
ইংরেজরা ভারতে আসার অনেক আগে থেকেই এই পুতুল তৈরি প্রচলন লোকশিল্পে দেখা যায়। তাম্রপ্রস্তর যুগ থেকে দুই খোল ছাঁচের পুতুল তৈরির প্রচলন এদেশে রয়েছে। আবার এ-ও মনে করা হয়, পুতুলটিতে যে রানি রং ব্যবহার করা হয় সেই জন্যে এই পুতুলের সঙ্গে মিশে গিয়েছে ‘রানি’ কথাটি।
অগ্রহায়ণের শান্ত দুপুরে মিঠে রোদ গায়ে মেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন উচ্চতার মাটির পুতুল। অগ্নিশুদ্ধি করার আগে ঠিক এভাবেই মাটির পুতুলগুলোকে নিজেদের বাড়ির ছাদ এবং উঠোনে শুকোতে দেন প্রতাপ পাল। পৌষ সংক্রান্তির দিন উলুবেড়িয়ার বাণীবনে বসে পীর হজরত জঙ্গলবিলাসের মেলা। সেই উপলক্ষে উলুবেড়িয়া তাঁতিবেড়িয়ার কুমোরপাড়ায় প্রতাপ পালের মতো শিল্পীরা গড়ে তোলেন রানি পুতুল। বাংলার পুতুল মানচিত্রে হাওড়া জেলার রানি পুতুলের গুরুত্ব অপরিসীম। হাওড়া জেলার শৈশবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই পুতুলের স্মৃতি। কল-কারখানার ধোঁয়া, দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলা এক্সপ্রেস ওয়ের ব্যস্ততার ছাড়াও হাওড়ার নিজস্ব লোকজ পরিচয় রয়েছে। হাওড়ার প্রাকৃতিক স্নিগ্ধতা ও গ্রাম্য সরলতা মেখে আজও গড়ে ওঠে রানি পুতুল। জার্মানি বললেই যেমন আমাদের সকলের মনে বার্বি পুতুলের কথা মনে আসে, ঠিক তেমনই হাওড়া মানেই রানির রাজত্ব। প্রতাপ পাল ও তার মা শংকরী পাল ছাড়াও দিপালি পাল, পরিতোষ পাল আর তার ছেলে প্রশান্ত পাল বংশপরম্পরা মেনে দু’ খোল ছাঁচের এই পুতুল তৈরি করে চলেন। মুখের গঠনে মধ্যবয়সী রাজকীয় স্থূলপূর্ণ গাম্ভীর্যতা। মাথা উঁচু, চোখের দৃষ্টিতে দৃঢ়চেতা ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন রানি। পরনে ইউরোপীয় শৈলীর গাউন। কোমর বন্ধনী। হাতের গঠন বিমূর্ত। পুতুলের কোমর থেকে নিম্নাংশ পর্যন্ত গোলাকার। উদ্যত স্তনযুগলে নারীত্বের গর্ব স্পষ্টভাবে পরিস্ফুট। প্রতাপ পালের কথায় মূলত এঁটেল মাটি দিয়ে এই পুতুলগুলো তৈরি করা হয়ে থাকে। সর্বোচ্চ আট ইঞ্চি উচ্চতার পুতুল তৈরি হয়। কিছু পুতুলে মুকুট দেওয়া দেওয়া হয়। আবার কোনওটা মুকুটহীন থাকে। আর সেই মুকুটহীন পুতুলগুলিতে চুলের সিঁথি মাঝবরাবর থাকে। প্রতিটি পুতুলের মধ্যেই খোঁপা দেওয়া থাকে। ছাঁচ থেকে তুলে রোদে শুকোতে দেওয়ার পর পোড়ানো হয়। তারপর তেঁতুল বীজের আঠার সঙ্গে অভ্র মিশিয়ে পুতুলের গায়ে প্রলেপ দেওয়া হয়। সেটি শুকিয়ে গেলে গোলাপি রঙে চোবানো হয়। ফলে পুতুলের শরীর উজ্জ্বলতা নির্গত হতে থাকে। পৌষ সংক্রান্তি ছাড়াও কিছু পুতুল রথ এবং চড়ক উপলক্ষে তৈরি করা হয়।

হাওড়ার আমতা নরেন্দ্রপুরে দিবাকর পাল এবং তার পুত্র শুভজিৎ পালের তৈরি রানি পুতুলের মধ্যে চড়া গোলাপি রঙ ও অভ্রের মিশেল নেই। তবে ছাঁচ থেকে তুলে রোদে হালকা শুকোনোর পর বনকের প্রলেপ দিয়ে পোয়ান বা পোনে পড়ানো হয়। গলায় এবং কোমর বন্ধনীতে গোলাকার দানার মতো মাটির মালা দিয়ে রাজকীয় আভিজাত্যকে গ্রাম্য সরলতায় তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। মুখ ও শরীরের স্থূলতার মধ্যে মাতৃত্ব অনুভূত হয়েছে। কপালের টিপ। মুখে দৃষ্টিতে স্নেহশীল হালকা হাসির অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী। ছাঁচ থেকে তোলার সময় পুতুলের মধ্যে থাকা মাটির বাড়তি অংশটা রেখে দেওয়া হয়। ফলে পুতুলের শরীরের পেছনে নিজস্ব পটভূমি নির্মাণ হয়ে যায়।
আমতার উদংয়ের সুব্রত কুমার পালের তৈরি রানি পুতুলের মধ্যে মুখের স্থূলতা নেই। নাকের গঠন টিকলো। মাথায় মুকুট। মুখের ভাব অভিব্যক্তিহীন। কোমর বন্ধনী, গলার মালা ও চুলের খোঁপা নিয়ন্ত্রিত টানে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে। পুতুলের ওপর রং করলেও সেখানে অভ্রের ভাব অনুপস্থিত। গাউনের নিম্নাংশের প্রতিটি ভাঁজ স্পষ্টভাবে প্রস্ফুটিত করেছেন শিল্পী।

হাওড়ার বড় ঘুঘু বেশিয়ায় শিল্পী টুম্পা রানি পালের তৈরি রানি পুতুলের মধ্যে লালের সঙ্গে সোনালি রং ব্যবহার করা হয়েছে। পুতুলের শরীরের ধারগুলোতে এই রং ব্যবহার করার পাশাপাশি গলার মালা, কোমর বন্ধনী এবং গাউনের নিম্নাংশে এই রঙের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। শিল্পীর কথায় শুধু পুতুল তৈরি করে সংসার চলে না, তার জন্য বছরের বাকি সময়টা তিনি জরির কাজ করেন। হাওড়ার দেওয়ানতলা বাবা দেওয়ান সাহেবের মেলা বসে পয়লা মাঘ। সেই উপলক্ষে রানি পুতুল তৈরি করেন তিনি। বছরের এই একটা সময় তিনি এই পুতুলটি তৈরি করে থাকেন। হাওড়ার শিশু মনগুলো তার থেকে রানি পুতুল কেনার পাশাপাশি মাটির রান্না বাটি, পালকি কিনে থাকে। এই তিনটি উপাদান দিয়েই তারা নিজেদের খেলাঘরকে ভরিয়ে তোলে। রাজকীয় আভিজাত্য ছেড়ে রানি হয়ে ওঠেন শিশু মনের ঘরণী। বাবা দেওয়ান সাহেবের মেলা উপলক্ষে রানি পুতুল তৈরি করেন সীতাপুরের শিল্পী স্বপন পাল। যদিও চাহিদা কম থাকায় নিজের পুতুল নির্মাণের ক্ষেত্রে খুব একটা মনোযোগী নন শিল্পী।
ঝিখিরার আর যে অংশটি হাওড়া জেলার মধ্যে পড়ছে সেখানে রানি তৈরির সময় পুতুলটির চুলের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন মৃৎশিল্পী সুষমা পাল। কেশবিন্যাস এখানে আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মাঝখানে সিঁথি রেখে হালকা কৃত্রিম কোঁকড়ানো তৈরি করা হয়েছে। চুলের সামনের অংশটা চোয়াল পর্যন্ত এসে ঠেকেছে। অন্যদিকে গাওনের নিম্নাংশে সুন্দরভাবে নকশা করা হয়েছে। কোমর বন্ধনী ও গাউনের গলার লেস স্পষ্টভাবে পরিস্ফুট হয়েছে। অন্যান্য শিল্পীদের তৈরি রানি পুতুলের তুলনায় সুষমা পালের পুতুলের মধ্যে গলার গঠন চওড়া। তিনি কোনও প্রকার রং ও অভ্র ব্যবহার করেননি। শিল্পীর কথায় তাঁর তৈরি পুতুল পুকুরের জলে দু’-চার বছর ডুবিয়ে রাখলেও কিছু হবে না।

হাওড়া, দক্ষিণ ২৪ পরগনার সীমান্তবর্তী গ্রাম চকশ্রীকৃষ্ণ। এই গ্রামটি মূলত হাওড়া জেলার মধ্যেই পড়ে। সেখানকার মৃৎশিল্পী ধনঞ্জয় পাল সাড়ে চার ইঞ্চি রানি পুতুল তৈরি করে থাকেন। তাঁর তৈরি পুতুলে সিথির গঠনে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রদান করা হয়েছে। তাঁর তৈরি পুতুলের মুখের অভিব্যক্তিতে সমাহিত ভাব রয়েছে। খোপা ও কেশবিন্যাসে বিশেষভাবে অলংকরণ করা হয়েছে।
হাওড়া জেলার সীমান্ত ছাড়িয়ে তাঁর দুই প্রতিবেশী জেলাতেও রয়েছে রানি পুতুল তৈরির ঐতিহ্য। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা অঞ্চলের ৪ নম্বর বেলসিং-এর নিত্যানন্দপুর গ্রামের হরিসভা কুমোরপাড়ায় এই পুতুল তৈরি করেন নীলমণি মল্লিক, দিলীপ মল্লিক, মদন মল্লিক। তাদের তৈরি পুতুলে লাল রং এবং অভ্রের মিশ্রণ রয়েছে। মৃৎশিল্পী দিলীপ মল্লিকের কথায় অভ্রকে প্রথমে পুড়িয়ে তারপর জলে ভিজিয়ে তেঁতুল বীজের আঠা মিশিয়ে থকথকে করে নিতে হয়। এরপর সেটিকে পুতুলের গায়ে প্রলেপ দিতে হয়। নিত্যানন্দপুরের রানি পুতুলের গড়ন লম্বাটে। নিত্যানন্দপুরের পার্শ্ববর্তী গ্রাম কামারডাঙায় একই শৈলীর পুতুল তৈরি করে থাকেন কাজললতা পাল, গৌড় পাল এবং অর্চনা পাল। মৃৎশিল্পী অর্চনা পালের কথায় তাঁর বাপের বাড়ি তাঁতিবেড়িয়ায়। ফলে হাওড়ার সঙ্গে তাঁদের আত্মীয়তার সম্পর্ক। শিল্পীর কথায় এখানকার স্থানীয়রা এই পুতুলকে মেয়ে বা বউ বলে ডেকে থাকে। তালডাঙার গাজী সাহেবের মেলা উপলক্ষে এই পুতুল তৈরি করা হয়ে থাকে।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার পাশাপাশি হুগলি জেলার জাঙ্গিপাড়া বেলির মোড় পালপাড়ায় রানি পুতুল তৈরির ঐতিহ্য রয়েছে। শীতের সময় রাজবলহাটের পৌষ সংক্রান্তির আলুরদমের মেলা এবং পয়লা মাঘ মেলা উপলক্ষে রানিপুতুল তৈরি করেন কালীপদ পাল, বেচারাম পাল, রঘুনাথ পাল, লক্ষ্মী পালের মতো শিল্পীরা। অভ্র এবং লাল রঙের ব্যবহার করে থাকেন এখানকার শিল্পীরা। একজন শিশু যখন মেলা থেকে এই পুতুলটি সংগ্রহ করে, তখন এর পাশাপাশি সে মাটির তৈরি রান্নাবাটি এবং লক্ষ্মী ভাণ্ডারও কিনে থাকে বলে জানান স্থানীয় শিল্পীরা। অর্থাৎ শুধু রানি নয় তাকে ঘিরে জাগতিক গৃহস্থালির ছোট খেলনা সংস্করণও শিশু মনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে ওঠে। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল হুগলি-হাওড়া সীমান্তে জাঙ্গিপাড়া অবস্থিত।
এখন সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে যে, রানি পুতুলের মধ্যে থাকা রানি আসলে কে? বাংলার মাটির পুতুল গ্রন্থে গবেষক বিধান বিশ্বাস দেখিয়েছেন যে পুতুলটির গরন, বেশভূষা, মাথার চুলের গঠন দেখে পূর্বের পুতুল সংগ্রাহক এবং আলোচকেরা এই পুতুলের নাম দিয়েছিলেন রানি পুতুল। মহারানী ভিক্টোরিয়া যখন ভারতের শাসনভার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি থেকে নিজের হাতে তুলে নেন, তখন থেকে তার সম্মানার্থে এই পুতুল তৈরি হয়ে থাকে। বাংলার সংস্কৃতিতে পুতুল ও খেলনা গ্রন্থে গবেষিকা ড. সোমা মুখোপাধ্যায় একই কথা বলেছেন। ২০১৭ সালের ২১ মার্চ ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় গবেষক দেবদত্ত গুপ্ত রানি পুতুল নিয়ে একটি প্রতিবেদন লেখেন। সেখানেও মহারানি ভিক্টোরিয়ার সাথে রানি পুতুলের গঠনের মিলের কথা তিনি তুলে ধরেন। ‘পশ্চিমবঙ্গের লোকশিল্প ও শিল্পীসমাজ’ গ্রন্থে তারাপদ সাঁতরা রানি পুতুলকে ‘কুমোরে পুতুল’ বলে অভিহিত করেছেন। রানি পুতুল যেহেতু কুম্ভকার সম্প্রদায়ের দ্বারাই তৈরি হয়ে থাকে, অর্থাৎ কুমোরপাড়াতে বেশি পাওয়া যায়। তাই একে ‘কুমোরে পুতুল’ বলে তিনি অভিহিত করেছেন। ২০২২ সালে হাওড়া জেলার বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী তপন কর প্রতিবেদককে রানি পুতুল সম্পর্কে জানিয়েছিলেন যে, পুতুলটির নির্মাণের মধ্যে ইংরেজ মহিলাদের প্রভাব রয়েছে। তপনবাবু নিজেও রানি পুতুল তৈরি করতেন। তাঁর বাড়ি কুলগাছিয়ার আর্ট গ্যালারি ছাড়াও বাগনানের দেওয়ানতলাতে পোড়ামাটির মূর্তি ও পুতুলের একটি গ্যালারি তৈরি করেছিলেন। সেখানে শোভা পেত তার তৈরি রানি পুতুল। তপনবাবুর প্রয়াণের পর তার ছাত্রী সবিতা মান্না এই শিল্পধারাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।

অন্যদিকে একদল গবেষকের মতে, ইংরেজরা ভারতে আসার অনেক আগে থেকেই এই পুতুল তৈরি প্রচলন লোকশিল্পে দেখা যায়। তাম্রপ্রস্তর যুগ থেকে দুই খোল ছাঁচের পুতুল তৈরির প্রচলন এদেশে রয়েছে। আবার এ-ও মনে করা হয়, পুতুলটিতে যে রানি রং ব্যবহার করা হয় সেই জন্যে এই পুতুলের সঙ্গে মিশে গিয়েছে ‘রানি’ কথাটি।
শিল্প ইতিহাসবিদ ও কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী-অধ্যাপিকা মৌমিতা রায় জানিয়েছেন,
‘হাওড়া জেলার পাশাপাশি দক্ষিণবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী পুতুল হচ্ছে রানি পুতুল। হাওড়া জেলার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি জেলাতেও এই পুতুল তৈরি হয়ে থাকে। রানি কথাটার অনেকগুলো ব্যাখ্যা রয়েছে। স্বাধীনতার আগে তৎকালীন জমিদার গিন্নি, যিনি স্বামীর প্রয়াণের পরে নিজে জমিদারি চালাচ্ছেন, তাকেও রানি মা বলা হত। অন্যদিকে ভিক্টোরিয়ান যুগ কলকাতাতে শুরু হচ্ছে ১৮৫৮ সালের পয়লা নভেম্বর। গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্ট-এর মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি থেকে মহারানি ভিক্টোরিয়ার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়। ১৮৫৭ মহাবিদ্রোহের ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি থেকে সরাসরি ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশের শাসনভার ব্রিটিশরা নিজেদের হাতে তুলে নেয়। ১৮৩৭ থেকে ১৯০১ পর্যন্ত সময়কালকে ভিক্টোরিও যুগ বলা হয়ে থাকে। এই সময় ইংরেজ মেয়েদের একটা নির্দিষ্ট hair style বা কেশবিন্যাসের শৈলী ছিল। এই hair style-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মেয়েদের লম্বা চুল থাকবে। চুলের পেছনে খোপা বা bun বাধা থাকত। কপালের পাশে loose curls থাকত। সিঁথিটা একেবারে মাঝামাঝি রেখে দু’দিকে চুল সমানভাবে রাখা হত। চুলগুলোতে কৃত্রিমভাবে একাধিক coil করা হত। আবার কিছু চুলের কেশবিন্যাসে plates দেখা যায়। কপালের দুই পাশ দিয়ে এই কৃত্রিম plates তৈরি করা হত। এই ধারা খুবই প্রচলিত ছিল। আবার কপালের পাশ দিয়ে ছোট বিনুনি করে চুল বাধার প্রচলন ছিল। curls, ringlets, updose with falling curls গুলো হালকা ভাব তৈরি করত। মাথার পেছনের যে খোঁপাটি সেটিকে chignons বলা হয়ে থাকে। লোকপুতুল এমন ঘরানার পুতুল যা যুগের পর যুগ ধরে দেশীয় মানুষের সংস্কৃতির অন্তর্গত। রানি পুতুল আদতে লোক পুতুল। হাওড়া জেলার রানি পুতুলে কিছু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে যে, কপালের পাশে এই ভিক্টোরিও যুগের মতো breds বা curls বা plates শৈলী ব্যবহার করে চুল বাঁধা হয়েছে। এই ধরনের চুলের শৈলীকে abdous বলা হয়ে থাকে। লোক পুতুলের উৎস নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। হতে পারে রানি নামক পুতুলটি ভিক্টোরিয়া যুগের আগে থেকেই তৈরি হয়ে আসছে। ভিক্টোরিও যুগে এসে এই পাশ্চাত্য ধারার কিছু অংশ লোক পুতুলের মধ্যে সংযোজিত হয়েছে। সেই সময়ের শিল্পীরা ভিক্টোরিও যুগের এই শিল্পভাবনা অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের পুতুল শৈলীতে তার কয়েকটি ধারা সংযোজিত করেছে। ভিক্টোরিয়া যুগে যে সকল ইংরেজ মহিলারা ভারতে থাকতেন তাদের চুলের যে বিন্যাস সেটাই হাওড়া জেলার রানি পুতুলে প্রত্যক্ষভাবে ফুটে উঠেছে। রানি ভিক্টোরিয়া সেই সময় খুব বড় একটা নাম। তার মহিমা লোকমুখে ছড়িয়ে পড়েছিল। এদেশে বসবাসকারী ইংরেজ মহিলাদের কেশবিন্যাস দেখে মৃৎশিল্পীরা নিজেদের তৎকালীন দেশীয় পুতুলের মধ্যে রানির ভাবকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। বাংলার দেশীয় ধারার পুতুলের মধ্যে ভিক্টোরিও শৈলী সংমিশ্রণ হয়েছে রানি পুতুলের মধ্যে দিয়ে। রানি পুতুলের হাতের গঠন এবং দাঁড়ানোর ভঙ্গিমার মধ্যে দেশীয় ভাব রয়েছে। কিন্তু যখনই চুল ও মুখের অভিব্যক্তি প্রসঙ্গ উঠছে তখন তার মধ্যে ভিক্টোরিও শৈলী লক্ষ করা যাচ্ছে। আর এই পরিবর্তনের জন্যই রানি পুতুলের জনপ্রিয়তা এতটা বেশি। রানির গাউন ও তার মধ্যে লেসের ব্যবহার ভিক্টোরিও যুগের দিকে ইঙ্গিত করে। লোক পুতুলের সামাজিক কিংবদন্তি ও বিভিন্ন সামাজিক ঘটনা প্রভাব থেকে যায়। রানি পুতুল তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।’

দক্ষিণ ২৪ পরগনার চম্পাহাটি জাফরপুরের কুমোরপাড়ায় মন্দাকিনী নামে একটি পুতুল তৈরি প্রচলন রয়েছে। উক্ত পুতুলটিকেও জনপ্রিয়ভাবে ‘রানি পুতুল’ বলেই ডাকা হয়ে থাকে। এই প্রসঙ্গে আঞ্চলিক লোকসংস্কৃতি গবেষক সায়ন রায় জানিয়েছেন, ‘অনুমান করা যায় দক্ষিণ গড়িয়া অঞ্চলের বন্দোপাধ্যায় জমিদার বাড়ির কোনো নারীর নামে এই পুতুলটির নামকরণ করা হয়েছিল। মন্দাকিনী ওই পরিবারের পুত্রবধূও হতে পারে আবার কন্যাও হতে পারে। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকেই এই পুতুল তৈরীর প্রচলন ওই অঞ্চলে অর্থাৎ জাফরপুরে হয়ে আসছে। হটোর গ্রামের আঞ্চলিক পুতুল গবেষক পরিমল চক্রবর্তী লেখায় প্রথমবারের জন্য মন্দাকিনী পুতুলের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই পুতুলকে তিনি রানি পুতুলের এক ধরনের প্রকার হিসেবেই অভিহিত করেছিলেন। তার লেখায় পদ্মরানি বলে এক ধরনের পুতুলের পরিচয় আমরা পাই। মন্দাকিনী পুতুলের ক্ষেত্রে যেটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তা হলো পুতুলটির হাত পূর্ণাঙ্গভাবে রয়েছে। হাওড়া জেলার রানি পুতুলের মতো সেটি বিমূর্ত নয়। পায়ের গঠন স্পষ্ট ভাবে বোঝা যাচ্ছে। হাতের মধ্যে দলিল জাতীয় কাগজও স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। এর থেকে ধারণা করা যেতে পারে মন্দাকিনী জমিদারের স্ত্রী। জমিদারিত্ব চালানোর জন্য তিনি আইনি দলিল হাতে তুলে নিয়েছেন।’
উল্লেখ করা যেতে পারে রানি পুতুলের মধ্যে আজও গ্রামীণ হাওড়া ও তার পার্শ্ববর্তী জেলার প্রান্তিক শিশুরা নিজের শৈশবের আনন্দকে খুঁজে পায়। এই পুতুলের গঠন ও বিন্যাসের মধ্যে নারীর রাজকীয় স্বতন্ত্র অস্তিত্ব প্রত্যয়ভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আবার সে একইভাবে যুগের পর যুগ ধরে বাংলার পুতুলের ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করে চলেছে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved