
পভার্টি পর্ন-এর সাধারণ ক্যাটাগরিতে গরিব মানুষ মানেই দুঃখ, অসহায়তা, কান্না কবলিত মুখ, ভাঙাচোরা বাড়ি, রাস্তার পাশে শুয়ে থাকা মানুষ, কলতলা থেকে বড়জোর ঠেলার চাউমিনের দোকানের মোড়কে মানুষকে সম্পূর্ণ মানুষ না-বানিয়ে ‘স্টোরি’, ‘অবজেক্ট’ বানানোর নেশা। মানুষকে অসহায় ‘বস্তু’ হিসেবে দেখানোর এক মস্ত এজেন্সি। স্ট্রিট-ওয়াক ফটোগ্রাফি, নানাবিধ ফিল্ম কন্টেন্ট, রিল, ব্লগ– যত গরিব, তত মিলিয়ন এই নিরিখে বেড়ে ওঠা এক শকিং প্যাটার্নে চলতে থাকা নেশার মতো দারিদ্রের নীলছবি ব্যবসা।
আলো ঝলমলে হাইরাইজের পাশেই মাটির কাছাকাছি শুয়ে থাকা বস্তি সারসার। জানলায় উঁকি অথবা ব্যালকনির অন্ধকারে চুপিসারে দাঁড়িয়ে দেখা বস্তির মহিলাদের সমবেত খিস্তি, তরুণ সংঘ ক্লাবের ছেলেদের মদ খেয়ে অকারণ মারামারি, সমকামী মেয়েটির সুইসাইডের পরবর্তী রাতে মায়ের ড্রেনের পাশে থেবড়ে বসে করুণ কান্না থেকে ওয়ান্টেড লিস্টে থাকা তরুণ বিপ্লবীটিকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়াটুকু প্রতিটি মুহূর্ত অবধি উপভোগ্য।
চরম উপভোগ্য বটে এই দারিদ্রের টেক্সচার। আর এই আলফা দারিদ্র হাই-এন্ড কন্টেন্টকে ঝকঝকে প্যাকেজে বিশ্বের দরবারে মেলে ধরাই হল গিয়ে চরমতম এলিটিস্ট, একাধারে সমাদৃত এবং অবশ্যই পপুলার কালচার।
এই উপভোগ্য এবং সেলিব্রেটেড কালচারের নিন্দুকীয় নামকরণ হল ‘পভার্টি পর্ন’।
দারিদ্র, দুর্ভোগ বা অসহায়তাকে অতিরঞ্জিত এবং চমৎকার সেনসেশনাল ভাবে ছোট-বড় ভিডিও, ডকুমেন্টারি কিংবা ফিকশন ফিচার ফিল্ম, কিংবা নিছক মোবাইল ফটোগ্রাফির মাধ্যমে দেখিয়ে দর্শকের সহানুভূতি, দান, ভিউ ফান্ড ফলোয়ার আদায় করা। অন দ্য আদার হ্যান্ড ভুক্তভোগী মানুষের মর্যাদা, বাস্তব প্রেক্ষিত, অধিকার এসবকে ইয়াব্বড় কাঁচকলা দেখিয়ে এই পভার্টি পর্ন বেড়ে উঠছে তোমার আমার লাল-নীল সংসারে।
পভার্টি পর্ন-এর সাধারণ ক্যাটাগরিতে গরিব মানুষ মানেই দুঃখ, অসহায়তা, কান্না কবলিত মুখ, ভাঙাচোরা বাড়ি, রাস্তার পাশে শুয়ে থাকা মানুষ, কলতলা থেকে বড়জোর ঠেলার চাউমিনের দোকানের মোড়কে মানুষকে সম্পূর্ণ মানুষ না-বানিয়ে ‘স্টোরি’, ‘অবজেক্ট’ বানানোর নেশা। মানুষকে অসহায় ‘বস্তু’ হিসেবে দেখানোর এক মস্ত এজেন্সি। স্ট্রিট-ওয়াক ফটোগ্রাফি, নানাবিধ ফিল্ম কন্টেন্ট, রিল, ব্লগ– যত গরিব, তত মিলিয়ন এই নিরিখে বেড়ে ওঠা এক শকিং প্যাটার্নে চলতে থাকা নেশার মতো দারিদ্রের নীলছবি ব্যবসা।

আরেক ন্যারেটিভ হল ‘উদ্ধারক’-এর ভূমিকায় উত্তীর্ণ আমি, কিংবা আমরা এসে বাঁচালাম। লাল মার্সিটিজ, লালনীল বাতির গাড়ি অথবা নিছক এনফিল্ড হাঁকিয়ে অবতীর্ণ হয়ে এসে আজ আমি মস্ত দান করলুম অ্যান্ড মহান হইলাম। মহান হওয়ার নেশা এবং সেনসেশনাল কন্টেন্ট নিয়ে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে কমেন্টের বন্যায় ভেসে যাওয়ার চেয়ে তৃপ্তিদায়ক আর কিছু নেই। পরিবারের কচিটির জন্মদিন গরিবগুর্বোদের নোংরাদের মাঝে পালন করিয়া আমি আলট্রা-আপার ক্লাস, আমার শরীর দয়ার সাগর আর আপনাদের বাটি হাতে লাইন দিয়ে অবতীর্ণ হবার যে ব্যাপারটা…!
সেদিনই সোশাল মহাকাশে জ্বলজ্বলিয়ে ওঠে ‘আজ আমি এক গরিবকে সাহায্য করিলাম’! ‘গরিব’ শিশু বৃদ্ধ পঙ্গু অবলাদের কম্বল বিতরণ করে অথবা মফস্সলীয় এনজিও হাঁকিয়ে দাতা-পরিত্রাতার ভূমিকায় লাইভে আসার অমোঘ আকর্ষণ। সাহায্যকে ক্ষমতার এক বিরাট প্রদর্শনী বানিয়ে সোশালি আপলোড আর ধাঁই ধাঁই করে ভিউ আর সামাজিক স্ট্যাটাস কাউন্ট। এই প্যাটার্ন মূলত NGO ফান্ড-রেইজিং এবং পপুলারিটি কনটেন্ট হিসেবে সব থেকে জনপ্রিয়।

নিম্নবিত্ত বা অতি দরিদ্র পরিবার, যারা নিজেদের চরম দারিদ্রের কারণেই লাইনে দাঁড়িয়ে এই পৈশাচিক উল্লাসে একপ্রকার বাধ্য হয় অংশগ্রহণ করতে। একদিকে তাদের খুল্লমখুল্লা পরিচয় উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। তাদের নাম, মুখ, ঘর, স্কুল, অসুখ, পারিবারিক-ব্যক্তিগত সমস্যা সব একের পর এক প্রকাশ পেতে থাকে। স্বভাবতই, ভবিষ্যতে সেই মানুষটার সম্মান, নিরাপত্তা, কাজের জায়গা, বিয়ে, স্কুলিং ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বিপন্ন হয়ে পড়ে ডিপ্রেশন, সোশাল স্ট্যাটাস অনুযায়ী একাকিত্বে চলে যাওয়া, বিভিন্নভাবে মানুষ অথবা পরিবারটি ভাঙতে থাকে।
এরপরও আছে। বন্যায় ভেসে যাওয়া মানুষ আঁকড়ে বসে আছে খড়কুটো, ঝড়ে ভেঙে যাওয়া বাড়িঘর; অসহায় পরিবার ঘূর্ণিঝড়ে সর্বস্ব হারিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে– প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ক্যামেরা হাতে দৌড়ে যাওয়া মানুষ। লাইভ ভিডিও-তে মানুষের ঘর ডুবে গিয়েছে– ক্যামেরা ঢুকে পড়ে অন্দরমহলে। ক্লোজ আপ, ঠান্ডায় কুঁচকে যাওয়া শিশুটির মুখ। ২০২৫-এর উত্তরবঙ্গের ভয়ংকর বন্যায় ভেসে যাওয়া মানুষ, গবাদি পশু– বাঁচাতে যত না মানুষ এগিয়েছে, তার প্রায় তিনগুণ মানুষ সেই স্পটে ক্যামেরা নিয়ে গভীর চিত্রায়নে ব্যস্ত। বিখ্যাত, কুখ্যাত, অখ্যাত রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্বরা তো সমাজসেবার জমজমাট স্ক্রিপ্টে প্রপার সিনেমাটোগ্রাফার নিয়েই ঘোরেন। আমাদের বড়বাবু, দাদা-দিদিভাইদের স্ক্রিপ্টেড সমাজসেবার ভাইরাল ভিডিও-ও সবার মোবাইলেই ঘুরছে।

এরও এক বিকৃত পর্যায় রয়েছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভাইরাল ভিডিও। সে যদিও পভার্টি পর্নের আওতায় পড়ে না, কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার করা অসহায় মানুষের চিৎকার, আগুনে মাংস পোড়ার গন্ধ, ঘরবাড়ি দাউদাউ করে জ্বলতে জ্বলতে ছুটে পালাচ্ছে শিশু, কেটে টুকরো করে কেরোসিন দিয়ে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেওয়া লাশের লাইভ ভিডিও-তে আলফা মেলের আস্ফালন, গাছে বেঁধে বারুদের স্তূপে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে মারছে, আমরা শীতের রাতে লেপের আদরে বুড়ো আঙুল হেলিয়ে আনন্দ নিচ্ছি। এ-ও কি অশ্লীল পর্ন নয়!
আমাদের ফিল্ম লাইনের পুরনো পাতা উল্টে বাই ফোকালে নজরে আসে, ঐতিহাসিক রায়বাবুর পাঁচালীকেও দাগিয়ে দেওয়া আছে দারিদ্রের টেক্সচারাস ফ্রেমিং সংকলন হিসেবেই। ভারতের অসংখ্য চলচ্চিত্র পরিচালক অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে অনেক হিসেব কষে এই পভার্টি পর্ন-কে প্রোমোট করে যান। স্লামডগ মিলিয়েনিয়ার নিয়েও সোচ্চার ছিল একদল মানুষ। বাস্তব আর বাস্তব ঘিরে তার ফায়দা তোলার মধ্যে এক সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েই যায়।

ফ্রেঞ্চ থেকে ইতালীয়, আমেরিকান থেকে জাপানিজ– সর্বত্র ডকুমেন্টারি কিংবা প্যারালাল সিনেমার ফান্ডদাতাদের কলারেই দারিদ্রের জয়জয়কার। ভারত তথা বাংলার এই অমোঘ দরিদ্র পর্নোগ্রাফিকে অল্পসংখ্যক কিছু বুদ্ধিমান মানুষই শিল্পে, সাহিত্যে, সিনেমায়, গানে, ফটোগ্রাফিতে অতি সন্তর্পণে, জ্ঞানে কিংবা সজ্ঞানে ব্যবহার করে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবেই লাভবান হয়েছেন। আন্তর্জাতিক স্তরে তথ্যচিত্র নির্মাণ কৌশলে, যা আমাদের সাদা চামড়া শেখায়– সেই মহানুভব ক্লাসরুমে দারিদ্রের কারণ, জীবনযাত্রা, তাদের বিপ্লব, আনন্দ ইত্যাদি ইত্যাদি দেখানো নেই। শুধুই অনর্থক কষ্ট দেখানো। ভাত-টাত লেগে থাকা শিশুর মুখ, ত্রিপলের ঘরবাড়ি এবং সবচেয়ে জরুরি– তাদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত, সম্মতি ছাড়া ক্যামেরা নিয়ে ‘সাবজেক্ট’-এর বেডরুমে ঢুকে যাওয়ার এক নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান।

জাস্ট একটু কান্না, শিশুর ক্ষুধা, নোংরা পোশাক এবং ভুক্তভোগী মানুষের মর্যাদাকে যত্নের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত করে সর্বত্র ক্যামেরায় জোর করে ফোকাস, হাইলাইটের জন্য বসে থাকা বছরের পর বছর। দারিদ্রের এই অশ্লীল মার্কেটাইজেশন, সামাজিক এক্তিয়ারে অনেক অনেক বেশি ভয়ানক। মেটাবিশ্বে ভার্চুয়ালি এবং পিঠ চাপড়ানো পরিসরে সশরীরে বর্তমান উপস্থিতি নিয়ে মানবজাতি আজ সযত্নে টেনিদার সেই অমোঘ ডায়লগ আউড়ে বেড়ায়– ‘পরের জন্য প্রাণ দিয়ে দেব পিসিমা’। কানে খাটো পিসিমার জবাব– ‘অ্যাঁ, কী বললি! ঘরের লোকের কান কেটে নিবি!’
প্রাণ দিতে গিয়ে আদতে ঘরের লোকের কানই কাটছে পভার্টি পর্নস্টারের দল!
……………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন অভ্রদীপ ঘটক-এর অন্যান্য লেখা
……………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved