
তিনি কেবল কলমে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। শবর অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে গিয়ে তাদের সঙ্গে থেকেছেন, কথা বলেছেন, আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন। ‘বনবাসী চেতনা আশ্রম’, ‘ডিনোটিফায়েড ট্রাইবস’ আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ শবরদের জীবনবাস্তবতাকে আরও গভীরভাবে তাঁর লেখায় স্থান দিয়েছে। ফলে তাঁর সাহিত্য কখনও কল্পনাপ্রসূত রোমান্টিকতা নয়– বরং অভিজ্ঞতা-নিঃসৃত এক কঠিন সত্য।
বাংলা ও ভারতীয় সাহিত্যে মহাশ্বেতা দেবী একটি অনন্য নাম– যিনি কেবল সাহিত্যিক নন, বরং একজন সামাজিক যোদ্ধা, নীরব মানুষের কণ্ঠস্বর। তাঁর লেখার কেন্দ্রে বারবার উঠে এসেছে ভারতের প্রান্তিক মানুষ– আদিবাসী, দলিত, ভূমিহীন শ্রমিক, শোষিত নারী। এই প্রেক্ষিতে শবর জনগোষ্ঠী ও তাঁদের জীবনসংগ্রাম মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্যচর্চায় এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ‘শবর’ কেবল একটি জাতিগোষ্ঠীর নাম নয়; মহাশ্বেতা দেবীর কাছে শবর হল রাষ্ট্রীয় অবহেলা, সামাজিক নিষ্ঠুরতা এবং মানবিক লাঞ্ছনার এক প্রতীক।
শবররা মূলত পূর্ব ও মধ্য ভারতের আদিবাসী জনগোষ্ঠী– বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা ও ছত্তিশগড় অঞ্চলে বসবাসকারী। ঐতিহাসিকভাবে শবররা বননির্ভর জীবনযাপন করত– শিকার, ফলমূল সংগ্রহ, বনজ সম্পদের ওপর নির্ভর করেই ছিল তাদের অস্তিত্ব। ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থায় বন আইন, পরবর্তীকালে স্বাধীন ভারতের তথাকথিত উন্নয়নমূলক নীতির ফলে শবররা ধীরে ধীরে তাদের জীবিকার অধিকার হারাতে থাকে। রাষ্ট্র তাদের দেখেছে ‘অপরাধপ্রবণ’, ‘অসভ্য’, ‘পিছিয়ে পড়া’ জনগোষ্ঠী হিসেবে– মানুষ হিসেবে নয়।

এই অমানবিক অবস্থানকেই মহাশ্বেতা দেবী তাঁর লেখার মাধ্যমে উন্মোচিত করেছেন। তাঁর সাহিত্য শবরদের কেবল সহানুভূতির বস্তু হিসেবে দেখায় না; বরং তাদের সংগ্রাম, রাগ, প্রতিরোধ ও অস্তিত্বের লড়াইকে সামনে আনে। বিশেষ করে তাঁর ছোটগল্প ও রিপোর্টাজধর্মী রচনায় শবররা হয়ে ওঠে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক বাস্তবতা।
মহাশ্বেতা দেবীর লেখা ‘শবর’, ‘দ্রৌপদী’, ‘অরণ্যের অধিকার’, ‘হাজার চুরাশির মা’– এইসব রচনায় রাষ্ট্র ও ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রান্তিক মানুষের সংঘাত স্পষ্ট। যদিও ‘দ্রৌপদী’ গল্পে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু শবরদের ক্ষেত্রেও একই রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ছক প্রযোজ্য। শবরদের উপর পুলিশি নির্যাতন, মিথ্যা মামলা, অনাহার, চিকিৎসাহীন মৃত্যু– এসব মহাশ্বেতা দেবীর লেখায় নিছক ঘটনা নয়, বরং এক নির্মম রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দলিল।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য মহাশ্বেতা দেবীর অ্যাক্টিভিস্ট ভূমিকা। তিনি কেবল কলমে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। শবর অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে গিয়ে তাদের সঙ্গে থেকেছেন, কথা বলেছেন, আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন। ‘বনবাসী চেতনা আশ্রম’, ‘ডিনোটিফায়েড ট্রাইবস’ আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ শবরদের জীবনবাস্তবতাকে আরও গভীরভাবে তাঁর লেখায় স্থান দিয়েছে। ফলে তাঁর সাহিত্য কখনও কল্পনাপ্রসূত রোমান্টিকতা নয়– বরং অভিজ্ঞতা-নিঃসৃত এক কঠিন সত্য।
মহাশ্বেতা দেবীর কাছে শবর মানে শুধুই দারিদ্র্য নয়; শবর মানে প্রশ্ন– সভ্যতা কাকে বলে? উন্নয়ন কার জন্য? গণতন্ত্রের অর্থ কী, যদি একটি জনগোষ্ঠী প্রজন্মের পর প্রজন্ম অনাহারে মরে? তাঁর লেখায় শবররা আমাদের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তোলে– আমরা কি সত্যিই স্বাধীন?
ভাষার দিক থেকেও মহাশ্বেতা দেবীর শবর-কেন্দ্রিক রচনা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রমিত, অলংকৃত ভাষার বদলে ব্যবহার করেছেন কঠোর, অনাড়ম্বর, কখনও অস্বস্তিকর ভাষা– যা পাঠককে আরাম দেয় না, বরং ঝাঁকুনি দেয়। শবরদের কথা বলার ভঙ্গি, তাদের নীরবতা, তাদের হাহাকার– সবই তাঁর লেখায় এক রাজনৈতিক ভাষা পেয়ে ওঠে।
আজকের সময়েও শবরদের অবস্থা খুব একটা বদলায়নি। অনাহারে মৃত্যু, ভূমিহীনতা, শিক্ষার অভাব এখনও বাস্তব। এই প্রেক্ষিতে মহাশ্বেতা দেবীর লেখা আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন– সাহিত্য কেবল সৌন্দর্যের অন্বেষণ নয়; সাহিত্য একটি দায়িত্ব।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, মহাশ্বেতা দেবী ও শবর– এই সম্পর্ক সাহিত্য ও মানবিকতার এক ঐতিহাসিক বন্ধন। মহাশ্বেতা দেবী শবরদের জন্য কথা বলেছেন, লিখেছেন, লড়েছেন। তাঁর সাহিত্য আমাদের বাধ্য করে শবরদের চোখে তাকাতে, তাদের মানুষ হিসেবে স্বীকার করতে। এই স্বীকৃতিই তাঁর লেখার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও মানবিক অর্জন।
মহাশ্বেতাদির বালিগঞ্জ স্টেশন রোডের দু’ কামরার ঘরের বাইরে বারন্দা– মাঝে এক ফালি ফাঁকা জায়গার ওপারে দুই বারন্দার ফাঁকে একটি ঘরে শবরদের তৈরি নানা বৈচিত্রময় কাজের জিনিস, যা শবর সম্প্রদায় তৈরি করত তাদের বনজ সম্পদ থেকে। দুটো বারান্দা পেরিয়ে ৬০ বছর বয়সে অনায়াসে লাফ দিয়ে সেইসব সামগ্রী সবাইকে দেখাতেন, বিভিন্ন মেলায় নিয়ে যেতেন। সমস্ত প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে সেইসব সামগ্রী তৈরি। তার সঙ্গে ছিল সুতোর কাজ।
মহাশ্বেতাদির খুব ইচ্ছে কলকাতা শহরে শবর মেলা করবেন। পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শবররা কলকাতায় ছ’দিন থেকে মেলা করবে। আমায় ও আমার স্ত্রীকে তাঁর আদেশ– ‘তোমরাই করবে’। তখন ‘বিনোদন বিচিত্রা’ পত্রিকার পক্ষ থেকে কলকাতা তথ্যকেন্দ্রে এই প্রদর্শনীর উদ্যোগ নেওয়া হল। জুলাই মাসে পরপর তিন বছর শবর সম্প্রদায় কলকাতা এসে এই শহরে থেকে এই মেলার আয়োজন হল। নাম ছিল ‘কাজের জিনিসের কারুকাজ’। মহাশ্বেতা দেবী রোজ দুপুরে আসতেন, আর ছিলেন তুষার তালুকদার ও সুদেব চক্রবর্তী। প্রথম বছর দারুণ হল– সাধারণ মানুষও উৎসাহ দেখাতেন– কেনাকাটাও ভালোই হয়েছিল। এই শবরদের যাতায়াতের ভাড়াও আমরা দিতাম।

দ্বিতীয় বছরে মেলা শুরু হবার পর মহাশ্বেতাদি বললেন, শুধু কলকাতা দেখালেই এদের হবে না। বড় রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে হবে। সেবার গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক ছিলেন। তুষার তালুকদারের শরণাপন্ন হতেই পিয়ারলেস ইন-এ নৈশভোজের আয়োজন হল। মহাশ্বেতাদি খুব খুশি।
আজ এই শতবর্ষে মহাশ্বেতাদির সঙ্গে এই কাজটুকু আমাদের জীবনের শুধু সঞ্চয় নয় প্রাপ্তিও। নানাসময়ে কত যে চিঠি লিখেছেন– যা অমূল্য আমাদের কাছে! তার একটি চিঠি এ লেখার শেষে জুড়ে দিলাম। তাঁর শতবর্ষ ১৪ জানুয়ারি। সকালে ফোন করলে বলতেন– একদিনের বড় দাদা আমায় ফোন করছে। কারণ ১৩-এ আমার জন্মদিন।

A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved