
চলতি বছরে বার্লিনালে অরুন্ধতী রায়ের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। তাঁর লেখা থেকে নির্মিত ‘ইন হুইচ অ্যানি গিভস ইট দোজ ওয়ানস’ প্রদর্শিত হওয়ার কথা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনি অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ হিসেবে জানান, গাজা নিয়ে পর্যাপ্ত প্রতিবাদ না হওয়া এবং জুরির তরফে ‘রাজনীতি সিনেমার বাইরে থাকা উচিত’– এই অবস্থান তিনি মেনে নিতে পারেন না। কয়েক বছর আগে দিল্লি বিমানবন্দরে তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘ভুলে যাবেন না, নীরবতাও এক ধরনের অবস্থান।’ বিশেষ করে গাজায় লাগাতার বোমাবর্ষণ, অসামরিক মানুষের মৃত্যু, হাসপাতাল ধ্বংসের প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নীরবতা প্রশ্ন তোলে।
ফেব্রুয়ারির শুরু, ২০১৫।
হেলসিংকি, ফিনল্যান্ড– উত্তর ইউরোপ।
ফরেস্টের পাশে জানলার ধারে বসে আছি। থিয়েটার থেকে কয়েকদিন বিরতি নিয়েছি। শেষ ঘণ্টায় ঠিক একজন মানুষ দেখেছি। গ্রামবাংলার কথা মনে পড়ছিল। বীরভূমের লাভপুরে সবুজ পুকুরপাড়ের পাশে একটা নির্লিপ্ত বাঁশগাছ কিছুটা ঝুঁকে পড়েছে। দূরে একটা তালগাছ। মনে পড়ছিল, পৌষ সংক্রান্তির কত রাত জয়দেব-কেন্দুলির ফকির-বাউল আশ্রমের মাটিতে পাতা খড়ের বিছানায় কেটেছে। অলস জীবন।
কাট টু হেলসিংকি।
কয়েক দিন আগেই হেলসিংকি একটা হালকা তুষার ঝড় দেখেছে। কয়েকটি পাতাহীন বার্চগাছ অনুভূতির লাশ কাঁধে নিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। শেলির বিখ্যাত লাইন মনে পড়ে: If winter comes, can spring be far behind? কিন্তু বসন্ত আর শীতের পার্থক্যই বা কী? ফিনল্যান্ড আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছে। এই দেশে, বা যে কোনও নর্ডিক-স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশে, বসন্ত মানে শীতেরই আরেকটা দীর্ঘ সংস্করণ। আলো একটু বাড়ে, বরফ একটু গলে– এই যা। বহু বছর উত্তর ইউরোপে থেকেও বসন্তের আনন্দ ঠিক বোঝা যায় না। শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসব যেন আলোকবর্ষ দূরে।

ঠিক সেই সময় এয়ার বার্লিনের একটা সস্তা টিকিট পেয়ে হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম– বার্লিন যাব। উদ্দেশ্য একটাই: বার্লিন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে কিছু সিনেমা দেখা, বিশেষ করে জাফর পানাহি-র ‘ট্যাক্সি তেহরান’।
তখন বার্লিনের দেওয়াল ভাঙার ২৬ বছর পেরিয়ে গিয়েছে। দুই জার্মানি এক হয়েছে। হেলসিংকির তুলনায় বার্লিনে ঠান্ডা কিছুটা কম। হেলসিংকিতে কিছু কিনতে গেলেই দু’বার ভাবতে হয়, বার্লিনে তা নয়– জিনিসপত্র তুলনামূলকভাবে সস্তা। তখনও ইন্টারনেট-সর্বস্ব জীবন হয়ে ওঠেনি আমাদের। ফেব্রুয়ারির শীতকে তোয়াক্কা না করে উৎসবের মূল কেন্দ্র পটসডামার প্লাৎজে জড়ো হন সিনেমাপ্রেমীরা। পোস্টার, ব্যানার, সিনেমা হলের সামনে লাইন– সব মিলিয়ে এক উৎসবের আবহ।
রাতভর লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কাটা। ঠান্ডায় হাত-পা জমে যাচ্ছিল। অবশেষে দেখলাম ট্যাক্সি তেহরান। ফিকশনের ভেতরে কী সুন্দরভাবে পানাহি নন-ফিকশন এলিমেন্ট ঢুকিয়েছেন, না-দেখলে বিশ্বাস হত না। হল থেকে বেরিয়ে দেখি জটলা, গন্ডগোল। অনেকেই টিকিট পাননি। তখন অ্যাপ দিয়ে টিকিট কাটার সুযোগ ছিল না। সিনেমা নয়, জীবন দেখা থেকে বঞ্চিত হয়ে মানুষ ক্ষুব্ধ। সিনেমার জন্য এই প্যাশন দেখে ভালো লেগেছিল। মনে হচ্ছিল, কলকাতায় মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ না দেখতে পেয়ে মানুষ যেমন রেগে যায়, ঠিক তেমনই।

কিন্তু এই উৎসবের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল রাজনীতি, প্রশ্ন, অস্বস্তি– যা হয়তো ২০১৫ সালে পুরোপুরি বুঝিনি। ‘Taxi Tehran’ নানা পুরস্কারে ভূষিত, নতুন করে কিছু বলার নেই। এটুকুই বলি– নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তৈরি এক অনন্য রাজনৈতিক চলচ্চিত্র। হ্যাঁ, রাজনৈতিক বললাম। আগামীতেও বলব।
সেদিন বার্লিনালে আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে শিখিয়েছিল– সিনেমা কখনও নিরপেক্ষ হয় না। হবেও না। প্রশ্ন একটাই, কোন রাজনীতিকে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।
হল থেকে বেরিয়ে দর্শকদের সঙ্গে কথাবার্তায় একটা অদ্ভুত বিষয় লক্ষ করেছিলাম। অনেকেই বলছিলেন, তাঁরা ইরানের তথাকথিত দমনমূলক শাসন ব্যবস্থাকে সমর্থন করেন না। কিন্তু একই সঙ্গে তারা এটাও বলছিলেন– যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব যে দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে রেখেছে, সেটাও তারা সমর্থন করেন না। তখনই কেউ একজন প্রশ্ন তুলেছিলেন, পানাহি নিজের দেশের দমননীতি সাহসের সঙ্গে উন্মোচন করেছেন, কিন্তু পশ্চিমের দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে তাঁর ক্যামেরা কি কখনও সরব হয়েছে?
সেই প্রশ্ন তখন খুব জোরে উচ্চারিত হয়নি। আজ, ১১ বছর পরে, সেই প্রশ্নটাই আরও স্পষ্ট।
যে শহর একসময় দেওয়াল দিয়ে বিভক্ত ছিল, সেই শহরকে আজ বিশ্ব-সিনেমার এক ধরনের ‘নৈতিক রাজধানী’ হিসেবে দেখা হয়। মানবাধিকার, যুদ্ধ ও শরণার্থী সংকট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আলোচনা প্রায়শই এই মঞ্চেই শোনা যায়। অথচ ঠিক সেই মঞ্চ থেকেই যদি বলা হয় ‘রাজনীতি সিনেমার বাইরে থাকুক’, তখন প্রশ্ন ওঠে: সিনেমা কি আদৌ রাজনীতি ছাড়া সম্ভব?

এই প্রশ্নটাকেই নতুন করে সামনে এনেছেন অরুন্ধতী রায়। চলতি বছরে বার্লিনালে তাঁর উপস্থিত থাকার কথা ছিল। তাঁর লেখা থেকে নির্মিত ‘ইন হুইচ অ্যানি গিভস ইট দোজ ওয়ানস’ প্রদর্শিত হওয়ার কথা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনি অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ হিসেবে জানান, গাজা নিয়ে পর্যাপ্ত প্রতিবাদ না হওয়া এবং জুরির তরফে ‘রাজনীতি সিনেমার বাইরে থাকা উচিত’– এই অবস্থান তিনি মেনে নিতে পারেন না।
জুরি-প্রেসিডেন্ট উইম ওয়ান্ডার্সের বক্তব্য শুনতে নিরপেক্ষ মনে হলেও বাস্তবে তা গভীরভাবে ‘রাজনৈতিক’, এমনটাই মনে করেন অনেকেই। কারণ কোন রাজনীতি গ্রহণযোগ্য, আর কোনটা নয়– এই বাছাইটাই কি ক্ষমতার ভাষা নয়?
কয়েক বছর আগে দিল্লি বিমানবন্দরে অরুন্ধতী রায় আমাকে বলেছিলেন, ‘ভুলে যাবেন না, নীরবতাও এক ধরনের অবস্থান।’ বিশেষ করে গাজায় লাগাতার বোমাবর্ষণ, অসামরিক মানুষের মৃত্যু, হাসপাতাল ধ্বংসের প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নীরবতা প্রশ্ন তোলে।
গত বছর কান চলচ্চিত্র উৎসবে জুলিয়ান আসাঞ্জ যে টি-শার্ট পরে উপস্থিত হন, তাতে ইজরায়েলি হামলায় নিহত হাজার হাজার ফিলিস্তিনি শিশুর নাম লেখা ছিল, একথা বহু মিডিয়ায় আলোচিত হয়েছে। তাঁর উপস্থিতি নিছক চলচ্চিত্রের বিষয় হয়ে থাকেনি; তা হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের ভাষা।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপীয় ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলো যেভাবে রাশিয়ার সিনেমা ও সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব বর্জন করেছিল, তা নজিরবিহীন। আমিও যুদ্ধ সমর্থন করি না। কিন্তু একই নৈতিক মানদণ্ড ইজরায়েলের ক্ষেত্রে কেন প্রযোজ্য হয় না, এই প্রশ্ন থেকেই যায়।
বার্লিনালে ইরানি সিনেমা বরাবরই গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু ফিলিস্তিনি বা গাজা-কেন্দ্রিক ছবির ক্ষেত্রে সেই মাত্রার আলোচনা দেখা যায় না। লাতিন আমেরিকার বহু দর্শক ও নির্মাতার কাছ থেকেও শুনেছি– একসময় প্রতিরোধের সিনেমার যে মঞ্চ ছিল বার্লিনালে, সেখানে আজ অনেক রাজনৈতিক ছবি জায়গা পাচ্ছে না।
আরেকটি বড় অভিযোগ– স্বাধীন সিনেমার প্রতি অবিচার। ‘সেরা’ ছবির সংজ্ঞা ক্রমে এমন হয়ে উঠেছে, যেখানে টেকনিক্যাল ক্রাইটেরিয়া, প্রযোজনা মূল্য ও আন্তর্জাতিক লবিই মুখ্য। ফলে যাদের নেপথ্যে স্টুডিও নেই, মিডিয়া নেই, তারা প্রায় অদৃশ্য।

বার্লিনালে ভারতীয় সিনেমা বলতে কি শুধুই বলিউড বোঝে? বড় বাজেটের ছবির উপস্থিতি বেড়েছে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে ভারতীয় স্বাধীন সিনেমা কি সত্যিই খোঁজা হয়?
এই নীরবতার বিরুদ্ধে শুধু অরুন্ধতী রায় নন। জেভিয়ার বারডেম, টিলডা সুইনটন-সহ অন্তত ৮০ জন চলচ্চিত্রকর্মী বার্লিনালের জুরিকে খোলা চিঠি লিখেছেন। এই প্রেক্ষিতে অরুন্ধতী রায়ের অনুপস্থিতি শুধুই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি এক সচেতন রাজনৈতিক অবস্থান। কখনও কখনও অনুপস্থিতিই সবচেয়ে জোরালো ভাষা।
বার্লিন শহর একসময় দেওয়াল ভাঙার প্রতীক ছিল। প্রশ্ন থেকে যায়, বার্লিনালে কি সেই ঐতিহ্য বহন করছে, নাকি শিল্প ও রাজনীতির মাঝে নতুন এক নীরব দেওয়াল তুলে দিচ্ছে?
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved