Robbar

বিয়ে এখন ক্লেশ নয়, ক্লিশে

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 24, 2026 5:36 pm
  • Updated:January 24, 2026 7:38 pm  

দয়া করে ভাববেন না, আমার এই বিয়েবিদ্বেষ আত্মকরুণা থেকে পাকা ফলের মতো ঝরে পড়া বস্তু। আপনাদের মনে হতে পারে, আমি বোধহয় বিয়েতে বিশেষভাবে বিফল ও অত্যাচারিত। তাই এমনটা লিখছি। একেবারে সেটা নয়। সত্যিটা বরং, এমনটা লিখছি আমার গভীর অপরাধবোধ থেকে। দাম্পত্যজীবনে আমি ততটা অত্যাচারিত নই, যতটা অত্যাচারী, অনাচারীও বলতে পারেন। মোদ্দা কথা, ম্যারেজ, মরালস, মানি– আমি ম্যানেজ করতে পারিনি।

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

বিয়ে হল জীবনের সবথেকে ক্লান্তিকর, ক্লিশে। বহুবার আকণ্ঠ প্রণয়ে পড়েছি। শরীর-মনের সেই অক্টোপাসকে মাত্র দু’বার টেনে নিয়ে গিয়ে বিয়েতে ফেলতে পেরেছি। প্রতিবার মনে হয়েছে, এর চেয়ে বড় জিত জীবনে নেই। কিন্তু দু’বারই সেই প্রেমকে চর্বিত চুরমার থেকে বাঁচাতে না পেরে এই উপনিষদে উপনীত হয়েছি, বিয়ের থেকে বড় ক্লেশ ও ক্লিশে জীবনে নেই।

১০০ বছর আগে, ভিক্টোরিয়ান শঠতা এবং শ্লীলতাকে চুরচুর করে, বার্ট্রান্ড রাসেল বিয়ে বাঁচিয়ে রাখার যে পথ দেখিয়েছিলেন– সেই পথে সব সাংসারিক এবং সামাজিক ঢাকনা সরিয়ে এগনোর মতো আধুনিক বাঙালি এখনও হতে পারেনি। সেই সরণির মর্ম কথা হল, সমস্ত বিয়েতে প্রয়োজন তৃতীয় উপস্থিতি। অর্থাৎ, পুরুষটির অন্য এক সঙ্গিনী। নারীটির ভিন্ন এক সঙ্গী। লুকিয়ে রাখা আনবাড়ি নয়। নয় কোনও আড়ালের দুপুর ঠাকুরপো। এ তো চলছে ঘরে ঘরে। বিবাহিত জীবনে মিশে থাকা আটপৌরে ঠকবাজি। এই ঠকবাজিতে ধরা পড়তেই হবে। একদিন-না-একদিন। তারপর অশান্তির চূড়ান্ত! তারপর শেষ পর্যন্ত ভাঙা বিয়েতে ফিরে আসা। এবং বাকি জীবন ভাঙা আরশিতে মুখ দেখা। এবং ভাবা বিয়েটাকে তো টিকিয়ে রেখেছি। আমরা সুখী ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস’।

‘চোখের বালি’-র দৃশ্যে ঐশ্বর্যা রাই

এই দাম্পত্য দেখনাই-কে ধিক্কার দিয়েছেন রাসেল। বলেছেন, স্বামী বিয়ের বাইরে পা ফেলে অন্য নারীর আঁচ পোয়াবে স্ত্রীকে জানিয়ে। স্ত্রী বিয়ের গণ্ডির বাইরে ভিন্ন পুরুষের ওম পোয়াবে স্বামীকে অবগত রেখে। যেমন এক রান্না রোজ খাওয়া যায় না। স্বাদ বদলের প্রয়োজন আছে। তেমনই আর কী! এতে কোনও অন্যায় নেই। এইটুকু মেনে নিতে পারলে বিয়েটা সহনীয় হয়ে উঠতেও পারে। তবে রাসেলকে একটি অনিবার্য প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল। প্রশ্নটা হল, দাম্পত্য প্রেমে কি ‘ঈর্ষা’ নামক বস্তুর কথা আপনি ভাবতেই পারেননি? রাসেলের মারাত্মক উত্তর: আমি শুধু শিক্ষিত এবং মানসিকভাবে প্রাপ্তবয়স্ক দম্পতিদের কথাই ভেবেছি। অন্যরা তো বিয়ে করার যোগ্যতাই অর্জন করেনি। তাদের নিয়ে ভাবতে যাব কেন?

এইসব কথা তিনি বলেছেন, তাঁর পৃথিবী কাঁপানো, ভিক্টোরিয়ান রীতিনীতি উড়িয়ে দেওয়া ‘ম্যারেজ অ্যান্ড মর‍্যালস’ গ্রন্থে। এখন তো চলছে বিয়ের ঋতু। বাঙালি তেড়ে বিয়ে করছে। কেউ পড়ছে অপাত্রে। কেউ পড়ছে অপাত্রীতে। বিয়ে শুধু ক্লেশতম ক্লিশে নয়। শ্লথতম ক্লিশেও। ছয়-সাত বছর লাগে অসুখটা ধরা পড়তে। তারপর বোঝা যায়, তোমার হৃদয় যেখানে আমার হৃদয়ও সেখানে, বিয়ের মন্ত্রে এই রোমান্টিকতা কতখানি খুড়োর কল। কী ব্যাপক মিথ্যাচার! বিয়ের আসল রূপটি ধরেছেন শেষ বয়সের রবীন্দ্রনাথ, অব্যর্থ আর্তনাদে। প্রতিটি বিয়ের শেষ সৎ উচ্চারণ এটাই: ‘হেথা মোর তিলে তিলে দান, করুণ মুহূর্তগুলি গণ্ডুষ ভরিয়া করে পান।’ কোনও বিয়ে কিছু দেয় না। শুধু নেয়। স্বীকার করি বা না করি।

দয়া করে ভাববেন না, আমার এই বিয়েবিদ্বেষ আত্মকরুণা থেকে পাকা ফলের মতো ঝরে পড়া বস্তু। আপনাদের মনে হতে পারে, আমি বোধহয় বিয়েতে বিশেষভাবে বিফল ও অত্যাচারিত। তাই এমনটা লিখছি। একেবারে সেটা নয়। সত্যিটা বরং, এমনটা লিখছি আমার গভীর অপরাধবোধ থেকে। দাম্পত্যজীবনে আমি ততটা অত্যাচারিত নই, যতটা অত্যাচারী, অনাচারীও বলতে পারেন। মোদ্দা কথা, ম্যারেজ. মরালস, মানি– আমি ম্যানেজ করতে পারিনি। এবং নিজেকে কেটে-ছেঁটে, এডিট করে বিয়েযোগ্য করে তুলতেও পারিনি।

আমার ১৭ বছর বয়সের একটা সন্ধে মনে পড়ছে। ইংরেজি সাহিত্যের ব্রিলিয়ান্ট অধ্যাপক আমাকে নিয়ে যাচ্ছেন ইংরেজি কবি শেলির মুক্তপ্রেম দর্শনের অন্তরে: Yes, marriage is hateful, detestable. A kind of ineffable, sickening disgust seizes my mind when I think of this most despotic, most unrequited fetter. Love is free. To promise for ever to love the same woman is not less absurd than to promise to believe the same creed. Such a vow in both cases excludes us from inquiry.

শেলির এই কথাগুলি দেবীপ্রসাদের উচ্চারণে এখনও জ্বলজ্বল করছে স্মৃতিতে।

নিগূঢ় আইরনিটা কোথায় জানেন? এই দেবীপ্রসাদের কন্যাকে আমি বিয়ে করে, সেই বিয়ের বাইরে আমি পা ফেলে, অন্য এক মেয়েকে ভালোবাসি, তাকে বিয়ে করি, তারপর আবার বিয়ের বাইরে পা– আমার শেলির প্রেমদর্শনে ক্রমাগত বিশ্বাস আরও গভীর হয়, ‘লাভ ইজ ফ্রি’। তাকে বিয়ের খাঁচায় বেঁধে রাখা যায় না। এবং সেই চেষ্টা হাস্যকর। একই কথা বলেছেন রবীন্দ্রনাথ: পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থী। অর্থাৎ ফ্রি লাভ। মুক্ত প্রেম তো ‘পাগল হাওয়া, ফুলের বনে যার পাশে যায় তারেই লাগে ভালো।’

‘অপুর সংসার’-এ শর্মিলা ঠাকুর

কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই মুক্ত প্রেমে স্বস্তি পায় না। যাকে ভালোবাসি, সে শুধুই আমার, প্রেমের সঙ্গে এই অধিকারবোধ, এই ‘পোজেসিভনেস’ পেয়ে বসে আমাদের। তখনই আমাদের একটা খাঁচার দরকার হয়। প্রচুর লোকজনকে সাক্ষী করে, ধর্মীয় মন্ত্র পড়ে, আইনি সই করে, ফুলের বিছানা বানিয়ে আমরা গুরুজনদের সামনে বুক ফুলিয়ে যৌনশয্যায় যাই। তারপর দিন যায়। সপ্তাহ যায়। মাস যায়। বছর যায়। অ্যানিভারসারির পরে অ্যানিভারসারি যায়। এবং ফ্যামিলিয়ারিটি নট অনলি ব্রিডস কনটেম্পট, ইট অলসো ব্রিডস চিলড্রেন। এই সেই পরম লগ্ন যখন বিছানার অন্ধকারে ঠান্ডা সাপের মতো ফণা তোলে বিয়ের আসল সর্বনাশ: হাত বাড়ালেই সেক্স। কোথায় গেল সেই উত্তেজনা? সেই প্রবল তাড়না? সেই ব্যাকুল বাসনা? কখন শুরু হয়েছে যৌনতার সম্পর্কে ডিমিনিশিং রিটার্ন! টের পাইনি তো? ব্যবহৃত হতে হতে, ব্যবহৃত হতে হতে, ব্যবহৃত হতে হতে দু’জনেই শুয়োরের মাংস হয়ে গিয়েছি! মনে কি পড়ে বহু বছর আগে ফুলশয্যার রাতের কথা? আর এখন ‘মাল্য যে দংশিছে হায়, শয্যা যে কণ্টকশয্যা, মিলনসমুদ্রবেলায় চির-বিচ্ছেদজর্জর মজ্জা।’ আবার সেই রবীন্দ্রনাথই সুপ্ত মনে জাগিয়ে তোলেন বিয়ে নামের বন্ধ খাঁচার বাইরে পা ফেলার ইচ্ছে। কেউ পারে। কেউ পারে না। কিন্তু যারা বিয়ের বাইরে পা ফেলে, তারা যা কিছু করে সব লুকিয়ে।

পুরুষদের মধ্যে আরও একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখেছি। নিজের স্ত্রীটিকে বিচিত্র মিথ্যের মধ্যে পাকড়ে রেখে পরের স্ত্রীর সঙ্গে খেলাধুলো করছে। এদের কেউ কিন্তু রাসেল, সর্ত্রে, কামু, সিমোনের মতো মুক্ত যৌনজীবনে বিশ্বাস, তাদের ব্যক্তিগত যাপনে নিয়ে যায় না। তাদের অধিকাংশই ঘরে-বাইরে দু’জন আলাদা মানুষ। প্রকাশ্যে শেলির মতো বলতে পারে না– ‘লাভ ইজ ফ্রি’। বরং ঠিক উল্টো। বিয়ের ঋতু এলেই তারা পাগল হয়ে ওঠে বিয়ে করার জন্য অথবা বিয়ে দেওয়ার জন্য। এই আধুনিক যুগেও বিয়ের খাঁচার নিশিডাক তারা এড়িয়ে গিয়ে একা থাকতে ভয় পায়। কিন্তু ভেবে দেখলে, একা জীবন বিয়ে– জীবনের চেয়ে অনেক বেশি দেয়। কাজের পরিসর, ভাবনার পরিসর, নিজের পছন্দের মেলামেশায় স্বাধীনতা, নতুন নতুন সম্পর্কে নিজেকে বিস্তারের আনন্দ ও সুযোগ এবং বিচিত্র প্রণয় ও প্রণোদনার মধ্য দিয়ে যাপনের সুযোগ– এই সব শুধু দিতে পারে একলা জীবন।

আমি নিজে গত ৪০ বছরের বেশি একা। তার মানে এই নয়– আমি শুকিয়ে মরছি। তার মানে এই, আমি ঘরে বাইরে কম মিথ্যে বলছি। তার মানে এই, আমি ভালোবাসার বার্তা ডিলিট করে দিচ্ছি না। তার মানে এই যে. ভালোবাসার মানুষ আমাকে যখন হোক ফোন করতে পারে। কারও কাছে কোনও জবাব দেওয়ার প্রশ্ন নেই। তার মানে এই যে, আমি কারও কাছে সম্পূর্ণ সমর্পিত নই। কারও-র পূর্ণ সমর্পণও আমি চাই না। আমার লাটাইতে ছেড়ে খেলার অনেক সুতো। মনের আকাশে উদারতার অভাব নেই। সারাদিনের কাজের পরে শুঁড়িখানার বিষণ্ণ কোণটিতে নিঃসঙ্গ অপেক্ষা, খাঁচার মধ্যে সেই একঘেয়ে প্রাপ্তির থেকে ভালো নয় কি? কোনও কোনও রাতে সামান্য আচ্ছন্নতার মধ্যে সে যখন নিজের হাতে ঢেলে দেয় আর মুখে কিছু না-বলে শুধু তাকায় চিয়ার্স তাকানো, তখন?

হতে পারে স্মৃতি। হতে পারে মনকেমন। তা হোক। ওটাই তো একলা যাপনের সবথেকে বড় দান। ক্লিশে হয়ে যাবে না কোনও দিন।

……………………….

রোববার.ইন পড়ুন রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়-এর অন্যান্য লেখা

……………………….