Robbar

অনর্গল বইয়ের খোঁজে

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 28, 2026 1:35 pm
  • Updated:January 28, 2026 1:36 pm  

যে বইমেলায় একটা বই বেরলেই, খানিক বিক্রিটিক্রি হলেই, তরুণ লেখক ভাবেন, পরের বইয়ের আগে অগ্রিম পুরস্কার তাঁর প্রাপ্য, যে বইমেলায় স্টলের নিচে লেখা থাকে ফেসবুকের ফলোয়ার সংখ্যা, যে বইমেলায় রোবটের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করতেও ভিড় হয়, যে মেলা অফুরন্ত সেলেব-সেলফি শিকারোৎসব– সেই মেলায় এক প্রবীণ শিল্পী, বাংলা সাহিত্যের প্রচ্ছদ-অলংকরণের ইতিহাস সংরক্ষক ও লিখিয়ে আত্মপরিচয় যতসম্ভব ঝাপসা করে দিয়ে বলছেন, ‘ওই আর কী।’

প্রচ্ছদে সুবর্ণরেখার স্টলে প্রণবেশ মাইতি

রোববার ডিজিটাল ডেস্ক

ষষ্ঠ দিন। পাতি মঙ্গলবার, জঙ্গল সাফ করার দিন। বইমেলার ভিড় আমদিনের তুলনায় খানিক বেশিই ঠেকল। বিক্কিরি কী হচ্ছে কে জানে, গিল্ড তো ব্যোমকেশ বক্সী, শেষ বেলায় রহস্য়োপম ঘোষণা– বিক্রিবাটার হিসেবনিকেশ! এই ব্রেকিং নিউজের বাজারে একটা ‘ডেইলি আপডেট’ থাকলে মন্দ হত না! মন্দ হত না, বইমেলায় যাঁরা বই কিনতে এসে হারিয়ে ফেলেছেন বই– কী কী বই, তারও যদি একটা ফর্দ বানানো যেত। মেলার মাঠে ঘোষণা করা হত ধরে ধরে। শুধু কচি খোকাখুকু, বাইকের চাবি, হাবিজাবি জিনিসপত্র হারিয়ে গেলে ঘোষণা? বই হারালেও মস্ত করে ঘোষণা হওয়া উচিত। তারপর না-হয় কয়েকশো বইপোকা লালমোহনবাবুর মতো ‘এটা আমার’ বলা প্র্যাকটিস করতেন, সে আলাদা কথা!

পোস্ট অফিস এখন বইমেলাতেই!

বই কেনার ব্যাপারে অসংযমী, দুবলা স্বাস্থ্যের এক মগ্ন পাঠিকাকে এ দিন মেলায় দেখা গেল। দু’কাঁধে দুঃসহ ভার, মুখে স্মরণীয় হাসি। বাধ্যত, ভারে ও ভিড়ে, তাঁর শ্লথ চলাতেই আনন্দ। বইমেলায় ইন্ডিয়া পোস্টের স্টল থেকে নিজের ঠিকানায় বই পাঠালেন। তারপর হাত-পা ঝাড়া, ফের স্বমহিমায় স্টলাভিমুখে। এক অভিজ্ঞ দার্শনিকের এ ব্যাপারে মহিমময় উক্তি: ‘পোস্ট-মর্ডান ব্যাপারস্যাপার’।

রাবণ-এর স্টলে এবার শঙ্কাকাণ্ড! কী নেওয়া যায়, আর কী-ই বা আপাতত স্থগিত রইল– সে নিয়ে পাঠকমনে ধুন্ধুমার! হিমানীশ গোস্বামীর ‘যখন বাঙাল ছিলাম’, হিমানীশ-কন্যা হৈমন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুরনো কাসুন্দি’, কৃষ্ণ শর্বরী দাশগুপ্তর ‘চোরকাহন গন্ধপুলিশ এবং অন্যান্য’– একের পর এক সরস প্রোডাকশন। ‘পুরনো কাসুন্দি’ থেকেই জানতে পারা যায়– নিউ মার্কেটে ভালো হ্যাম পাওয়া যেত বলে ‘হ্যামবাজার’ বলতেন হিমানীশ গোস্বামী। শক্তি চাটুজ্জে পরিমল গোস্বামীর কাছে লেখা চেয়েছিলেন স্টেপ জাম্প করে ‘তুমি’ সম্বোধনে, অতঃপর বিরক্তি ও আরও পরে– ভালোবাসাবাসি। ‘যখন বাঙাল ছিলাম’-এ জ্যেষ্ঠের ঝড়, রতনদিয়া গ্রাম, ত্রৈলোক্যনাথের রসবোধ, ইলিশ মাছ, মামাবাড়ির নানা গপ্পগাছা মিলিয়ে হিমানীশ গোস্বামীকে স্পর্শ করা যায়। আলোছায়াভরা স্মৃতিই শেষ কথা নয়, এমন টলটলে বাংলা গদ্য বাঙালি কি আজকাল লেখে? কৃষ্ণ শর্বরী দাশগুপ্তর তাঁর পদ্মলুচি খাইয়ে পাঠককে আহ্লাদিত করেছিলেন, এবারেও তাঁর সরু হিউমারে পাঠক ঘায়েল হবেন আশা করা যায়। এই তিনটি বইয়েরই প্রচ্ছদ করেছেন কৃষ্ণেন্দু চাকী। ‌‘পুরনো কাসুন্দি’-তে টুকরো স্কেচ স্বয়ং লেখিকার।

হাট্টিমাটিমটিম, এখন পাড়ায় পাড়ায় জিম। কে না জানে, স্বাস্থ্যই সম্পদ, যদিও উত্তরাধিকার নেই। বাঙালিও চপ-শিঙাড়া-কচুরি ছেড়ে ওটস, মিলেট, রাগি, স্যালাড– এয়ার ফ্রায়ারে রান্না– মোটামুটি যা জিভের ইতিহাসখানাই বদলে ফেলতে চাইছে। নিরোগ, দীর্ঘায়ু হওয়ার এই ইচ্ছেকে মোটেই খাটো করে দেখছি না আমরা। তবে সেই স্বাস্থ্যসচেতন বাঙালির জন্য মার্কেটে একটি বাজারের ব্যাগ এসেছে। হাতের তালুর মতো। ছোট্টপানা। বইমেলায় এহেন বাজারের ব্যাগ মিলছে। খোলসা করি, ‘ল’– একটি মিনি লিট্‌ল ম্যাগাজিন। তাদের এবারের সংখ্যা বাজার। গতবার, তাদের ‘রেডিও’ বাজারে বেশ বেজেছিল। এবারে ওই একমুঠো ব্যাগে টাটকা ‘বাজার’। বৈঠকখানা রোডের সাদা-কালো চমৎকার ছবি ছাড়াও, বেশ কয়েকটি স্কেচ মিলে, গড়নে ও বয়ানে পটু। করুণাময়ী মেট্রোতে উঠে আড়াল বেছে পড়তে শুরু করলে ধর্মতলা কিংবা হাওড়া স্টেশনে বাজার পড়া ফুরুৎ! বই পড়ুয়া বাঙালি ডায়েটে এমন বাজারই চায় হয়তো। ব্যাগ নিয়ে কথাই যখন হচ্ছে, বলে নেওয়া ভালো, বইমেলায় এবার অজস্র জুট জুটেছে। দামও নাগালের মধ্যে। পৃথিবীটা যদি আরেকটু বেঁচেবর্তে থাকে, মন্দ কী, একবার ঢুঁ মেরে দেখতে পারেন ছড়িয়ে থাকা নানা জুটের স্টলে।

বইমেলায় চিরকালই সুবর্ণরেখা একটু ‘স্টার’ গোছের। পুরনো সিনেমার পোস্টারে যেমন ‘এবং উত্তমকুমার’– ওই ‘এবং’ কেমন জুড়ে গিয়েছে সুবর্ণরেখা-র ইতিহাসের সঙ্গে। যদিও শান্তিনিকেতনের বইখুপরিটি কেমন বিষণ্ণ, নিষ্প্রভ। সুবর্ণরেখা-র ইতিহাস নানামুখে শুনে বাঙালির তাকে প্রায় পুরনো বইয়ের কল্পতরু বলেই মনে হওয়া স্বাভাবিক। দুষ্প্রাপ্য পুরনো মুদ্রণ/সংস্করণের বইপত্তর ফেসবুক গিলে নেওয়ার আগে তাদের স্টক দুরন্ত ছিল বলে আক্ষেপ করলেন এক কর্মী। তাতেও অবশ্য কেউ কেউ দমেন না। যেমন প্রণবেশ মাইতি! বয়স ৮৫ ছুঁই ছুঁই। সূর্য ‘চললাম’ বলে তখন হাঁটা লাগিয়েছে ঢের পশ্চিমে। সেসময় সুবর্ণরেখার নানা বস্তাভরা বইয়ের স্তূপ পেরিয়ে প্রণবেশ মাইতিও ঝাঁপ দিয়েছেন শেষ প্রান্তে। ছোটদের রামায়ণ, জগন্নাথ চক্রবর্তীর কবিতার বই, বিবিধার্থ সংগ্রহ– আরও দু’-চারখানা বই হাতড়ে বের করেছেন। তাঁর থেকে বয়সে ১০-১২ বছরের ছোট এক ভদ্রলোক, কিতাব-অন্বেষণে সেকেন্ড। ভদ্রলোক জানালেন প্রায় ৫০০ কবিতার বই তিনি ‘ডিজিটাইজ’ করেছেন! প্রণবেশ মাইতির কাজকম্মো সম্পর্কে তেমন অবগত নন। কথায় কথায় ফোন নাম্বার সেভ করার সময় নাম ‘প্রণবেশ মাইতি’ শুনে বললেন, ‘আপনি তো আর্টিস্ট না? প্রচ্ছদে আপনার নাম দেখেছি বোধহয়।’ প্রণবেশ মাইতি এতটুকুও বিস্মিত না হয়ে নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিলেন, ‘ওই আর কী।’

সুবর্ণরেখার স্টলে প্রণবেশ মাইতি

কী আশ্চর্য, কী অপরূপ ‌‘ওই আর কী’! যে বইমেলায় একটা বই বেরলেই, খানিক বিক্রিটিক্রি হলেই, তরুণ লেখক ভাবেন, পরের বইয়ের আগে অগ্রিম পুরস্কার তাঁর প্রাপ্য, যে বইমেলায় স্টলের নিচে লেখা থাকে ফেসবুকের ফলোয়ার সংখ্যা, যে বইমেলায় রোবটের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করতেও ভিড় হয়, যে মেলা অফুরন্ত সেলেব-সেলফি শিকারোৎসব– সেই মেলায় এক প্রবীণ শিল্পী, বাংলা সাহিত্যের প্রচ্ছদ-অলংকরণের ইতিহাস সংরক্ষক ও লিখিয়ে আত্মপরিচয় যতসম্ভব ঝাপসা করে দিয়ে বলছেন ‘ওই আর কী।’ যদিও সেই ‘ডিজিটাইজ’ বাঙালিকে রোববার.ইন-এর তরফে যখন প্রশ্ন করা হয়, ‘আপনি কি প্রচ্ছদগুলোও ডিজিটাইজ করেছেন?’ তখন তিনি উত্তর দিয়েছেন, ‘না, নিজে বানিয়ে নিয়েছি।’ ইতিহাসবিস্মৃত বাঙালি তাও ঠিক আছে, কিন্তু ইতিহাসের এরকম বেহায়া বিনির্মাণ কি বর্তমান ভারতের যুগলক্ষণ?

কাকতালীয় ৬

৫ নম্বর গেটের বাইরে, রাস্তার ওপারে, শিল্পীদের ব্যবসার ঠেক নাকি তুলে দেওয়া হয়েছে একপ্রকার জোর করেই! মেলার মধ্যেই এককালে শিল্পীরা বসতেন। এখন, এমনকী, বাইরেও তাঁরা বসতে পারবেন না? বইমেলায় যে মুক্তির স্বাদ ছিল, যে অফুরন্ত রংমশাল ছিল, তা কি নিয়মাধিক্যের হঠকারিতায় ক্রমেই তেতো হয়ে যাচ্ছে না? শুধুই বই কেনার এক একঘেয়ে খুপরিতে আমরা যেন আটকে না পড়ি। নতুন-পুরনো বই হাতে, একটু হেঁটে গেল যেন শুনতে পাই ঘাসলগ্ন গান, দেখতে পাই পটের ছবি, স্পর্শ করতে পারি হরেক কিসিমের ডায়েরি, স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি যেন লাইভ পোর্ট্রেটের জন্য। বিস্মিত আর স্বপ্নময় লিট্‌ল ম্যাগের এবড়োখেবড়ো তরুণ কবিকেও যেন দেখতে পাই– যে তাঁর দূরপাল্লার একফর্মা ফেলে রেখেছে বাংলাভাষার অগণন দূর্বাদলে।