
তিন নম্বর রো থেকে হঠাৎ ঋত্বিক। হিরণ মিত্রের স্কেচ। ফুল সাইজ পোস্টার। পঞ্চাশ টাকা। দু’ নম্বরে বই প্রকাশ। ভিড় জমেছে। কোনওমতে কবিতা পড়ছে লাজুক তরুণ। দু’জন সিকিওরিটিকে ডজ করে যে মেয়েটি এইমাত্র টেবিলে পৌঁছল, তার পিঠ থেকে উঁকি দিচ্ছে পুরনো গিটার। আরেকজন, কালো টি-শার্ট, বুকপকেটে আটকানো গোলাপি কাগজ– ‘ঠোঙা মুড়ি ঠান্ডা চপ/ তুমি যদি ভাবো আমি/ কবি নই, সম্পাদক/ ভুল হবে। বড় ভুল হবে।’ এই তো লিটল ম্যাগ। টুকরো টুকরো দৃশ্যের আনন্দভৈরবী। একে তুমি কোন মুখে ‘প্যাভিলিয়ন’ বলো হে ছোকরা!
প্রচ্ছদের ছবি: আবু সোলায়মান দরানি
বইম্যালায় আর মাটিতে বসতে দেওয়া হবে না আমাদের, সেকথা আমাদের জানানো হয়েছে গতবারই। মাটিটাই যে আমাদের জায়গা, সেটা আমরা বুঝিয়ে উঠতে পারিনি ম্যালার কর্মকর্তাদের। দেউচাপাচামিতে যে আদিবাসীদের উঠে যেতে হবে সাতপুরুষের ভিটে ছেড়ে, বুঝিয়ে উঠতে পারেনি তারাও। খবরে শুনলাম, নিউটাউনের ঝিলপাড়ে খাবার, পান-বিড়ির দোকানগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বুলডোজার চালিয়ে। আমার ঘরের জানলার পাশে একটা বোলতার চাক হয়েছে। বোলতাগুলো ঢুকে পড়ছে ঘরের ভেতর। সকালে পোকা-মারার বিষ কিনে এনেছি বাজার থেকে। চাকটা ভেঙে ফেলতে হবে অবিলম্বে।
–তাসের ঘর, দেবরূপ সরকার
৯ নম্বর দিয়ে ঢুকে সোজা গড়িয়া স্টেশন রোড। এ এলাকা মণীন্দ্র গুপ্তর নামে। বাঁয়ে ঠেক, ছোট কাগজের। গত বিশ বছরে ঠিকানা বদলাতে বদলাতে, চরিত্র বদলাতে বদলাতে মা যাহা হয়েছেন, তার পোশাকি নাম ‘প্যাভিলিয়ন’। সেদিনের ছোঁড়া। ধুলো গড়াগড়ি মাঠ থেকে আজকের সুসজ্জিত মাপা টেবিল-স্পেস। ভাড়া করা আস্তিন, ভাড়া করা ছাতা।

ঠেকের আরেক দিক জ্যোতির্ময় দত্তর এলাকা। মনে পড়ল, তিনি একবার পুরনো মেলার কর্নার প্লটে কিং সাইজ স্টল দিয়েছিলেন। ‘সোনার তরী’। স্টলের পাশে এক চিলতে মাঠ। স্টল থেকে মাঠ জুড়ে টাঙানো কাপড়ের রঙিন ফ্লাটার। বিশেষ আকর্ষণ: উঠতি কবি-গদ্যলেখকদের একটি করে পঙ্ক্তির সঙ্গে শিল্পীদের ছবির পোস্টার।
সুনীল, সন্দীপন, তুষার রায়, কমল চক্রবর্তীর লেখার সঙ্গে পোস্টার এঁকেছিলেন বিপুল গুহ, শুভাপ্রসন্ন, সুনীল দাশ, যোগেন চৌধুরী, বিকাশ ভট্টাচার্যরা। ‘স্টেটসম্যান’ খবর করেছিল: ‘পোস্টার ড্রন বাই এমিনেন্ট আর্টিস্টস আর বিয়িং সোল্ড অ্যাট বুক ফেয়ার ফর রুপিস টেন ইচ’।


এ সবই এখন অতীত। পাঁচতলা মল পুরোটাই বিশেষ সংখ্যা। লিটল ম্যাগকে এখন বিক্রয়যোগ্যতার কথা ভেবে-চিন্তে কাজ করতে হয়। বইয়ের বাজার যে ক্রমশ পোলারাইজড হয়ে যাচ্ছে, বিক্রি যে ক্রমশই মেলা-কেন্দ্রিক– কপালে ভাঁজ ফেলে এ আলোচনার সন্দর্ভ ফাঁদতে হয় টেবিল থেকে টেবিলে। পাঠক এখন মূলত সংগ্রাহক। তাই বিশেষ সংখ্যা। ছোট প্রকাশনা। টাইটেল বেশি, ইস্যু অনিয়মিত। টাইটেল বাড়লে স্থানাভাবে প্যাভিলিয়ন ছেড়ে স্টলে। আরেকদল মূলত বিক্রেতা; ম্যানুফ্যাকচারার নয়, রিটেইলার। টেবিল বলতে হরেক মাল বিক্রির বারোয়ারি দোকান।

টেবিল, টেবিল নয়। কাগজের চোখ। এক ঝলক চোখে চোখ রেখেছ কি টেবিলের নিজস্ব চরিত্র পড়া যাবে। কাজের ইঙ্গিত, আর কাজের বহর, পরিসর। কী খায়, কোন দিকে হাঁটে, আহত-আক্রান্ত হলে কত রাগে, কতটুকু কাঁদে। সবই তো টেবিলে। দাহপত্র, জারি বোবাযুদ্ধের অবিন্যস্ত মাংস কেটে কেটে ছড়িয়ে রাখা; কালি কলম ইজেলের নিপুণ গৃহিণীপনা; সবই তো টেবিলে। ঠাসাঠাসি পঞ্চগব্য টেবিলের ভিড় থেকে দু’-একটি ফ্ল্যাশ! রহস্য! উঁকি মারে, মেরে চলে যায়। খুঁজে নিতে হয়।

দেবব্রত মুখুজ্জের ’৮৯-এর একটি ডাবল ডিমাই সেট উঁকি দিল অনামা কাগজের টেবিল থেকে। ‘ব্যালাড অফ দ্য টিলার’। খান চারেক। গোটা সেট জুড়ে কৃষক আন্দোলনের ছবি। সাদা-কালো বোল্ড স্ট্রোকে রোপণের স্পর্ধাটুকু ধরা।


তিন নম্বর রো থেকে হঠাৎ ঋত্বিক। হিরণ মিত্রের স্কেচ। ফুল সাইজ পোস্টার। ৫০ টাকা। দু’ নম্বরে বই প্রকাশ। ভিড় জমেছে। কোনওমতে কবিতা পড়ছে লাজুক তরুণ। দু’জন সিকিওরিটিকে ডজ করে যে মেয়েটি এইমাত্র টেবিলে পৌঁছল, তার পিঠ থেকে উঁকি দিচ্ছে পুরনো গিটার। আরেকজন, কালো টি-শার্ট, বুকপকেটে আটকানো গোলাপি কাগজ– ‘ঠোঙা মুড়ি ঠান্ডা চপ/ তুমি যদি ভাবো আমি/ কবি নই, সম্পাদক/ ভুল হবে। বড় ভুল হবে।’
স্পার্ক!

এই তো লিটল ম্যাগ। টুকরো টুকরো দৃশ্যের আনন্দভৈরবী। একে তুমি কোন মুখে ‘প্যাভিলিয়ন’ বলো হে ছোকরা! আর আছে সঙ্গসুধা। অগুনতি পরিচিত মুখ। চা-সিগারেট। আড্ডা গড়িয়ে চলে মুখ থেকে মুখে। এমনকী যে না-পাঠক, না-শিল্পী, না-ক্রেতা, না-লেখক, তাকেও জড়িয়ে নেবে ভালোবাসার এই পুরনো অসুখ।

হিজিবিজি ফেলে রেখে নতুন কাগজ। সূত্রপাত। বইমেলা সংখ্যায় তিনখানা মারকাটারি গদ্য। সমান্তরাল সিনেমা নিয়ে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়। টিকে থাক সাধারণ সংখ্যার পড়তির বাজারে। ‘অন্নপূর্ণার বিবিধ আক্রোশ’– এ টেবিলে দেখবার মতো। অন্নপূর্ণার এলোকেশ, দু’-একটি কাগজের নৌকো তার থেকে নেমে, প্রচ্ছদের বানানো আকাশে। কবিতাবইয়ের সঙ্গে নান্দনিক ছবি।


‘ভুল’ নিয়ে তিতিরের ছিমছাম একখানা ইস্যু। প্রাচ্য দর্শনের ভ্রমজ্ঞান থেকে ডিএনএ-র ভুলত্রুটি, আইনের ভুলভুলাইয়া থেকে লিঙ্গ নির্মাণের ভ্রান্তি। ভুল কবিতা, ভুল গপ্পো। চমৎকার সংকলন। ভুল করে, কিনে নিতে হয়। সদ্য সদ্য ছেপে আসা শুভশ্রী-র ‘প্রসাধন এবং’। নখ-কেশ-গোঁফ-তিলক-আয়না-চিরুনি-গামছা-রণসাজ-পার্লারের বিবিধার্থ সূচি।

হপ্তাক কাচরার ঘাতক টেবিল জুড়ে নান্দনিক ভাঙচুর। দৃশ্যসুখ হয়। পাশাপাশি কালি কলম ইজেল। নির্মাণের প্রথাভাঙা পরীক্ষার ধারা। আহত, আক্রান্ত করে। তবু ভালো লাগে। ‘অপরূপভাবে ভাঙা গড়ার চেয়েও মূল্যবান কখনও সখনও’। ছিপছিপে আধারের সহজ তনিমা। ঝকঝকে লে-আউট, মেধা ও মদের যৌথতা। এবং বিনির্মাণ। বইপত্র ওলটাতে গিয়ে, নেশা লাগে– দামের জায়গায় লেখা: ‘আশি টাকা অথবা এক বোতল নেপালি হারচুর’; নেশা লাগে, উৎসর্গপত্রে: “নন্দন লিট. ম্যাগ. ম্যালায় আলাপ হওয়া সেই মহিলাটিকে/ যিনি আমাদের সপ্তম বর্ষের ম্যাগাজিনের সংখ্যার/ প্রচ্ছদটি দেখে মৃদু হেসে/ ‘জঘন্য’ বলে চলে গেলেন।” এ এক আশ্চর্য ডেরা। অনেকের সম্মিলিত অন্তর্ঘাত, প্রকাশ্য রাস্তায়; অথবা নিবিড় প্রেম, শরীরমনের–
এটি একটি শান্তিসংঘ
অথবা সুখীগৃহকোণ সংখ্যা
এবং ভায়োলেন্স ছেড়ে আমরা সকলেই
গোল করে দাঁড়িয়েছি ক্যাম্প-ফায়ারের চারপাশে।


নেশা লাগে। চিরকেলে ব্যতিক্রমী স্যাফো-র টেবিল। জন্মচিহ্নে চিহ্নিত নারী; অথচ ক্যুয়ার, কিংবা ট্রান্স, নন-বাইনারি– অল্পবয়সে বিয়ে ক্ষতি করে গেছে; তাদের বয়ানে লেখা ‘অ-শুভদৃষ্টি’-র কথা: ‘কবুল করিনি’। নারী ও ট্রান্সজেন্ডার যৌনতার অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে চলেছেন তাঁরা। আরেকটি সংকলনে চোখ আটকায়। দু’ বাংলার নারী সমকামীদের মনোলগ। অসিত পোদ্দারের টানটান রেখাচিত্র। নেশা লাগে।
২২ বছর পর অঁতন্যাঁ আর্তো-র চিন্তাবীজ ছেপে এল। গ্রাফিত্তির টেবিল। ২২ বছর পর দীপক মজুমদার, শৈলেশ্বর ঘোষের এইসব অনুবাদ। শুভঙ্কর দাশের শরীর, এ মেলার ধুলো-হাওয়া-জলে মিশে গিয়েছে কবে। তবু শুভঙ্কর দাশ রয়ে গিয়েছে গ্রাফিত্তির টেবিলে কিংবা কাগজের ঠোঙায়। ধুলোপড়া, হলদেটে উজ্জ্বল উদ্ধারে, স্মারক বক্তৃতার প্রচ্ছদে ম্লান সন্দীপ দত্তকে দেখে দুঃখ হয়। দুঃখ হয়, বুড়ো তাপস দাস! গিল্ডের সামনে তুমি, লিটল ম্যাগাজিনে তুমি নেই। গত বছরেও ছিলে। তুমি আর তোমার সাইকেল। কীভাবে ম্যাজিক হয়, শেষ বলে খেলা ঘুরে যায়। ছাপার কালির গন্ধ প্রেস থেকে মেলায় পৌঁছয়।


মরা মানুষের মেলা। মরা কাগজের। মরা শিল্পীদের জন্য বরাদ্দ দূরের ফুটপাথ। এমনকী মরা কবি, সন্তু দাস, যিনি আজ অক্ষরশ্রমিক, কেউ কি বলেছে তাকে ‘মা বলেছে মরে যাবে’ পড়ে– সব ছেড়ে কবিতার কাছে ফিরে এসো? যে সমস্ত বই আর হবে হবে করে, এল না মেলার মাঠে, তারাও তো মেলায় নিঃশব্দে প্রেতের মতো ঘোরে, ফেরে। বোধশব্দ, আচমন নেই। একা দুর্গ সামলায় পৃথ্বী বোস, আর দশমিক। মাছি ওড়ে, মহাকাল মাঝেমধ্যে দেখে যান এসে। দিস্তে দিস্তে কাগজের, দিস্তে দিস্তে হাওয়ার মানুষ। মহাশূন্যে দোল খায়। এক নম্বর কর্নারে মিতবাক বিপ্লব নায়েক– ‘সুবিমল মিশ্র দেখো, এ বছর নতুন করলাম।’ পুঁজি কম, বাকি তিনখানা বই নিয়ে গেছে কোলাব্যাঙে, চিলে। নাটমন্দিরের ঘরে রঞ্জন আচার্যর অমলিন হাসি। কাঁধে ব্যাগ, কাঁপা কাঁপা শীর্ণ হাতে বই দেখে চলে অজয় নাগ। পুরুলিয়া থেকে এসে দু’ দিনের হই হই নির্মল হালদার। অসুস্থ, হাতে লাঠি অরণি বসু কি এবার একবারও আসতে পারলেন? মেলার দু’-ধারে গান, রাত বাড়লে শুরু হবে অসতর্ক টলোমলো নাচ। কেউ বা ডুপকি হাতে, কারও কারও দোতারায় ঝরে পড়বে নিবিড় আক্ষেপ। জটলা বাড়বে, আর হই হই, ক্রমাগত ভিড়। মাঠের দখল নেবে আদিগন্ত শ্যামতনু ঘাস। মেলার নেশায় পড়ে, নবীন পাঠক, ফিরে গিয়ে লিখে ফেলবে একখানা নতুন সিরিজ। এ-ই তো লিটল ম্যাগ, এটুকুই চিনি।
একে তুমি কোন মুখে ‘প্যাভিলিয়ন’ বলো হে ছোকরা!
………………………………….
আপনারা বইমেলার কড়চা নিয়মিত পড়ছেন তো? তা, কেমন লাগছে? আপনাদের মতামতের আমরা প্রত্যাশী। আমাদেরকে মেলও করতে পারেন যে কোনও দিন, যখন খুশি– ভালোবাসায়, জিজ্ঞাসায়, বন্ধুত্বে, শত্রুতায়, আবদারে– [email protected]– এই মেল আইডিতে।
………. পড়ুন বইমেলার কড়চা-র অন্যান্য পর্ব ……….
৫. দুষ্প্রাপ্য বইয়ের ভিড়ে পাঠকও কি দুষ্প্রাপ্য?
৪. ছাব্বিশের বইমেলা বাণীপ্রধান!
৩. বই পোড়ানোর চেয়ে গুরুতর অপরাধ বই না পড়া
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved