
বাংলা ভাষায় যখন যাযাবরের ‘দৃষ্টিপাত’ নতুন এক ধরনের লেখালিখির পথ খুলে দিচ্ছে, তখন যাযাবরের বন্ধু রঞ্জন লিখেছিলেন ‘শীতে উপেক্ষিতা’। দুটি লেখার ধাত্রীপত্রই সেকালের ‘মাসিক বসুমতী’। দুই বন্ধুর লেখার মধ্যে এমন মেজাজগত মিল যে, পাঠকও সেসময় খানিকটা ধন্দে ছিলেন– কোনটা কার লেখা, বুঝতে তাদের অসুবিধে হত।
মরশুমের শীতল থেকে শীতলতম দিনগুলোতে এমন শহরের কথা ভাবতে বসেছি যার তাপমান আরও অন্তত পাঁচ-সাত ডিগ্রি কম। সে-শহর আমারও বড় পছন্দের। কিন্তু যখন চারপাশে সব জমে যাওয়ার মতো অবস্থা, তখন সেই শহরের হৃৎপিণ্ডে হাত রাখার ইচ্ছে শুধু একাকিত্বের সন্ধানে নয়।
যখন পাশের মানুষটিরই হাত ধরা যায় না, সেই সময় শৈলশহর দার্জিলিংয়ের সদ্য অতীত ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির স্বাদ পাইয়ে দেয় ‘শীতে উপেক্ষিতা’। টাইমলাইনটা সাত দশকের পুরনো। কিন্তু দার্জিলিংকে আমরা আর কবেই-বা একুশ শতকের চেহারায় দেখতে চেয়েছি। তার কলোনিয়াল মেজাজই তো আমাদের যাবতীয় আকর্ষণের মূল।
তবে বুদ্ধদেবের ভাষায় তৃপ্তিহীন বিরহে জ্বলছে যে মন– তাকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খাক করে, নিজের যা কিছু পুরনো তাকে বিসর্জন দিয়ে নতুন পৃথিবীর সন্ধানও জারি থেকেছে এ পৃথিবীতে। পাতালের সিঁড়ি বেয়ে আরও অন্ধকারে নেমে যেতে-যেতে যখন জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা, তখনই হয়তো সম্ভব নতুনের প্রত্যাশা করা। তখনই ঘিরে ফেলে অতীত, হাসিমুখে এগিয়ে আসে অনাগত। মৃত্যু শীতল, মৃত্যু অন্ধকার– আর আমাদের জরায়ু-জন্ম?
সম্ভবত, রবীন্দ্রনাথ একবার লিখেছিলেন, পাহাড়ে মন নিজের মধ্যেই ডুবে যায়। সত্যিই কি পাহাড় আমাদের আত্মমগ্ন করে না? তবে নাগরিক ঘেরাটোপে বড় হওয়া আমরা হাজারও প্রশ্ন নিয়ে চেনা চৌহদ্দির বাইরে গিয়ে নতুন মানুষ হয়ে ফিরি কি কখনও?

আজকের ভাষায় ‘সোলো ট্রিপ’। একা নিজের সঙ্গে। তার রস পেতে গেলে একা হতে জানতে হয়। মুদ্রাদোষের মতো একা হওয়া। নইলে যাহা নগর কলিকাতা, তাহাই কনকনে দার্জিলিং। তা জানতেন ‘শীতে উপেক্ষিতা’র লেখক। অবশ্য তাঁর তখন শূন্য দৃষ্টি, মনের ক্ষতে খানিকটা প্রলেপের আশায় তাঁর ‘অসময়ের’ দার্জিলিং ভ্রমণ।
২.
খবরের কাগজের তাৎক্ষণিকতার দুনিয়া থেকে যদি হঠাৎ পালাতে হয়, জীবনে যে-সামান্য আশ্রয়টুকু লাগে তার ভিতটাই যদি নড়ে যায়– তাহলে কী করবেন একজন সুশিক্ষিত মানুষ ! শুনতে সহজ লাগলেও প্রশ্নগুলো কিন্তু বেশ দার্শনিক। তাই তার মীমাংসা দার্শনিক পথেই হওয়া উচিত।
বাংলা ভাষায় যখন যাযাবরের ‘দৃষ্টিপাত’ নতুন এক ধরনের লেখালিখির পথ খুলে দিচ্ছে, তখন যাযাবরের বন্ধু রঞ্জন লিখেছিলেন ‘শীতে উপেক্ষিতা’। দুটি লেখার ধাত্রীপত্রই সেকালের ‘মাসিক বসুমতী’। দুই বন্ধুর লেখার মধ্যে এমন মেজাজগত মিল যে, পাঠকও সেসময় খানিকটা ধন্দে ছিলেন– কোনটা কার লেখা, বুঝতে তাদের অসুবিধে হত।

খাদের ধারের রেলিংয়ের সুরে আমরা যারা বড় হয়েছি, তাদের কাছে ‘শীতে উপেক্ষিতা’ জাদুঘরে একবেলা কাটিয়ে আসার মতো। আমাদের সব বদলে গিয়েছে– কেবল এই সত্যটা ছাড়া যে, দার্জিলিং এখনও শীতকালে ফাঁকাই থাকে। কিন্তু পোশাকি ভ্রমণ আর ‘শীতে উপেক্ষিতা’র লেখকের জানুয়ারির শীতে দার্জিলিং আসা আদৌ একরকম মানসিকতা থেকে নয়। পোশাকি ভ্রামণিকের পিঠের বস্তা দাড়ি কামানোর যন্ত্র, জলের ফ্লাস্ক, ওষুধপত্তর, ট্যুর অপারেটরের দেওয়া ম্যাপ, টুপি রুমাল মোজা দস্তানা অন্তর্বাসে ঠাসা। আর লেখক বেড়িয়েছেন নিজেকে খুঁজতে। যতটা নতুন জগত খুঁজতে পোশাকি ভ্রামণিক ঘর ছাড়ে, তার ততটাই রুচি সেই সংবাদ দুনিয়ার লোককে শোনানোয়। তার চোখ আসলে কলুর বলদের মতো প্রাণান্তকর পরিশ্রমে কিছু তথ্য সংগ্রহ করে চলে। শেষমেশ নিজের ঝোলায় ততটুকুই নিয়ে ফেরে যতটা ঘর থেকে বেরনোর সময় তার সঙ্গে ছিল।
রঞ্জন এসব থেকে বহুদূরে বাস করেন। তাঁর জীবনজিজ্ঞাসা প্রবল। তবে তিনি ‘ছাপার অক্ষরের দৌত্যে, অর্থাৎ অপরের রচনার মধ্যস্থতায়’ জ্ঞানার্জনের পক্ষপাতী। তাঁর বয়ানে– ‘পরের মুখে ঝাল খাওয়ার সুবিধাই এই যে এতে রস থেকে বঞ্চিত হতে হয় না, অথচ রসনাও লাঞ্ছিত হয় না।’ এতে সুবিধা হল, ট্রেনে অপরিচিত লোকজনের বাড়তি কৌতূহল থেকে বাঁচা যায়, ভোররাতে টাইগার হিল যাওয়ার প্রয়োজন থাকে না।
কিন্তু রঞ্জন শব্দটা শুনে যাদের স্মৃতিতে ‘রক্তকরবী’র রেশ ভেসে ওঠে, তাদের কাছে রঞ্জন তো নন্দিনীর ভাষ্য অনুযায়ী রঞ্জন– ‘দুই হাতে দুই দাঁড় ধরে সে আমাকে তুফানের নদী পার করে দেয়; বুনো ঘোড়ার কেশর ধরে আমাকে বনের ভিতর দিয়ে ছুটিয়ে নিয়ে যায়; লাফ-দেওয়া বাঘের দুই ভুরুর মাঝখানে তীর মেরে সে আমার ভয়কে উড়িয়ে দিয়ে হা হা করে হাসে। আমাদের নাগাই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্রোতটাকে যেমন সে তোলপাড় করে, আমাকে নিয়ে তেমনি সে তোলপাড় করতে থাকে। প্রাণ নিয়ে সর্বস্ব পণ করে সে হারজিতের খেলা খেলে। সেই খেলাতেই আমাকে জিতে নিয়েছে।…’ কিন্তু ‘শীতে উপেক্ষিতা’র রঞ্জন রবীন্দ্র-রচনায় নিস্নাত হলেও কার্যত কুঁড়ের ডিম।
তবু তিনি নানা রকম পর্যবেক্ষণ আর বিবিধ দার্শনিক চিন্তা নিয়ে হাজির হন জানুয়ারির দার্জিলিং শহরে। সেই শহর তখন সারারাতের উন্মাদনার পর ভোরবেলার মতো পরিত্যক্ত, জড়সড়ো। কিন্তু মানুষের মুখ এড়িয়ে কতক্ষণই বা থাকা যায়। তাই দুশ্চিন্তার ভারী পাথরের মতো, দস্তয়েইভস্কির গদ্যের মতো, অতল শোকের মতো কুয়াশায় মাখামাখি হয়েও একের পর এক মানুষ আর তার জীবনের গল্প তাঁর পিছু ছাড়েনি। এই কুয়াশা এমন, যাতে পাশাপাশি বেঞ্চিতে বসা মানুষের মুখ দেখা যায় না। অন্যের সিগারেটে আগুন ধরিয়ে দেওয়া যায় না। তবে মানুষের মনের হদিশ পেতে আলো লাগে না। কথা না বলে পাশাপাশি কয়েক কদম হেঁটে গেলেও অনুভব করা যায় মন তোলপাড় করা ঝড়। এমনকী ধীরে-ধীরে তাঁর মতো আমরাও বুঝি আসলে নিত্যদিনের খবর ঘাঁটা থেকে আধুনিক মানুষের মুক্তি নেই। ইতিহাস, রাজনীতি পিছু ছাড়ে না। ‘শীতে উপেক্ষিতা’য় যেমন গডসের হাতে খুন হওয়া ভারতাত্মা হেঁচকা টানে লেখককে বাস্তবের জমিতে দাঁড় করিয়ে দেয়।

তবু ইশারা রয়ে যায়। ভাষা তো ইশারাই। ভালোবাসা বিচ্ছেদ, প্রেম প্রতিহিংসা পেরিয়ে জীবনের বিপুল সম্ভাবনারও ইশারা। কিন্তু হিমশীতল পাহাড়ে যাবতীয় কূট জীবনজিজ্ঞাসা শেষ পর্যন্ত কোনও উত্তরই খুঁজে পায় না। বরং আরও জটিল হয় প্রশ্ন। ফেরার সময় তাই লেখককে আঁকড়ে ধরতে হয় সারিবাদি সালসার মতো সমতলের আশ্রয়স্বরূপার একখানি চিঠি। তার জীবন থেকে একেবারে নির্বাসিত নন– তিনি এই সাদা-কালো আশ্বাসটুকুতে ভর করে তিনি ঘরে ফেরার পথে পা বাড়াতে উদ্যত হন। পড়ে থাকে ১৫ দিনের স্মৃতি। কিন্তু দুঃখের যে নিরসন নেই– সে-কথাও জানা যার, যা না পাওয়ার দুঃখে শীতের শৈলশহরে চলে আসা, সেই বাসনা যে সমতলে এসেও একই রকম সবল থাকবে না, তা তো তিনি জানেন। তাই মরীচিকার মতো মিলিয়ে যায় তাঁর ক্ষণকালের আশা ভরসা। ঠিক দার্জিলিং-এর কুয়াশার মতো, যা আশা-নিরাশার ছন্দে নিয়ত দুলছে।
৩.
পাহাড়, কুয়াশা, জীবনের অর্থের সন্ধান চলবে, অথচ তা নারীবর্জিত হবে সে কেমন করে হয়! তাই দার্জিলিংয়ের হিম ঠান্ডায় নারীও আছে। এবং বেশ ইঙ্গিতময় ভাবেই আছে। পরিণতিহীন প্রেমের ইশারায় আছে। যাত্রাপথে নাস্তানাবুদ করা শীতলতায় উষ্ণতা নিয়ে আসে শিখা– নিকট বন্ধুর সহোদরা। সে তখন সোনাদায় কর্মরত স্বামীর গরবে গরবিনী হয়ে পাহাড়ে উষ্ণতা বিলোয়। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে পুরুষ তার একসময়ের কাঙ্ক্ষিতকে যে বেশ নৈর্ব্যক্তিকভাবে দেখতে শেখে– জীবনের এই শিক্ষাটাও পাওয়া যায় কেলনারের দোকানে চা খেতে গিয়ে। আত্মতৃপ্ত পতিদেব কাছে আসার আগে দ্রুত পুরোনো প্রণয়ীকে শিখা তার দার্জিলিংয়ের ঠিকানা লিখে দিলেও তার আর ততটা রোমাঞ্চ হয় না। বরং খবরের কাগজে মনোনিবেশ করা আসবাব-তুল্য বরের পাশে শিখাকে তার তখন মনে হতে থাকে প্রাচীন রোমের কলোসিয়ামে গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই দেখতে আসা দৃপ্ত সম্রাজ্ঞীর মতো। শিখা ফের অবতীর্ণ হয় দার্জিলিংয়ের মল রোডে। এবার অশ্বারূঢ়া। প্রায় স্বপ্নে আসার মতোই। কিন্তু জেগে দেখা স্বপ্ন কবে সত্যি হয়! তাই কথাবার্তা যা হয় সবটাই নেহাত সাদামাটা। মধ্যবিত্ত, ভীতু। প্রাণপণে শিখা অস্বীকার করতে চায় পুরনো প্রেম। সেই আত্মপ্রবঞ্চক নারী জানে না প্রেমহীন অন্তরঙ্গতার সঙ্গে পৃথিবীর প্রাচীনতম পেশার কোনও ফারাক নেই।

পাহাড়ে মিসেস রায়ও আছেন। সচেতন। নিজের খোলসে ঢুকে থাকা নয়। বরং প্রেমে নিজের জায়গাটা বুঝতে চাওয়া এক রমণী। তিনি যখন বুঝতে পারলেন রায় তাঁর সঙ্গে তঞ্চকতা করছে– তাঁর হৃদয়ে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলে ওঠে। সে আগুন ছারখার করে দেয় রায়-কে, তাদের সম্পর্ককে, সম্ভবত নিজেকেও। নির্বাক দর্শকের মতো বসে থাকেন লেখক।
৪.
যে-মানুষটা স্বভাবগতভাবে উচ্ছ্বাসপ্রবণ নন, চরিত্রে যার মাত্রাবোধ প্রবল। মনের তয়খানায় যিনি সঙ্গকামী, বুবুক্ষু। তিনি দার্জিলিং থেকে ফেরার সময় সঙ্গে করে নিয়ে এলেন অনেকটা স্মৃতি। কোনও রেস্তোরাঁর কাচের জানলা দিয়ে দেখে এলেন চলচ্ছবির মতো জীবনের উত্থান-পতন। এই বোধটুকু নিয়ে এলেন, ‘এই হিমালয়ের তলায়, অজ্ঞাতের আমন্ত্রণের যে অদৃশ্য সংকেতের অস্পষ্ট ইঙ্গিত পেয়ে গেলেম, হয়তো তার কোনো প্রভাবই রেখাপাত করবে না আমার কাল থেকে পরের দিনগুলির ছোটখাটো অকিঞ্চিৎকর কাজের মধ্যে।’ আর যদি করে তাহলে তো দার্জিলিং আসা সার্থক বলতে হবে।

গল্পের সাগরে টাইটানিকে চড়ে বসা পাঠকের মন তো বোঝে না, কখন কোন আইসবার্গের ধাক্কায় টলে যাবে জীবনের ছন্দ। অজ্ঞাত গহ্বর থেকে জীবনের উষ্ণ অনুরাগ প্রার্থনা করা ছাড়া আর কীই-বা চাওয়া সম্ভব। শীতের দার্জিলিং তাই পাঠককে খালি হাতে ফেরায় না। চেনা চৌখুপ্পির বাইরে অনেকটা খোলা উঠোন আছে এমন একটা ইঙ্গিত দেয়। আর হ্যাঁ, শীতলতার মধ্যেও উষ্ণতার উপাসনা করতে বসা মানুষকেও চিনিয়ে দেয়।
……………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়-এর অন্যান্য লেখা
……………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved