Robbar

ক্যানেস্তারা নয়, কনসার্ট

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 23, 2026 8:01 pm
  • Updated:January 23, 2026 8:01 pm  

তীক্ষ্ণ, প্রবল বাজনার আড়ালে ঢেকে রাখা জীবনের নৈঃশব্দ্য। ঢেকে রাখা অর্থচিন্তা। কেবল ছুটে চলা। রাক্ষসবাদ্য হাতে, নেশুড়ের মতো। মনে পড়ে, বিজয় চৌধুরীর স্মৃতিচারণে সাকিব আলির কথা: ‘এই লাইনের কত ফ্লুট বাজানেওলা যে টিবি রোগে মারা গেছে তার হিসেব নেই! বিলকুল বিনা ইলাজে!’ মেফিস্টো! একটা নেশার পিছনে ধাওয়া করতে করতে, নাচতে নাচতে, নাচাতে নাচাতে, মারতে মারতে, বাঁচাতে বাঁচাতে– ‘একদিন কা সুলতান’– আমাদের ব্যান্ডমাস্টার, হয়তো একদিন লাটুবাবুর মতোই বলে উঠবেন: ‘কালেস্তারা কি মশায়? দস্তুরমত কল্‌সাট।’ জীবন তো কল্‌সাটই!

প্রচ্ছদের আলোকচিত্র: বিজয় চৌধুরী

গৌরবকেতন লাহিড়ী

কালেস্তারা কি মশায়? দস্তুরমত কল্‌সাট। এই ইনি লবীন লিয়োগী ক্লারিয়লেট,– এই লরহরি লাগ ফুলোট,– এই লবকুমার লন্দন ব্যায়লা। তা ছাড়া কর্লেট, পিক‍্লু, হারমোনিয়া, ঢোল, কত্তাল সব লিয়ে ঊলিশজন আছি। বর্ম্মা অয়েল কোম্পানির ডিপোয় আমরা কাজ করি। ছোট-সাহেবের সেদিন বে হল, ফিষ্টি দিলে, আমরা বাজালুম, সাহেব খুশী হয়ে টাইটিল দিলে– কেরাসিন ব্যাণ্ড।

বেলেঘাটা কেরাসিন ব্যাণ্ডের ব্যান্ড-মাস্টার লটবর লন্দী ওরফে লাটুবাবুর জবানিতে কলকাতার ব্যান্ডপার্টির এই বর্ণনা পড়েছিলাম ছেলেবেলায়। ‘গড্‌ডালিকা’ প্রকাশের সন-তারিখ ধরলে, এ বিবরণীর শতবর্ষ অতিক্রান্ত। ‘কল্‌সাট’ অর্থাৎ কনসার্ট শব্দটি লক্ষণীয়। সচরাচর পশ্চিমে ‘কনসার্ট ব্যান্ড’ বলতে যা বোঝানো হয়, লাটুবাবুর ব্যান্ড কিন্তু তা নয়। কনসার্ট তুলনামূলক সুর-কেন্দ্রিক। তাই স্যাক্সোফোন কিংবা সিন্থেসাইজারের পাশাপাশি ভায়োলিন, গিটার, পিয়ানোর ব্যবহার সেখানে অধিক। মূর্ছনার প্রয়োগ বেশি। এবং অবশ্যই, ‘কনসার্ট’ চলমান নয়। চলমান ব্যান্ডের ক্ষেত্রে তাল গুরুত্বপূর্ণ; খানিকটা চলার গতির সঙ্গে মেলানোর জন্যেই। তাই ক্ল্যারিওনেট, বাঁশি কিংবা পিকোলোর মতো ব্রাস বা পারকাশন জাতীয় যন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গে, বিভিন্ন আকার ও টোনের ড্রাম এ জাতীয় ব্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ও দেশে এ ধরনের ট্রুপগুলোকে বলে ‘মার্চিং ব্যান্ড’। পনেরো শতকের জার্মানিতে এমন বহু মিউজিকাল ট্রুপের উত্থান ঘটেছিল। আমাদের বেলেঘাটা কেরাসিন ব্যাণ্ড সম্ভবত সেই গোত্রীয়। যাকে ‘কানেস্তারা’ বলে হ্যাটা করতে চেয়েছে বিনোদ। আরও পরে, আঠেরো শতকের ইতিহাস মন্থন করলে দেখা যাবে– আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রামে সেনাদের উদ্বুদ্ধ করতে যুদ্ধক্ষেত্রে নেমেছে মিলিটারি ব্যান্ড। সুর ও অসুরের আশ্চর্য সহাবস্থান। এর আগেই, সম্ভবত বারোক পর্ব থেকেই একটু একটু করে জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল ‘অর্কেস্ট্রা’। ব্যান্ড এবং অর্কেস্ট্রা– এ দুয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে: ব্যান্ড শুধুই বাদ্য– ইনস্ট্রুমেন্টাল; অর্কেস্ট্রা কিন্তু গীতনৃত্যবাদ্য– তিনের সম্মিলনী। এই দুই সংস্কৃতিই পশ্চিম থেকে ক্রমশ এ দেশে এসেছে বলে দাবি করা হয়। তবে সেই দাবি সম্পূর্ণত সত্য নয় বলেই মনে হয়। এসবের বহু পূর্বে চর্যাপদের ‘গীত-নট-নৃত্য-বাদ্য’-এ এদেশীয় অর্কেস্ট্রার প্রাচীনতম লিখিত নিদর্শনটি মেলে। তবে সেখানে অবশ্য বাদ্য হিসেবে উল্লেখ রয়েছে বীণা, পটহ, মাদল, করণ্ড, কসালা, দুন্দুভি ও ডম্বরুর কথা। পটহ, করণ্ড, দুন্দুভি সবই তালবাদ্য– ঢাক-ঢোল-ধামসার পূর্বসূরি; আর কসালা– কাঁসিজাতীয় বাজনা। এই অর্কেস্ট্রেশনই বিবর্তিত হতে হতে, লাটুবাবুর বয়ানে এসে ঠেকেছে– যেখানে খোল আর কর্তাল বাদে এদেশীয় যন্ত্র আর একটিও নেই। ‘দস্তুরমত কল্‌সাট’ হয়ে ওঠার পথে পশ্চিমা বাতাসের ঝাপটে তাদের পথ গিয়েছে বেঁকে। কারণটি মূলত অর্থনৈতিক; ওই যে– ‘সাহেব খুশী হয়ে টাইটিল দিলে’। ‘টাইটিল’ না জুটলে শিল্পকে যে সংখ্যালঘু হয়ে যেতে হয়, তার প্রমাণ মিলবে আজকের সেন্ট্রাল এভিনিউ ছাড়িয়ে মহাত্মা গান্ধি রোডের ফুটপাথ ধরে কলেজ স্ট্রিটের দিকে দু’ পা হাঁটলেই।

আলোকচিত্র: বিজয় চৌধুরী

ভারতীয়, মূলত বাঙালি বিয়ের সঙ্গে যৌথ সংগীতের গাঁটছড়ার সম্পর্কটি বেশ পুরনো। সেই কবে আমাদের প্রতিবেশী দেশের পর্যটক এ দেশকে সংগীত ও নৃত্যের দেশ বলে গিয়েছিলেন। চিনের চেয়ারম্যান তখনও আমাদের চেয়ারম্যান হননি। আমরাও তখন ‘বাঙালি’ বলতে শুধুই ‘হিন্দু’ বাঙালির কথা ভাবতে শিখিনি। বিশেষত গ্রামীণ বাঙালি বিবাহ সংস্কৃতির অন্দরমহল পরিক্রমা করতে গিয়ে, মুসলমানি বিয়ের গানের চমৎকার ভাঁড়ারটিকে বাদ দেওয়ার রাজনীতি শিখিনি। আঞ্চলিক ভাষায় লেখা, মুখে মুখে প্রচলিত গান। মঙ্গলগীত, বন্দনা, ক্ষীর খিলানি, ঢেঁকি মঙ্গলার গান, আলমতলার গান, ঝুমুর ডালা, আশীর্বাদ, গায়ে হলুদ, মঙ্গল স্নান, থুবরা বা আইবুড়ো ভাতের গান, ফিরানির গান। যৌথ সংগীত। দলবদ্ধভাবে রচিত, পরিবেশিত। এবং তার সবটুকুই মেয়েদের হাতে; ভিতরমহলের মেয়েরাই তার একমাত্র প্রণেতা-শ্রোতা। ফলত বিষয়ও– মেয়েদের আনন্দবিষাদ, আবেগ-উৎকণ্ঠা, কিংবা দাম্পত্য-বিষয়ক রসিকতা, যৌন হাসি-ঠাট্টা। কবিগান, তরজা, আলকাপ বা রায়বেঁশের মতো পুরুষ-অধ্যুষিত দলের পাশাপাশি, বর্ধমান, বীরভূম, মালদা, মুর্শিদাবাদে বিবাহের সান্ধ্য-গীতি পরিবেশনের জন্য এককালে ডাক পড়ত ‘মেরাসিন’-দের। সে-ও একরকম ব্যান্ড। মুসলমান মেয়েদের ব্যান্ড। বাজনা হিসেবে তাঁরা ব্যবহার করতেন হারমোনিয়াম, ঢোল এবং ঘুঙুর। রাঢ়ের বিয়ে-গাউনি, গীত-গাহিরি কিংবা উত্তরবঙ্গের গিদালিরা প্রত্যেকেই এই যৌথ সংগীতেরই অংশ। বাঙালি বিয়ের বাদ্য ছিল মূলত শাঁখ, সানাই, ঢোল এবং কাঁসর। শাঁখ প্রাচীনতম। হিন্দু বিবাহের লোকাচারে শঙ্খের ভূমিকা মাঙ্গলিক। চর্যাপদে অবশ্য বিবাহোৎসবের বাদ্য হিসেবে পটহ, মাদল, করন্ড, কসালা ও দুন্দুভি-র উল্লেখ মেলে। মুঘলদের আগে থেকেই অবস্থাপন্ন হিন্দু-মুসলিম এমনকী অন্যান্য ধর্মের বিয়েতেও সানাই বাজত। বিবাহ সংস্কৃতির অঙ্গ হিসেবে। তবে ‘নহবত’ শব্দটি অপেক্ষাকৃত নবীন। যন্ত্রসংগীতের প্রতি বাংলার নবাবদের বিশেষ দুর্বলতা ছিল। মুর্শিদাবাদের নবাবি বাজনদারদের জন্য ছিল স্বতন্ত্র কক্ষ– ‘নহবতখানা’ বা ‘নক্করখানা’। মনে রাখতে হবে, ‘নক্কর’ শব্দটি এসেছে কিন্তু ‘নাক্কারা’ বা ‘নাকাড়া’ থেকে। কেবল সানাই নয়– ডঙ্কা, কুয়ার্গা (দামামা), দুহুল (দু’-মুখো ঢোল), কর্না (বড় আকারের সানাই), নাফির (পিতলের সানাই), সাঞ্জ (ঝাঁঝ), পিতলের শিঙা– এ সবই ছিল নহবতখানার বাদ্য। এছাড়া এ-ও স্মরণীয় যে, নবাব যখন ‘জুলুশ’ বা মিছিল নিয়ে জনসমক্ষে যাত্রা করতেন, সেই জুলুশে সমবেতভাবে যন্ত্রসংগীত পরিবেশন করতেন নবাবি বাদ্যকররা। বাদ্যগুলির নাম এ কারণেই উল্লেখ করা যে, খেয়াল করলে দেখা যাবে, একই ধরনের কতগুলি বাদ্যই পরবর্তীকালে গড়ে তুলবে আজকের ব্যান্ডপার্টির মূল বাজনা-সমবায়। কারণ উনিশ শতকের শেষার্ধে এসে বদলাতে শুরু করবে বাদ্যযন্ত্রের রুচি; ইংরেজি সুরের প্রভাব পড়বে দেশোয়ালি সহজ সুরে। দেশি বাজনদারদের সঙ্গে সঙ্গে, বিদেশি বাজিয়ের আনাগোনা শুরু হবে। সাগরপাড় থেকে আসবে ব্রিটিশ মিউজিকাল ট্রুপ। তৈরি হবে বেশ কয়েকটি ‘ব্যান্ড স্ট্যান্ড’। কারণটি অনুমেয়, আগেই বলেছি– ‘টাইটিল’।

বাদ্যকর। আলোকচিত্র: বিজয় চৌধুরী

‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’-এ (আদিপর্ব) নীহাররঞ্জন রায় জানাচ্ছেন, ইংরেজ সরকারের আমলে বিহার, উত্তরপ্রদেশ থেকে বেশ কিছু মানুষ কাজের জন্য কলকাতায় এসে পড়েছিলেন। তাঁরা স্থানীয় বাদ্যকর। কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বাজনা বাজিয়ে উপার্জন করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল। এঁদের বলা হত ‘বাইন’। পরবর্তীকালে এঁরা জমিদারদের চোখে পড়ে যান। নিজেদের বংশগৌরব, ঐতিহ্য, আভিজাত্য, অর্থ-ঐশ্বর্য ও কৌলিন্যের প্রচারে জমিদাররা এঁদের ব্যবহার করতে শুরু করেন। কারণ সাধারণ মানুষের মধ্যে এঁদের জনপ্রিয়তা। বদলে ভরণপোষণের ভার, নিষ্কর জমি ভেট পাওয়া ইত্যাদি সুবিধা পেতেন বাইনরা। অল্পদিনের মধ্যেই অনেকে এই পেশায় আসতে শুরু করেন। স্বাধীনতার পর আরও বেশি করে। বিহার, উত্তরপ্রদেশের বহু শিক্ষিত বাজনাদার কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস করে এই পেশায় নিযুক্ত হন। পরে এ শহরের বাঙালিরাও, পেশার টানেই, ভিড়ে পড়েন দলগুলিতে। তৈরি হতে থাকে ব্যান্ডপার্টি। কলকাতায়, সংগঠিত আকারে মিউজিকাল ব্যান্ড শুরু হয়েছিল আঠেরো শতকের শেষদিক থেকেই। কলকাতা তখন– যাকে বলে, বাবু কলকাতা। হিন্দুস্থানি সংগীত। বাইজি সংস্কৃতি। জাঁকজমক আর আভিজাত্যের দেখনদারি। গঙ্গাস্নানযাত্রা থেকে পুতুলের বিয়ে– সবেতেই শোভাযাত্রার চাকচিক্য। প্রথমদিকে এই সমস্ত শোভাযাত্রাগুলোতেই ব্যান্ডওয়ালাদের ভিড় জমতে শুরু করে। বাদ্যযন্ত্র সামান্যই। দেশি ঢাক-ঢোল, কাঁসা, করতাল। পরবর্তীতে বাঁশি অর্থাৎ লাটুবাবুর ‘ফুলোট’, সানাই। ট্রুপের কলেবর বৃদ্ধি পেতে শুরু করল। ঝলমলে পোশাক, গ্যাসবাতির আলো। ব্যান্ডপার্টি হয়ে উঠল আভিজাত্যের শিলমোহর। এবং আশ্চর্য এ কলকাতার মধ্যেই তখন আরেকটা কলকাতা আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করেছে। শহরের পেটের ভিতর বড় হচ্ছে স্বদেশি আন্দোলনের ভ্রুণ। মিটিং-মিছিল, অধিবেশন, জন-সংযোগ। খেয়াল করলে দেখা যাবে, এইসময় যে সমস্ত ব্যান্ডগুলি গড়ে উঠেছিল, তাদের অধিকাংশের নামই জাতীয়তাবাদী। আজাদ ইন্ডিয়া, বেঙ্গল ন্যাশনাল, ভারত ব্যান্ড। পতাকায় জাতিয়তাবাদী লোগো। একটা দীর্ঘ সময় ধরে এদের নির্বাচিত গানের অধিকাংশই ছিল দেশাত্মবোধক গান। স্বাধীনতার পরেও ‘চল্‌ চল্‌ চল্‌’ কিংবা জাতীয় সংগীত ছিল অন্যতম জনপ্রিয় পিস। এভাবেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইতিহাস জুড়ে গিয়ে বৃহত্তর ইতিহাসের প্রেক্ষাপট রচনা করে। গতায়ু কালের পলি তার গায়ে লেগে থাকে জীবাশ্মের মতো।

ব্যান্ডমাস্টার, আলোকচিত্র: বিজয় চৌধুরী

এ বাংলার পাশাপাশি পুব বাংলার ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল ইত্যাদি এলাকাতেও গড়ে উঠেছিল ব্যান্ডপাড়া। ঢাকার আদি বাদক দলের ইতিহাস শুরু হয়েছিল বাদশা জাহাঙ্গীরের আমলে, আলুবাজার বা ‘আল্লুর বাজার’ অঞ্চলে। জনশ্রুতি আছে, ব্যান্ডপার্টি ছাড়া একসময় কোনও ঢাকাইয়া বিয়ে হত না। লাল, নীল, বেগুনি, হলুদ বাহারি পোশাক। টুপিতে গোঁজা পালক। ড্রাম আর ট্রাম্পেটের সম্মিলিত আওয়াজ শুনলেই শোভাযাত্রা দেখতে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসত ছেলেবুড়ো সকলেই। নয়ের দশক অবধি কেবল ঢাকা নয়, এপার-ওপার দুই বাংলার অধিকাংশ বিবাহেই এই ছবিখানা দেখা যেত। গাঁ-মফস্‌সলে ছিল তাসাপার্টি। ব্যান্ডের অবজ্ঞায়িত সংস্করণ বলা চলে। মফস্‌সলি বিবাহযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। গরুর গাড়ির কনভয়। কলের গান। ঝলমলে পোশাকের ঔজ্জ্বল্যহীন, আলোর রোশনাই-বিহীন গরিবগুর্বো মানুষের বাজনার দল। মূলত তালবাদ্য। উচ্চগ্রামের আবহসংগীত।

ব্যান্ডওয়ালা, শিল্পী: কিষেন খন্না

কলকাতা কিংবা ঢাকা– দু’ ক্ষেত্রেই বর্তমান ছবিটা খুব একটা আশানুরূপ নয়। মোহাম্মদ খাঁ প্রতিষ্ঠিত ঢাকার বিখ্যাত ‘ঢাকা ব্যান্ড পার্টি’ বর্তমানে তিনটি শাখায় ভেঙে তিনখানা টিমটিমে দোকানঘর। কলকাতার একসময়ের বিখ্যাত ব্যান্ডগুলি প্রায় ধুঁকছে। পঞ্জাব, ক্যালকাটা, মেহবুব, মিলন, মনসুর– কোনওক্রমে টিকে রয়েছে ভাড়া করা পার্ট-টাইমার কিংবা শখের বাজনদারদের নিয়ে। মূলত শ্রমজীবী মানুষ। অধিকাংশই অবাঙালি। ঠিকে শ্রমিক, জুতো সারানেওয়ালা, কুলি, ফলওয়ালা, রিকশাওয়ালা, ঠেলাওয়ালা, দিনমজুর, রং মিস্তিরি, বাসের হেল্পার। কেউ বা দেহাতে চাষবাস সামলান। সিজনে আসেন, বুকিং হলে। অক্টোবর থেকে মার্চ। দুর্গাপুজো, কালীপুজো, বিসর্জন, বিয়ে, পার্টি। কখনও পরেশনাথের শোভাযাত্রা, নবদ্বীপের রাস, চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী। ওপার বাংলায় রয়েছে ওরশ কিংবা বিজয় দিবস। পারিশ্রমিক কমেছে তুলনায়। দেওয়াল জুড়ে সাজানো বাপ-ঠাকুরদার আমলের সাদাকালো ফটোগ্রাফ। সেই কবেকার বিহারের শরীফ। পরিযায়ী গানওয়ালাদের ইতিহাস। কাচের শো-কেসে রঙিন টুপি, পিতলের তৈরি বাদ্যযন্ত্র। মিরাট থেকে আনা ক্ল্যারিওনেট, ফ্লুট, বেস ড্রাম, জ্যাম্বো স্যাক্সোফোন। সিজনে কখনও-সখনও ঝটিতি মহড়ার দৃশ্য। মাপকানা ইউনিফর্ম। ভাঙাচোরা কতগুলো মানুষের সমবেত রাজবেশ। বিউগল বেজে ওঠে। বেজে ওঠে ট্রাম্পেট। ট্রা রালা লি রালা লা। ঠিক চাবি হাতে দেখি খুলে যায় তালা। তুষার রায়ের কথা মনে পড়ে। ব্যান্ডমাস্টার। মনে পড়ে কিষেন খন্নার ছবি। চোখমুখআনন্দবেদনাঅনুভূতিহীন কতগুলো সুসজ্জিত ম্যানিকুইন। রাজপথ আলো করে চলেছে। শান-ও-শওকত। রাতের অন্ধকার কেটে বেরিয়ে আসছে রক্ত উর্দি, কাঁধের অ্যাপোলেট– পিতলের ঝালর। ঘনকৃষ্ণতনু ক্ল্যারিওনেট। উজ্জ্বল সোনালি কটিবন্ধে চিকন বাগপাইপার। ট্রা রালা লি রালা লা। দেড়শ টাকা রোজ। ট্রা রালা লি রালা লা। বড়বাজারের গুমটিতে ঠাসাঠাসি। ট্রা রালা লি রালা লা। সস্তা মদ। ট্রা রালা লি রালা লা। কোলের উপর রেখে মুছে নেওয়া পিতলের ধুলোর প্রলেপ। আয়রনি অফ সেলিব্রেশন। তীক্ষ্ণ, প্রবল বাজনার আড়ালে ঢেকে রাখা জীবনের নৈঃশব্দ্য। ঢেকে রাখা অর্থচিন্তা। কেবল ছুটে চলা। রাক্ষসবাদ্য হাতে, নেশুড়ের মতো। মনে পড়ে, বিজয় চৌধুরীর স্মৃতিচারণে সাকিব আলির কথা: ‘এই লাইনের কত ফ্লুট বাজানেওলা যে টিবি রোগে মারা গেছে তার হিসেব নেই! বিলকুল বিনা ইলাজে!’ মেফিস্টো! একটা নেশার পিছনে ধাওয়া করতে করতে, নাচতে নাচতে, নাচাতে নাচাতে, মারতে মারতে, বাঁচাতে বাঁচাতে– ‘একদিন কা সুলতান’– আমাদের ব্যান্ডমাস্টার, হয়তো একদিন লাটুবাবুর মতোই বলে উঠবেন: ‘কালেস্তারা কি মশায়? দস্তুরমত কল্‌সাট।’ জীবন তো কল্‌সাটই!