
১৯৬৩ সালে পার্থপ্রতিম চৌধুরী পরিচালিত ‘ছায়াসূর্য’ ছবিতে শর্মিলা ঠাকুর অভিনীত চরিত্রটির আঁকার হাত ছিল বেশ। একটি ছুটন্ত মহিষের ছবি এঁকে সে পরিবারের সকলকে তাক লাগিয়ে দেয়! যদিও সে ছবি আদতে ছিল নারায়ণ দেবনাথের আঁকা। এরপর ১৯৬৪ সালে রাজেন তরফদারের ছবি ‘জীবন কাহিনী’তেও নামলিপি অঙ্কন করেন শ্রী দেবনাথ। ইনসিওরেন্সের এজেন্ট-রূপী বিকাশ রায় পাওনাদার আর কাবুলিওয়ালার তাগাদা এড়াতে পালাচ্ছেন, পর্দায় ফুটে উঠছে ‘পরিচয়পত্র: নারায়ণ দেবনাথ’। সম্ভবত এটাই ছায়াছবির জগতে শেষ ‘নারায়ণী’ নামলিপি। পরবর্তী সময়ে তরুণ মজুমদার পরিচালিত ‘বালিকা বধূ’ (১৯৬৭) ছায়াছবির বুকলেটে উল্লিখিত হয়েছিল শিল্পীর নাম।
ফ্ল্যাশব্যাক। কলকাতা বইমেলা। ২০১৭। দুপুর তখন বিকেল হব হব, মাঠে তেমন ভিড় নেই। অল্প ধুলো উড়িয়ে হাতেগোনা কয়েকজন এগিয়ে নিয়ে চলেছেন একটি হুইলচেয়ার। তাতে বসে আছেন দুধসাদা পাজামা-পাঞ্জাবি ও গমরঙা শাল গায়ে একজন প্রবীণ ব্যক্তি। আগ্রহভরা দু’চোখে তিনি চেয়ে দেখছেন মেলার চারদিক। এমন সময় কাছাকাছি একটি বইয়ের স্টল থেকে সদ্য বেরিয়েছেন সাহিত্যিক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। হুইলচেয়ারে বসা মানুষটির দিকে চোখ পড়তেই সাহিত্যিকের মুখে ফুটে উঠল উজ্জ্বল হাসি। তিনি এগিয়ে এলেন দ্রুত পায়ে। এসে সটান প্রবীণ মানুষটির হাতদু’টি শক্ত করে ধরে, ‘নারায়ণদা, কেমন আছেন? ওহ্, কতদিন পর দেখা, কী ভালোই যে লাগছে!’ শিল্পীর মুখেও ছড়িয়ে পড়ল আশ্চর্য স্নিগ্ধ হাসি। কুশল বিনিময়ের মধ্যেই সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় সোৎসাহে বলে ওঠেন, ‘ওহ্! নারায়ণদা আপনি ১০০ বছর বাঁচুন। আপনার তুলনা নেই। আমরা আজও আপনার নন্টে-ফন্টে, হাঁদা-ভোঁদায় বিভোর হয়ে আছি।’ ততক্ষণে চারপাশে ছোটখাটো ভিড় জমে গিয়েছে। নারায়ণ দেবনাথকে চিনতে পেরে কচিকাঁচার দল বই সই করাতে জমে গেল। লেখক-শিল্পীর এমন যুগলবন্দির দৃশ্যটি ক্যামেরায় ধরে রাখার সুযোগ হয়েছিল প্রতিবেদকের। ছবিটি ছাপা হয়েছিল ঠিক তার পরের দিন, বাংলার প্রথম সারির একটি দৈনিক সংবাদপত্রে। এরপর পেরিয়ে গিয়েছে আট বছরেরও বেশি সময়। ভাবতে অবাক লাগে শুধু সেই দিনটিই নয়, শিল্পীর জীবনের শেষ দশটি বছরে ঘটে যাওয়া বহু উজ্জ্বল মুহূর্ত, বহু বিরল ঘটনা চাক্ষুষ দেখার সৌভাগ্য হয়েছে অধমের। কাজেই আজ তাঁর সামগ্রিক শিল্পভুবন নিয়ে দু’-চার কথা বলতে গিয়ে ব্যক্তিগত কথা হয়তো অনিচ্ছাকৃত ভাবেও চলে আসবে দু’-একবার। পাঠকদের কাছে অগ্রিম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি।

জেঠু, অর্থাৎ নারায়ণ দেবনাথ শিবপুর মন্দিরতলার আজন্ম নিবাসী। বাবা হেমচন্দ্র দেবনাথের ছিল সোনার দোকান, বাড়ির অদূরেই ছিল তাঁদের কারখানা। কাকা আঁকতেন সোনার গয়নার নকশা। ছোট্ট ‘নারান’ মাঝেমধ্যেই কাকার হাতের কাজ দেখতে সেখানে হাজির হয়ে যেতেন। কিন্তু কেবল নকশা, বা ফুল-লতাপাতার ডিজাইন আঁকায় তাঁর তেমন আগ্রহ হত না। বরং কোথাও ভালো ছবি দেখলেই সুযোগ মতো অবিকল কপি করতেন। তাঁর এই গুণ নজর এড়াল না অনেকেরই। ফলে, হাওড়ার বি.কে.পাল ইনস্টিটিউশন থেকে স্কুলজীবন শেষ করেই সরাসরি একটি বেসরকারি আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়া। পরবর্তী সময়ে যদিও সে প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়ে যায় গভর্মেন্ট আর্ট কলেজের সঙ্গে। কিন্তু বিধি বাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দরুণ আর্ট কলেজের পাঠ অসমাপ্ত থেকে যায় শিল্পীর। শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। কর্মজীবন। প্রথম জীবনে স্থানীয় দোকানের সাইনবোর্ড, আলতা এবং অন্যান্য প্রসাধনী দ্রব্যের বিজ্ঞাপন, এমনকী সিনেমা স্লাইডও এঁকেছেন। কিন্তু এতে করে তাঁর মন ভরছিল না। তিনি তখন অলংকরণ-শিল্পী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। আদর্শ মনে করেন সে সময়ের নামজাদা শিল্পী প্রতুলচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তীকে। সুযোগও এসে গেল একদিন অপ্রত্যাশিত ভাবে। মহাকবি কালিদাসের লেখার বঙ্গানুবাদ করে ‘ত্রিবেণী’ নাম দিয়ে প্রকাশ করেন অমূল্য গঙ্গোপাধ্যায় নামে জনৈক ব্যক্তি। বইটির প্রচ্ছদ এবং অলংকরণ করেন নারায়ণ দেবনাথ। এইটিই তাঁর করা গ্রন্থচিত্রণের প্রথম কাজ।

চারের দশকের একেবারে শেষদিকে দেব সাহিত্য কুটীরে ইলাস্ট্রেটর হিসেবে যোগ দেন শিল্পী। প্রচ্ছদের পাশাপাশি দেব সাহিত্য কুটীর থেকে প্রকাশিত বিবিধ পূজাবার্ষিকীর জন্য পাদপূরণ ছবি, কার্টুন, ছবির ধাঁধা ইত্যাদি করতে থাকেন। ১৯৪৮-এ দেব সাহিত্য কুটীর ছোটদের জন্য ‘শুকতারা’ নামে একটি নতুন পত্রিকা চালু করে। প্রখ্যাত লেখক-লেখিকাদের গল্পের সঙ্গে নারায়ণ দেবনাথের আঁকা শীর্ষচিত্র (বা হেডপিস) এবং অলংকরণ অচিরেই বিপুল জনপ্রিয়তা পায় ছোটদের কাছে।


ক্রমেই আরও স্বকীয়তা এল শিল্পীর আঁকায়। কালিকলমে জন্তু জানোয়ারের ছবি, মজার ছবি, অ্যাকশন-দৃশ্যের ছবি সব যেন জ্যান্ত হয়ে উঠল। স্টাইলাইজড ড্রয়িংয়ের পরিবর্তে রিয়্যালিস্টিক ছবিই তাঁর মোহরছাপ। সেসময় ছবি ছাপা হত ব্লকে। ক্রস-হ্যাচিং, ইংকের জমাট কালো প্যাচ এবং জোরালো লাইন-ড্রয়িং-এর পরিপাটি ছবি অচিরেই হয়ে উঠল তাঁর ইলাস্ট্রেশনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাড়তি আর্কষণ ছিল তাঁর চমৎকার লেটারিং। তুলির টানের ছবির সঙ্গে সরু নিবে আঁকা মানানসই নামাঙ্কন অন্য মাত্রা যোগ করত গল্পের হেডপিসে। এক ধরনের ছবিতে আটকে যাননি, দু’হাত ভরে বিভিন্ন স্টাইলে ছবি এঁকেছেন। কখনও তাতে দেশজ ছাঁদ, কখনও লিনোকাট, আবার কখনও আলোছায়ার ব্যবহার একেবারে ইউরোপীয় ঘরানার মেজাজে। বিভিন্ন সিনেম্যাটিক অ্যাঙ্গেলের ব্যবহার, পৌরাণিক গল্পে গুহাচিত্রের আদল, ঐতিহাসিক কাহিনিতে পোশাক-পরিচ্ছদ, অস্ত্র ইত্যাদির ডিটেলস বজায় রাখার মতো বিরল ক্ষমতা তাঁকে অচিরেই পৌঁছে দিয়েছিল প্রথম সারিতে। ‘পাঞ্জাব কেশরী’, ‘বৈজু বাওরা’, ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু’, ‘বাঘকে দেব চরণধূলো’, ‘যার হাতে যা মানায়’, ‘হর্ষবর্ধণের সরস্বতী দায়’, ‘ভালাইথোড়ুর সন্ন্যাসী বাঘ’, ‘কবন্ধ-বিগ্রহের কাহিনী’, ‘মুখ দেখে কি মানুষ চেনে?’ এমন অজস্র গল্পের শীর্ষচিত্র আজও মুগ্ধ করে পাঠকদের।

ইউরোপীয় ইলাস্ট্রেটরদের প্রভাব অবলীলায় মিলিয়ে দিয়েছিলেন নিজের কাজে। বিমলচন্দ্র ঘোষ সৃষ্ট ‘শিম্পু’ সিরিজের ছবিতে ব্রিটিশ ইলাস্ট্রেটর লসন উডের প্রভাব ছিল পুরোমাত্রায়, অন্যদিকে জমাট কালোর পাশাপাশি তাঁর ক্রস হ্যাচিংয়ের কাজ ভীষণভাবে মনে করাত মার্কিনি শিল্পীদ্বয় অ্যালেক্স রেমন্ড এবং জন প্রেন্টিসকে। ভাবলে অবাক লাগে সেই একই মানুষ যখন স্বপনকুমারের রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজের উজ্জ্বল মলাট আঁকছেন তখন তাতে আগাগোড়া পাল্প বইয়ের রঙচঙে ধাঁচ!

সুদীর্ঘ কর্মজীবনের একটা পর্যায়ে নারায়ণ দেবনাথ চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। সময়টা পাঁচের দশকের শেষদিক, তখনই তিনি ইলাস্ট্রেটর এবং অক্ষরশিল্পী হিসেবে বেশ পরিচিত। এই সময়ে আত্মীয় বাণী দত্তের দৌলতে নারায়ণবাবুর সংযোগ হয় টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়ার সঙ্গে। প্রখ্যাত পরিচালক অসিত সেন তাঁকে দায়িত্ব দেন ছায়াছবির টাইটেল কার্ড বা পরিচয়লিপি আঁকার। সে ফিল্ম নিশ্চিতভাবে এখানে উপস্থিত অনেকেই দেখে থাকবেন। উত্তম-সুচিত্রা জুটির চিরন্তন ছবি, ‘জীবন তৃষ্ণা’ (১৯৫৭)! বলাবাহুল্য অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেই নামলিপি সাজিয়েছিলেন জেঠু, সেসময় প্রযুক্তি এত উন্নত ছিল না। ভিএফএক্স বা বিভিন্ন টাইপফেস, টেমপ্লেট ইত্যাদি ব্যবহার করে আজ যেখানে অনেক সহজেই বানিয়ে নেওয়া যায় ফিল্ম ক্রেডিটস্, সে যুগের পেশাদার শিল্পীরা তা করতেন সম্পূর্ণ হাতে এঁকে! রামচন্দ্র সিন্ডে, দিগেন স্টুডিও– এই নামগুলি সে আমলে নামাঙ্কনের ক্ষেত্রে ছিল অতি পরিচিত। এদের পাশাপাশি স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল ছিলেন নারায়ণ দেবনাথ। ১৯৬৩ সালে পার্থপ্রতিম চৌধুরী পরিচালিত ‘ছায়াসূর্য’ ছবিতে শর্মিলা ঠাকুর অভিনীত চরিত্রটির আঁকার হাত ছিল বেশ। একটি ছুটন্ত মহিষের ছবি এঁকে সে পরিবারের সকলকে তাক লাগিয়ে দেয়! যদিও সে ছবি আদতে ছিল নারায়ণ দেবনাথের আঁকা। এরপর ১৯৬৪ সালে রাজেন তরফদারের ছবি ‘জীবন কাহিনী’তেও নামলিপি অঙ্কন করেন শ্রী দেবনাথ। ইনসিওরেন্সের এজেন্ট-রূপী বিকাশ রায় পাওনাদার আর কাবুলিওয়ালার তাগাদা এড়াতে পালাচ্ছেন, পর্দায় ফুটে উঠছে ‘পরিচয়পত্র: নারায়ণ দেবনাথ’। সম্ভবত এটাই ছায়াছবির জগতে শেষ ‘নারায়ণী’ নামলিপি। পরবর্তী সময়ে তরুণ মজুমদার পরিচালিত ‘বালিকা বধূ’ (১৯৬৭) ছায়াছবির বুকলেটে উল্লিখিত হয়েছিল শিল্পীর নাম। কারণ তাঁর কন্যা, নমিতা দেবনাথ (মজুমদার) অভিনয় করেছিলেন সে ছবিতে। আশ্চর্যের বিষয়, নিজের করা এইসব মূল্যবান কাজের কথা কার্যত বিস্মৃত হয়েছিলেন শিল্পী। ২০১৩ সালে তাঁর বাড়ি গিয়ে সেইসব কাজের নমুনা মনে করানোর সৌভাগ্য হয়েছিল। নিজের পুরোনো কাজগুলি দেখে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল জেঠুর মুখচোখ। অধমের ভাগ্যে জুটেছিল জেঠুর স্বহস্তে লেখা শংসাপত্র।





বিদেশী-সাহিত্যের অনুবাদ বইয়ে তাঁর আঁকা মলাট ছিল তাকিয়ে থাকার মতো। ছবি আঁকা এবং সেই সংক্রান্ত রিসার্চ ওয়ার্কে রীতিমতো পরিশ্রম করতেন। আজকের দিনে ইন্টারনেটের সুবিধে সেসময় ছিল কল্পনারও অতীত। ‘বেন হুর’ বা ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’, ‘আঙ্কল টমস্ কেবিন’ বা ‘কোরাল আইল্যান্ড’-এর মতো জনপ্রিয় বিদেশি অনুবাদ সাহিত্যের প্রচ্ছদ-অলংকরণের ক্ষেত্রে পরিবেশ, পোশাক ও আবহ যথাযথভাবে বুঝতে জেঠু নিয়মিত ধর্মতলা চত্বরে এসে হলিউডি ছবি দেখতেন। ফিল্ম দেখে বাড়ি ফিরে মন থেকে আঁকতেন অজস্র থাম্বনেইল স্কেচ। বাড়ির উল্টোদিকেই শিবপুর লাইব্রেরি। রেফারেন্সের সন্ধানে মাঝেমধ্যেই হানা দিতেন সেখানেও। সঠিক অ্যানাটমি, সঠিক পরিচ্ছদ, পাকাপোক্ত কম্পোজিশন এবং দক্ষ তুলির টানে সেজে উঠত একেকটি মলাট। আজও তার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে তাঁর আঁকা ‘দৈত্যের কেটলি’, ‘ভূত পেত্নী রাজা রাণী’, ‘দুষ্ট দানব’, ‘চম্বলের দস্যুসর্দার’, ‘বাঘ শিয়ালের মেলা’ প্রভৃতি বইয়ের প্রচ্ছদ।


কিন্তু দুঃখের বিষয় ইলাস্ট্রেশনে পরিপূর্ণ মনোনিবেশ তিনি খুব বেশিদিন করতে পারেননি। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষের আবহে কবি-সাহিত্যিক বিমল ঘোষের (মৌমাছি) আহ্বানে, তাঁরই চিত্রনাট্যে রবীন্দ্র-জীবন নির্ভর প্রথম চিত্রকাহিনী ‘রবি ছবি’ আঁকতে শুরু করেন আনন্দবাজার পত্রিকার ‘আনন্দমেলা’ ক্রোড়পত্রে। সেটি জনপ্রিয় হওয়ায় স্বামী বিবেকানন্দের শতবর্ষে আনন্দবাজার পত্রিকা এবং শুকতারায় ছবিতে ‘বিবেকানন্দ-জীবনী’ এঁকে অভাবনীয় সাফল্য পান। এই সময়েই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ অবলম্বনে কমিক্স আঁকেন নবকল্লোলের পাতায়। ‘শুকতারা’ পত্রিকার দফতরে খুদে-পাঠকদের চিঠি থেকেও অচিরেই বোঝা গেল যে, তারাও আরও বেশি করে ‘ছবিতে গল্প’ বা ‘কমিক্স’ পড়তে আগ্রহী। ফলে নারায়ণবাবুর উপর ফের দায়িত্ব বর্তাল। এর আগে প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বোলতা’ ছদ্মনামে কিছুদিন ‘বোম্বেটে আর ডানপিটে’ নামক একটি কমিক্স করেছিলেন। প্রাথমিকভাবে সেটিকেই এগিয়ে নিয়ে যেতে মনস্থ করে কয়েকটি কমিক্স আঁকেন নারায়ণ দেবনাথ। ১৯৬২ সালে সেই চরিত্রেরা তাঁরই কল্পনায় ভর করে নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করে হাঁদারাম পাকড়াশী এবং ভোঁদারাম গড়গড়ি, ওরফে ‘হাঁদা’ এবং ‘ভোঁদা’ রূপে। সঙ্গে তাঁদের পিসেমশাই বেচারাম বক্সী। বছর খানেকের মধ্যেই দাবি উঠল নতুন কমিক্স চরিত্রের। ১৯৬৫ সালে শুকতারার পাতাতেই আবির্ভাব হল ‘বাঁটুল দি গ্রেট’-এর। বাঙালি পাঠক প্রথমেই এই মহাশক্তিমান তরুণকে সাদরে আপ্যায়ন করতে পারেনি। ১৯৬৫ তে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের আবহে শুকতারার তৎকালীন সম্পাদক ক্ষীরোদচন্দ্র মজুমদারের আগ্রহে নারায়ণবাবু বাঁটুলকে সরাসরি যুদ্ধে পাঠিয়ে দিলেন। বাঁটুল সেখানে খান-সেনাদের ট্যাঙ্ক ভেঙে, ল্যাসো দিয়ে যুদ্ধবিমান টেনে নামিয়ে একেবারে তুলকালাম কাণ্ড বাঁধিয়ে ছাড়ল। ছোটদের কাছে বাঁটুলের জনপ্রিয়তাও বেড়ে গেল এক লাফে। দেব সাহিত্য কুটীরের পারিবারিক সদস্য এবং সংস্থার একজন অংশীদার সেই সময়ে বিদেশে বসবাস করতেন। তিনি কলকাতায় এলে বাড়ির কিশোর-কিশোরীদের জন্য বিদেশ থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন কমিক্স সংকলন নিয়মিত নিয়ে আসতেন। সেগুলি শুকতারা দপ্তরেও চলে আসত হামেশাই। শিল্পী নারায়ণ দেবনাথ তৎকালীন কমিক্স (বিশেষত ফানিজ) এর চেহারা-চরিত্র সম্বন্ধে অবহিত থাকতে এগুলি পড়তেন, দেখতেন, এবং সর্বোপরি আত্মস্থ করতেন অসীম মনোযোগ দিয়ে।

মনে রাখতে হবে, বিদেশে কমিক্স আগাগোড়া একটি ইন্ডাস্ট্রি। সেখানে একদল লোক একযোগে বিভিন্ন ধাপে কাজটিকে ভাগ করে নিয়ে পরিপূর্ণ একটি শিল্পনির্মাণ করেন। একদল শিল্পী পেন্সিলে রাফ ড্রয়িং করেন, একদল দেখেন ইংকিং-এর কাজ, আবার কেউ লেখেন স্পিচ-বাবলের সংলাপ, অন্যদিকে একদল করেন বর্ণ-বিন্যাস। নারায়ণ দেবনাথ সেখানে একা হাতে সামলাতেন প্রাথমিক খসড়া, পেনসিল থেকে কালিতে ছবি আঁকা, স্পিচ-বাবলের প্রতিটি সংলাপ সুদৃশ হস্তাক্ষরে লেখা থেকে শুরু করে প্রয়োজন মতো প্যানেলে রং করার কাজও!

একা হাতে ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সাদাকালো কমিক্স ছাড়াও, নিয়মিতভাবে চার রঙা কমিক্স তিনি দু’টি করতেন: ‘গোয়েন্দা কৌশিক’ এবং ‘বাহাদুর বেড়াল’। এই দু’টি চরিত্রকেই তিনি ধারাবাহিকভাবে এঁকে গিয়েছেন যথাক্রমে ২০১৬ এবং ২০১৭ পর্যন্ত।

কাজেই কমিক্স প্রায় সর্বক্ষণের কাজে পরিণত হল তাঁর জন্য। চরিত্ররাও বেড়ে চলল সমানে। ‘কিশোর ভারতী’ পত্রিকার আত্মপ্রকাশ হওয়ার সমসময়েই তিনি তৈরি করলেন আরেক চরিত্র ‘পটলচাঁদ দ্য ম্যাজিশিয়ান’। কিন্তু চরিত্রটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পরিবর্তে কতকটা হাঁদা-ভোঁদার ধাঁচেই তিনি আঁকলেন আরও দুই কিশোর– ‘নন্টে আর ফন্টের নানান কীর্তি’। এই কমিক্স সৃষ্টির নেপথ্যে জোরালো অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল নারায়ণবাবুর নিজেরই আঁকা প্রচ্ছদ এবং অলংকরণ সম্বলিত একটি বই। মনোরঞ্জন ঘোষের লেখা ‘পরিবর্তন’ নামক এই বইটির চরিত্র ও একাধিক ঘটনা, যেমন– বোর্ডিং স্কুল, সুপারিনটেনডেন্ট স্যার ইত্যাদি ফিরে ফিরে এসেছে কমিক্সে। নারায়ণবাবুর সবক’টি মজার কমিকসের ক্ষেত্রেই অঙ্কনশৈলী এবং ইংকিং-এ প্রবল প্রভাব দেখা গিয়েছিল ব্রিটিশ শিল্পী রবার্ট নিক্সন এবং কেন রিড-এর। কারণ সেই সময় রেফারেন্স হিসেবে শিল্পী প্রায়শই দেখতেন ‘ড্যান্ডি’, ‘বিনো’, বা ‘ফানি পেজেসের’ মত বিদেশি কমিক্স সংকলন। ব্রিটিশ ইলাস্ট্রেটরদের কাজ নিয়মিত দেখা এবং অনুশীলন করতে থাকার দরুণ তাঁর আঁকায় ক্রমেই একটা ঝকঝকে স্মার্টনেস চলে আসছিল ছয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকেই। সম্পাদকীয় বিভাগের নির্দেশ মেনে কিছু কিছু প্যানেলে ও গল্পে সরাসরি প্রভাব বোঝা গেলেও স্বীয় দক্ষতায় এবং সংলাপ রচনার গুণে নারায়ণ দেবনাথ তাঁর চরিত্রগুলিকে খাঁটি বাঙালি মেজাজ ও চেহারায় হাজির করতে পেরেছিলেন। বাঁটুলের কীর্তিকলাপ ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ড্যান্ডি-সংকলনের নিয়মিত চরিত্র ‘ডেসপারেট ড্যান’-এর সাদৃশ্য উল্লেখযোগ্য। কিন্তু যতই বাঁটুল ব্যাঙ্কের পাশে গির্জাঘরের ঘড়ি দেখে সময় মেলাক, বা রোড-রোলারের মতো বেঢপ বাইক চালিয়ে দাঁতের ডাক্তারের কাছে যাক; আমাদের তা এতটুকুও বেমানান লাগে না, কারণ কমিক্সটি সার্বিক প্রসাদগুণ ও উপস্থাপনার পারিপাট্যে এককথায় চমৎকার।

উপস্থাপনের শৈলী বা ঘরানা বিদেশি হওয়া সত্ত্বেও, তাতে প্রয়োজনীয় এবং সূক্ষ্ম রদবদল ঘটিয়ে শিল্পী সামগ্রিক আবহটিকে পুরোমাত্রায় ভারতীয় এবং বাঙালি করে তুলতে পেরেছিলেন। তাঁর সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল এইটিই। ‘উইঙ্কার ওয়াটসনের’ বিভিন্ন কীর্তিকলাপ ‘নন্টে ফন্টে’-র বিভিন্ন অঘটনে ছায়া ফেললেও, ‘ছানার বড়া এমন সাংঘাতিক কড়া’ জাতীয় সংলাপ, ‘গ্লুচ, ইরক’ জাতীয় আশ্চর্য শব্দবন্ধ, রাঁধুনি ঠাকুরের দেহাতি সংলাপ থেকে শুরু করে সাধু ভাষায় কথা বলা ‘বালখিল্য মুনি’ এমনকী ডিস্কোগানে নাচতে থাকা কেল্টুকুমারের অবিশ্বাস্য সহাবস্থান, একে অন্য স্তরে নিয়ে গিয়েছিল। বাঙালির রকে বসে আড্ডা বা ‘গুলতানি সংস্কৃতি’-র সার চুম্বক ধরা আছে তাঁর প্রতিটি ফানিজের স্পিচ বাবল-এ। ঠিক যেমন বাহাদুর বেড়ালের মূল অনুপ্রেরণা ‘কর্কি দ্য ক্যাট’ হলেও চেহারায় এবং অবয়বে বাহাদুরের নিজস্বতা ছিল এক্কেবারে খাঁটি বাঙালি হুলো বেড়ালের।

নন্টে ফন্টে, বাঁটুল এবং হাঁদা ভোঁদা, বাহাদুর বেড়াল ও গোয়েন্দা কৌশিকদের প্রতি মাসে হাজির করার দায় থেকে সাতের দশকের শেষ থেকেই অলংকরণের সংখ্যা কমতে লাগল শিল্পীর। ধারাবাহিকভাবে একা হাতে কখনও চার-পাঁচটি পত্রিকার কাজও সামলেছেন। ২০০০ সালের পর ‘বুদ্ধিমান কুকুর’ (‘পত্রপাঠ’ কাগজের জন্য) নামক একটি নতুন চরিত্র সৃষ্টি করে তাকেও এঁকেছেন বেশ কিছুদিন। এছাড়া অনিয়মিতভাবে এঁকেছেন ‘শুঁটকি ও মুটকি’ (শুকতারা, ১৯৬৪)। হাঁদা-ভোঁদার মতোই এরা দুষ্টুমিতে দড় দুই কিশোরী। মেয়েমহলের আপত্তিতে কমিক্সটি বন্ধ হয়ে যায়। দুর্ভাগ্য আমাদেরই। নারায়ণ দেবনাথ কিন্তু থেমে থাকেননি। ‘ছোটদের আসর’ কাগজে ১৯৮৩-৮৪ জুড়ে আঁকেন ‘ডানপিটে খাঁদু আর কেমিক্যাল দাদু’-র কমিক্স (এর অনুপ্রেরণা এসেছিল ‘বার্টি বাঙ্কল অ্যান্ড হিজ কেমিক্যাল আঙ্কল’ থেকে), এবং ‘কিশোরমন’ পত্রিকার জন্য তৈরি করেন ‘পেটুক মাস্টার বটুকলাল’ নামক এক মজাদার চরিত্র। জীবিকা নির্বাহের জন্য এইসব বিবিধ ফানিজ কখনও নিয়মিত কখনও অনিয়মিতভাবে তাঁকে এঁকে যেতে হয়েছিল বেশ কয়েক দশক জুড়ে।

ব্লকে ছাপার যুগ শেষ হয়ে অফসেট এসে যাওয়ার দরুণ আরও অনেক শিল্পীর মতোই নারায়ণ দেবনাথের কাছেও টেকনিকের বদলঘটিত বিষয়টি গুরুতর হয়ে উঠেছিল। অন্যান্য ছবির ক্ষেত্রে কারিগরি রদবদল সসম্মানে উতরে গেলেও সিরিয়াস ছবির ক্ষেত্রে শিল্পীর একটি সমস্যা রয়েই গেল। কমিক্সের চাহিদা মেটাতে নাগাড়ে অতিরিক্ত ফানিজ ড্রয়িং করার ফলে তাঁর সিরিয়াস ছবিগুলিতে ঈষৎ কমিক্যাল ধাঁচ চলে আসছিল আটের দশকের শেষ ভাগ থেকে। এই দুই কারণের যৌথ অবরোধে ইলাস্ট্রেটর নারায়ণ দেবনাথ একেবারেই হারিয়ে গেলেন। ‘চিত্রকাহিনী’ দখল নিল তাঁর পুরো সময়ের। যে কমিক্স তাঁকে অবিসংবাদিত জনপ্রিয়তা দিয়েছে আট থেকে আশি সবার কাছে, সেই কমিক্সই শেষমেশ বাধ সাধল তাঁর অলংকরণে। ব্যতিক্রম কেবলমাত্র শুকতারায় পাতায় ‘টারজান’। একটানা ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে একা হাতে এই সিরিজের অনবদ্য সব ইলাস্ট্রেশন তিনি করে চললেন ন’য়ের দশক অবধি। এও অলংকরণ শিল্পী হিসেবে তাঁর আরেক রেকর্ড।

২০০৪ সালের আগস্ট নাগাদ শুকতারার ভৌতিক সংখ্যার প্রচ্ছদ তাঁর আঁকা শেষ রঙিন মলাট। এরপর ২০০৫ সালে শারদীয় ‘সন্দেশ’ পত্রিকার পাতায় সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের লেখা ‘প্রোফেসর তানাচৌর শেষ ম্যাজিক’ গল্পে সম্ভবত জীবনের শেষ রঙিন অলংকরণ করেন নারায়ণ দেবনাথ। সময়ের নিয়মে অলংকরণ বন্ধ হয়ে গেলেও, কমিক্স অবিশ্যি শিল্পী এঁকে গিয়েছেন ২০১৭ পর্যন্ত, চিরাচরিত দক্ষতায়। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৯২। ২০১৪-১৫ নাগাদ একটি প্রথম সারির বাংলা সংবাদপত্রের জন্য ‘বাঁটুল দ্য গ্রেট’-কে নিয়ে এক প্যানেলের অভিনব রাজনৈতিক কমিক্সও করেছিলেন কিছুদিন। নিয়মিত কিছু কমিক্স চরিত্র ছাড়াও বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত অসংখ্য অনিয়মিত কমিক্স নিরলস ভাবে এঁকেছেন জীবনের শেষ পর্যন্ত।

চার বছর আগে আজকের দিনেই চলে গিয়েছিলেন শিল্পী। নিজের শতবর্ষপূর্তি তিনি দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু বাংলা কমিক্স এবং অলংকরণ জগতে তাঁর একক অবদান অবিশ্বাস্য– কী সংখ্যায়, কী উৎকর্ষে! একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়– যতদিন বাংলাভাষা থাকবে, ততদিন উৎসাহী পাঠকের কাছে তাঁর সৃষ্টিসম্ভারের ‘রত্নপেটিকা উদ্ঘাটন’ ফুরবার নয়।
………………………………………
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: নমিতা দেবনাথ, তাপস দেবনাথ, অর্চনা দেবনাথ, শান্তনু ঘোষ, দেবাশীষ দেব, আবীর ভট্টাচার্য, দেবাশিস সেন, কৌশিক মজুমদার, অর্ণব দাশ
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved