
এমন কথাই বলেছিলেন জোসেফ ব্রডস্কি। দেখা গেল বইমেলায় জ্বলজ্বল করছে এ-কথা। তৃতীয় দিন বইমেলায় গরম বেশি। প্রথম শনিবার। হল্লাও বেশি। হয়তো বিক্রিও। মেলার মাঠে ধীরে ধীরে নতুন, টাটকা বই ঢুকে পড়ছে। পাঠকেরাও আহ্লাদিত। কেউ কেউ দাম দেখে আঁতকেও উঠছেন। সব মিলিয়ে মেলা জমে উঠেছে। আজ রবিবার, কাল সাধারণতন্ত্র দিবসের ছুটি। আমাদের যদিও ছুটি নেই। বইমেলায় রোজ আমরা থাকছি। থাকছে আমাদের কড়চাও। পড়বেন কিন্তু!
বইমেলার তৃতীয় দিন। বই-ঝলমলে দিন। মেলার মাঠ বেশ সরগরম। লোকসমাগমও গত দু’দিনের তুলনায় বেশি। বিকেল পর্যন্ত তেমন টুপি-সোয়েটারের দেখা মিলল না। সন্ধে পেরতেই কেউ কেউ শালে নিজেকে জড়িয়েছেন। নতুন, টাটকা বই প্রেস থেকে এসে পড়ছে এইবেলা। কেউ কেউ এখনও বিরস বদনে বলছেন, ‘ছাব্বিশের পর দেখা যাক’। আশা করি, তিনি ছাব্বিশের ভোটের কথা বলছেন না। স্টল থেকে বেরিয়ে এসে নবীন প্রকাশককে দেখা গেল ফোনে তিতিবিরক্ত হয়ে প্রেসমালিকের সঙ্গে তরজায় মেতেছেন! সেসবের থেকেও আশ্চর্য ও মায়াবী ‘সে কিছু বলতে চায়’ প্রকাশনা সংস্থাটি। হাতে ফ্লুরোসেন্ট ব্যাগ, ব্যাগে বই এবং সেই ব্যাগ নিয়েই বইমেলার মাঠে নানা জায়গায় ‘স্টপ’ দিচ্ছে তারা। সায়ন্তন সেন ও সৃজনী গঙ্গোপাধ্যায় পরিচালিত এই প্রকাশনা সংস্থার ছাপাছাপি যথেষ্ট রুচিশীল, মার্জিত। অরিত্র সান্যালের কাব্যগ্রন্থ, কৌশিক সরকারের উপন্যাস ইত্যাদি বই তাঁদের ঝুলিতে। তাঁদের কাছে আর্জি– বইভরা ব্যাগটিতে যদি প্রকাশনা সংস্থার নাম থাকত, তাহলে উৎসাহী পাঠক নিশ্চিতভাবে তাঁদেরও কিছু বলতে চাইতেন।

সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষ এ বছর। স্কুলপাঠ্যের বাইরে ততটা কি সেলিব্রেটেড সুকান্ত? সুকান্ত সমগ্রর সেই একটুকরো ছবিটি যদিও অনেক পড়ুয়ারই মনে থাকবে। পূর্ণেন্দু পত্রী, একবার জানিয়েছিলেন সেটিই তাঁর করা প্রথম প্রচ্ছদ। সুকান্ত-প্রসঙ্গে আসার কারণ ‘যাপন’ প্রকাশনীর একটি চমৎকার উদ্যোগ। সুকান্ত ভট্টাচার্যর ‘আকাল’ কাব্যগ্রন্থটি (১৯৪৪) তারা ‘ফ্যাক্সিমিলি’ করে, যথাযথ প্রাচীন রূপটিকে বজায় রেখে ছেপেছেন। চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্যের আঁকা সেই প্রচ্ছদটিও রয়েছে অবিকল। দামও অতি সুলভ, মাত্র ৫০!

বাংলায় লেখা ‘ষ্টল নং: ৬৩০’ আর ইংরেজিতে ‘Stall No.- 330’! এহেন বিচিত্র সংখ্যাদর্শনে থমকে যাওয়াই রীতি। তবে তার চেয়ে ভালো বস্তু জুটল নামপাটার নীচে। লেখক জোসেফ ব্রডস্কি-র একটি কোটেশন: ‘বই পোড়ানোর চেয়েও গুরুতর অপরাধ অনেক আছে। সেগুলোর মধ্যে একটা হল বই না পড়া।’ তা দেখেই কি না, জানি না, মেলার মাঠে, ঘাসের সজ্জায় এক নিবিড় পাঠককে দেখা গেল। সদ্য শীত ফুরনো রোদ্দুরে, তাঁকে দেখেই মনে হল– বসন্ত এসে গেছে। হাঁটতে হাঁটতে আরেক এলাকায় একদল ছেলেমেয়ে গিটার বাজিয়ে গানবাজনা করছে। যাক, মেলা তবে জমে উঠেছে! ফুডকোর্টের আশপাশে ভিড় বেশ ভালোই। তবে খাদ্যের স্বাদ তেমন সুখকর নয়। নেহাত মূল উদ্দেশ্য বই কেনা, নইলে এহেন নিরেট ফিশফ্রাই বা চিকেন কাটলেট বাঙালি বাংলাভাষার শত্রুর চাঁদি লক্ষ্য করেই মারত!

ভোট আসছে। দেওয়াল লিখনের সময়। বেশ কয়েক বছর আগে শুভেন্দু দাশগুপ্তর ‘দেওয়াল লেখার আত্মকথা’ বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘মনফকিরা’ থেকে। অত্যন্ত চমৎকার ছিল সেই বইয়ের কথা বলার ধরন, ছবির চাল। কিন্তু হায়, সে বস্তু দীর্ঘকাল অমিল। এ বছর ‘সুপ্রকাশ’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে অনন্ত জানার ‘দেয়ালের লেখা’ বইটি। ছবি, নামপাটা, বিজ্ঞাপন, রাস্তার শিল্প, পোস্টার, গ্রাফিত্তি সব মিলিয়ে এই বই একটি আন্তরিক আখ্যান, যেখানে শিল্পইতিহাস চলতে থাকে সমান্তরালে। কখনওসখনও শিল্পইতিহাসই হয়ে উঠেছে মুখ্য, ব্যক্তিগত কথাবার্তা চলে গিয়েছে আড়ালে-আবডালে। বহু ছবি রয়েছে এই বইতে, সবই সাদা-কালো– কয়েকটি রঙিন পৃষ্ঠা যদি ছবির জন্য বরাদ্দ থাকত, তাহলে পাঠক হয়তো ইতিহাসের স্পর্শ আরও নিবিড়ভাবে পেতে পারতেন।

প্রাচীন, শতবর্ষ পুরনো প্রকাশনাগুলির একটি সমস্যা গত কয়েক বছর ধরেই গজিয়ে উঠেছে। তা হল, পুরনো প্রিন্টের বই আজকের বাজারে এসে তারা আর পুরনো দামে দিতে পারছে না। ফলে দামের জায়গায় স্টিকার লাগিয়ে নতুন দাম ধার্য করেছেন। দুঃখের কথা, কিছু কিছু জায়গায় ‘সডাক’ বা ‘বিদেশে’র দাম উঁকি মারছে। ধরা যাক, স্টিকারে লেখা মূল্য, ১৫০ টাকা। এদিকে সডাক কিংবা বিদেশে– মূল্য ৩ টাকা! স্টিকারটি খানিক দীর্ঘায়িত করা গেলে বোধহয় নতুনত্বের স্বাদ যথাযথভাবে পাওয়া যাবে। যদিও এই উগ্র হিন্দুত্ববাদের ভারতে, ইতিহাস পড়িমরি করে বুজিয়ে দেওয়ার কূটকৌশলই সুপারহিট! নেত্রা মুখার্জি অনূদিত রোমিলা থাপারের বই ‘অতীত নির্মাণের রাজনীতি’ তাই এই দুঃসময়ে জরুরি হয়ে ওঠে। আনন্দরূপ চক্রবর্ত্তী-কৃত সম্পাদকীয় টীকা বইটিকে আরও খাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। শুধুমাত্র লিখনভঙ্গিমা, বিশ্লেষণ কিংবা স্বচ্ছ গদ্যরীতিই নয়, বইয়ের সম্পাদকীয় টীকা অংশে অত্যন্ত চমকপ্রদভাবে ব্যবহৃত হয়েছে ‘নিষিদ্ধ’, ‘বাজেয়াপ্ত’ বইগুলির কিউআরকোড! আনন্দরূপ চক্রবর্ত্তীর আরেকটি কাজ ইউসুফ সইদের ‘পার্টশনিং বাজার আর্ট: পপুলার ভিজুয়াল কালচার অফ ইন্ডিয়া অ্যান্ড পাকিস্তান অ্যারাউন্ড ১৯৪৭’-এর অনুবাদ ‘দেশভাগে বাজার শিল্প’। ১৬টি ছবি-সহ এই বই পড়তে লোভী পাঠকের বড়জোর একবেলা লাগবে, কিন্তু ‘সময়ের ধ্বংসাবশেষ’ কাকে বলে, তা চিহ্নিত হতে থাকবে এই বই পড়ার পর থেকেই। দু’টি বই-ই একলব্য প্রকাশনীর।

দুই কে সি পাল বাজার মাতিয়েছেন। একজন ছাতার ব্যবসায়ী, আরেকজন বলে চলেছেন সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। কিন্তু এ সি পাল? চট করে নাম বললে, তেমন কেউ কি খেয়াল করতে পারবেন? এই বইমেলার পর, হয়তো কেউ কেউ ‘এ সি পাল’ বললে, ঠিক সিধুজ্যাঠার মতো বাতলে দিতে পারবে, তাঁর পরিচয়। আপনাদের এখানেই জানিয়ে রাখি, হোলসেল বা রিটেল কাগজ বিক্রেতা তিনি। নোটখাতা, এক্সারসাইজের খাতা, হিসেবপত্রের খাতাও তাঁর দোকানে তৈরি হত। ঠিকানা ছিল ৩৪ কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, কলকাতা। এক্সারসাইজ খাতা, যার নাম ‘দ্য ইউনিভার্সাল এক্সারসাইজ বুক’– তার পিছনে ক্যালেন্ডার, রুটিন, এমনকী, একটি সিমলা স্ট্রিটের একটি প্রেসের বিজ্ঞাপনও। না, আজকের খাতার মতো সহজে পিন-মারা নয়, মেরুদণ্ডে সেলাই। বইমেলার কড়চায় হঠাৎ কেন এ সি পাল নিয়ে এত কথা? এসব বলার কারণ ‘প্রতিক্ষণ’-এর ‘Poems by Jibanananda Das, Calcutta– 1925.’ জীবননান্দ দাশ ১৯২৫ সালে, এই এ সি পালের এক্সারসাইজ খাতাতেই লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। তা পুরোদস্তুর সেই অবয়বে হাজির করেছে ‘প্রতিক্ষণ’। মূল পাণ্ডুলিপিটিকে অক্ষত রেখে, হরফে মুদ্রিত আরেকটি বই তৈরি করেছেন, অভিজিৎ গুপ্ত-র চমৎকার ‘পরিশেষ’-সহ।

তৃতীয় দিনে, এক পাঠকের দুঃসহ ইয়ার্কি দিয়ে শেষ করি। এক পরিবেশ সচেতন ভদ্রলোক নদী সংক্রান্ত বেশ কিছু বই বগলদাবা করে কাউন্টারে এসেছেন। সঙ্গে তাঁর বখাটে ও দেদীপ্যমান বন্ধু। কাউন্টার থেকে বলা হল, বিল হয়েছে প্রায় ২৭০০ টাকার মতো। ভদ্রলোক অনলাইনে বিল মেটাবেন বলে, মানিব্যাগ বের করেছেন, এই সময় পাশ থেকে বন্ধু বলে উঠল: ‘তোমার সব টাকা জলে গেল।’

রবিবারের মেলা, জমিয়ে ঘুরুন, বই দেখুন, কিনুন। গল্পগুজব করুন। কড়চা আবার আগামিকাল। হে পাঠক অলমাইটি, আজকের মতো অলমিতি।
বইমেলার কড়চা পড়ুন
দ্বিতীয় দিন: মালিককে গিয়ে বল, ‘বইমেলা’ এসেছে!
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved