
নতুন সমুদ্র-সৈকত আবিষ্কারের উত্তেজনায় ১৯২১ সালে তিনি বেলদা হয়ে কাঁথি এসে হাতির পিঠে চড়ে বীরকুল গ্রামে পৌঁছন। তখনকার সমুদ্রতীর আজকের দিঘা থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে ছিল। দিঘা প্রথম দর্শনেই স্নেথকে মুগ্ধ করেছিল। বলা ভালো, এই অকৃতদার, প্রকৃতিপ্রেমী ব্রিটিশ দিঘার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। সেই প্রেম এতই গভীর যে, তিনি দিঘায় স্থায়ী বাসস্থান বানানোর কথা ভাবেন।
বাংলাতে ভ্রমণবিলাসীদের জন্য অতি পরিচিত একটা শব্দ– দীপুদা। অর্থাৎ, কি না দিঘা, পুরী আর দার্জিলিং। হাঁটি হাঁটি পা পা বাঙালি, যার হয়তো সবে ভ্রমণে হাতেখড়ি– এই তিনটে জায়গায় একবার না একবার সে গিয়েই থাকে। এর মধ্যে কলকাতার সবচেয়ে কাছে দিঘা, যার পূর্ব ইতিহাসও ভারি চিত্তাকর্ষক। একবার বরং চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক, সেই ইতিহাসে, একবার বরং মনে করা যাক, সেই সব মানুষ, যাদের হাত ধরে এক সময়ের জনহীন এক সমুদ্র-সৈকত আজ পরিণত হয়েছে বাঙালির সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট স্পটে।

সে আঠেরো শতকের আটের দশকের কথা। ব্রিটিশরা এদেশে ঘাঁটি তৈরি করে ফেলেছেন পুরোদমে। ব্রিটেন থেকে প্রতি জাহাজেই আগমন ঘটছে ব্রিটিশদের। তাঁরা কলকাতায় নানা উচ্চপদে তো আসীন হচ্ছিলেন। কিন্তু ওই দেশের জল-হাওয়ায় অভ্যস্ত মানুষগুলোর এদেশের জলবায়ুর সঙ্গে অভ্যস্ত হতে ভারি অসুবিধে হচ্ছিল। গ্রীষ্মপ্রধান দেশে নানা রোগ তাঁদের আক্রমণ করছিল। তাই খোঁজ পড়ছিল নিরিবিলি শৈলশহর কিংবা সমুদ্রতীরের। এই জায়গাগুলো ব্রিটিশরা ব্যবহার করত ‘স্যানাটোরিয়াম’ হিসেবে। জনপ্রিয়তা পাচ্ছিল সিমলা ও দার্জিলিং।

ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস। মীরজাফরকে সরিয়ে মীরকাশিম নবাব হওয়ার পর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মেদিনীপুর জেলা উপহার দেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে। ১৭৬৩ সাল থেকে হেস্টিংস কলকাতা অঞ্চলের প্রশাসনিক প্রধান হন। সেই সূত্রে তিনি বারবার বাংলা-ওড়িশা উপকূলীয় এলাকায় সফর করেন এবং সম্ভবত সেই সফরগুলোর কোনও একটায় এই নিরিবিলি সমুদ্রতীর সন্ধানের তাগিদে কাঁথির কাছে তিনি আবিষ্কার করেন এক চমৎকার সমুদ্রসৈকত, চারপাশে ম্যানগ্রোভ অরণ্য, যা ভালোবেসে হেস্টিংস এই জায়গার নাম দেন ‘প্রাচ্যের ব্রাইটন’।

হেস্টিংস বীরকুলে নিজের একটি বাংলো নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু হেস্টিংসের জমানার পর বীরকুল ক্রমে ক্রমে পরিত্যক্ত হতে থাকে। এর কারণ ছিল বেশ কয়েকটি। প্রথমত, কলকাতা থেকে বীরকুল যাতায়াত করা ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। দ্বিতীয় কারণ ছিল, উপকূলবর্তী অঞ্চলে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়। হেস্টিংসের ‘প্রাচ্যের ব্রাইটন’ আরও এক শতাব্দী এরকম জঙ্গলাকীর্ণ, পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থাকে।
উনিশ শতকের শেষদিকে কলকাতায় আসেন সেই মানুষটি, যাঁর হাত ধরে দিঘা আবার নতুন করে যাত্রা শুরু করেছিল– জন স্নেইথ। এক আদর্শ ব্রিটিশ, অভিজাত, প্রকৃতপ্রেমী ব্যবসায়ী, তৎকালীন বিখ্যাত ‘হ্যামিলটন জুয়েলারি’ কোম্পানির মালিক। তিনি প্রকৃতিপ্রেমী হওয়ার সুবাদে নানা নির্জন কিন্তু ভ্রমণোপোযোগী জায়গার কথা তাঁকে জানাতেন তাঁর বন্ধুরা। জুয়েলারি ব্যবসার সুবাদে কলকাতা বা বলা ভালো বাংলার বেশিরভাগ অভিজাত পরিবারের সঙ্গেই ছিল তাঁর অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। সেরকম একজন ছিলেন বালিশাহীর জমিদার। তিনিই স্নেইথকে কাঁথির কাছে বীরকুল সমুদ্র-সৈকতের কথা জানান।

জানার পর আর দেরি কীসের! নতুন সমুদ্র-সৈকত আবিষ্কারের উত্তেজনায় ১৯২১ সালে তিনি বেলদা হয়ে কাঁথি এসে হাতির পিঠে চড়ে বীরকুল গ্রামে পৌঁছন। তখনকার সমুদ্রতীর আজকের দিঘা থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে ছিল। দিঘা প্রথম দর্শনেই স্নেইথকে মুগ্ধ করেছিল। বলা ভালো, এই অকৃতদার, প্রকৃতিপ্রেমী ব্রিটিশ দিঘার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। সেই প্রেম এতই গভীর যে, তিনি দিঘায় স্থায়ী বাসস্থান বানানোর কথা ভাবেন। কলকাতা থেকে দিঘা যাতায়াতের জন্য তিনি কেনেন একটি দু’-আসনের বিমান, যার প্রপেলার আজও সংরক্ষিত আছে দিঘায়, স্নেইথের বাসভবনে।

সরকার তাঁর জন্য সাড়ে ১১ একর জমি বরাদ্দ করে দিঘায়। স্থপতি এইচ. এ. ক্লয়-এর তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠে ‘রান্সউইক হাউস’। সমুদ্রপথে বাড়ি তৈরির জিনিসপত্র আনা হয়, ইট তৈরি করা হয় স্থানীয়ভাবে।

প্রেমিক স্নেইথ তাঁর প্রেমিকাকে আপন করে নিতে দিঘাতেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। গয়নার ব্যবসার দায়িত্ব দেন তাঁর ভাইপো চার্লস অ্যান্ড্রু ফ্ল্যানিগানকে। নিজে দিঘায় বসান জেনারেটর, সাজিয়ে তোলেন ‘রান্সউইক হাউস’, চাষবাস শুরু হয় দিঘায়।
ফ্ল্যানিগান প্রতি সপ্তাহে বেহালা ফ্লাইং ক্লাব থেকে বিমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে আসতেন। ব্রিটিশ আভিজাত্য ভোলেননি স্নেইথ আর তাই, ক্রমে ক্রমে তাঁর দিঘার বাংলো হয়ে ওঠে অতিথি আপ্যায়নের এক অন্যতম কেন্দ্র। এরপর স্নেইথ মন দিলেন দিঘা শহরকে ঢেলে সাজানোয় এবং দিঘাকে একটি সহজলভ্য ভারতীয় পর্যটনকেন্দ্র তৈরি করে তোলার দিকে। কিন্তু স্বাধীনতা আন্দোলনে ব্যস্ত ব্রিটিশ সরকার ১৯৪৭-এর আগে এই বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি।

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর স্নেইথের উদ্যোগ সাফল্যের মুখ দেখে আর তাঁকে সর্বতোভাবে সহায়তা করেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়। ধীরে ধীরে দিঘায় তৈরি হয় চিপ ক্যান্টিন, বে ক্যাফেটেরিয়া, শারদা বোর্ডিং ও সরকারি পর্যটন আবাস। ছয়ের দশক থেকে দিঘা পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়।
অন্যদিকে, স্নেইথের বয়স বাড়ছিল। বেশিরভাগ ব্রিটিশ ততদিনে ভারত ছেড়ে ফিরে গিয়েছেন নিজেদের জন্মভূমিতে। কিন্তু স্নেইথ যে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে পড়েছেন এই দিঘার সঙ্গে। ছেড়ে যাওয়ার কথা তো ভাবতেই পারেন না। বরং মৃত্যুর পরও এই প্রেমিকার বুকেই যেন তাঁর শেষ শয্যা রচিত হয় এই ছিল তাঁর ইচ্ছা। নিজের বাংলোর এক কোণে, যেখানে প্রতিদিন প্রথম সূর্যরশ্মি পড়ত, সেখানেই শেষ বিশ্রামের ইচ্ছা প্রকাশ করেন তিনি।

১৯৬৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন স্নেইথ। তাঁর মৃত্যুর পর ফ্ল্যানিগান ছিলেন ‘রান্সউইক হাউস’ দেখাশোনা করার দায়িত্বে। সাতের দশকে তিনি ভারত ছেড়ে ফিরে যান ইংল্যান্ডে, এক লক্ষ টাকার বিনিময়ে ‘রান্সউইক হাউস’ রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদকে বিক্রি করে।
আজ স্নেইথ বিস্মৃতপ্রায়। অবহেলায়, লোকচক্ষুর অন্তরালে, নির্জনতায় তাঁর শেষ শয্যা রয়ে গিয়েছে, আজও সূর্যের প্রথম রশ্মি ছুঁয়ে যায় সেই স্থানটি। তবু, যতদিন দিঘা থাকবে, ততদিন দিঘার সমুদ্রতটে প্রতিটি ঢেউয়ের ছোঁয়ায় লেখা হবে জন স্নেইথের নাম। দিঘার স্থপতি থেকে যাবেন তাঁর প্রাণপ্রিয় সমুদ্র-সৈকতে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved