
মাছধরা-ধানকাটা-পান-ঝিঙে-উচ্ছেচাষ। তার পাশাপাশি শিক্ষকতা-পরিবেশ আন্দোলন-নাটক-কবিতা-চিকিৎসা। কিন্তু মানুষ এখানে কোনও একটি পেশায় যেন সীমাবদ্ধ নয়। সকালে স্থানীয়দের জড় করে হাঁটু-সমান কাদায় নেমে সমুদ্রের পাড়ে যাঁকে দেখেছি গাছ লাগাতে, তাঁকেই দুপুরে দেখেছি কবিতা আবৃত্তি করতে, সন্ধেবেলায় ছাত্রদের ইংরেজি সাহিত্য পড়াতে। এই সমস্ত কাজ সারার ফাঁকে ফাঁকে চলে তাঁর দর্শনের প্রতিফলন। প্রাইমারি আর টার্শিয়ারি, পেশার দুই মেরুতেই অবাধ যাতায়াত এই অঞ্চলের মানুষের। চারদিনের জন্য কলকাতা ছেড়ে এসেছি এঁদের জীবন, কবিতা চর্চা, দর্শন আর লড়াইয়ের কথা জানার জন্য।
কলকাতা থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগনার দিকে নামতে থাকলে নামখানা ছাড়িয়ে হাতানিয়া-দুয়ানিয়া নদী পেরিয়ে আরও দক্ষিণে ফ্রেজারগঞ্জ, বকখালি। ডানদিক-বাঁদিকে হুগলি আর বকখালি নদীর খাঁড়ি। নিচে বঙ্গোপসাগর। চারদিক জলঘেরা কাকদ্বীপের এই অঞ্চলকে মূল ভূখণ্ড যেন কিঞ্চিৎ বৈমাত্রেয়-সুলভ নজরে দেখে। ব্রিজ জুড়েছে বছর ছয়েক আগে; তবু মন যেন জুড়ে নেয়নি তাকে। এই অঞ্চল আদতে সমুদ্র থেকে জেগে ওঠা এক চর। মধ্যে মধ্যে নোনা নদী। একসময় এখানে ছিল উঁচু ঘাসের জমি আর বাঘ! তার সঙ্গে লড়াই করে জমি দখল করেছে মানুষ, মেদিনীপুর থেকে এসে। পূর্ববঙ্গ থেকেও। তারাই তো ইলিশ ধরতে শিখিয়েছে। আর শিখিয়েছে শুঁটকির চাষ। দু’-দিকে কলা-বাবলাগাছের ছায়াঢাকা জাতীয় সড়ক ধরে গেলে চোখে পড়ে মাটির বাড়ি, ধানখেত, পুকুরপাড়। গোয়াল, পুকুরের পচা পাতা, পাকা ধান, অশোক ফুল, শুকনো মাছের গন্ধ নাকে আসে। মাটিতে মিশে আছে প্রতিরোধের ইতিহাসও। তেভাগা। এখানে সন্ধে নামলে কানে আসে ঝিঁঝিঁর ডাক, আজান আর কীর্তন। দরিদ্র হিন্দুও এখানে যিশুর শরণাপন্ন হয় আপদে-বিপদে। ঘেরাটোপে নয়, ধর্ম যেন হাত-পা ছড়িয়ে নিশ্চিন্তের অবসর কাটায় এই দ্বীপে। সমুদ্রতীরে গজিয়ে ওঠা ইতিউতি গ্রামে মূল জীবিকা মাছ ধরা। সমুদ্র এখানের অর্থনীতি তৈরি করেছে; কিন্তু অপত্য স্নেহ দেয়নি। স্নেহ তার শর্তসাপেক্ষ। অবিচার হলে নিষ্ঠুর, প্রতিশোধী হয়ে ওঠে। শুকনো মাছ, চিংড়ি চাষ, উন্নয়ন আর পর্যটনের কোপে অবাধে কাটা পড়েছে ম্যানগ্রোভ। সমুদ্র সহ্য করেনি। বাড়তে থাকা নোনা জলের স্তর তীর ছাপিয়ে ঢুকে পড়েছে গ্রামে, চাষের জমিতে, খাবার জলে, শরীরে।

উপকূলীয় জীবন অনিশ্চয়তার দোসর। মাছ ধরতে গিয়ে কুমির আর বাঘের পেটে যায় কতজন। আয়লা, আম্ফান, বুলবুল, ইয়াসের তাণ্ডবে বাঁধ ভাঙে অগুনতিবার। ক্ষয়-স্বজনবিয়োগ-ঝড়-ক্ষণিকতা দেখেছে এই ভঙ্গুর ভূমি আর ভূমিপুত্র। জীবনের মূল্য সে জানে। তার স্মৃতি আর বোধ থেকে তাই জাত হয় কবিতা-চেতনা-দর্শন। ছড়িয়ে পড়ে ফ্রেজারগঞ্জের আকাশে-বাতাসে। বকখালির শিরায়-উপশিরায়। শত প্রতিকূলতা, অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও এখানকার কবি সম্প্রদায়– সমুদ্র জানালা– সচেতনভাবে গড়ে উঠেছে গত দেড় দশক ধরে। বকখালি কবিতা উৎসব তাঁদেরই উদ্যোগ। সমসাময়িক কবিতার চর্চা এই প্রান্তিক ভূগোলকে সহানুভূতির বস্তুর বদলে করে তুলেছে সৃষ্টির উৎস।
কিন্তু সমুদ্র শর্ত দিয়েছে। কবিতা হতে হলে গাছ লাগাতে হবে। গাছ হলে তবেই কবিতা হবে এই মাটিতে। মেনে নিলেন কবিরা। সক্রিয় হলেন ম্যানগ্রোভ ফিরিয়ে আনার কাজে। স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং জমি হাঙরদের শাসানি, জীবন-সংশয় উপেক্ষা করে হাত বাড়ালেন স্থানীয় ও দূরের পরিবেশ সক্রিয় সংগঠনগুলির দিকে। ক্ষয়ের বিপরীতে সৃজন হল শুরু। যে মাটিতে সরকারি সিমেন্ট-বালির বাঁধ ভেঙে নোনা জল ঢুকেছিল; চাষ ছিল বন্ধ; আজ সেখানে জমেছে পলি। চারদিকে সোনালি ধান। যে বাড়িটার চারদিকে ছিল রুক্ষ জমি, আজ সেখানে মিষ্টি জলের গাছ– আমড়া, কাঁঠাল, তাল। সিংহভাগ কাজ অসম্পূর্ণ এখনও। তবু অনিশ্চয়তাকে নান্দনিক ও পরিবেশের শর্ত হিসেবে দেখার এক আশ্চর্য সুযোগ করে দিল এই মাটি। বৈপরীত্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে মানুষ এখানেই প্রতিদিন নিজেকে নতুনভাবে গঠন করে, পেশা ও পরিচয়ের বহুস্তরী চর্চায়।

মাছধরা-ধানকাটা-পান-ঝিঙে-উচ্ছেচাষ। তার পাশাপাশি শিক্ষকতা-পরিবেশ আন্দোলন-নাটক-কবিতা-চিকিৎসা। কিন্তু মানুষ এখানে কোনও একটি পেশায় যেন সীমাবদ্ধ নয়। সকালে স্থানীয়দের জড় করে হাঁটু-সমান কাদায় নেমে সমুদ্রের পাড়ে যাঁকে দেখেছি গাছ লাগাতে, তাঁকেই দুপুরে দেখেছি কবিতা আবৃত্তি করতে, সন্ধেবেলায় ছাত্রদের ইংরেজি সাহিত্য পড়াতে। এই সমস্ত কাজ সারার ফাঁকে ফাঁকে চলে তাঁর দর্শনের প্রতিফলন। প্রাইমারি আর টার্শিয়ারি, পেশার দুই মেরুতেই অবাধ যাতায়াত এই অঞ্চলের মানুষের। চারদিনের জন্য কলকাতা ছেড়ে এসেছি এঁদের জীবন, কবিতা চর্চা, দর্শন আর লড়াইয়ের কথা জানার জন্য।
গাছকে যেন বুকে জড়িয়ে রাখে কবিতা এখানে। সমুদ্রের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে ডানদিকে ইকো পার্ক। পার্কের চারদিকে উইন্ডমিল ইতিউতি মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে। আরও ডানদিকে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। তারপরই বঙ্গপোসাগরের তট। সূর্য ডুবতে চলেছে। নরম বিকেলের রেশটুকু মেখে ঝাউবনের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছি আমরা। বীরেন-দা পথ দেখিয়ে চলেছেন আগে আগে। আর সপ্তাহ দুয়েক আগেই শেষ হওয়া বকখালি কবিতা উৎসবের বর্ণনা দিচ্ছেন– এখানেই কবিতা উৎসবের আয়োজন হয়, বুঝলে? সমুদ্রের গর্জন শুনতে শুনতে, ঝাউবনের হাওয়ায়, পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় কবিরা বসে বসে কবিতা খান। আমন্ত্রিত কবিদের লেখা কবিতা গাছের গায়ে টাঙানো হয়। প্রত্যেক কবি দত্তক নেন এক একটি গাছ।– শুনতে শুনতে এগিয়ে চলেছি দিগন্ত বিস্তৃত বাঁধ টপকে সমুদ্রের দিকে। বাঁশ বেঁধে রেলিং তৈরি হয়েছে মাটির ঢাল ধরে– সমুদ্র রুখতে। আড়াআড়ি বাঁধা ধূসর রঙের বাঁশ; গগনচুম্বী ঝাউয়ের সারি; বনের ভেতর ঘন অন্ধকার নামছে নভেম্বরের সন্ধে বেয়ে। মনের মধ্যে ফুটে উঠছে আন্দ্রেই তারকোভস্কি। স্যাক্রিফাইস। সেই পটভূমি।

আমাদের আগে আগে কবি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ পড়ুয়া আবৃত্তি করতে করতে চলেছেন মন্ত্রোচ্চারণের মতো:
‘যাবো ভেবে যেদিকে তাকাই
চিত্রকর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মানুষ
কোথাও এক বৃদ্ধ
গাছের শেকড়ে হাত বোলাচ্ছেন
পাতা সন্তান দত্তক নেবেন;
হারিয়ে যাওয়া গানের কলি খুঁজতে
বাওরের জলে পা ডোবায় সাতকাহন বুড়ি
গভীর করে কাটা রাত্রি স্বপ্ন হয় ভালোবেসে।
যাব না বলে যখন দাঁড়িয়ে থাকি
যীশুহীন ক্রুশবিদ্ধ কাঠ নিয়ে
লোফালুফি খেলে দাঁড়ি কমা মানুষ
আকাশের তারা গোনবার ভয়ে হিসেব করে পকেটের খুচরো জীবন।’
উপকূলীয় অঞ্চলের কবিতার চরিত্র নাগরিক জীবনের কবিতার থেকে আলাদা। মানুষ আর প্রকৃতির সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবেই এই অঞ্চলের কবিতার মুখ্যভাগ জুড়ে। তবে সীমাবদ্ধ নয় তাতে। রমেশ পাত্রের কবিতায় মানুষ আর প্রকৃতির সম্পর্ক ছাড়াও রাজনীতি আর প্রতিদিনের যাপন গুরুত্বপূর্ণ। শরৎ বোধহয় জন্মপ্রেমিক। প্রকৃতি-প্রেম-বোহেমিয়ানিজমে ভেজা তার কবিতা। সৌগত প্রধান (সম্পাদক, সমুদ্র জানালা), দ্বীপজন্মের মায়াসাঁতারে মুগ্ধ করেন পাঠককে। পেশায় চিকিৎসক স্বপন-বাবুর (ড. দাস) চোখে নামখানাকে আবিষ্কার করার মধ্যে এক আশ্চর্য কারুণ্য লক্ষ করা যায়। ব্যারাকপুর ছেড়ে, চাকরি ছেড়ে এই মায়াবি মাটিকেই আঁকড়ে পড়ে রইলেন কবিতা আর সংসার সমেত। এখানকার মানুষজন-প্রকৃতির নিষ্ঠুরতা পেরিয়েও মনুষ্যতের প্রতি কী করুণ বাৎসল্য কবিতায় তাঁর। কানে এখনও লেগে আছে তাঁর লেখা ‘ঝড়’–
‘…ঘরে ওঠা জল আর ঘূর্ণাবর্ত বাতাস নিয়ে ফিরে গেল ঝড়
তারপর আকাশে চাঁদ উঠল
মানুষ তবু ভুলল না সেইসব দিন
…
বিভীষিকার চর্চা উঠতে লাগল কবি ও কলমের জাবরে জাবরে
…
গাই, গরু নেমে গেছে ফ্লাড-হাউজ হতে
…
নোনতা ঘাসের ওপর নরম পলির প্রলেপ চেটেচেটে
ছাগলের মুখ ভরে উঠল বিরক্তির আবেগে
গাভীরা টেনে টেনে আনতে লাগল দূরের ঘাস
খুঁটি-বাঁধা জীভের অপূর্ব ঘূর্ণনে ছিঁড়ে ছাড়া গরু হল…।’

দশমাইলের মোড়ে মোতির চা-দোকান। খদ্দের বসার জায়গাটা পেরিয়ে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নীচে শোওয়ার ঘর। কাঠের তক্তাপোশের ওপর বসে আড্ডা চলে কবিদের সকাল-সন্ধে-রাত। শরৎ (চট্টোপাধ্যায়) প্রশ্ন করছে বাকি কবিবন্ধুদের: সম্পর্ক, কবিতা, সংজ্ঞা নিয়ে। কবির সংজ্ঞাহীন সত্তা নিয়ে হচ্ছে আলোচনা। কী আশ্চর্য এক বিমূর্ততার মধ্যে বিরাজ তাদের ভাবনাচিন্তার। আজ থেকে তিন বছর আগে পানিহাটি পত্রকের ম্যানগ্রোভ বৃক্ষরোপণের অবজার্ভার হয়ে এসে দেখেছিলাম এই কবিগোষ্ঠীর সংগঠিত, সর্বক্ষণ সজাগ কবিতা-চর্চা। রমেশ জানিয়েছিলেন এই যূথবদ্ধতার কারণ– ‘আমাদের প্রত্যেকেরই এত ক্ষত, তা একা বললে কে শুনবে? তাই একসঙ্গে বসা দরকার।’ সেই বসার বৃত্তে থাকেন শিক্ষক, কবি, সমুদ্র জানালার সদস্য, স্থানীয় যুবক, বাইরের মানুষ।
বীরেনদা আর শরৎ প্রতিদিন কবিতা লিখিয়ে নেন দায়িত্ব নিয়ে। সৌগতদা, স্বপনদা অপত্য স্নেহে ছোটদের উৎসাহ দেন। এঁদের ছায়ায় বড় হয়ে উঠছে মানস, পলাশ, ধ্রুব, রমেশ। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছয় সৃজনের অভ্যাস: আঞ্চলিক উচ্চারণ থেকে সাহিত্যভাষায় উত্তরণের লড়াই; নামখানার কবিতাকে বৃহত্তর চর্চার ভুবনে তুলে ধরার লড়াই। ‘ঊষা-গোধুলী মাড়িয়ে সে লড়াই’। সুমনের (দিন্ডা) কথায়, এই নিরন্তর কাটাছেঁড়া, আলোচনা ও মত বিনিময়ের মধ্য দিয়েই পরিশীলিত হচ্ছে ভাষা ও ভাবনা। যৌথতার কারণেই ভাষার সংকট কাটিয়ে ওঠা গিয়েছে।

শরৎ সদাসতর্ক: ‘আঞ্চলিক ভাষার দোষে দুষ্ট না হয় আমাদের কাব্যভাষা।’ দু-তিন লাইন লেখার পরই যখন আঞ্চলিক শব্দ ঢুকে পড়ে, আবার তাকে সরানোর যুদ্ধ। বহু স্বাদ মিশে একসময় ভাষার সংকট ছিল; ১৫ বছর আগেও ভাষা ছিল ‘বেনোজলে’ ভরা। সংকট আজও আছে, কিন্তু শুদ্ধ ভাষায় পৌঁছতে গেলে ভেতরে ভেতরে যে পুড়তে হয়। কলকাতার কবিদের সে দায় নেই– কারণ সেখানে লেখা আর বলার ভাষা প্রায় এক। এখানে ভাষার দুই ভিন্নতা কবিকে প্রতিনিয়ত পরিশ্রম করায়।
সমুদ্র জানালার কবিতার অনুশীলন বাহ্যিক স্বীকৃতির জন্য নয়; সাধারণ জীবনযাত্রার স্বতঃস্ফূর্ততা থেকেই জন্ম নেয়। প্রতি সন্ধ্যায় সৃষ্ট হয় ম্যাজিক রিয়ালিজম। শরৎ ধরে ধরে বিশ্লেষণ করেন প্রত্যেকের প্রতিটি লাইন। মতবিরোধ হয়। একের কবিতা আবৃত্তি করেন অপরে। মত নেওয়া-দেওয়ার এই নিরন্তর আদানপ্রদানে ধীরে ধীরে ‘জারণ’ হয় কবিতার; কবির স্বর অম্লান থাকে, কিন্তু নির্মাণ হয়ে ওঠে যৌথ-যাপনের সন্তান। যে কলকাতার সঙ্গে নিজেদের তুলনা টানা অনিবার্য, সেই শহরে কবিরা বিচ্ছিন্নভাবে লিখে যান; এখানে কবিতা যেমন ব্যক্তিগত, তেমনই কমিউনিটির ঔরসজাত। এই অবিরত যৌথ সাধনার আর কোন দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝা যায়?

মনে পড়ল স্লাভয় জিজেকের “An Answer to Today’s Crisis: A Leninist View”-এর কথা। সেখানে জিজেক বলেছেন, সমাজের সংকটকে কাটিয়ে উঠতে শুধু স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এমন এক সংগঠিত নাগরিক-সত্তা, এমন এক রাজনৈতিক অ্যাক্টর (actor), যিনি সম্মিলিত শক্তিকে একটি ধারায় পরিচালিত করতে পারেন। অর্থাৎ, নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশ ছাড়া বিপ্লবের শক্তি বিস্তৃত হতে পারে না। ফ্রেজারগঞ্জ-বকখালির কবি-সমাজকে দেখলে এই কথাটাই নতুনভাবে অর্থবহ হয়। এখানে কবিতা একক সাধনা নয়। সমালোচনা, আবৃত্তি, বিতর্ক, মতবিরোধ ও পারস্পরিক সংশোধনের মধ্য দিয়ে তৈরি এক সমবেত সৃষ্টিশীলতা। প্রত্যেক কবি তাঁর স্বকীয়তা বজায় রাখেন, কিন্তু কবিতার নির্মাণের দায়িত্ব সমবেত। দেড় দশক ধরে মূল ভূখণ্ডের কেন্দ্রীয় সাহিত্যবৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে এই প্রান্তিক ভূগোল নিজের ভাষা, স্মৃতি ও ভূদৃশ্যকে রক্ষার জন্য সংগঠিত হয়েছে।
জিজেক যাকে বলেন ‘political actor that can assert force against systemic power,’– এখানে সেই শক্তি রাজনৈতিক নয়, কাব্যিক রূপে উপস্থিত। মূলস্রোতের ভাষা-প্রাধান্য, নগর-কেন্দ্রিক সাহিত্যের আধিপত্য, এমনকী, বিস্মৃত হয়ে যাওয়ার বিপরীতে সমুদ্র জানালা নিছক কবি-সমাজ নয়; এক সম্মিলিত প্রতিরোধ, এক প্রাত্যহিক হাতিয়ার, যা ভঙ্গুর ভূমি ও ভঙ্গুর ভাষাকে ধরে রাখার লড়াই চালায়।

যে সমালোচনার অভ্যাসের গুরুত্ব অপরিসীম জিজেকের কাছে, এখানে তার জারণেই জন্ম নেয় কবিতা। বন্ধুকে টেনে নামানো নয়, তার উৎস নিয়ে পরিহাস নয়, বরং তাকে সস্নেহে এগিয়ে দেওয়া, সচেতন ইগোর লড়াইবর্জিত এক পরিসর সৃষ্টি করা। জিজেক যে জনগণের শক্তিকে সাবয়ব রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে রূপান্তরের কথা বলেন, এই দ্বীপাঞ্চলে সেই শক্তির সাংস্কৃতিক সংস্করণই দেখা যায় সম্মিলিত কাব্যিক হস্তক্ষেপে। এক আশ্চর্য ভ্রাতৃত্ববোধ বেঁধেছে এই কবিদের। এই তত্ত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল পরের দিন কয়েক মাঠে-ময়দানে তাঁদের সঙ্গে থাকতে থাকতে।
দ্বিতীয় দিন সকালে ভিড়হীন হেনরি আইল্যান্ডে যাওয়া হল। বীরেনদা সেখানেও গাছ লাগিয়েছেন। বলছিলেন তিনি, ‘এখানের ভাঙাগড়া এমনভাবে আমাদের জীবনে ঢুকে পড়েছে, যে ভাঙাটাও সত্য; গড়াটাও সত্য। আমার কবিভাবনা তো তা থেকে কখনওই নিষ্কৃতি পেতে পারে না। প্রকৃতি থেকে আমি প্রেমে আসতে চেয়েছি; আমাদের শূন্যতা থেকে মুক্তি আনন্দ খুঁজতে চেয়েছি।’ ‘নির্বাসন’ তেমনই এক কবিতা:
‘নৌকা নোঙরহীন নয়
সমুদ্র প্রেমিক নয় সে পুরুষ।
ঘুমের ভেতর নারী বলে যাবো
যেতে গিয়ে নারী নদী হয়ে যায়।…’
সেদিন বিকেল। ইকো পার্কে বাকি কবিদের ডেকেছি। পড়ন্ত রোদে বঙ্গোপসাগরের তীরে তাঁদের কবিতা শুনব বলে। সূর্য ঢলে পড়ছে। কবিরা তন্ময়। সিমেন্ট-কংক্রিটের সরকারি তট। কেউ কেউ বাঁধানো তটে শুয়ে শুয়ে পাঠ করছেন নিজের লেখা কবিতা। অর্ধশায়িত শরৎ পড়ে চলেন, ‘পাগলের অনুবাদ’:
‘সে পাগল খায় কি খায় না, কি আসে যায় কার।
তার পোশাকের রং দূষণ দূষণ।
সে নদী হারিয়ে গেল উঁচু-উঁচু প্রোমোটার
অট্টালিকা গরম দুধ ফেনিয়ে ওঠা সাজানো নগরে
কি আসে যায় কার আমরা তো ঘুমের সঙ্গীত
…
ঘোর বৃষ্টির রাতে ফিরে আসছি মায়াকুঞ্জের লোভে
কাদা জলে মাখামাখি একটি মানুষ চিৎ ও সুন্দর
তার মুখে শারদ অহংকার ও অমলিন হাসি
স্বমূর্ত আমি দেখি সেই পাগলের মৃত অথচ
কি উজ্জ্বল তার মুখ। দুর্যোগের সমস্ত ঘৃণা
অস্বীকার করে সমূহ আকাশ, পথ–
উপহার দিয়ে যাচ্ছে। খুশির অপূর্ব নিবেদন।’
[বানান অপরিবর্তিত]

দশমাইলের নৌকা-ভেড়ির মাঠে খোলা আকাশের নিচে আড্ডা জমে উঠেছে। চারদিকে ঝিঁঝিঁর ডাক ভেদ করে ভেসে আসছে কীর্তন। আড্ডার ভিডিও শুট হবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। ঘন অন্ধকারে সৈকত আর ড্রাইভার কার্তিকদা আল পেরিয়ে ২০ মিটার দূরে বসিয়ে দিল স্পট-লাইট। আমাদের সামনে আলোয় একটা একটা করে ফুটে উঠছে বিশালাকার নৌকা, ট্রলার, লঞ্চ। মঞ্চ এক। নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে বোঝা যায়নি। মাথার ওপর তারা ফুটে উঠেছে। চোখের সামনে এক অজানা ভূগোল ধরা দিচ্ছে নাটকীয়ভাবে। আমাদের ধরে নেওয়া পৃথিবীর আসলে কতটুকুই বা জানি। সৌগতদা বলছিলেন মূল ভূখণ্ডের কবিতা আর বকখালির আঞ্চলিক কবিতা নিয়ে তাঁর মতামত। তাঁর মতে, কলকাতার নাগরিক কবিরা যাঁরা কবিতার কেন্দ্রে দাপিয়ে বেড়ান– তাঁদের থেকে কোনও অংশে কম নয় এই ভূখণ্ডের কবিতা। সারা বছরভর বিভিন্ন কবিতা উৎসবে তাঁদের সঙ্গে দেখা হয়। ব্রিজ হওয়ার আগে পর্যন্ত বকখালি ছিল দ্বীপাঞ্চল; বিচ্ছিন্নতাই ছিল তার স্বভাব। তবু সৌগতদার মনে হয়েছে, এখানকার কাব্যভাষা অনেকটাই এগিয়ে। ১০০ জন কবি কবিতা পড়ছেন– এমন উৎসবে থেকেও মনে হয়, আমাদের নিজের কাব্যভাষা যেন বিশেষভাবে পরিণত। ‘ভূতাত্ত্বিক গবেষণা বলছে, সুন্দরবন অঞ্চল আগামী কুড়ি বছরের মধ্যে তলিয়ে যেতে পারে। তবে কি আমাদের কাব্যভাষাও ডুবে যাবে সঙ্গে? নাকি আমরা রেখে যাব নতুন কোনও ভাষা– যা ভবিষ্যতের ভাষাতাত্ত্বিকদের গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে? কারণ, এই কবি-সমাজে প্রত্যেকের কাব্যভাষাই স্বতন্ত্র, নিজ নিজ জগৎ থেকে উঠে আসা।’
হিম পড়ে জ্যাকেট ভিজছে। ক্যামেরা আর আলোর ওপর বিন্দু-বিন্দু জলকণা। পায়ের নিচে ভেজা ঘাস, মাটি। ভাবছি, যে জমি ভঙ্গুর, যার আয়ুষ্কাল হয়তো আর দু’-দশক, ভাষার বোধ তার কত দৃঢ়চেতা। স্থায়িত্বের স্বপ্নে ভরপুর। জীবন আর চেতনার ফারাক স্পষ্ট হচ্ছে হিমপড়া সন্ধেয়।

আমাদের কথোপকথনে নতুন স্বপ্ন, আদানপ্রদান আর আবার সংগঠিত হওয়ার কথা আসা স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু সেই সঙ্গেই বারবার মাথা তুলছিল অনিশ্চয়তা– ১৬-২০ বছরের হিসেব, মানচিত্র থেকে এক অঞ্চল মুছে যাওয়ার আশঙ্কা। তবু এই ভঙ্গুরতার মধ্যেই এক অদ্ভুত প্রত্যয় নিয়ে কবিতার চর্চা চলছে এখানে। সেই প্রত্যয়েরই প্রতিধ্বনি শোনা যায় রমেশের কবিতায়:
‘একশো তিরিশ টাকার চটি জুতো
পরপর তিনবার ফিতে পাল্টাবার পর
প্রত্যক্ষ করি ক্ষয়ে যাওয়া সুকতলা
আমি উঠে দাঁড়াই
আমাকে পরিত্যক্ত বলো না…
ধুলোয় ছড়িয়ে আছে আয়ু ও প্রেম।
না পাওয়া যত ক্রোধ ভেসে যাক জলে
একশো তিরিশ টাকায় উঠে দাঁড়ানো যায়!’
নাটক ছেড়ে চলে এসেছিল রমেশ কবিতার ভাষায় নিজেকে ব্যক্ত করবে বলে। শরৎ ও বীরেন-দা, তাকে ছায়ার মতো আগলে রেখে কবিতা লেখার চর্চায় অঙ্গাঙ্গীভাবে জুড়েছেন।
যে টিউটোরিয়ালে ছাত্ররা পড়ে, তারা ফিরে গেলে সেখানেই শুরু হয় নাটকের মহড়া। এক সন্ধেয় কবিদের সঙ্গে আড্ডা চলছিল সেখানে। সুমন বলছিল কেন সে না থাকলেও তার কবিতা বেঁচে থেকে যেতে পারে। ‘প্রথমে বুঝতে হবে কোন পারিপার্শ্বিকতা থেকে আমাদের কবিতা জন্ম নেয়। আমাদের চারপাশে একদিকে মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য, অন্যদিকে কঠোর জীবনসংগ্রাম। এই বৈপরীত্যই আমাদের অনুপ্রেরণা। এই দুইয়ের মিশেল আমার লেখায় একটা নতুন প্রয়োগ এনেছে। পরিবেশ, মানুষের সংগ্রাম, আর আমাদের নিজস্ব বোধ– এই তিনের মিলনে আমরা আমাদের শব্দ খুঁজে পাই। আমি যে ভাষা ও প্রকরণ ব্যবহার করি, তা আমার কাছে সমসাময়িক অনেক কবির থেকে আলাদা বলেই মনে হয়। আর সেই ব্যতিক্রমী স্বরই হয়তো আমি না থাকলেও আমার কবিতাকে টিকিয়ে রাখবে।’

বীরেনদা এই বিষয়ে কিঞ্চিৎ স্বতন্ত্র। তাঁর মতে, যদ্দিন জীবন আছে, তদ্দিন জীবনে প্রেম আছে। প্রেম ছাড়া জীবন হয় না। প্রেম যখন শূন্যতা তৈরি করে, তখনও অন্যরকম একটা প্রেম তৈরি হয়। যেখানে জীবন খোঁজার জন্য এক দার্শনিকতার জন্ম হয়। দর্শন-প্রেম, সেসবের মধ্যে দিয়ে বাস্তব যেন অন্যরকমভাবে উঁকি মারে। আমাদের সামান্য চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে যখন মানুষ একা হয়। একা থেকে আরও একা, নিজেকে খোঁজার এক তোড়জোড় শুরু হয় ভেতরে ভেতরে। তখন নিজেকে খোঁজার যে চেষ্টা শুরু হয়, ওই একা হওয়ার চেষ্টার স্তরেই তিনি তাঁর কবিতাকে নিয়ে যেতে চান। ‘আমি মনে করি ঠিক ওই জায়গাতেই আমার কবিতা থাকবে, আমিও থাকব। শেকসপিয়রের মতো বলতে চাই, যতদিন মানুষ বেঁচে থাকবে, কান শুনতে পাবে, চোখ দেখতে পাবে, ততদিন হে কবিতা, তুমিও আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে।’
এই ক’দিনে আমার গাড়ির সিটের ওপর জমে উঠেছে একগুচ্ছ উপহার পাওয়া কবিতার বই। ‘আবিষ্কার’ ও ‘নষ্টচাঁদ’ থেকে যথাক্রমে প্রকাশিত শরৎ চট্টোপাধ্যায়ের ‘‘অপ্রস্তুত দু’হাত’’ এবং ‘রূপসি জ্যোৎস্নার ঝুপ অন্ধকার’। ‘বেতসে বিদিশা বাঁশি’, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ পড়ুয়া, পাটাতন। ‘অতল চক্রের ঘ্রাণ’, সৌগত প্রধান, বের করেছেন আগামী বাংলা। দিগন্ত থেকে প্রকাশিত ধ্রুব বিকাশ মাইতির ‘বান্ধবী’; ‘চোখের ভেতর মাছরাঙা’; ‘অথবা জলচক্র’। রমেশ পাত্রের ‘নদী ও বৈষ্ণবী’, আবিষ্কার। সুমন দিন্ডার ‘আফসোস বাতাসে ফসলের ঘ্রাণ’, ‘অন্বেষা এবং ঈশ্বরী’, ধ্রু পাবলিকেশন থেকে, ‘অপেক্ষা হয়ে আছি’ এবং ‘না হয়ে ওঠা কবিতারা’, পাটাতন থেকে প্রকাশিত। মানস দোলইয়ের চাঁদের আলো নোনতা হাসি, বই-ভব পাবলিশার্স।– স্মৃতি-জল-ক্ষয়-ভাষা-সংগ্রামের একটি গ্রহমালা। দক্ষিণবঙ্গের দ্বীপ-রাজ্যের সমসাময়িক কবিতার সম্পূর্ণ এক কসমোলজি।
চারদিনের কবিতা-সফর শেষে ফিরে যাব। তাই শুক্রবার সকালে লালগঞ্জের তীরে কাদায় নেমে গাছ লাগানোর পর নিজেদের হাতে গড়া ঝাউবনে একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজন। ডাক্তারবাবুর স্ত্রী, মাধুরীদি ঝাউবনে ঢোকামাত্র কাজ করতে শুরু করে দিলেন। কন্যা নিঝুমকে ঝাউগাছের একটা উঁচু ডালে তুলে দেওয়া হল। সে ঝুঁটিবাঁধা-ফ্রক-সু-পরা বনদেবী। গোলাপি ফুল আর লতায় ছেয়ে রয়েছে ঝাউবন। মাধুরীদি সেই লতা তুলে গিঁট দিয়ে মালা বুনে সবার গলায় পরিয়ে দিলেন। সমুদ্র পাশেই। সাবার থেকে হালকা শুঁটকি মাছের গন্ধ ভেসে আসছে; কানে ঘুঘুর ডাক। মালা পরে কবিরা উদাত্ত-কণ্ঠে আবৃত্তিতে মেতে উঠলেন একে একে।

দশমাইল থেকে লালগঞ্জের ঝাউবনে খাবার রান্না করিয়ে আনা হয়েছে। শরৎ, মানস, স্বপন-বাবু, সৌগতবাবু, কবিরাই হাত লাগিয়ে ধরাধরি করে এনে দিলেন। এবড়ো-খেবড়ো মাটির রাস্তা ধরে অটোতে চাপিয়ে প্রাণ দিয়ে রক্ষা করে নিয়ে আসা হয়েছে সেই খাবার। গরম মোটা চালের ভাত, ডাল, আলুমলা, তাজা আমোদি মাছভাজা, পেঁপের চাটনি, পান্তুয়া আর পায়েস। ‘এই দিয়ে খেতে পারবেন তো?’ কিঞ্চিৎ ইতস্তত করে জানতে চাইলেন বীরেনদা। কী করে বোঝাই খোলা আশমান-জমিন এক করা সমুদ্র থেকে ভাঙন রোখার পর, সন্তানসম ঝাউবনে এই আতিথ্য, এই অমৃতসমান খাদ্য, এই নিঃশর্ত ভালোবাসার কাছে কোহিনূরও ম্লান।
ফেরার দিন সকালে দেখলাম মাথা-বোঝাই ধান নিয়ে বাড়ি চলেছে চাষি। শুনলাম, কাজ থেকে ফেরার পথে বানি-গরান-ঝাউয়ের জঙ্গলে, গাছের ছায়ায় মেয়েরা আজকাল জিরিয়ে নিতে পারে একটু। ওরা মনে মনে কুর্নিশ করে সেই মানুষকে, যিনি কবিতা লিখতে লিখতে ছায়াটুকুও আনিয়ে দিয়েছেন নোনা জলের মাটিতে। মেরু দেশের বরফ গলছে। পায়ের নিচে মাটি কতক্ষণ থাকবে জানি না। কবিতা লেখা, গাছ পোঁতার স্মৃতি শুধু বলে যাবে– চেষ্টা চলেছিল সৃজনের।
…………………………………………………………
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: সমুদ্র জানালা, পানিহাটি পত্রক, সৈকত সুরাই, কার্তিক দাস
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved