
কলকাতার পর চেন্নাইতেও হারল অস্ট্রেলিয়া। সিরিজ জিতল ভারত। সিরিজের টার্নিং পয়েন্ট কিন্তু ইডেনের ওই চতুর্থ দিন। যেদিন বিশ্বের সেরা দলের অহং ভেঙে চুরমার করে দেয় দুই দক্ষিণী যুবকের আকর্ষক ব্যাটিং। বিশ্বরেকর্ড গড়ার পর অস্ট্রেলিয়ার হার, মেজাজ হারিয়ে স্টিভ ওয়ার সৌরভকে ব্যক্তি আক্রমণ, লক্ষ্মণ-হরভজনদের উত্থান– সব মিলিয়ে এই সিরিজ বর্ডার-গাভাসকর ট্রফির সেরা সিরিজ হিসেবে আজও চিহ্নিত।
সেদিন ইডেনের প্রেসবক্সে কোনও নেভিল কার্ডাস বা সিএলআর জেমস ছিলেন না। যদি থাকতেন, তাহলে ক্রিকেট ইতিহাসের অবিশ্বাস্য একটি অধ্যায় সোনার কলমে লিপিবদ্ধ করা থাকত।
১৩ মার্চ, ২০০১। তৃতীয় দিনের পড়ন্ত বেলায় গ্লেন ম্যাকগ্রার আউট সুইং উইকেটকিপার অ্যাডাম গিলক্রিস্টের গ্লাভসে জমা দিয়ে ভারত অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় যখন প্যাভিলিয়নের পথ ধরলেন, তখন ইডেন গার্ডেনে উপস্থিত ৮০,০০০ দর্শক মনে করেছিলেন ম্যাচ ও সিরিজে ফেরার আশা শেষ টিম ইন্ডিয়ার। ২৭৪ রানে পিছিয়ে ফলো অন করতে নেমে ভারতের স্কোর তখন ২৩২/৪। তখনও স্টিভ ওয়ার অস্ট্রেলিয়া ৪২ রানে এগিয়ে, ভারতের হাতে মাত্র ছ’টি উইকেট। এই পরিস্থিতিতে ছ’নম্বরে ব্যাট করতে নামলেন রাহুল দ্রাবিড়; ক্রিজে যোগ দিলেন শতরানের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা ভিভিএস লক্ষ্মণের সঙ্গে। লক্ষ্মণকে ব্যাটিং অর্ডারে তিনে এনে রাহুলকে ছয়ে নামিয়ে দেওয়াই বলছে দ্রাবিড়ের এই সিরিজে সেরকম ফর্ম ছিল না। লক্ষ্মণের সেঞ্চুরির পর ভারত দিন শেষ করল ২৫৪/৪-এ; লক্ষ্মণ ১০৯ আর দ্রাবিড় ৭ রানে অপরাজিত রয়ে গেলেন।

চতুর্থ দিনে মাঠে ঢোকার সময় ইডেনের প্রেসবক্স থেকে ক্লাবহাউস হয়ে গ্যালারিতে জল্পনা চলছিল, ভারত কি পঞ্চম দিনে খেলাটা নিয়ে যেতে পারবে? না ওইদিনই টেস্ট ও সিরিজ পকেটে পুরে ফেলবে স্টিভ ওয়ার অস্ট্রেলিয়া? মুম্বইতে প্রথম টেস্টে ১০ উইকেটে জিতে তিন টেস্টের সিরিজে ১-০ এগিয়ে তখন অজিবাহিনী। ম্যাচ এতটাই ঝুঁকে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে যে, চতুর্থ দিনে ভারতের পক্ষে ইনিংসে হার বাঁচানো ছাড়া আর কিছু আশা করা বাস্তবিকভাবে সম্ভব ছিল না। লক্ষ্মণের সেঞ্চুরি– সে তো হয়েই গিয়েছে। উইকেটে শেষ প্রতিষ্ঠিত ব্যাটসম্যান জুটি; এরপর উইকেটরক্ষক নয়ন মোঙ্গিয়া, তারপর বোলাররা।
স্টিভ ওয়াদের আরও সুবিধে হয়ে যায়, কারণ, তৃতীয়দিন শেষ হয়েছিল ভারতের ইনিংসের ৭৫ ওভারের পর, যার অর্থ, চতুর্থদিনের সকালে পাঁচ ওভার পরই নতুন বল নিতে পারেন তাঁরা। এবং নতুন বল নিয়ে দুর্ধর্ষ ম্যাকগ্রা-জেসন গিলেসপি জুটিকে যে অজি অধিনায়ক লেলিয়ে দেবেন ভারতের শেষ প্রতিরোধটুকু ধূলিসাৎ করতে, তা কেবল সময়ের অপেক্ষা।
আশা-আশঙ্কার মধ্যেই শুরু হল ইডেনে টেস্টের চতুর্থদিনের ২২ গজের লড়াই। মিডল অর্ডারে জায়গা পেয়ে এই সিরিজে লক্ষ্মণের পুনর্জাগরণ হচ্ছিল। আগে মেক-শিফ্ট ওপেনার হিসেবে সিডনিতে তার একটি ১৬৯ রানের ইনিংস থাকলেও, মূলত মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান হওয়ায় ওই ভূমিকায় টেস্টে তিনি বিশেষ সুবিধে করতে পারছিলেন না। তাই এই সিরিজের আগে ভিভিএস জানিয়ে দিয়েছিলেন, কোনও অবস্থাতেই তিনি আর ভারতের হয়ে ওপেন করবেন না। ইডেনে প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার ৪৪৫ তাড়া করতে নেমে ভারতীয় ব্যাটিং যখন হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছিল ১৭১ রানে, তখন একমাত্র তাঁর ব্যাট থেকেই এসেছিল ঝকঝকে ৫৯ রান। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় আর তদানীন্তন ভারতের কোচ জন রাইট দ্বিতীয় ইনিংসে তাকে তিন নম্বরে পাঠালেন। ভিভিএস তৃতীয় দিনেই শতরান করে কোচ-অধিনায়কের আস্থার মর্যাদা দিয়েছিলেন ঠিকই; কিন্তু তাঁর দল তখনও পড়ে খাদের কিনারায়!

টানা ১৬টি টেস্ট জিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ে স্টিভ ওয়ার অস্ট্রেলিয়া তখন অশ্বমেধের ঘোড়ার মতো ছুটছে। ম্যাকগ্রা-গিলেসপি-শেন ওয়ার্ন সমৃদ্ধ অজি বোলিং, ক্লাইভ লয়েডের ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলিংয়ের মতো অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। তৃতীয় পেসার মাইকেল ক্যাসপ্রোভিচও ১৯৯৮ সফরে চিন্নাস্বামী টেস্ট জিতিয়ে গিয়েছিলেন। তাই যথাসময়েই ওয়া নতুন বল নিয়ে সিম-আক্রমণ শুরু করলেন। এই পরিস্থিতিতে লক্ষ্মণ আর রাহুল যে-পরিকল্পনা নিয়ে ক্রিজে এসেছিলেন চতুর্থ দিন সকালে, তা হল, কাউন্টার অ্যাটাক। অর্থাৎ, গুটিয়ে থাকলে ম্যাকগ্রারা আরও মাথায় চেপে বসবেন, তাই সুযোগ পেলেই শট খেল। নতুন বল ইডেনের উইকেটে পড়ে সহজে ব্যাটে আসায় সেই প্রতি-আক্রমণের কৌশল দারুণ কাজে লাগল। গিলেসপিকে অবলীলায় পরপর তিনটি বাউন্ডারি মেরে লক্ষ্মণ বুঝিয়ে দিলেন, ‘খেল আভি বাকি হ্যায়’।
স্টিভ ওয়া শেন ওয়ার্নকে আনার পর লক্ষ্মণরা আরও আগ্রাসী হলেন। লাঞ্চের আগে ২৯ ওভারে ভারত তুলল ১২২ রান; লক্ষ্মণ ১৭১ অপরাজিত, রাহুলের সংগ্রহ ৫০। নড়েচড়ে বসল ইডেন; চারিদিকে রটে গেল ভারত লড়ছে, সেই বার্তা পেয়ে গ্যালারির ফাঁক ভরাট করতে শুরু করলেন বহু ক্রিকেটপ্রেমী।
দিনের দ্বিতীয় পর্বে ক্রিকেট তার মায়াবী রূপ মেলে ধরল। লক্ষ্মণ ২০০-র গণ্ডি পেরলেন। শেন ওয়ার্নের বল মিড-উইকেট বাউন্ডারির বাইরে পাঠিয়ে সেঞ্চুরি পূর্ণ করে লাফিয়ে শূন্যে ব্যাট ছুড়ে এমন ভঙ্গিতে উচ্ছ্বাস দেখালেন দ্রাবিড়, যা তাঁর মতো ধীরস্থির ক্রিকেটারের কাছে অপ্রত্যাশিত। আর এই জুটি ভাঙতে কতরকম চেষ্টাই না করে গেলেন স্টিভ ওয়া! নিজে এবং উইকেটকিপার গিলক্রিস্ট ছাড়া বল করালেন বাকি ন’জনকে দিয়েই! ক্যাপ্টেনের ডাকে পন্টিং, হেডেন, ল্যাঙ্গার, স্লেটাররাও হাত ঘোরালেন একে-একে। কিন্তু ব্রেক-থ্রু এল না কিছুতেই। দুরন্ত টাইমিং, স্বতঃস্ফূর্ত স্ট্রোক প্লে-র জাদুতে ভিভিএস লক্ষ্মণ তখন ২২৭-এ দাঁড়িয়ে। সুনীল গাভাসকরের ২৩৬-এর রেকর্ডের থেকে মাত্র ৯ রান পিছনে।

অন্যদিকে, চিনের প্রাচীরের মতো অবিচল রাহুল দাঁড়িয়ে ১০৬ রানে। চা-পান বিরতির সময় ভারত ৪৯১/৪; ২১৭ রানে এগিয়ে! ইলেকট্রনিক স্কোরবোর্ডের ভেসে ওঠা এই সব সংখ্যার ঊর্ধ্বে সমগ্র ইডেন তখন সম্মোহিত ‘গ্লোরিয়াস গেম অফ আনসাটের্নটি’-তে! ধ্রুপদী ঘরানার দুই জিনিয়াস সমান্তরালভাবে নিজস্ব স্টাইলে ব্যাট করে মজিয়ে রেখেছেন গোটা মাঠকে। ক্রিকেটের এই শৈল্পিক-সৌন্দর্য ও নিখুঁত টেকনিক-সমৃদ্ধ নন্দনতত্ত্ব, মরিয়া লড়াই আর মহান অনিশ্চয়তার পরিমাপ করা সম্ভব নয় বলেই তো নেভিল কার্ডাস স্কোরবোর্ডকে গাধা বলেছিলেন!
ইডেনে তখন সকালের আশঙ্কার মেঘ কেটে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে জয়ের আলো। কেউ বলছেন, ৩০০-র ওপর লিড নিলে চাপে পড়ে যাবেন হেডেনরা; কেউ বা আবার পাল্টা বলছেন, ‘ছাড় তো, এই ব্যাটিং-ই চলুক, চলতেই থাকুক। ওদের আর ব্যাট দিতেই হবে না’! এই অবধি পড়ে কেউ যদি ভেবে নেন যে, অজি-বোলাররা সেদিন খারাপ বোলিং করছিলেন, তা হলে খুব ভুল করবেন। ম্যাকগ্রা ও শেন ওয়ার্ন– যথাক্রমে সেই যুগের বিশ্বক্রিকেটের সেরা পেসার ও স্পিনার, ততক্ষণে তাঁদের সেরা অস্ত্রগুলো প্রয়োগ করে ফেলেছিলেন। উইকেট পেতে অজিরা তখন মরিয়া হয়ে বল করছিলেন। যার প্রমাণ স্বরূপ, দিনের শেষ ঘণ্টায় গিলেসপি দ্রাবিড়কে একাধিক বাউন্সারে নাস্তানাবুদ করলেন।

টেস্টের প্রথম দিনে নবাগত অফস্পিনার হরভজন সিংয়ের প্রথম ভারতীয় বোলার হিসেবে টেস্ট-হ্যাটট্রিক হয়তো বাড়তি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল রাহুল-লক্ষ্মণকে। তাই অবলীলায় গাভাসকরের ভারতের হয়ে টেস্টে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ২৩৬ রানের ইনিংসকে টপকে ২৫০ পার করলেন ভিভিএস; তার শৈল্পিক টাচ ফিরিয়ে আনল গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথের স্মৃতি। অবলীলায় গাভাসকরকে টপকে ইডেনের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর, ১৯৫৮-তে করা রোহন কানহাইয়ের ২৫৬ রানও পার করে দিলেন ‘ভেরি ভেরি স্পেশাল’ লক্ষ্মণ। ১৫০ করার পথে রাহুল দেখালেন কপিবুক ব্যাটিং কাকে বলে? ‘লিটল মাস্টার’ সানির পর ভারতীয় ব্যাটিংয়ে এরকম ‘ওয়াল’ আর হয়ে উঠতে পারেননি কেউ।
শেষ পর্বে ৩২ ওভার খেলা হল, কলকাতার প্রবল আর্দ্রতায় নিস্তেজ হয়ে আসছিল রাহুলদের হাত-পা। তাই রানের গতি কিছুটা মন্থর হল, কিন্তু তাদের টেম্পরামেন্টে চিড় ধরানো গেল না। ইতিহাস গড়লেন লক্ষ্মণরা! ভারত ৫৮৯/৪; দিনের ৯০ ওভারে উঠেছিল ৩৩৫ রান।
নার্ভের খেলায় ১৪ মার্চই কি ম্যাচটা হেরে যাননি স্টিভ ওয়ার অস্ট্রেলিয়া?

সেই সময়ের ক্রিকেটে এত ওভার বাউন্ডারির বন্যা বইত না। রিভিউ সিস্টেম, এমনকী, হক-আই ভিউও ছিল না। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট কী, জানতেন না লক্ষ্মণ-ওয়ার্নরা। আইপিএলের উদ্ভব হয়নি, ঘরোয়া ক্রিকেট মানে রনজি, দলীপ, দেওধর ট্রফিকেই বোঝাত। টেস্ট ক্রিকেটের কোনও বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ ছিল না। ওয়ান ডে ছিল, কিন্তু টেস্ট না-খেলেই, স্রেফ ফ্র্যাঞ্চাইজি-ক্রিকেট থেকে কোটিপতি মহাতারকা হওয়ার সুযোগ ছিল না। সেলিব্রিটি বলি-তারকারা এত ওতপ্রোতভাবে ক্রিকেটের অংশ হয়ে ওঠেননি। গ্যালারিতে ডিজে, জলসার আবহ, নীল জার্সি পরিহিত ‘ব্লিড-ব্লু’ জনতার উগ্র চিৎকার ভাবাই যেত না। প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরও বিপক্ষ দলের সঙ্গে হাত মেলাতেন ক্রিকেটাররা। ক্রিকেটবিশ্ব ভারত-ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া-সহ চার-পাঁচটি ওজনদার টিমের মধ্যে সীমিত ছিল না। ভারতীয় ক্রিকেটের সঙ্গে ধর্ম, দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি মিশে যায়নি আজকের মতো। আইসিসিতে বিসিসিআইয়ের সে-রকম কোনও প্রভাব ছিল না, যা কোনও সিরিজ বা টুর্নামেন্টে ভারতকে ‘অ্যাডভান্টেজ’ পাইয়ে দেবে। ভারত ট্রফি পেলে পুরস্কার-মঞ্চে নাচতে দেখা যেত না কোনও আইসিসি চেয়ারম্যানকে। ক্রিকেটের এমন এক পর্বে, রেকর্ড ২৮১-র ইনিংসের পথে হায়দরাবাদি লক্ষ্মণ মেরেছিলেন ৪৪টি বাউন্ডারি। পরে পাক সফরে মুলতান টেস্টে ট্রিপল সেঞ্চুরি করে এই রেকর্ড ভেঙে দেন বীরেন্দ্র শেহবাগ। তবে রেকর্ড ভেঙে যাওয়ায় লক্ষ্মণের এই ইনিংসের ‘ক্লাস’ ও মর্যাদা, এককণাও ক্ষুণ্ণ হয় না। আজও ইডেনের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের ইনিংস ২৮১! আর পঞ্চমদিনের সকালে ১৮০-তে রানআউট হওয়ার আগে দ্রাবিড়ের নামের পাশে ছিল ২০টি চার। ওই রান আউটেই ভাঙল ৩৭৬ রানের ভারতের রেকর্ড পঞ্চম উইকেট জুটি। এই অবিস্মরণীয় পার্টনারশিপে প্রতিপদে ছিল নিখুঁত টেকনিক আর টেস্ট-টেম্পরামেন্ট, ছিল না একটিও ওভার বাউন্ডারি!

বিশ্বক্রিকেটে এই পঞ্চম উইকেটে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড স্যর ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান-সিড বার্নসের দখলে। ১৯৪৬-এর সিডনি টেস্টে এই জুটি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে করেছিল ৪০৫ রান। আর ভারতের পক্ষে যে- কোনও উইকেটে সর্বোচ্চ রানের জুটি এখনও পঙ্কজ রায় ও ভিনু মাকঁড়ের দখলে। মাদ্রাজে (চেন্নাই) নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১৯৫৬-এ প্রথম উইকেটে করা সেই ৪১৩। রাহুল অবশ্য পরে ইডেন টেস্টের থেকে আরও বড় জুটির অংশ হন– ২০০৬-এ লাহোরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বীরেন্দ্র শেহবাগের সঙ্গে প্রথম উইকেটে তোলেন ৪১০ রান, তবে এর স্থায়িত্ব ছিল ৭৬ ওভার। তবে দুটোর কোনওটাই ইডেনের মতো নিশ্চিত হারের মুখ থেকে দলকে ম্যাচে ফেরানোর জুটি নয়! টেস্টে সবথেকে বেশি ৮৮টি সেঞ্চুরি পার্টনারশিপের রেকর্ডের অংশও ভারতীয় ক্রিকেটের ‘মিস্টার ডিপেন্ডবল’। শচীন তেণ্ডুলকরের সঙ্গে ২০টি শতরান জুটি তাঁর, যা টেস্ট ক্রিকেটে রেকর্ড। শচীন-রাহুল জুটির দখলে টেস্ট ক্রিকেটে জুটিতে মোট সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডও– ৬,৯২০ রান।
পঞ্চম দিন ৬৫৭/৭-এ ইনিংস সমাপ্তি ঘোষণা করে চতুর্থ ইনিংসে ম্যাথু হেডেনদের ৭৫ ওভার ব্যাট করার সুযোগ দিলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। বাকিটা ইতিহাস। হরভজনের আবার জ্বলে ওঠা। এবার স্টিভ ওয়াদের আত্মসমর্পণের পালা শুরু। অশ্বমেধের ঘোড়া প্রথম মুখ থুবড়ে পড়েছিল কলকাতাতেই।

কলকাতার পর চেন্নাইতেও হারল অস্ট্রেলিয়া। সিরিজ জিতল ভারত। সিরিজের টার্নিং পয়েন্ট কিন্তু ইডেনের ওই চতুর্থ দিন। যেদিন বিশ্বের সেরা দলের অহং ভেঙে চুরমার করে দেয় দুই দক্ষিণী যুবকের আকর্ষক ব্যাটিং। বিশ্বরেকর্ড গড়ার পর অস্ট্রেলিয়ার হার, মেজাজ হারিয়ে স্টিভ ওয়ার সৌরভকে ব্যক্তি আক্রমণ, লক্ষ্মণ-হরভজনদের উত্থান– সব মিলিয়ে এই সিরিজ বর্ডার-গাভাসকর ট্রফির সেরা সিরিজ হিসেবে আজও চিহ্নিত। আর হরভজন সিং? তিনি তো একাধিকবার বলেছেন, তার জন্ম পাঞ্জাবে হলেও, তাঁকে তৈরি করেছে কলকাতা!

সেই ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের পর ২০১২ অবধি ভারতীয় টেস্ট দলে স্তম্ভ হয়ে বিরাজ করেছেন রাহুল দ্রাবিড়-ভিভিএস লক্ষ্মণ। দু’জনেই খেলেছেন বহু স্মরণীয় ইনিংস, দেশ-বিদেশে জিতিয়েছেন বহু ম্যাচ। কিন্তু বিশ্বের সেরা বোলিংকে নির্বিষ করে ইডেনের ওই অপ্রত্যাশিত প্রত্যাঘাতী পার্টনারশিপ, ২৫ বছর পরও সর্বোচ্চ মানের ক্রিকেটের অন্যতম সেরা প্রদর্শন হয়ে রয়ে গিয়েছে ক্রিকেট-ইতিহাসের পাতায়।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved