Robbar

মূর্তি কি শুধুমাত্র ঐতিহাসিক স্মারক?

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 20, 2026 7:51 pm
  • Updated:March 20, 2026 7:51 pm  

মূর্তি কি শুধুমাত্র ঐতিহাসিক স্মারক? কেবল একখণ্ড শৈল্পিক নিদর্শন? ভারতের নিরিখে, একেবারেই তা নয়। এই দেশের রাজনীতির যে মূল ন্যারেটিভ, যে গণতান্ত্রিক পরিসর, যে ধর্মনিরপেক্ষতা– সম্পূর্ণ লীন হয়ে ছিল এহেন মূর্তিতে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে, এই তিনটি উপাদানই স্থানান্তরিত হয়েছে। গুজরাতে। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের দীর্ঘকায় মূর্তির ওপরে। কেউ কেউ বলবেন, এ-হল রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলের অবধারিত ফলাফল। তবু হে পাঠক, একুশ শতকের ভারত কি বল্লভভাই প্যাটেল অথবা তাঁর উজ্জ্বল মূর্তির মতোই লৌহসম? স্ট্যাচু অফ ইউনিটি থেকে যৌথতার কোন পাঠ গ্রহণ করেছে ভারতের প্রতিটি নাগরিক এবং সরকার?

রোদ্দুর মিত্র

দরিয়াগঞ্জের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ল একটি মূর্তি। প্রাচীন। দৃশ্যত মলিন। জওহরলাল নেহরু। স্থির তাকিয়ে থাকলে মনে হয়, এ-মূর্তি কি শুধুমাত্র ঐতিহাসিক স্মারক? কেবল একখণ্ড শৈল্পিক নিদর্শন? ভারতের নিরিখে, একেবারেই তা নয়। এই দেশের রাজনীতির যে মূল ন্যারেটিভ, যে গণতান্ত্রিক পরিসর, যে ধর্মনিরপেক্ষতা– সম্পূর্ণ লীন হয়ে ছিল এহেন মূর্তিতে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে, এই তিনটি উপাদানই স্থানান্তরিত হয়েছে। গুজরাতে। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের দীর্ঘকায় মূর্তির ওপরে। কেউ কেউ বলবেন, এ-হল রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলের অবধারিত ফলাফল। তবু হে পাঠক, একুশ শতকের ভারত কি বল্লভভাই প্যাটেল অথবা তাঁর উজ্জ্বল মূর্তির মতোই লৌহসম? স্ট্যাচু অফ ইউনিটি থেকে যৌথতার কোন পাঠ গ্রহণ করেছে ভারতের প্রতিটি নাগরিক এবং সরকার? জওহরলাল নেহরুর চোখে, গালে, চিবুকে পায়রার গু দেখে আপনার কি অমৃতকালের কথা মনে পড়ে ইদানীং? এও আসলে এক ধরনের রাজনীতি। যার কেন্দ্রে, মূর্তি।

ভারতের ‘স্ট্যাচু অফ ইউনিটি’

এইবার চোখ মেলে দেওয়া প্রয়োজন। পৃথিবীতে, এমন মূর্তি-কেন্দ্রিক রাজনীতির অভিঘাত কত গভীর? এ-লেখা সেগুলোই ছানবিন করে দেখবে।

দক্ষিণ কোরিয়া। সিওল শহর। জাপানি এম্ব্যাসির সামনে ব্রোঞ্জের একটি মূর্তি। বাচ্চা মেয়ে। পরনে কোরিয়ান পোশাক, চিমা জেওগ্রি– চিমা অর্থাৎ লম্বা স্কার্ট এবং জেওগ্রি হল জ্যাকেট। সরাসরি সে তাকিয়ে আছে কেন জাপানি এম্ব্যাসির দিকে? মেয়েটির ধাতব চোখ, নিস্পন্দ ঠোঁট, অসাড় চাহনি যেন ইতিহাসে ঘাই মারে। বিস্মরণের বিরুদ্ধাচারণ করে। প্রতি মুহূর্তে যেন মনে করিয়ে দিতে চায়, যৌন নিপীড়িত অযুতনিযুত কোরিয়ান মেয়ের কথা– দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং এশিয়া প্যাসিফিক যুদ্ধের কালে, দীর্ঘসময় ধরে, জাপানি ইম্পেরিয়াল মিলিটারির যৌনদাসী হয়েছিলেন যারা! মূর্তিটির নাম, ‘স্ট্যাচু অফ পিস’। চলতি ভাষায় বলা হয়, ‘কমফোর্ট ওম্যান’। আসলে কমফোর্ট এবং পিস– উভয় শব্দেরই আশ্চর্য দ্যোতনা তৈরি করে এ-মূর্তি। আর তৈরি হয়, ভীষণ কোনও প্রতিবাদ। একটা অদৃশ্য চোখ, যেন সভ্যতারই তৃতীয় নয়ন, অপলক তাকিয়ে আছে। হাজার হাজার গ্যাস-চেম্বার। কালো মানুষের আর্তনাদ। গণহত্যা। বুলডোজার। তিনজন কৃষককে পিষে দিয়েছিল যে এসইউভি গাড়ি! সকলের দিকেই তাকিয়ে আছে সেই চোখ। তাই ‘স্ট্যাচু অফ পিস’ ছড়িয়ে গেছে সমগ্র বিশ্বে। প্রেক্ষিত বদলে কখনও-বা হয়েছে হলোকস্ট। স্বাভাবিক।

দক্ষিণ কোরিয়ার সিওলে ‘স্ট্যাচু অফ পিস’

কৈশোরেই আমরা জেনেছিলাম, ‘স্ট্যাচু অফ লিবার্টি’। রিও ডি জেনেইরো শহরের, ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার। বয়স যত বেড়েছে, পড়েছি হোসে মার্তির কথা। গুগল ইমেজেস থেকে খুঁজে খুঁজে দেখেছি, হাভানা শহরের সেন্ট্রাল পার্কে একটি মূর্তি। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা দৃঢ় হোসে মার্তি। আগ্রাসী। অথবা মনে পড়তে পারে রাশিয়ার ভলগোগ্রাদে, সোভিয়েত আমলের দুর্দান্ত একটি নারী মূর্তি। ‘দ্য মাদারল্যান্ড কলস’। ডানহাতে তরবারি। বাঁ-হাত যেন আহ্বান করছে। দেশের মাটির জন্যে। সংগ্রামে। ব্যাকগ্রাউন্ডে যে-ইতিহাস ধিকিধিকি জ্বলে, তা স্তালিনগ্রাদের সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধ। সেই সমস্ত রাশিয়ান সৈন্যের স্মৃতিসমূহের নির্মাণ ‘দ্য মাদারল্যান্ড কলস’, যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিল যারা। কিন্তু এ-লেখার মূল প্রতিপাদ্য তুলনায় ভিন্ন। সেই প্রতিবাদের চোখ, পৃথিবী ঘুমলেও জেগে থাকে সততই। আরও একটি উদাহরণ দেওয়া যাক।

রাশিয়ার ভলগোগ্রাদে ‘দ্য মাদারল্যান্ড কলস’

সম্প্রতি ওয়াশিংটন শহরের ন্যাশনাল মলের রাস্তায়, নির্মিত হয়েছে অভূতপূর্ব এক মূর্তি। উচ্চতায় দশ। সোনালি রং। দু’হাত মেলে দাঁড়িয়ে আছে জেফ্রি এপস্টিন। পিছনে, ডোনাল্ড ট্রাম্প। যেন টাইটানিক ছবির প্রবল জনপ্রিয় দুই প্রেম-যুগল: জ্যাক এবং রোজ। উভয় যুগলের কী ভীষণ মিল! বিলাসবহুল কোনও ভ্রমণে মত্ত। পৃথিবীর তাবড় তাবড় মানুষের সমাগম। নৈশপার্টি। গোপনে আঁকা নগ্ন ছবি। অপার মস্তি। কান পাতলে নিশ্চয়ই শোনা যাচ্ছে, ‘এভরিনাইট ইন মাই ড্রিম…’ এই ড্রিম আসলে সেই ‘আমেরিকান ড্রিম’। যার পিছনে ছুটতে ছুটতে ছুটতে বিশ্বের প্রতিটি দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ, কুকুর হয়ে গেছে। শিশুর মুখের দিকে তাকালে, সে দেখে মৃত্যু। অথবা যৌনতা। আহা রে একুশ শতকের মানুষ! আর মূর্তিটির নাম? ‘কিং অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’। মিউজিয়ামে কেন রাখা হল না? পথচলতি যে কোনও মানুষেরই যেন এ-মূর্তি দেখামাত্র মনে পড়ে যায় কুৎসিত এপস্টিন ফাইলসের কথা। অতএব এই মূর্তির রাজনীতি খুব গভীরে। সেখানে তীব্র পরিহাস আছে। অসংখ্য মেয়ের দুর্দমনীয় যন্ত্রণা আছে। আর আছে একটা তাকিয়ে থাকা। শেষমেশ তোমরা কাকে কিং বানিয়েছ ভাই? একজন সেক্স অফেন্ডার?

‘কিং অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’

মূর্তি-কেন্দ্রিক রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, মূর্তি-ভাঙার রাজনীতি। সোভিয়েত পতনের পরে যেমন লেনিন-মূর্তি ভেঙেছিল ইউক্রেনের বিক্ষুব্ধ জনতা, ইরাকের মানুষ ভেঙেছিল সাদ্দাম হোসেনের মূর্তি! এহেন রাজনীতির কথা শুরুতেই লিখেছি। উল্টোপিঠে আরও একখানি দৃষ্টির অস্তিত্ব আছে। সেই কথা বলেই লেখাটি শেষ করি।

আমেরিকায় যখন খুন হলেন জর্জ ফ্লয়েড! যে-মূহূর্তে পৃথিবী তোলপাড় করছে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলন! সেই সময়েই, ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল শহরের মানুষ গুঁড়িয়ে দিয়েছিল এক মূর্তি। এডওয়ার্ড কলস্টনের। একজন সাদা চামড়ার মানুষ। ক্রীতদাস কেনাবেচাই ছিল একমাত্র পেশা। সেই তাকিয়ে থাকাগুলো যেন শরীর পেয়ে, ক্রোধে আর ঘৃণায়, উপড়ে দিয়েছিল কলস্টনের মূর্তিখানা। সভ্যতার শিরা-উপশিরা থেকে বর্ণবিদ্বেষ উপড়ে ফেলা যায় না এভাবেই। তবে যেটুকু সম্ভব, তা কলস্টনের মূর্তির বদলে একটি নারী মূর্তি স্থাপন। গায়ের রং কালো। কোঁকড়া চুল। একটা মুষ্টিবদ্ধ হাত। আন্দোলনেরই একটি মুখ। আর ওই মুঠোর ভেতরে, জমা হয়ে থাকে অগুনতি আগুনে চোখ। অনাদিকালের। বর্তমানের। ভবিষ্যতেরও।

……………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন রোদ্দুর মিত্র-র অন্যান্য লেখা

……………………