
সংস্কৃত নাট্যশাস্ত্র এককালে প্রাকৃত সংলাপ অনুমোদন করেছিল। জয়দেবের ছিল দ্বিবিধ ভঙ্গি। আনন্দমঠের বীর সন্ন্যাসীদের বন্দনাও দেবীর উপাসক ও মায়ের সন্তানের ভাষায় পর্যায়ক্রমে গীত হয়েছে। আসলে সংস্কৃত ও যে-কোনও প্রাকৃত ভাষা আলাদা নয়– একই প্রবহমান পদ্ধতির ভিন্ন পর্যায় মাত্র। কালের নিরিখে, প্রসঙ্গের নিরিখে। যেমন তালমুদের ভাষা আর আধুনিক হিব্রু, আবেস্তার ভাষা আর খৈয়মের ফার্সী। তাদের একে-অন্যকে প্রতিস্থাপন নয়, সমন্বয়ই সভ্যতার সঞ্চয়। বিবেকানন্দের বাংলায় দেবভাষার দার্ঢ্য আর রাঢ়ী ভাষার সাবলীলতা– এমনকী স্ল্যাং– একাকার হয়েছে।
‘মা যা হইবেন’ তার আকুল অপেক্ষায় শ্মশানচারিণীকে দশপ্রহরণে সাজিয়ে আনন্দমঠের ভবানন্দ তাঁর বন্দনা করছিলেন। মহেন্দ্র গান শুনে অবাক হয়েছিল, ‘এ ত দেশ, এ ত মা নয়–’
কারণ, মাতৃবন্দনার এই ভাষা, দেশাত্মবোধের এই আঙ্গিক মহেন্দ্রর কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। কমলাকান্তের মানসপটে ‘সুবর্ণময়ী বঙ্গপ্রতিমা’র ক্ষণিক আবির্ভাবকে না ধরলে, ‘আনন্দমঠ’ই বোধ করি বিশ্বসাহিত্যে প্রথমবার জন্মভূমির ’পরে রূপ আরোপ করে ধরা-ছোঁয়ার মধ্যে মূর্ত করেছিল।
প্রাচীনকালে কুষাণ দিগ্বিজয়ী থেরবাদের করুণাঘনকে রূপদক্ষের শৈলীতে স্পষ্ট করতে চেয়েছিলেন। এই ঐতিহাসিক উপন্যাসটি রাজনীতিতে তদ্রূপ মূর্তিপূজার প্রচলন করল। কম্পানি আর নবাবের দ্বৈত-শাসনে জর্জরিতা বাংলার দুর্দশা অমনি স্পষ্ট ও প্রতিকারযোগ্য হয়ে দেখা দিল।
অর্ধসহস্রাব্দ যাবৎ পরাধীন জাতি। তবু, মরা গাছের বৈশিষ্ট্যও দস্যু রত্নাকরের সদিচ্ছায় রাম-নামে পর্যবসিত হয়। রামপ্রসাদের সমসাময়িক মাতৃবন্দনা ভারতবর্ষের অগ্নিযুগকে তরান্বিত করেছে।

ভবানন্দ গাইছিল দেবভাষায়, যেন স্তবগীতি। আন্দাজ করি, আরাধ্যার রূপ-মাধুর্য বর্ণনার পরে তার কণ্ঠ ক্রমশ উদ্দীপনার তীব্রতায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠেছিল, ‘সপ্তকোটিকণ্ঠকলকলনিনাদকরালে–’; হঠাৎ নেহাৎ প্রাকৃতভাষায় বালকোচিত অনুযোগে সে আত্মধিক্কার ব্যক্ত করে বসে– ‘অবলা কেন মা এত বলে?’ স্তোত্র নেমে আসে স্লোগানে। দার্শনিকের অধ্যাত্ম সশস্ত্র বিপ্লবের উপযোগী হয়ে ওঠে।

এই আঙ্গিক বঙ্কিমচন্দ্র পেলেন কোথায়? মৈথিলী কবিরা সংস্কৃতের প্রলেপে তাঁদের গ্রাম্য শৈলীকে মুড়ে জাতে উঠবার চেষ্টা করেননি। বিদ্যাপতির সংস্কৃত ও মৈথিলী গানের সমাহরণ, এবং সম্ভবত পাঠকও, পৃথক। শাক্ত গীতিকাররা শাস্ত্রপ্রসঙ্গ একরকম দূরেই রেখেছেন। চৈতন্য চরিতামৃতে দেখছি বটে কোথাও কোথাও সংস্কৃতে উদ্ধৃতি– প্রাকৃতভাষায় সপ্রাণ করে ব্যাখ্যা করা। ‘যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্–’ গীতার এই ঘোষণা যেমন বুঝিয়ে বলা,
প্রিয়া যদি মান করি করয়ে ভর্ৎসন।
বেদস্তুতি হৈতে হরে সেই মোর মন॥
বাংলার প্রাকৃত সাহিত্যে অন্তত এই গানের পূর্বসূরি দেখছি না। পরবর্তীকালে, রামকৃষ্ণ মিশনের সান্ধ্য প্রার্থনায় দ্বিবেণী গ্রন্থন।
ভারতবর্ষের এতকালের পদ্যসাহিত্য হাতড়ে, চলুন, ‘বন্দেমাতরম্’ গানের বাচনভঙ্গির কোনও অবিচ্ছিন্ন ধারা, নিদেনপক্ষে নিদর্শন খুঁজি।
আদিম মানবী কোলের শিশুকে আনসফিস্টিকেটেড্ ঘুমপাড়ানি গান শুনিয়েছিল– তার সেই ‘আধেক হৃদয় ঋণ’ গেঁথে গিয়েছিল কাঁচা বয়সের মানবতার মনে। তারপরে, ক্রৌঞ্চবিরহী কবি তমসার তীরে উচ্চারণ করলেন সেই বাণী, বেদমন্ত্রের ভাষা যাতে গান হয়ে উঠল। ভাষার দুর্গমতা ডিঙিয়ে তা উত্তরকালে সাদরে গাওয়া হ’ল বটে, মা-শিশুর অবচেতনের অন্তঃপুরে প্রাকৃত গুনগুনানির মাহাত্ম্য এতটুকু কমল না।
শক-হূণ-গ্রিকের আক্রমণের রেশ কাটলে পুষ্যমিত্র অশ্বমেধ যজ্ঞের পুনঃপ্রবর্তন করলেন, বেদ-রামায়ণের ভাষাকে পতঞ্জলি বাঁধলেন ব্যাকরণে– যাতে বহুযুগের ওপারে ভাষার ভঙ্গুরতায় ভাবটুকু আবছা না হয়। উগ্রশ্রবাঃ শৌনককে মহাভারত শুনিয়েছিলেন সংস্কৃতে, তাই বলে সেকালের পাঁচালিকার গল্প-বলিয়ে কি সেই ভাষাই ব্যবহার করতেন? কালিদাসের মাতৃভাষা কী ছিল আমরা জানি না, কিন্তু মহাকালেশ্বর মন্দিরে সংস্কৃত অধ্যয়নের আগে যেই আনমনা শ্রমজীবী নিজের বসে থাকা ডালটাই ভুল করে কেটে ফেলত– তার আপন মনে লোকসাহিত্য রচনা হত না, তা মানতে পারি না। বিক্রমাদিত্যের চোখে পড়েনি, আলাদা কথা।
পূর্বসূরি মহাকবি ভাসের নাটকে রাজপুরুষদের সংলাপ পরিমার্জিত দেবভাষায়। শ্রীকৃষ্ণের দূতবাক্য আর ধৃতরাষ্ট্রের বিলাপ– দুইই ত্রুটিহীন সৌষ্ঠবে গাঁথা। হয়তো বেদমন্ত্রের প্রণেত্রীদের যুগ তখনই শেষ হয়েছে, কারণ রাজকুলের মহিলাদের দেখছি প্রাকৃতভাষায় কথা বলতে। ‘ঊরুভঙ্গম্’-এ নাবালক পুত্র সমরভূমিতে ভূপতিত দুর্যোধনকে খুঁজছে, সংস্কৃত তার এখনও রপ্ত হয়নি– ‘তাদ! কহিং সি?’ ভগ্ন ঊরুর ওপর বসিয়ে ছেলেকে আদর করতে না পেরে দুর্যোধনের আক্ষেপ সংস্কৃত গদ্যে, মধ্যে মধ্যে শ্লোক। মা গান্ধারীকে বলছেন, “অন্যস্যামপি জাত্যং মে ত্বং এব জননী ভব– আর জন্মেও তুমিই আমার মা হ’য়ো।” সারা জীবন যে মনস্বিনী মাতা পুত্রের অধর্মে মনস্তাপে দগ্ধ হয়েছেন, ভর্ৎসনা করেছেন, আজ স্খলিত প্রাকৃতভাষায় বললেন, ‘মম মণোরহো খু তুএ ভণিদো– আমার মনোরথই তুই উচ্চারণ করলি!’

‘শ্লোক’ বাল্মীকির স্বতঃস্ফূর্ত বিলাপ হয়ে থাকতে পারে, ভাসের পূর্বেই বুদ্ধের কথ্যভাষা ছিল মাগধী প্রাকৃত। ধর্মাশোক জনসংযোগকে প্রভূত গুরুত্ব দিতেন বলে তাঁর শিলালেখে চলিত ভাষাই খোদিত করেছিলেন।
কালিদাসের নাটকেও এমনই পর্যায়ক্রমে সংস্কৃত ও প্রাকৃত ভাষার সংলাপ। কয়েক শতাব্দীর ব্যবধানে, বা ভাসের কর্মভূমি থেকে উজ্জয়িনীর দূরত্বের নিরিখে, দেখছি প্রাকৃত ভাষাটি কিছুটা বদলে গেছে। সেই চলিত ভাষা কালে আরও বদলেছিল– সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রবন্ধে পড়েছিলাম, সমসাময়িক সংস্কৃত নাটকে ব্যবহৃত প্রাকৃত ভাষার অভিযোজনে আদিযুগের উর্দু লেখকদের কসরৎ করতে হয়নি।
সেদিন ভারতবর্ষের পশ্চিম আকাশে উঠেছিল ঝড়, বিক্রমশীল মহাবিহারের অধ্যক্ষ ‘বোধিপথপ্রদীপে’র শিখাটিকে যত্নে বাঁচিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন তিব্বতে। এক প্রদেশের সঙ্গে অন্য প্রদেশের সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান গিয়েছিল বন্ধ হয়ে। সংস্কৃত পালি– পূর্বের দুই দফতরি ভাষার ধ্বসা ইমারতের আনাচে-কানাচে, ফার্সীর শান্-বাঁধানো মর্মরফলকের থেকে সচেতন দূরত্ব রেখে, জন্ম নিল কথ্য ছাঁচে যত্নহীন বটের চারার মতো বাংলা ভাষা।
জয়দেব সংস্কৃত সাহিত্যের শেষ স্তম্ভ। বঙ্গের সাহিত্যের আবিষ্কৃত প্রথম। আগাগোড়া সংস্কৃতেই লিখেছেন। অথচ ভাষার গায়ে অমনি ‘লেবেল’ জুড়ে বিন্যাস যথাযথ বোঝা যাবে না। কংগ্রেসের অধিবেশনে ইংরেজির ব্যবহার সাধারণ ভারতবাসীকে বঞ্চিত করছে ভেবে তরুণ রবীন্দ্রনাথ মাতৃভাষায় আপন বক্তৃতা দিয়েছিলেন। মঞ্চ থেকে যখন নেমে আসছেন, কেউ জিজ্ঞাসা করল, ‘রবিবাবু, আপনার বাংলাই কি তারা বুঝতে পেরেছে?’ বিচিত্রা সভার ভাষা আর পটলডাঙার রোয়াকের ভাষা এক নয়, হোক না দুটোই বাংলা।

জয়দেব তাঁর গানের পটভূমি উচ্চাঙ্গ শ্লোকে লিখেছেন পাণিনিকে বিব্রত না করে। লিখেছেন স্তব, ‘পর্যাঙ্কীকৃতনাগনায়ক–’। চক্রপাণির বন্দনায় তা যথাযথ– কিন্তু সুদর্শন চক্রের প্রযুক্তিবিদ্যার থেকে ছুটি নিয়ে নিবিড় উপবনে বেণুবাদকের এ অন্য লীলা। কিশোরী নায়িকার অন্তর্দাহে তাই কবির বাক্য লঘু, ছন্দে ঝঙ্কার ও অন্ত্যমিল।
দিশি দিশি কিরতি সজলকণজালম্
নয়ননলিনমিব বিদলিতনালম্॥
‘গীতগোবিন্দম্’-এ মধ্যে-মধ্যে গানের ‘লিরিক’-গুলিকে বেষ্টন করে শ্লোক– বা শ্লোকগুলিকে ভাসিয়ে নিয়ে গান। পর্যায়ক্রমে কাব্যরস আর সংগীতরসের সম্মিলিত মাধুর্যে সার্থক।

সংস্কৃত নাট্যশাস্ত্র এককালে প্রাকৃত সংলাপ অনুমোদন করেছিল। জয়দেবের ছিল দ্বিবিধ ভঙ্গি। আনন্দমঠের বীর সন্ন্যাসীদের বন্দনাও দেবীর উপাসক ও মায়ের সন্তানের ভাষায় পর্যায়ক্রমে গীত হয়েছে।
আসলে সংস্কৃত ও যে-কোনও প্রাকৃত ভাষা আলাদা নয়– একই প্রবহমান পদ্ধতির ভিন্ন পর্যায় মাত্র। কালের নিরিখে, প্রসঙ্গের নিরিখে। যেমন তালমুদের ভাষা আর আধুনিক হিব্রু, আবেস্তার ভাষা আর খৈয়মের ফার্সী। তাদের একে-অন্যকে প্রতিস্থাপন নয়, সমন্বয়ই সভ্যতার সঞ্চয়। বিবেকানন্দের বাংলায় দেবভাষার দার্ঢ্য আর রাঢ়ী ভাষার সাবলীলতা– এমনকী স্ল্যাং– একাকার হয়েছে। আবার, শিষ্য ও গুরুভাইদের লেখা তাঁর সংস্কৃত চিঠিতে একটা ফ্যাক্টর আছে, যা ধ্রুপদি লেখকদের বোধের বহির্ভূত ছিল। বাচনভঙ্গির সেই স্পষ্টতা উত্তর কলকাতার রকের ভাষায় দেখা যায়।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved