
আগুনের নানা রূপ দেখেছি সেই ছোটবেলায়। অবাক করা সে আগুন কখনও ভীষণ ভয়াবহ, বিধ্বংসী। মনে হত সমস্ত পৃথিবী জ্বালিয়ে দেবে। রাতে ধোঁয়া দেখা যায় না। দিনের বেলায় কখনও কখনও বর্ষার স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া কিংবা কাঁচা-কাঠের কারণে দেখেছি, ব্যাপকভাবে কুণ্ডলী পাকিয়ে ওপরে ওঠা বিশাল কালো ধোঁয়া। সেই ধোঁয়ার মধ্যে কেমন যেন মনে হত, শরীরের অংশ ছাই হয়ে আকাশের দিকে চলে যাচ্ছে স্বর্গের উদ্দেশে। আরও কত কিছুই যে ভাবতাম, সবকিছু আজ আর মনে নেই।
১৯.
জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে?
যিনি বললেন এ-কথা, সেই মধুসূদন দত্ত, বেশ দিব্যি অমর হয়ে রইলেন আমাদের মনে, আমাদের স্মৃতিতে। তবে মৃত্যুর চেয়ে বড় সত্যি বোধহয় আর কিছু নেই। কোনও কোনও মৃত্যু মেনে নিতে কষ্ট হয়। কষ্ট হয় বেশিরভাগটাই বোধ হয় একান্তই ব্যক্তিগত কারণে।
আমার এই ‘সুইট সেভেন্টিজ’-এ এসে মনে হচ্ছে যে, সত্যিকারের মৃত্যুর খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছি। অনেক সহপাঠী, বন্ধু, আত্মীয়স্বজন, আমাদের কাছাকাছি বয়সের যারা ৭০ থেকে ৮০-র কোটায়, তারা একে একে চলে যাচ্ছে আমাদের ছেড়ে। তাছাড়া মৃত্যু বেড়েছে জগতে অনেক। চারিদিকে যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই আছে। তারই মধ্যে একটা জিনিস লক্ষ করার মতো, আগের তুলনায় মানুষ কিন্তু অনেক মৃত্যু-সচেতন। মৃত্যুর আগে অগোছালো কিছু কিছু কাজ নিজেই সে গুছিয়ে রেখে যেতে চায়।

মৃত্যু, শ্মশান এবং সৎকার আমার প্রায় জন্ম থেকেই পাশাপাশি। যখন খুব ছোট ছিলাম, আমাদের বাড়ির অদূরে ছিল মহাশ্মশান। সেখানে ছিল বিশাল বড় ভয়ানক দর্শন শ্মশান-কালী। রাতবিরেতে আকাশে ভীষণ আকারের হলুদ-সাদা-কমলা-সিঁদুরে-লাল এবং রক্তবর্ণের লেলিহান আগুন দেখে ভয় করত। শুনতাম, ওখানে একটা মানুষকে নাকি পোড়ানো হচ্ছে। সেই ভয় একটা বয়স পর্যন্ত মনের মধ্যে আচ্ছন্ন ছিল। মৃত্যুর সঙ্গে আগুনের সম্পর্ক, এটাই মনে দাগ কেটেছিল। আর একটু বড় হলে আমরা একটা ছোট টাউনে বাস করতাম, সেখানেও শ্মশান খুব কাছেই। পাড়ার কারও মৃত্যু হলে, কেন জানি না, ভীষণ টান অনুভব করতাম ওই পরিবেশে যেতে। শোকসন্তপ্ত পরিবারের বাড়িতে গিয়ে একটা দৃশ্য লক্ষ করতাম, প্রচুর পরিমাণে প্রতিবেশী লোকজনের সমাগম অথচ একটা অদ্ভুত নীরবতা, নিস্তব্ধতা! অল্প জ্ঞানে বুঝতে পেরেছিলাম, বুড়ো হলে মৃত্যু একটা অনিবার্য ব্যাপার। কারণ, ছোটবেলায় বেশিরভাগই যাদের মৃত্যু দেখেছি, তারা বয়সে আমাদের চেয়ে অনেক বড়।
ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান মেনে বাঁশের মাচায় করে মৃতদেহকে তুলে নিয়ে যাওয়া হত শ্মশানে, শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী অংশ নিত এই কর্মকাণ্ডে। তার খণ্ড দৃশ্যগুলো স্মৃতি হয়ে আছে এখনও। তখনকার দিনে ক্যামেরায় অভাব সত্ত্বেও জুটে যেত একজন ক্যামেরাম্যান। সে মৃতদেহ ঘিরে প্রতিবেশীদের সঙ্গে একটা গ্রুপ ছবি তুলত। যাতে ছবিতে বাদ না পড়ে, তাই ভিড়ের মাঝামাঝি একটা ভালো জায়গা নেওয়ার হিড়িক পড়ে যেত আমাদের মধ্যে। যেন সবাই ওই মৃত মানুষটির সঙ্গেই স্মৃতিতে অমর হয়ে থাকবে ছবিতে।
মৃতদেহ পালকি-বেহারার মতো চারজন শববাহকের কাঁধে চেপে চলেছে শ্মশানের উদ্দেশে। আমাদের ছোটদের হাতে দিত একটা পাত্রে কিছু খই আর খুচরো পয়সা। সেগুলোকে রাস্তায় ছড়াতে ছড়াতে যাওয়া। পিছনে থাকত গ্রামের হরিনাম সংকীর্তনের দল। মাঝে মাঝে শববাহকের মুখে হরিবোল ধ্বনি। সমবেত কণ্ঠে এই শব্দ উচ্চারণ এবং সুর, প্রভাত-ফেরি, মন্দিরের ভজন-কীর্তন, স্কুলের প্রার্থনা সংগীতের মতো না। আর এক রকমের সামাজিক সুরেলা শব্দ।
পায়ে হেঁটে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে শ্মশানে যখন পৌঁছল শবযাত্রীরা, তখন তারা বিশ্রাম নেওয়ার জন্য শ্মশানের আশপাশে গাছের ছায়ায়, কেউ কেউ শ্মশানকালী মন্দিরের চত্বর খুঁজে নিল। কল্কেতে ধূমপানের জন্য শ্মশানকালী মন্দিরের সাধুদের সঙ্গে মিশে গেল কেউ কেউ। সেই সময়ে আমি অবাক হয়ে দেখতাম, চিতা সাজানো।
আগুনের নানা রূপ দেখেছি সেই ছোটবেলায়। অবাক করা সে আগুন কখনও ভীষণ ভয়াবহ, বিধ্বংসী। মনে হত সমস্ত পৃথিবী জ্বালিয়ে দেবে। রাতে ধোঁয়া দেখা যায় না। দিনের বেলায় কখনও কখনও বর্ষার স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া কিংবা কাঁচা-কাঠের কারণে দেখেছি, ব্যাপকভাবে কুণ্ডলী পাকিয়ে ওপরে ওঠা বিশাল কালো ধোঁয়া। সেই ধোঁয়ার মধ্যে কেমন যেন মনে হত, শরীরের অংশ ছাই হয়ে আকাশের দিকে চলে যাচ্ছে স্বর্গের উদ্দেশে। আরও কত কিছুই যে ভাবতাম, সব কিছু আজ আর মনে নেই।

ছোট থেকে বড় হতে হতে দ্রুত কিছু জিনিসের অবস্থান, অভ্যাস এবং পরিবেশনের পরিবর্তন লক্ষ করলাম। ধর্মাধর্ম মেনে প্রথাগত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার নানা ধরন। বিভিন্ন রকম বিশ্বাস মিলিয়ে বিভিন্ন আচার, আচরণ। পরিবেশ অনুযায়ী, শেষকৃত্য সম্পন্নের আলাদা আলাদা শৈলী যেন।
দেশে-বিদেশে দহন, দাফন, জলে ভাসানো কিংবা জলের তলায়, আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা পশুপাখিদের দ্বারা শেষ সৎকার। হিন্দুদের সৎকার শুধুমাত্র যে শ্মশানে দহনের দ্বারা হয়, তা নয়। তাদের মধ্যে মাটিতে সমাধিরও প্রচলন আছে। আমরা গ্রামে দেখেছি, সাপে-কাটা রোগীকে কলাগাছের ভেলায় করে জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। এমনকী, শিশুমৃত্যুতেও দেহ পোড়ানো হয় না, একটা বয়স পর্যন্ত। জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
মৃতদেহ ভেলায় ভাসিয়ে দেওয়ার কথা বলতেই, একটা পৌরাণিক কাহিনি, বেহুলা-লখিন্দরের কথা মনে পড়ে। লখিন্দরের সাপে কাটা দেহ নিয়ে বেহুলা চলেছে, গাঙুড়ের জলে ভেলায় ভেসে। তাছাড়াও পৌরাণিক কাহিনি, কাব্যে, মহাকাব্যে নানা রকম অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার গল্প পড়েছি, শুনেছি। দুটো প্রধান মহাকাব্যের কথাই ধরা যাক। রামায়ণ আর মহাভারত। রামায়ণের কাহিনিতে রাজা দশরথের বিশাল বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার অসাধারণ বর্ণনা আছে। এমনকী, কিছু কিছু পুরনো দিনের চিত্রকররা তার ছবিও এঁকেছেন। এছাড়া আছে মহা পরাক্রমশালী যোদ্ধা, রাজা, শাসনকর্তা এবং ঈশ্বরভক্ত রাবণের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কাহিনি। রামায়ণ মানে সুন্দর গল্প আর অসাধারণ বর্ণনা।
যুদ্ধক্ষেত্রের ধুলোয় শুয়ে আছেন রাবণ। চুল খুলে দিয়ে দেহের পাশে বসে কাঁদছেন রানি মন্দোদরী আর অন্য স্ত্রী-রা। ভাইয়ে ভাইয়ে ভেদাভেদ ভুলে বিভীষণ শোকপ্রকাশ করছেন। তাঁকে রাম বলছেন, রাবণ একজন যোদ্ধা, একজন মহান যোদ্ধার মতো যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন। শোক করো না, বরং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁকে সম্মান জানাও। রামের কথায় চিতা প্রস্তুত করলেন বিভীষণ।

মহাভারতে আছে মহাযুদ্ধের পরে বিশাল সংখ্যক মৃত সৈনিকদের এক সম্মিলিত সৎকারের আয়োজন। রামায়ণে যেমন রাবণ, তেমনই মহাভারতে আমাদের প্রিয় এবং সবার কাছে জনপ্রিয় চরিত্র, কর্ণ। তার শেষকৃত্য সম্পন্নের কাহিনিও বর্ণময়। যুদ্ধ শেষে কর্ণের প্রকৃত পরিচয় পাওয়ার পর যুধিষ্ঠির ও অর্জুন তার মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত। তাঁদের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, এই সত্য জেনে পাণ্ডবদের বিজয় আনন্দ মুহূর্তেই ভারী হয়ে ওঠে অপরাধবোধে। যুধিষ্ঠির অজান্তেই নিজের জ্যেষ্ঠভ্রাতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার বেদনায় গভীর শোকে, অনুতাপে ভেঙে পড়েন। এরপরে কর্ণের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কে সম্পন্ন করবেন, সেখানে বিরোধ দেখা দেয়। অর্জুন দাবি করেন, তাঁরই অধিকার, অন্যদিকে দুর্যোধন বলেন, কর্ণের প্রকৃত বন্ধু তিনি, যখন সবাই তাঁকে অবহেলা করেছে, তখন তিনি তাকে সম্মান ও আশ্রয় দিয়েছিলেন। শেষে যুধিষ্ঠিরই কর্ণের উদ্দেশে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন। কর্ণ চেয়েছিলেন, তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া যেন পবিত্র, অক্ষত ভূমিতে সম্পন্ন হয়। সে ইচ্ছাও পূরণ করা হয়।
কাব্য, মহাকাব্য ছেড়ে ইতিহাসে আসি। ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল মহাসমারোহে বর্ণাঢ্য অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন যাঁর মৃত্যুতে, তিনি ‘আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট’। খরচের হিসেব শুনে মাথা ঘুরে যায়। এই আয়োজন করতেও নাকি সময় লেগেছিল বছর দুয়েকের বেশি। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ সালে বর্তমান হিসেবে অনুযায়ী, ৬০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ছিল সোনার কফিন, অলংকৃত রথ এবং আরও কত কী! মৃত্যু থেকে সৎকারের মাঝখানের সময়ে পচনের হাত থেকে বাঁচিয়ে সংরক্ষণের জন্য শরীরটাকে রাখা হয়েছিল মধুর মধ্যে ডুবিয়ে।
অদূর অতীতের দু’-একটা ঘটনা বলতে, আমরা দেখলাম, এক বিশ্বব্যাপী টেলিভিশনে প্রচারিত অনুষ্ঠান। ১৯৯৭ সালে প্রিন্সেস ডায়ানার শোকযাত্রায় বিশাল জনসমাগম হয়েছিল এবং শুধুমাত্র অনুষ্ঠানের জন্যই প্রায় ১২ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল। তারপরে ২০০৯-এ মাইকেল জ্যাকসনের বেলাতেও একটি জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়, যার পরিষেবার জন্য ১ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল, যেখানে সেলিব্রিটিরা উপস্থিত ছিলেন এবং টেলিভিশনে বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ এটি দেখেছিলেন।

আমাদের দেশের সেলিব্রিটিরাও কিছু কম যান না। অস্বাভাবিক মৃত্যুর পরে অভিনেত্রী শ্রীদেবীর দেহ দুবাই থেকে যখন মুম্বইয়ে আনা হয়, তখনও হয়েছিল এক বিশাল জনসমাগম। শ্রীদেবী যেখানে থাকতেন, সেই ‘গ্রিন একর হাউসিং সোসাইটি’ সেবার প্রয়াত অভিনেত্রীকে শ্রদ্ধা জানাতে পুরো কমপ্লেক্সটাই হোলি উৎসব পালন করেনি। আর খুব সম্প্রতি, মানে কয়েকমাস আগে জুবিন গর্গ-এর মৃত্যু নিয়ে অভাবনীয় বিশাল জনসমাবেশ দেখলেন অসমের মানুষ। গায়ক, লেখক, কম্পোজার, অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক জুবিন গর্গ, মূলত অসমীয়া, বাংলা এবং হিন্দি ছাড়াও অনেক ভাষায় গান গাইতেন।
বিশ্বের বৃহত্তম অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার শোভাযাত্রাটিও যে আমাদের দেশে, তা শুনে অনেকেই অবাক হবেন।
১৯৬৯ সালে সিএন আন্নাদুরাই-এর মৃত্যুতে শোক জানাতে ১৫,০০০,০০০-এর বেশি মানুষ মাদ্রাজ শহরের রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন কবি, সুবক্তা এবং তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী। ইতিহাসে কোনও রাজা-বাদশা, মহাত্মা বা সেলিব্রিটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় এত বড় শোভাযাত্রা পাননি।

ভয় হয়, বুক কাঁপে সবকিছু ছেড়ে যেতে হবে?
কবির কথা নয়, ভয় তো হয়ই। অস্বস্তিকর দুটো মৃত্যুর ঘটনার কথা, জীবনে ভোলা যাবে না। প্রথমটা, মরিশাস দ্বীপে গিয়ে দেখেছিলাম, যেখানে জীবনের যন্ত্রণায় মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিল। মরিশাসের ‘লে মোর্ন’ পর্বতের পাদদেশে দাঁড়িয়ে শুনেছিলাম সে-কাহিনি।
দাসেরা ব্রিটিশদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে এই স্থানটিকে লুকিয়ে থাকার জন্য ব্যবহার করত। ১৮৩৫ সালে যখন মরিশাসে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করা হয়, তখন কিছু ব্রিটিশ-সৈন্য এই বিলুপ্তির সংবাদ দিতে পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছনোর চেষ্টা করে, সেই সময় পাহাড়ের চূড়ায় লুকিয়ে থাকা প্রায় ২০০ জন দাস মনে করে যে তাদের আবার ধরে নিয়ে যাওয়া হবে, তাই তারা খাড়া পাহাড়ের ওপর থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে! লে মোর্ন, দাসপ্রথার ভয়াবহতার প্রতীক। এটি এখন একটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান।

অন্যটা হিটলারের সময়ের লক্ষ লক্ষ মানুষের নৃশংস গণহত্যার ঘটনা। সেই হত্যাকাণ্ডের কাহিনি সারা পৃথিবীর মানুষ কখনও ভুলতে পারবে না। আমার ভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য, হলোকস্ট মিউজিয়ামে সেই দলগত মৃত মানুষেরও যে প্রথা মেনে সৎকার বা অন্ত্যেষ্টির ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তার একটা চলচ্চিত্রায়ন দেখেছিলাম। যেটা মনে করলে আজও আমার ঘুম নষ্ট হয়।
মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান
ইচ্ছামৃত্যু। সেও তো শুনলাম পুরাণে, মহাকাব্যে। আর একরকম মরণ, মরণকে বরণ। প্রাচীন ভারতীয় ধর্মীয় ও পৌরাণিক ধারণায় ছিল, মহাভারতে যেমন ভীষ্ম। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে এখন এটা একটা জটিল নৈতিক ও আইনি বিষয়, যেখানে অনেক দেশে এটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অবৈধ।
ইন্দোনেশিয়ায় বোরোবুদুরে বুদ্ধজাতকের গল্পের যে বিশাল শিল্পসম্ভার, সেও দেখলাম। পাহাড়প্রমাণ ভাস্কর্যের বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে একেবারে আকাশে চূড়ায় উঠে দেখেছিলাম, বুদ্ধ-জীবনের শেষ পরিণতির পরিবেশনা। অনুভব করার চেষ্টা করেছিলাম, নির্বাণ, পরিনির্বাণ কিংবা মহানির্বাণ। বুদ্ধ তাঁর শিষ্যকে সব সময় বলেছেন, যে মৃত্যুই হচ্ছে তাঁর আসল আকাঙ্ক্ষা। বুদ্ধের কাছে মৃত্যু ছিল জীবনের একটি অনিবার্য অংশ ও দুঃখের কারণ, যা আসক্তি ও তৃষ্ণা থেকে জন্মায়। তাঁর অনুভূতি ছিল মৃত্যুকে মেনে নিয়ে, প্রতিটি শ্বাসে এর ক্ষণস্থায়িত্ব উপলব্ধি করে, পুনর্জন্মের চক্র ভেঙে দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করা। প্রতিটি মুহূর্তকে বর্তমান বাস্তবতায় যাপন করার মধ্যে শান্তি খোঁজা।

ইতিহাসে রানি পদ্মাবতীর সঙ্গে চিতোরের অন্যান্য রাজপুত রমণীদের দ্বারা পালিত জহরব্রত এক ঐতিহাসিক আত্মাহুতি, যেখানে আলাউদ্দিন খিলজির হাতে পরাজয় নিশ্চিত জেনে, তাঁরা নিজেদের সম্মান ও সতীত্ব রক্ষায় আগুনে ঝাঁপ দেন। এটি মূলত ত্যাগ ও সম্মানরক্ষার প্রতীক, যা মধ্যযুগীয় রাজপুত ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রাচীন ভারতে ‘সহমরণ’ প্রথার প্রচলন ছিল। সাধারণত ‘সতী’ হওয়ার মাধ্যমে নারী তার পবিত্রতা ও স্বামীর প্রতি চরম আনুগত্য প্রকাশ করছে বলে মনে করা হত। বর্তমানে ভারতে সতীদাহ প্রথা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। ১৯৮৭ সালে ‘সতীদাহ প্রতিরোধ আইন’ পাশের মাধ্যমে এই প্রথাকে মহিমান্বিত করা বা এতে সহায়তা করাকে কঠিন শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে।
ইতিহাস থেকে বেরিয়ে এলেও মৃত্যু, সৎকার, স্মৃতিসৌধ এবং সেই নিয়ে মহা আয়োজন ও শিল্পকর্মের যোগাযোগ– তার সাক্ষী হয়ে আছি। তা থেকে বেরিয়ে আসারও উপায় নেই।
মিশর সব সময় আমার কাছে একটা সভ্যতা আর রহস্যের। সেখানে মৃত্যু, তার সমাধিস্থল এবং আকাশচুম্বী স্মৃতিসৌধগুলো পিরামিড। শিল্পীদের, দার্শনিক মনস্তাত্ত্বিকদের আর বিজ্ঞানীদের গবেষণার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে মাথা তুলে পিরামিডগুলো।

ফারাওদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা অনুযায়ী, সামর্থ্য এবং সম্মান অনুযায়ী, স্মৃতি-সুরক্ষা আর জন্ম-পুনর্জন্ম নিয়ে তাদের ভাবনা-চিন্তার আয়োজনের ত্রুটি নেই। তাদের সম্মানের ওজন হিসেবে পরবর্তী স্তরের মানুষগুলোর বিভিন্নভাবে স্মৃতির রক্ষার আয়োজনও সমান গুরুত্ব ওদের কাছে, দেখেছিলাম মাটির নিচে। মাটির নিচে একতলা-দোতলা-তিনতলা করে নেমে গিয়েছে বিভিন্ন তল, আর সেখানে দেখেছিলাম দেওয়ালের গায়ে কুলুঙ্গির মতো গর্ত করে ঢুকিয়ে রাখা আছে কফিনগুলো, যেন মৃতদেহের লাইব্রেরি। প্রয়োজন মতো তাঁরা সেগুলোকে বের করে তাদের জন্মদিন, মৃত্যুদিনের শ্রদ্ধা জানানোর আয়োজন করেন। অদ্ভুত ধরনের দেহ রক্ষণাবেক্ষণ এবং শ্রদ্ধা জানানোর পদ্ধতি।
ইজরায়েলের জেরুজালেমে কবরস্থানের যে দৃশ্য দেখেছিলাম সেবার, সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। কবরের ওপরে স্মৃতিবেদী অসংখ্য এবং সপ্তাহান্তে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য যেমন বিভিন্ন স্মৃতিবেদীতে ফুল নিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসে আত্মীয়-পরিজন, এখানেও ঠিক তাই, তবে এখানে ফুল নয়, নিয়ে আসে পাথরখণ্ড। বেদীতে এক টুকরো পাথর রেখে প্রার্থনা। পাথর এদের কাছে খুবই পবিত্র। শহরে সরকারিভাবেই বলা আছে যে, ইটের কংক্রিটের শরীর থাকলেও বাড়িঘরগুলোর ওপরের আবরণ যেন পাথরের টাইলস দিয়ে করা হয়। তাই জেরুজালেম শহরটা দূর থেকে দেখলে একটা পাথরের শহর বলে মনে হয়।

ইজরায়েলের জর্ডন নদী কিংবা ডেড সি-র ওপারের দেশটা জর্ডন। সেখানকার পেট্রা সিটিতে দেখলাম, সমাধিস্থল তৈরির একটা সাংঘাতিক পরিশ্রম সাধ্য আয়োজন। লাল পাথরের পাহাড় ঘিরে যত না বসবাসের জায়গা, তার চেয়ে বেশি পাথরের দেওয়াল কেটে তৈরি হয়েছে সমাধিস্থল এবং যথাসাধ্য শিল্পসুলভ তার অলংকার। এক একটা পাহাড় দেখে মনে হয় বড়সড় যেন একটা মৌচাক, যার প্রতিটি খুপরি যেন এক একটি মানুষের বিশ্রামকক্ষ।

এই প্রচলিত, প্রথাগত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার যে বিভিন্ন ধরন, তার লিস্ট অনেক লম্বা। হিন্দু, ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের প্রচলিত দহন, দাফন থেকে শুরু করে কিছু অনন্য প্রথাও প্রচলিত আছে। যেমন তিব্বত, মঙ্গোলিয়ার স্কাই বারিয়াল, যেখানে মৃতদেহ পাখিদের খাওয়ানো হয়। মাদাগাস্কারে মমি করা মৃতদেহের সঙ্গে নাচ, ভারত, ইরান ইত্যাদি দেশে জরথুস্ট্রীয় ‘টাওয়ার অফ সাইলেন্স’, যেখানে মৃতদেহকে উন্মুক্ত প্রাকৃতিক উপাদানের সংস্পর্শে রাখা হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো কিছু সংস্কৃতিতে ছাই দিয়ে পুঁতি বা কৃত্রিম প্রবাল প্রাচীর তৈরি করা হয়, আবার কোন সংস্কৃতিতে আছে ঝুলন্ত কফিনের ব্যবহার। দায়াক বা বোর্নিওতে মৃতের সঙ্গে রীতিমতো উৎসব পালন করা হয়। এসবই আত্মার যাত্রা এবং প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা সম্পর্কে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন বিশ্বাস।
জীবন শেষ হয়ে গেলে আমি হাসির আভা রেখে যেতে চাই
মৃত্যুর পর মানবদেহ ঐতিহ্যবাহী অথচ পরিবেশবান্ধব বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে সৎকার করা যেতে পারে। দাহ নাকি কফিন? পরিবেশবান্ধব সেরা উপায় কোনটি। এই বিকল্পগুলোর মধ্যে অনেকগুলোর স্থায়িত্ব বা ভবিষ্যৎ গবেষণায় অবদান রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন পরিবেশ-বন্ধুরা। ঠিক যেমন চিকিৎসাক্ষেত্রে মানব-শরীর ব্যবচ্ছেদ, তেমনই মৃত্যুর পরেও মানুষ, সমাজ সংস্কার ধর্ম বজায় রেখে তাদের সুবিধা-অসুবিধার কথা ভেবে নানারকম আচার-অনুষ্ঠানের কাটাছেঁড়া শুরু করেছে।
সৎকারের পরিবেশ-বান্ধব ও প্রাকৃতিক বিকল্প হিসেবে আলোচনায় উঠে আসছে নানা পদ্ধতি।
সবুজ সমাধি: মৃতদেহকে বায়োডিগ্রেডেবল কাফন বা বেতের কফিনে রাখা, যা এটিকে প্রাকৃতিকভাবে পৃথিবীতে মিশে যেতে সাহায্য করে।
মানব কম্পোস্টিং: দেহকে জৈব পদার্থ-সহ একটি পাত্রে রেখে প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে পুষ্টিসমৃদ্ধ মাটিতে রূপান্তরিত হয়।
অ্যালকালাইন হাইড্রোলাইসিস: জল, তাপ এবং ক্ষারীয় রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে নরম টিস্যু দ্রবীভূত করা।
ট্রি পড: মৃতদেহ বা ছাই একটি বায়োডিগ্রেডেবল পডের মধ্যে রাখা হয়, যা একটি নতুন গাছের বা বীজের পুষ্টির উৎস হিসেবে কাজ করবে।
মাশরুম স্যুট: এটি মাশরুমের স্পোর মেশানো একটা সমাধির পোশাক, যা মৃতদেহ পচনে সাহায্য করতে এবং বিষাক্ত পদার্থকে নিষ্ক্রিয় করতে ডিজাইন করা হয়েছে।
বৈজ্ঞানিক ও পরোপকারী প্রকল্পের মধ্যে রাখা হয়েছে, অঙ্গ ও টিস্যু দান, সম্পূর্ণ দেহ দান, প্লাস্টিনেশন ও বডি ফার্ম ইত্যাদি। মানুষের জীবনরক্ষা, চিকিৎসা, শিক্ষা ও ফরেনসিক গবেষণায় এসবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বড় কোনও স্মৃতিসৌধ নির্মাণ বা শরীরকে ধরে না রেখেও প্রিয়জনের অনন্য স্মৃতিচিহ্ন রাখতে নানা ভাবনা চলছে। ইটারনাল রিফ, ছাইয়ের গয়না, মহাকাশে সমাধি ও ভিনাইল রেকর্ড ইত্যাদির চিন্তা, যা মৃত্যুর পর স্মৃতিকে ভিন্ন ও অর্থবহভাবে ধরে রাখার আধুনিক উপায়। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের আবেগকে আহত না করে আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক ধর্মগুরু এবং পুরোহিতদেরও আলোচনায় সঙ্গে রাখার কথাও বারবার উঠে আসছে।
এত সব কাব্যগাথা, এত সব মনের কথা, এত সুন্দর জীবন বেঁচে থাকার পরে উচিত হবে, চমৎকার বন্ধুর মতো মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পরিবেশ নিয়ে সচেতন থাকাটা আমাদের অভ্যেসে এসেছে অনেকখানি। প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের জন্য মৃত্যুর পরেও আপনি অনেক কিছু করতে পারেন এবং একই সঙ্গে আপনার ধর্মের প্রতিও বিশ্বস্ত থাকতে পারেন। মরণের পরের নতুন ভাবনাগুলো, মৃত্যুর আগেই আমাদের করার সময় এসেছে।
…পড়ুন অল্পবিজ্ঞান-এর অন্যান্য পর্ব…
পর্ব ১৮: মন রে কৃষিকাজ জানো না
পর্ব ১৭: গুপ্তধন কিম্বা লুপ্তধন
পর্ব ১৬: ছবির শরীর, শরীরের ছবি
পর্ব ১৫: মাপ করুন, সৃষ্টিশীলভাবে!
পর্ব ১৪: মাপের ভুলভাল, পাগলের মাপজোখ
পর্ব ১৩: শব্দ কল্প দ্রুম
পর্ব ১২: হ্যালো, তুমি শুনতে পাচ্ছ কি?
পর্ব ১১: ‘শব্দ’ শুধুই আওয়াজ নয়
পর্ব ১০: শিল্পকলায় বিষ্ঠা মানে ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ অথবা প্রতিবাদ
পর্ব ৯: বাস্তব আর ভার্চুয়ালের সীমান্তে দাঁড়িয়ে হাইব্রিড আর্ট প্রশ্ন করতে শেখায়– শিল্প কী?
পর্ব ৮: মগজে না ঢুকলে শিল্পও আবর্জনা
পর্ব ৭: ছবির অসুখ-বিসুখ, ছবির ডাক্তার
পর্ব ৬: বিসর্জনের মতোই একটু একটু করে ফিকে হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর রং ও রূপ
পর্ব ৫: জীবন আসলে ক্যালাইডোস্কোপ, সামান্য ঘোরালেই বদলে যায় একঘেয়ে নকশা
পর্ব ৪: কুকুরেরই জাত ভাই, অথচ শিয়াল সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি?
পর্ব ৩: অন্ধকারে অল্প আলোর মায়া, ফুরয় না কোনওদিন!
পর্ব ২: বজ্রবিদ্যুৎ ভর্তি আকাশে ঘুড়ি উড়িয়ে আমাদের চিরকালের নায়ক হয়ে আছেন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved