
এই ভারতে আজ সারারাত বাজি পুড়বে। উৎসব হবে। বলা ভালো ‘উদযাপন’। এ জয় যে রিডেম্পশানের, ফিরে আসার। রিঙ্কু সিং বিশ্বকাপের মাঝে পিতৃহারা হলেন। সেই রিঙ্কু দিন ঘুরতে না ঘুরতেই দলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গাইলেন রবীন্দ্রনাথ– ‘পঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মারাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ…’, ফিল্ডিং করতে নেমে প্রাণপণ ছুটলেন, যেন বোঝাতে চাইলেন– এই বিশ্বজয়ী ভারতের অংশ হিসেবে তারও কিছু খড়কুটো থেকে যাক। এ দলে, তিনিও তো আছেন। ভারতের মহামানবের সাগরতীরে এই বিশ্বজয় যে আগুন জ্বালল, তার পাশে যেন ক’টা দিনের জন্য উবু হয়ে বসল দেশ। ঘৃণার বেসাতি করা ক্ষমতাশীলের ভারত এই ক’দিন হয়ে উঠল জনতার ভারত-আম আদমির ভারত– ‘দাদা স্কোর কত হল?’-র সেই চিরন্তন ভারত।
ভারত যখন বিশ্বজয়ের দোড়গোড়ায় তখন মগরাহাটের ভ্যান ড্রাইভার রফিক আলি গাজি শুয়ে আছেন মাটির তলায়।
মাটি। দেশ। যে দেশ, নিদান দিয়েছে, রফিককে দিতে হবে অগ্নিপরীক্ষা। সে-দেশের মাটির ওপর তাঁর অধিকারের পরীক্ষা। যেমনটা দিতে হবে রফিকের মতো আরও লক্ষ লক্ষ মানুষকে। রফিকের নিয়তি হয়ে গেল সেই মাটিই। সে মাটির ভারত বিশ্বকাপ জিতে গেল। আগেও জিতেছে। কিন্তু এ জয় আলাদা। এ জয় যেন দুই ভারতের সমান্তরাল হয়ে যাওয়া। রফিক আলি গাজির ভারত আর সঞ্জু স্যামসনের ভারত। ক্রিকেট এখানে যেন আয়না।
সঞ্জু ক্রিকেটটা খেলছেন যে-সময় থেকে, সে-সময়ে টিনেজার সঞ্জু স্যামসনের সামনে মহেন্দ্র সিং ধোনির প্রাসাদসম অবয়ব। ধোনি চলে গেলেন। এসে গেলেন ঋষভ পন্থ। উত্তুঙ্গ প্রতিভাধর। রাজস্থান রয়্যালসের সঞ্জু থেকে ভারতের সঞ্জু হয়ে ওঠার পথে অন্তরায় খামখেয়ালি ব্যাটিং। অন্তরায় ব্যাটিং পজিশন। বিশ্বকাপের নক-আউটের আগে যে সঞ্জুকে দলে রাখার প্রশ্নে স্বয়ং অধিনায়কও মশকরা করেন প্রেস কনফারেন্সে। সেই সঞ্জু, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দলে ঢোকা সঞ্জু ভারতের বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স দিয়ে গেলেন।

ভারতের ভেতর অনেকগুলো ভারত। কোনও ভারতে প্রভাবশালী নেতা বলে বসেন অমুক দল না-করলে কীসের বাঙালি, কিংবা তসুক নেতা বলেন যারা দেশের নেতার পাশে নেই তারা ঠিক ‘সহি ভারতীয়’ না। আবার কোনও ভারতে একটা নিঃশব্দে বাতিল মানুষের ফিরে আসার গল্পগাছা লেখা হয়। হাজার মানুষের মধ্যে, একটা ঈশান কিষান। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে ফের খেলবেন, এবং শুধু খেলবেন না, ভারতকে ফাইনালে একটা অতিমানবিক ইনিংস খেলে ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যাবেন, কে ভেবেছিল তা? ছেলেটার ক্রিকেট কেরিয়ারটাই তো প্রায় তলিয়ে যাচ্ছিল বিসিসিআইয়ের সেন্ট্রাল কনট্র্যাক্ট বাতিলের পর। ঝলমলে অভিষেক শর্মা, যিনি কি না ‘আইপিএল’ প্রোডাক্ট হিসেবে এলেন, প্রবল সমালোচনার রুকস্যাক কাঁধে নিয়ে ফাইনালে একটা তুবড়ির মতো খুড়ি ফুঁড়ে ওঠা ইনিংস খেলে গেলেন।

এই ভারতে আজ সারারাত বাজি পুড়বে। উৎসব হবে। বলা ভালো ‘উদযাপন’। এ জয় যে রিডেম্পশানের, ফিরে আসার। রিঙ্কু সিং বিশ্বকাপের মাঝে পিতৃহারা হলেন। সেই রিঙ্কু দিন ঘুরতে না ঘুরতেই দলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গাইলেন রবীন্দ্রনাথ– ‘পঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মারাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ…’, ফিল্ডিং করতে নেমে প্রাণপণ ছুটলেন, যেন বোঝাতে চাইলেন– এই বিশ্বজয়ী ভারতের অংশ হিসেবে তারও কিছু খড়কুটো থেকে যাক। এ দলে, তিনিও তো আছেন।
ভারতের মহামানবের সাগরতীরে এই বিশ্বজয় যে আগুন জ্বালল, তার পাশে যেন ক’টা দিনের জন্য উবু হয়ে বসল দেশ। ঘৃণার বেসাতি করা ক্ষমতাশীলের ভারত এই ক’দিন হয়ে উঠল জনতার ভারত– আম আদমির ভারত: ‘দাদা স্কোর কত হল?’-র সেই চিরন্তন ভারত। অভিষেক শর্মার বলে নিউজিল্যান্ডের শেষ উইকেটটা যখন তালুবন্দি করলেন তিলক ভর্মা– ওই মুহূর্ত অবধি ভারতকে খুব চেনা লাগল আজ। হয়তো, ভুলেই গেলাম, এ ভারতের পাশেই পড়ে আছে আরেক ভারত যেখানে গত দশ বছরে দেড় লক্ষ দলিত মানুষ অত্যাচারিত হয়েছেন, যেখানে আমার-আপনার মতো ভদ্রবিত্তের বাড়ির জলের গেলাসে অন্য ধর্মের কেউ জল খেলে আমরা সে গেলাস পারতপক্ষে ব্যবহার করি না, যেখানে ক্ষমতার সুবিধাভোগী মনে করে, প্রশ্নহীন আনুগত্যই ক্ষমতাহীনের বেঁচে থাকার পথ, যেখানে সংখ্যাগুরুর স্বাধীনতাই হয়ে ওঠে একমাত্র স্বাধীনতা, যেখানে সহনাগরিককে কলমের খোঁচায় বেনাগরিক করে দেওয়ার মধ্যে আমরা খুঁজে পাই কোনও পৈশাচিক সুখ!

এইসব ক্ষোভ আর বিদ্বেষের গনগনে লাভার ওপর ক্রিকেটের ক্ষণস্থায়ী পলেস্তারায় কয়েকটা দিন মানুষের বেঁচে থাকার কত কত রসদই না আমরা চেটেপুটে নিলাম। সঞ্জু যখন অকল্পনীয় ব্যাটিং করে পিচের মাঝখানটায় বসে দোয়া-প্রণাম-যিশুর ক্রস আঁকেন, একসঙ্গে তখন মনে হয় হাল্লা-রাজার সেনাদের জন্য আকাশ থেকে যেন নেমে এল হাঁড়ি হাঁড়ি মিঠাই। ক্রিকেট ‘ঐ আমাদের একটিমাত্র সুখ’– যে সুখ আসলে উদযাপনের। ক্রিকেট এখানে শুধুমাত্র ‘খেলা’ নয়। ‘দেশ আসলে কী’– এই প্রশ্নের এক কূটনৈতিক উত্তরমাত্র।

বিশ্বজয় শেষ। কাল থেকে ফের শুরু হবে ঘৃণার আগুনে হাত সেঁকা। যে অনির্বাণ মানবিকতার চিতার সামনে আমাদের রোজকার অসহায় দাঁড়িয়ে থাকা– এই দেড়-দু’ সপ্তাহের ক্রিকেটের বসন্ত বাতাস কি সেখানে কেবলই ক্ষণস্থায়ী আরাম হয়ে থাকবে? নাকি এক খচখচে অস্বস্তির মতো তাড়া করে বেড়াবে আমাদের?
সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন–
‘যখন
একসঙ্গে হাত মুঠো ক’রে দাঁড়াতে পারলেই আমরা সব কিছু পাই–
তখন
বিভেদের একটুকরো মাংস মুখে ধরিয়ে দিয়ে
চোরের দল আমাদের সর্বস্ব নিয়ে চলে যাচ্ছে।’
বিশ্বজয়ের এই রাত ফুরিয়ে যাওয়ার আগে, চোরেদের দেওয়া এ বিভেদের মাংসের টুকরো আমাদের গলাধঃকরণ হওয়ার আগে আমরা যেন একটিবার স্মরণে রাখি– শেষাবধি ক্রিকেটই কিন্তু আস্ত একটা ভারতকে একসঙ্গে বেঁচে থাকার সহজপাঠ উপহার দিতে চেয়েছিল…
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved