্যাঁচ, অন্যদিকে প্রকৃতির এই নিঃশব্দ আর্তনাদ– এই দুইয়ের টানাপোড়েনেই আজ ‘ঘার্বজাদেগি’ বা পাশ্চাত্য-নির্ভর আধুনিকতার এক ভিন্ন রূপ ফুটে উঠছে।

‘ঘার্বজাদেগি’ (Gharbzadegi)– একটি ফারসি শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ ‘পাশ্চাত্য-আচ্ছন্নতা’ বা ‘পাশ্চাত্য-ব্যাধি’। তবে এর ইতিহাসের গভীরতা ও তাৎপর্য অনেক বেশি বিস্তৃত। ফারসি ‘ঘার্ব’ অর্থাৎ, ‘পাশ্চাত্য’ এবং ‘জাদেগি’ অর্থাৎ ‘আক্রান্ত হওয়া’ বা ‘আচ্ছন্ন হওয়া’– এই দুইয়ের সমন্বয়ে শব্দটি গঠিত। সহজ কথায়, এটি এমন এক মানসিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থাকে বোঝায়, যেখানে কোনও সমাজ বা ব্যক্তি নিজের শিকড় ভুলে অন্ধভাবে পশ্চিমি সংস্কৃতি ও জীবনধারায় মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ইরানের ইতিহাসে পাশ্চাত্যের সঙ্গে এই জটিল সংঘাতের সূচনা হয় উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, কাজার রাজবংশের (১৭৮৯-১৯২৫) শাসনামলে। সেই সময় মধ্যপ্রাচ্যে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের বিস্তার ইরানকে এক রূঢ় বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। সামরিক পরাজয় এবং পশ্চিমি ধ্যান-ধারণা ও প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত অনুপ্রবেশ দেশটির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে স্পষ্টভাবে বেআব্রু করে দিয়েছিল। একদিকে ক্রমাগত সামরিক ব্যর্থতা ইরানের সার্বভৌমত্বকে ভঙ্গুর করে তুলছিল, অন্যদিকে ইউরোপ ফেরত ইরানি ছাত্র ও পর্যটকদের মাধ্যমে চুঁইয়ে আসছিল ভিনদেশি সংস্কৃতি। এই বিশেষ গোষ্ঠীকে তখন ‘ফারাঙ্গি-মায়াব’ বা ‘পাশ্চাত্যঘেঁষা’ বলে অভিহিত করা হত। তারা কেবল আধুনিক প্রযুক্তিই নয়, বরং ইউরোপীয় পোশাক, আদব-কায়দা এবং বৌদ্ধিক চিন্তাধারার আমদানিও করেছিল। পশ্চিমি অগ্রগতির মোহে পড়ে তাদের অনেকেই নিজস্ব ইসলামি মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা বিসর্জন দিয়ে বৃহত্তর ইরানি সমাজে গভীর আত্ম-পরিচয়ের সংকট সৃষ্টি করে।

এই সাংস্কৃতিক টানাপোড়েন আরও প্রকট হয়ে ওঠে পাহলভি রাজবংশের জমানায়। প্রথমে রেজা শাহ (১৯২৫-১৯৪১) এবং পরে তাঁর পুত্র মোহাম্মদ রেজা শাহের (১৯৪১-১৯৭৯) অধীনে। এই সময়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইরানকে পশ্চিমি ছাঁচে গড়ার এক পরিকল্পিত প্রচেষ্টা শুরু হয়। বিশেষ করে ১৯৫৩ সালে সিআইএ এবং এমআই-সিক্স মদতপুষ্ট রাজনৈতিক অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী অস্থিরতাগুলি ‘ঘার্বজাদেগি’ বা ‘পাশ্চাত্য-ব্যাধি’-র ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করে। শব্দটি তখনও সেভাবে প্রচলিত না-হলেও, সেই সময়কাল জুড়ে মূলত পশ্চিমি আধুনিকতা বনাম পারস্যের ইসলামি ঐতিহ্যের পারস্পরিক সংঘাতের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। মূলত বিশ্বায়নের মোড়কে পশ্চিমি সংস্কৃতির যে-আগ্রাসন, তা ইরানের নিজস্ব ইতিহাস ও মূল্যবোধকে কুরে কুরে খাচ্ছে– এমন এক গভীর আশঙ্কা থেকেই এই তত্ত্বের মূল উপজীব্য ‘ঘার্বজাদেগি’ শব্দটির উৎপত্তি।

‘ঘার্বজাদেগি’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক আহমদ ফারদিদ। ১৯৫০-এর দশকে তিনি এই পরিভাষাটি উদ্ভাবন করেন। ফারদিদ লেখালেখির চেয়ে বক্তৃতার মাধ্যমেই তাঁর দর্শন প্রচার করতে বেশি পছন্দ করতেন বলে ‘মৌখিক দার্শনিক’ (দ্য ওরাল ফিলোজফার) হিসেবে তাঁর বিশেষ পরিচিতি গড়ে উঠেছিল। ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে প্রখ্যাত ইরানি বুদ্ধিজীবী ও লেখক জালাল আল-ই-আহমদ তাঁর কালজয়ী প্রবন্ধ ‘ঘার্বজাদেগি’-র মাধ্যমে এই শব্দটিকে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক তত্ত্বে রূপান্তর করেন। তাঁর মতে, ইরান একটি গভীর ‘সাংস্কৃতিক মহামারী’তে আক্রান্ত, যেখানে পশ্চিমের অন্ধ অনুকরণ দেশটির নিজস্ব সত্তাকে গ্রাস করছে। তিনি এই অবস্থাকে অনেকটা ‘কলেরা’ বা ‘পঙ্গপালের আক্রমণ’-এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, যা কোনও রক্তপাত ছাড়াই একটি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। আল-ই-আহমদ যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ইরান ক্রমাগত পশ্চিমি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ফলে কেবল একজন ক্রেতা বা দাসে পরিণত হচ্ছে। তাঁর এই বলিষ্ঠ লেখনী তৎকালীন শিক্ষিত সমাজ ও ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করে। এটি শুধু এক তাত্ত্বিক আলোচনা ছিল না, বরং পাহলভি রাজবংশের পাশ্চাত্যঘেঁষা নীতির বিরুদ্ধে এক বৌদ্ধিক বিদ্রোহের আহ্বান ছিল। শেষ পর্যন্ত তাঁর এই ‘ঘার্বজাদেগি’ দর্শনই ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের অন্যতম প্রধান আদর্শগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করে, যা ইরানকে তার শিকড়ে ফেরার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।

‘ঘার্বজাদেগি’-এর বিরুদ্ধে ইরানে ছয়ের দশকে গণ অভ্যুত্থান

খার্গ দ্বীপের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের গভীরে তাকালে ‘ঘার্বজাদেগি’ বা ‘পাশ্চাত্য-আচ্ছন্নতা’ তত্ত্বটির এক অদ্ভুত প্রতিফলন দেখা যায়। একদিকে এই দ্বীপটি পশ্চিমি প্রযুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, অন্যদিকে এটিই আবার সেই ভূখণ্ড, যা জালাল আল-ই-আহমদকে তাঁর বিখ্যাত পাশ্চাত্য-বিরোধী দর্শনের রসদ জুগিয়েছিল।

যে আধুনিক পাইপলাইন আর বিশাল সব টার্মিনাল আজ ইরানকে বিশ্ববাজারে টিকিয়ে রেখেছে, সেগুলোর প্রায় সবটুকুই এক সময় পশ্চিমি প্রযুক্তির হাত ধরে গড়ে উঠেছিল। আহমদ ফারদিদ বা আল-ই-আহমদ যাকে ‘মহামারী’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন, সেই প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকতা আজ ইরানের অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, যে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির গ্রাস থেকে মুক্ত হতে এই বিপ্লব বা দর্শনের জন্ম, আজ সেই একই পশ্চিমের উদ্ভাবিত প্রযুক্তির ওপর ভর করেই ইরানকে তার অর্থনৈতিক যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এভাবেই ‘অনাথ মুক্তো’ বা খার্গ দ্বীপ আধুনিক ইরানের এক জীবন্ত প্যারাডক্স বা স্ব-বিরোধী প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে– যেখানে জাতীয়তাবাদ, ইসলামি ঐতিহ্য এবং অনিবার্য পশ্চিমি আধুনিকতা একে অপরের সঙ্গে নিরন্তর লড়াই করে টিকে আছে।

ইতিহাসজুড়ে পারস্য উপসাগরের এই ‘অনাথ মুক্তো’ বিভিন্ন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। কখনও এটি ছিল বাণিজ্যিক কেন্দ্র, কখনও নির্বাসন কেন্দ্র, কখনও ধর্মীয় স্থান, আবার কখনও অত্যন্ত কৌশলগত সামরিক অবস্থান। পাহলভি আমল থেকে দ্বীপটির এই চিরাচরিত চরিত্রে আমূল পরিবর্তন আসতে শুরু করে। বিশেষ করে ১৯৪০ থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে, খার্গ দ্বীপটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের জন্য একটি দুর্গম শাস্তিমূলক কলোনি এবং নির্বাসন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।

জালাল আল-ই-আহমদের ‘জান-ই-জেহাদি’-র প্রচ্ছদ

হাইড্রোকার্বন বা খনিজ তেল আবিষ্কারের অনেক আগে থেকেই এই দ্বীপের কৌশলগত সামুদ্রিক গুরুত্ব বিজয়ীদের কাছে একে এক আকাঙ্ক্ষিত রত্নে পরিণত করেছিল। কেউ কেউ ভুলবশত ‘খার্গ’ নামটিকে আধুনিক বসরার কাছে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মোহনায় আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট যে প্রাচীন শহর ‘ক্যারাক্স স্পাসিনো’ স্থাপন করেছিলেন, তার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক রেকর্ড অনুযায়ী, এই দু’টির মধ্যে কোনও সম্পর্ক নেই। বিভিন্ন শতকের পর শতক ধরে স্থানীয় উপভাষা এবং ইউরোপীয় মানচিত্রে দ্বীপটির নাম পরিবর্তিত হয়েছে– কখনও খার্গ, খার্ক, খারাজ বা খারেজ হিসেবে। এর প্রাকৃতিক সুপেয় জলের ঝরনা এবং অনন্য অবস্থান একে সামুদ্রিক বাণিজ্যের এক অপরিহার্য মিলনস্থলে পরিণত করেছিল, যা কৃষিপণ্য ও খনিজ রফতানি সহায়তা করত। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক যুগে পর্তুগিজরা প্রথম উপসাগরীয় অন্যান্য দ্বীপের সঙ্গে খার্গ দখল করে। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই দ্বীপের ওপরে ওলন্দাজদের নজর পড়ে। ১৭৫২ সালে ওলন্দাজ ব্যারন নিপহাউসেন বান্দর রিগের শাসক মীর নাসের আল-জাবির সঙ্গে একটি বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপনের চুক্তি করেন। পরের বছর ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের স্বার্থরক্ষায় সেখানে একটি শক্তিশালী দুর্গ নির্মাণ করে। তবে এই ঔপনিবেশিক আধিপত্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; দীর্ঘ উত্তেজনার পর ১৭৬৬ সালের জানুয়ারিতে বান্দর রিগের গভর্নর মীর মুহান্না সফলভাবে দুর্গটি আক্রমণ করেন এবং ওলন্দাজ বাহিনীকে হটিয়ে দেন।

বিশ শতকে দ্বীপের ইতিহাসে এক অন্ধকারময় অধ্যায় যুক্ত হয়, যখন পাহলভি রাজবংশের রেজা শাহ (১৯২৫-১৯৪১) একে রাজনৈতিক বন্দিদের নির্বাসন কেন্দ্রে পরিণত করেন। তখন এর বিশাল সম্ভাবনা পুরোপুরি অব্যবহৃত থেকে গিয়েছিল। ১৯৫৮ সালের পর থেকে আধুনিক পেট্রোলিয়াম শিল্পের স্পর্শে দ্বীপটির রূপান্তর ঘটতে শুরু করে। বন্দিশালার সেই মলিন অতীত মুছে ফেলে খার্গকে একটি বিশাল অপরিশোধিত তেল রফতানি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯৬০ সালের আগস্টে এর নতুন গভীর-সমুদ্র টার্মিনালটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানের তেলের সেই প্রথম উল্লেখযোগ্য রপ্তানি। আটের দশকে যখন ‘অফশোর’ ক্ষেত্রগুলি আবিষ্কৃত হতে থাকে, তখন খার্গ আবাদান বন্দরকেও ছাড়িয়ে যায়।

খার্গ-এর পেট্রোলিয়াম টার্মিনাল

দ্বীপের আধুনিক শিল্প-পরিকাঠামোর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিশাল প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ। এখানে মানব বসতির প্রমাণ পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শেষভাগ থেকে, যা এলামীয়, একেমেনীয় এবং সাসানীয় যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। এর অন্যতম পবিত্র স্থান হল ‘মীর মহম্মদ মাজার’, যা হিজরি সপ্তম শতকে (ত্রয়োদশ শতকের শেষভাগ) পাথর ও কাদা দিয়ে তৈরি দু’টি মোচাকৃতি গম্বুজ-সহ নির্মিত। কাছেই রয়েছে ‘মীর আরাম মাজার’, যেখানে একটি প্রস্তরখণ্ডে খোদাই করা আছে ইসলামি লিপি। আর রয়েছে দু’টি মশাল, যা একেমেনীয় আমলের বলে ধারণা। স্থানীয় অধিবাসীরা একে নূহ নবীর বংশধর মীর আরামের স্মৃতিবিজড়িত স্থান বলে মনে করেন।

খার্গ দ্বীপ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বহুত্বের এক অনন্য নিদর্শন। এখানকার প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী সমাধিস্থলে দেখা যায় জোরস্ট্রিয়ান (পার্সি), খ্রিস্টান এবং সাসানীয় সংস্কৃতির এক চমৎকার মেলবন্ধন। দ্বীপের অন্যান্য ঐতিহাসিক নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে ১৭৪৭ সালের ওলন্দাজ দুর্গ ও উদ্যান, ফলের বাগান, পরিত্যক্ত এক রেললাইন এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি একেমেনীয় শিলালিপি। প্রবালের ওপরে খোদাই করা ‘পারস্য উপসাগর’ নামটির উল্লেখ প্রাচীনতম প্রত্নতাত্ত্বিক খতিয়ানগুলির অন্যতম।

যুদ্ধের এক মাস অতিক্রান্ত হলেও ইরানকে বেকায়দায় ফেলতে না পেরে উন্মাদ ট্রাম্প এখন সেই দেশের অর্থনৈতিক শিরাটি কেটে দিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করার দিকে ঝুঁকছেন। ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি খার্গ দ্বীপ কেবল তেলের একটি প্রধান টার্মিনাল নয়– এটি ইরানের অর্থনীতি সচল রাখার প্রধান ফটক। কাজেই মার্কিন সেনারা খার্গ দ্বীপের ‘প্রতিটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু পুরোপুরি ধূলিসাৎ’ করে দিয়েছে বলে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট দেওয়ার পর ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালী খুলে না দেয় তাহলে খার্গ দ্বীপে তেলের অবকাঠামো বা অয়েল ইনফ্রাস্ট্রাকচারকেও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।

ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি জটিল করছে ইরানে যুদ্ধের পরিস্থিতি

এর আগে ইরানের তেল অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্য করে ইজরায়েল এক ভয়াবহ হামলা চালিয়েছিল। কেবল তেহরানই নয়, ইরানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘সাউথ পার্স’ গ্যাসক্ষেত্রেও ইজরায়েল আক্রমণ চালিয়েছে। সেটা আবার ট্রাম্পের মনঃপূত হয়নি। কারণ, ধ্বংস নয়, তাঁর তো লোভ ইরানের তেলের ভাণ্ডারের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ। ইরানের অস্ত্র ভাণ্ডার ধ্বংসের পাশাপাশি তেল বিক্রিও বন্ধ করা গেলে ইসলামিক সরকার বিপাকে পড়বে। দীর্ঘকাল ধরেই বিশ্লেষকরা এই দ্বীপটিকে তাই ইরানের একটি ‘দুর্বলতম স্থান’ (ক্রিটিকাল উইক পয়েন্ট) হিসেবে বিবেচনা করে আসছেন, যেখানে কোনও ধরনের আক্রমণ তেহরানের পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোর ও বিধ্বংসী পালটা জবাবের সূত্রপাত ঘটাতে পারে। অবশ্য ট্রাম্প যতই ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় ২,০০০ দক্ষ সেনাই পাঠান বা ইউএসএস ত্রিপোলির ৩,৫০০ নৌ-সেনা পাঠিয়ে খার্গ দ্বীপ দখলের স্বপ্ন দেখুন, তিনি আসলে ইরানিদের সম্পর্কে জানার কোনও তোয়াক্কাই করেননি। তিনি কখনওই বুঝতে চাননি যে, ইমাম হোসেনের শাহাদাত এবং প্রতি বছর ‘আশুরা’র শোক পালন ইরানিদের মনে এমন এক আদর্শ গেঁথে দিয়েছে যে, তারা কোনও স্বৈরাচারীর কাছে মাথা নত করার চেয়ে মৃত্যুকে বেছে নেওয়াকেই বড় মনে করে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানে দৃঢ়তার এক ঝলক

আসলে, যারা মরতে ভয় পায় না, তাদের সঙ্গে আমেরিকা লড়াই করবে কী করে? ইরানিদের হারাতে হলে আমেরিকা আর তাদের দোসর ইজরায়েলকে ৯ কোটি ৩০ লাখ ইরানিকেই মেরে ফেলতে হবে; কারণ যদি একজন ইরানিও বেঁচে থাকে, যুদ্ধ চলতেই থাকবে। সুতরাং, হরমুজ উন্মুক্ত করার দায় এখন ইউরোপের ওপর ঠেলে ট্রাম্প যেমন হাস্যাস্পদ হচ্ছেন, তেমনই খার্গ দ্বীপ দখল করার দাম্ভিক ঘোষণাও অচিরে অসার প্রমাণিত হবে।

………………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন দীপঙ্কর দাশগুপ্ত-র অন্যান্য লেখা

………………………..