Robbar

বিফের মতো সুপাচ্য, পুষ্টিকর মাংস ভূ-ভারতে নেই, মেয়েকে চিঠিতে লিখেছিলেন বুদ্ধদেব বসু

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 31, 2026 4:28 pm
  • Updated:January 31, 2026 4:37 pm  

 ‘ভোজন শিল্পী বাঙালী’ আমার ধারণায় বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বই– বুদ্ধদেবের রম্য গদ্যে অভিষিক্ত বাংলার চিরায়ত রন্ধনশৈলীর ইতিহাস। আজ ‌‘উপাদেয় বই’ সিরিজে ভোজনশিল্পী বাঙালির পাঠ। এছাড়াই উল্লেখ্য় ১৯৬২ সালের চিঠি– বাবা বুদ্ধদেব মেয়েকে লিখছেন, ‘ডর্মে প্রথম কয়েকদিন তোর খাওয়ার কষ্ট হবে। আসল কথা হলো কোনটা কী জিনিশ, কেমন স্বাদ, সেটা চিনে নেয়া। ওদের মাছ (ভালো রেস্তোরাঁয় ছাড়া) প্রায়ই আঁশটে লাগে– অবশ্য চিংড়িকে ‘মাছ’ বলে না– মাংসই বেশি নিস। ফলাহারী হ’য়ে প্রাণধারণ করা যেতে পারে, কিন্তু স্বাস্থ্য টিকবে না। বীফে অভ্যস্ত হ’তে হবে। ও-রকম সুপাচ্য ও পুষ্টিকর মাংস ভূ-ভারতে নেই। ওদের রান্নাও ভাল হয়। সঙ্গে আলু আর সবজি দেয় উত্তম।’

শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়

পুব-পশ্চিমে টানা ট্রামলাইনের পাশে ২০২ রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের দোতলায় উঠে বুদ্ধদেব বসুকে প্রথমবার দেখার স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে সুরজিৎ দাশগুপ্ত লিখেছিলেন, ‘দরজা খুলে দিলেন এক ছোটখাটো ব্যক্তি, শানিত মুখের কাটুনি, ভাসা ভাসা দুটি চোখ, মাথায় লম্বা লম্বা চুল না-এলোমেলো না-পরিপাটি। এই গরমেও পাজামার উপরে সাদা পাঞ্জাবি। বোধ হয় আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট।…’ এই বু.ব. আমাদের চেনা। পরিশীলিত, কবিতায় ডুবে থাকা মানুষ, একেক রকম কলম-কালিতে কবিতা-গদ্য-উপন্যাসাদি লেখার মতো শৌখিন। তাঁর ছোটো মেয়ে রুমি-র (দময়ন্তী বসু সিং) সাক্ষ্য অনুযায়ী বু.ব.-র শিল্পময় জীবনসাধনায় খাদ্যরুচিরও বিশিষ্টতা ছিল। স্বল্পাহারী বুদ্ধদেব খাওয়ার টেবিলে রকমারি ও বৈচিত্রময় পদ প্রত্যাশা করতেন। মিতাহারী হলেও সুখাদ্যে রুচি ছিল তাঁর।

এই বু.ব. আমাদের চেনা

এমনিতে বাঙালি ইউফেমিজমের দোহাই দিয়ে পেটুককে ‘ভোজনরসিক’ শব্দটি দিয়ে আড়াল করে। পেটুক কে? জানেন না? স্বয়ং সুকুমার রায় হরিপদ-র কথা বলতে গিয়ে এক সত্যিকারের পেটুকের বিবরণ দিয়েছিলেন (অবশ্য ‘পাগলা দাশু’র সিগনেট সংস্করণে তার হদিশ মিলবে না। ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশের সময় এই অংশটা গল্পে ছিল)। সুকুমার লিখছেন, “সেই যে এক বিষম পেটুকের গল্প শুনেছিলাম, সে একদিন এক বড় নেমন্তন্নের দিনে প্রতিজ্ঞা করেছিল, ‘আজ আমি নেমন্তন্নে যাব না।’ সবাই বললে, ‘কি ভয়ানক ! তুমি এমন ভীষ্মের মত প্রতিজ্ঞা করছ কেন?’ কিন্তু সে কারও কথা শুনল না, ঘরের মধ্যে লেপমুড়ি দিয়ে শুয়ে রইল, আর সকলকে বলে দিল– ‘ভাই, তোমরা আমার ঘরের বাইরে তালা লাগিয়ে দাও।’ পেটুক মশায় ঘরের মধ্যে বন্ধ আছেন, কিন্তু মনটাকে ত আর বন্ধ ক’রে রাখা যায় না– মনটা তার ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই নেমন্তন্নের জায়গায়। সে ভাবছে, ‘এতক্ষণে বোধহয় আসন পেতেছে আর পাত পড়েছে– এইবারে বোধহয় খেতে ডাকছে। কি খেতে দিচ্ছে? লুচি নিশ্চয়ই? লুচি আর বেগুন ভাজা দিয়ে গেছে– এবার ডাল তরকারি ছক্কা সব আসছে। তা আসুক, আমি ত আর যাচ্ছি না?– এইবারে কি মাছের কালিয়া?– তারপরে মাংস বুঝি?– তা হোক না– আমি ত আর যাচ্ছি না? মাংসটা না জানি কেমন রেঁধেছে ! সেবারে ওদের বাড়ি রান্না অতি চমৎকার হয়েছিল। অবিশ্যি এখনও সময় আছে– কিন্তু থাকলেই বা কি? আমি ত যাচ্ছি না। যাক্ এতক্ষণে টক দেওয়া হয়েছে– এইবার দই সন্দেশ রাবড়ি– আর রসগোল্লা! ঐ যা ফুরিয়ে গেল ত !’ বলেই একলাফে জানলা টপকিয়ে– হাঁপাতে হাঁপাতে সে নেমন্তন্নের জায়গায় গিয়ে হাজির!–’ এ হল পেটুক বাঙালির পরাকাষ্ঠা।

আবার এই বাংলার লেখক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় বেশ অসুস্থ অবস্থায় তাঁর এক প্রকাশক ও প্রকাশক-ঘরণীকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘…অনেকদিন দেখা হয় না। তোমরা আমার ভালবাসা নিও। কাঁচা আমের টক, গন্ধ লেবু দিয়ে মসুর ডাল ও ভাত এবং পটলভাজা এখন উপাদেয়।…’– এই হল ভোজনরসিকের নমুনা। ভোজনরসিক পেটে ঠুসে খাবার ভরেন না, তারিয়ে-তারিয়ে উপভোগ করেন। বু.ব. যেমন বাড়িতে হামেশাই গ্যোয়টকে উদ্ধৃত করে বলতেন, ‘মাই আইজ আর লার্জার দ্যান মাই অ্যাপেটাইট’।

বুদ্ধদেবের সংসারজীবন নিয়ে অনেক কথাই জানা যায়– বিশেষ করে প্রতিভা বসু এবং তাঁদের দুই কন্যার জবানিতে। সংসারে তিনি সন্ন্যাসী ছিলেন না, বলাই বাহুল্য। তবে রান্নায় পটু ছিলেন এমনটাও নয়। সম্ভবত রান্নাঘরের চৌকাঠ তিনি কখনওই পেরতেন না। তবে খাদ্যাখাদ্য বিষয়ে তাঁর ব্যুৎপত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলবে কে?

এমনকী, ছোট মেয়ে রুমি ১৯৬২-তে যখন প্রথমবার বিদেশে পড়তে গেলেন, সে-বছর ১৬ সেপ্টেম্বর একটি চিঠিতে বাবা বুদ্ধদেব মেয়েকে লিখছেন– “ডর্মে প্রথম কয়েকদিন তোর খাওয়ার কষ্ট হবে। আসল কথা হলো কোনটা কী জিনিশ, কেমন স্বাদ, সেটা চিনে নেয়া। ওদের মাছ (ভালো রেস্তোরাঁয় ছাড়া) প্রায়ই আঁশটে লাগে– অবশ্য চিংড়িকে ‘মাছ’ বলে না– মাংসই বেশি নিস। ফলাহারী হ’য়ে প্রাণধারণ করা যেতে পারে, কিন্তু স্বাস্থ্য টিকবে না। বীফে অভ্যস্ত হ’তে হবে। ও-রকম সুপাচ্য ও পুষ্টিকর মাংস ভূ-ভারতে নেই। ওদের রান্নাও ভাল হয়। সঙ্গে আলু আর সবজি দেয় উত্তম। একটা সবুজ তরকারি রোজই খাবি– বীন, মটরশুঁটি, Belgian Sprouts (ক্ষুদ্রাকৃতি বাঁধাকপি– ভালো খেতে), Spinach (উচ্চারণ– স্পিনিচ = পালংশাক), broccoli (উচ্চারণ– ব্রক্‌লি, খুব ভালো)। অন্যান্য সময়ে খাবার জন্য ঘরে রেখে দিবি দুধ, আঙুর, আপেল। কমলালেবুর রস রোজ সকালে উঠে খাবি– যে দেশে রোদ কম সেখানে ওটা খেতেই হয়, ব্রেকফাস্টে, লাঞ্চেও ঐ “juice” বাদ দিবি না। আশা করি ওদের আইসক্রীম তোর ভালো লাগে– এন্তার রকমের পাওয়া যায়। চায়ের সঙ্গে আলাদা একটা টী-ব্যাগ চেয়ে নিস– তাতে কড়া হবে। শনি-রবিবার ডর্মে যদি খাওয়া না থাকে, তা হ’লে বাইরে রেস্তোরাঁ আছে– একটা চীনে রেস্তোরাঁ ব্লুমিংটনেও থাকা উচিত, সেখানে যেতে পারিস, ইটালিয়ান বা অন্য রেস্তোরাঁ হ’লে কোনটা কী জিনিশ জিগেস ক’রে জেনে নিবি– নাম শুনে বোঝা যায় না। এই শনি রবিবার কোথায় খেলি?…”

রুমিকে লেখা এই চিঠি পড়া না-থাকলে বু.ব.-র সবটা চেনা হয় কি ?

বুদ্ধদেব ছিলেন জন্মসূত্রে পূর্ববঙ্গীয়। দময়ন্তী বসু সিং-এর কথা অনুযায়ী– “খাওয়া এবং খাওয়ানো নিয়ে বাড়াবাড়ি ওপার বাংলার মানুষদের একটা চরিত্রলক্ষণ বলা চলে। তার ওপর আমার বাবা ছিলেন মালখাঁনগরের বসুঠাকুর, খাদ্য বিষয়ে যাদের উৎসাহ রীতিমতো গল্পকথা। ভোজন বিষয়ে ওই বংশের অত্যুৎসাহ এবং খেতে খেতেই আরো খাবারের কথা বলার স্বভাব আমার মা-কে কুপিত করতো। মা বলতেন ‘হাকাই’। ছোট থেকে তাঁর মুখে যে বাঙাল প্রবাদবাক্যটি বাবার প্রতি বর্ষিত হতে শুনেছি সেটি হলো, ‘হাকাই আছে, রোচ নাই/দাড়ি আছে, মোচ নাই’ (রসগ্রহণ করতে হলে প্রতিটি ‘চ’ এবং ‘ছ’ ইংরিজি ‘s’-এর মতো পড়তে হবে)। ভোজ্যে অত্যুৎসাহী বাবা ভোজনে নেহাৎ অপারঙ্গম ছিলেন বলেই এই মশকরা। মা তাঁর নিজের দাদামশাইকে দিয়ে জানতেন এই বংশ অতিভোজনেও কী পরিমাণ দক্ষ (দুর্ভাগ্যক্রমে মা-র মামাবাড়িও ছিল মালখাঁনগরের বসুঠাকুর)। এঁদের খাদ্যপ্রীতির নানা গল্প আমাদের বাড়িতে প্রচলিত ছিল– বিশেষ করে লালুদার গল্প, যিনি নাকি বিশ্বের খাদ্য বিষয়ে এ্যাকাডেমিক আলোচনা শুরু করে শ্রেষ্ঠ খাদ্যের পীঠস্থান হিসেবে মালখাঁনগরের ‘নয়াবাড়ি’ ও শ্রেষ্ঠ শেফ্ হিসেবে ‘তর্‌ বৌদি’ অর্থাৎ তাঁর নিজের স্ত্রীকে শনাক্ত করতেন।”

তবে কড়াইতে খুন্তি নাড়ার অভ্যেস না-থাকলেও, বুদ্ধদেব বসুর এক আশ্চর্য লেখা হল ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় ধারাবাহিকভাবে চার কিস্তিতে প্রকাশিত ‘ভোজন-শিল্পী বাঙালি’ (প্রথম কিস্তিতে অবিশ্যি নাম ছিল ‘বাঙালি ও ভোজন বিলাস’)। বু.ব. খাদ্যের ব্যাপারে ১৯৬২-তে মেয়েকে যা-ই লিখুন না কেন, তাঁর খাদ্যরুচি ছিল ভীষণই প্রাদেশিক সেকথাও তিনি লুকোতেন না। তিনি যেমন বিশ্বাস করতেন ভারতীয় সাহিত্য বলে কিছু হয় না, তেমনই ভারতীয় রান্না বলে কার্যত কিছু নেই। আছে কিছু প্রাদেশিক রন্ধনপ্রণালী। সেসব প্রণালী মুখোমুখি বসে কিন্তু কোনও পাণ্ডুলিপি আয়োজিত হয় না। কেননা তারা কোনওদিনই হাতের ওপর হাত রাখতে পারে না। আমেরিকায় একবার যেমন বু.ব. এক বিশ্ববিদ্যালয়ে শহরে গিয়ে বাধ্য হয়েছিলেন প্রথমদিনই একটি তামিল পরিবারে রাতের খাবার খেতে। তাঁর মতো সুরুচিসম্পন্ন মানুষের মনে যদিও অন্য প্রদেশের প্রতি কোনও বিদ্বেষ ছিল না, কিন্তু জিহ্বা বড় দায়। তার বিদ্রোহে সে-রাতটা তাঁকে কয়েক চামচ ভাত আর এক পেয়ালা কফি খেয়ে কাটাতে হয়েছিল।

খাওয়া-দাওয়া নিয়ে রবীন্দ্রনাথেরও বিশেষ রুচির কথা তো সবাই জানেন। এমনকী, কবিতায় শুধু ‘অরুণবরণ আম’-এর উল্লেখেই থেমে না থেকে তিনি ‘সন্দেশ’ ‘পানতোয়া’ ‘মাছ-মাংসের পোলাও’ পর্যন্ত এগিয়ে গেছেন। আর তাঁর নিজের রোজের জলখাবারের বিস্তারিত বিবরণ জানতে চাইলে বনফুলের স্মৃতিচারণের খানকতক পাতা পড়ে নিলেই চলবে।

খাওয়া-দাওয়া নিয়ে বাঙালিরা আজকাল খুব বেশি কেউ লেখেন-টেখেন না। বিশেষ করে গোটা কলকাতায় রাস্তার দু’-ধার যেদিন থেকে রান্নাঘর হয়ে উঠল, সেদিন থেকে তো নয়ই। আমরা সবাই চলতি হাওয়ার পন্থী হয়ে মেট্রোরেলে গা ভাসিয়ে ছুটলাম এ-রেস্তোরাঁ থেকে সে-রেস্তোরাঁ। ‘ভোজন শিল্পী বাঙালী’তে বু.ব. নিজেও লিখেছেন– “বাঙালি রান্নার একটা মস্ত খুঁত এই যে তা বিশ্বের হাটে অচল; আমরা তাকে নিয়ে ঘরে-ঘরে সুখী হ’তে পারি, কিন্তু ব্যবসায় খাটাতে পারি না। নিখিল বাঙালির বাসভূমি এই কলকাতার শহরে এমন একটি রেস্তোরা নেই যেখানে কোনো তপ্ত দুপুরে লাঞ্চের ছুটিতে, ফার্পোর বাঁধা গৎ এড়িয়ে, আপনি খেয়ে নিতে পারেন সাধু বাঙালি খাদ্য– যাকে বলে ‘মাছের ঝোল ভাত’ সেই ধরনেরই ঘরোয়া মেনু, কিন্তু রান্নায় স্বাদু ও পরিবেষণে সুপ্রসারিত। ধরা যাক সুস্ফুট ও সুদৃশ্য বাটি-চাপা ভাত (শাদা ভাত, পোলাও জাতীয় ভাজা ভাত নয়), দু-এক টুকরো গন্ধ লেবুর সঙ্গে পাৎলা করে রাঁধা মুসুর ডাল ‘মুখে দেবার জন্য’ মুড়মুড়ে ভাজা মৌরলা বা কাচকি মাছ– আর, যদি দৈব হয় অনুকূল, সেই স্বর্গীয় খাদ্য প্রোটিনপূর্ণ ইলিশের ডিমের ডালনা, কাঁচা পেঁপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যা অমৃতরস নিঃসরণ করে। এর পরে আপনি কল্পনা করে নিন আপনার পছন্দ মতো যে-কোনো একটা মাছের ঝোল– কিন্তু আমি বলি সেটা বাদ দিলেও তেমন ক্ষতি নেই (আপনাকে আপিশে ফিরতে হবে, ঈষৎ ঊন-ভোজনই সমীচীন)– যদি থাকে এক পাত্র শুভ্রবর্ণ শুভক্রিয় অম্লস্বাদ দধি, সঙ্গে পাটালি গুড় এবং একটি সুপক্ব মর্তমান কলা। এমন-কিছু লম্বা ফরমাশ নয় কিন্তু দুঃখের বিষয়, এ-রকম একটি আয়োজন আপনি সারা শহর ঢুঁড়ে কোথাও পাবেন না; কেননা চৌরঙ্গি পাড়ার রেস্তোরাঁগুলিতে শুধু মোগলাই আর পাঞ্জাবি রান্নাই ভারতীয় ব’লে চলে, শস্তা দামের খানাঘরগুলিও লাহোর লক্ষ্ণৌ মাদ্রাজি শৈলীতেই সমৃদ্ধ।” আজকাল কিছু নামজাদা বাঙালি খানার রেস্তোরাঁ হয়েছে বটে, তবে বু.ব. তাঁদের ‘থালি সিস্টেমে’ খুব একটা খুশি হতেন বলে মনে হয় না।

‘ভোজন শিল্পী বাঙালী’ আমার ধারণায় বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বই– বুদ্ধদেবের রম্য গদ্যে অভিষিক্ত বাংলার চিরায়ত রন্ধনশৈলীর ইতিহাস। আজ যার অনেকটাই হারিয়ে বসেছি আমরা।

বুদ্ধদেব এই লেখায় প্রথম হাত খুলে খেলতে শুরু করেছেন দ্বিতীয় অধ্যায়ে। তাঁর ধারণা ছিল বাংলায় শব্দের বড়ই অভাব। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে রান্নাবান্নায় বাংলা ভাষায় অসামান্য কিছু শব্দের প্রয়োগ আছে। তিনি লিখছেন, “ফরাশিরা বাগবহুল বিশেষণ বসিয়ে তাদের মেনুগুলোকে জমকালো করে তোলে, কিন্তু ছোট্ট এক শব্দের নাম বানাতে বাঙালির মতো ওস্তাদ কেউ নেই। এ কি আশ্চর্য নয় যে ‘দম’ জিনিসটা অনন্যভাবে শুধু আলুরই অধিকারভুক্ত, এবং তিনি এতই সতী-সাধ্বী যে আলুর সঙ্গে কুমড়ো জুড়ে দিলেই তিনি দম-ত্ব হারিয়ে ‘ছকা’য় নামান্তরিত হন, আর পটল অথবা ফুলকপির সংযোগে আবার ‘ডালনা’য়, পৃথিবীর অগুনতি ফসলের মধ্যে পটল ছাড়া আর কোনওটি দিয়ে ‘দোলমা’ তৈরি হয়, এমন কথা কি সাত পুরুষে কোনও বাঙালি কখনও শুনেছে? না কি এমনও কেউ কল্পনা করতে পারে যে ‘ধোকা’ মানে ডালের একটা মশলাশ্রিত ব্যঞ্জন ছাড়া অন্য কিছু? অবশ্য ভাঁওতা অর্থেও ‘ধোকা’ বলি আমরা, কিন্তু ব্যঞ্জনটিও তো চারিত্রিকভাবে তা-ই– কেননা সে শস্যরচিত হয়েও ভান করে যেন মাংস– তাকে নকল মাংস বা নিরামিষ মাংস বললে দোষ হয় না; তার নামের মধ্যে একটা রসিকতাও প্রচ্ছন্ন আছে। আমরা রোজই খাচ্ছি চচ্চড়ি বা ঘণ্ট, কিন্তু ও দুটোয় তফাৎ কী তা জিগেস করলে আমরা অনেকেই মাথা চুলকোবো; দুটোতেই পাঁচ তরকারি লেপটে মিশে থাকে, দুটোতেই কুচো মাছ বা মাছের কাটার সংযোগ সম্ভব; বহু চিন্তা করে শুধু এই তফাৎটি খুঁজে পাওয়া যাবে যে চচ্চড়িতে যে-মশলাটি খুব স্বাদাধিক সেই সর্ষে মেশালে ঘণ্টর আর জাত থাকে না। চচ্চড়ির আর এক প্রকরণ হলো ছ্যাঁচড়া বা ছেঁচকি খুব অল্প তেলে পোড়া পোড়া রান্না হয় বলে তাকে আলাদা একটি নাম দেওয়া হলো। একই পাঁচমিশালি ধরনের অন্য একটি দ্রব্যের সঙ্গে আমরা পরিচিত আছি : ‘লাবড়া’– বৈষ্ণবরা যা ভক্তিসহযোগে আহার করে থাকেন, যার পবিত্রতা আমিষের লেশ সংশ্রব এড়িয়ে চলে, এবং জগন্নাথদেবের প্রসাদ হবার গৌরবের জন্য যাতে সব রকম সব্জিও অনুমোদিত নয়– থোড় মোচা শিম বেগুন মুলো আর মিঠা কুমড়াই প্রশস্ত। লাবড়ার আর একটি বৈশিষ্ট্য এই যে তাতে সব্জিগুলো প্রায় গলে যায়, চচ্চড়ি-ঘণ্টর সঙ্গে এইটে তার টেকনিকাল তফাৎ।”

তাই বলে ভাববেন না, নিরামিষ রান্নাতেই বু.ব.-র টান বেশি ছিল। তিনি তীব্র আমিষাশী ছিলেন। বিশেষ করে মৎস্যে আসক্তি ছিল প্রবল। আর ইলিশ মাছ নিয়ে তাঁর প্রভূত দুর্বলতা ছিল। তাই মাছের ঝোল ঝাল কালিয়া নিয়েও বিস্তর আলোচনা এই লেখায়। কাচকি, ট্যাংরা, চিতল, কই মাছেরও তিনি ভক্ত ছিলেন। তেল-কই প্রসঙ্গে তিনি লিখছেন এই রান্না– ‘শুধু পুষ্ট বড়ো বড়ো কই মাছেরই এলাকাভুক্ত– ছোটো কইয়েরও নয়– কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী তেল-রুই বা তেল-কাতলার সৃষ্টি হলো না, এতেই বোঝা যায় বাঙালি রাঁধুনির ঔচিত্যবোধ কত তীক্ষ্ণ।’ এক হাঙ্গেরীয় মহিলা কোনও বাঙালি কবিকে বিয়ে করে অনেক দিন এদেশে থাকার পর বু.ব.-কে বলেছিলেন বাংলার রান্নায় না কি মশলার আধিক্য। তা মশলা আছে বটে আমাদের রান্নাবান্নায়। কিন্তু মাছ-মাংসের ‘ঠান্ডা’ রান্নাও কি নেই? শ্রীপঞ্চমীর দিন পুব বাংলার ঘরে যে নবীন ইলিশের আয়োজন হয়, তাতে একটু হলুদ ছাড়া আর বেশি কী লাগে? কিংবা দুর্গাপুজোর পাঁঠার মাংসে কয়েকটা তেজপাতা ছাড়া অধিক কী প্রয়োজন? সরু করে কাটা কাঁচকলার ফালি দিয়ে অল্প জিরে আদা দেওয়া মাগুরের ঝোল কি খাই না আমরা? শীতকালে সামান্য ধনেপাতা সম্বল পাবদা মাছ? বুদ্ধদেব মনে করেন, এসবই ‘কোনো ভের্লেন বা জীবনানন্দর ভাষায় যার সুবাস যেন ঘাসের উপর দিয়ে বয়ে-যাওয়া সবুজ বাতাসের মতো’।

তবে বাংলার নিরামিষ রান্নার সূক্ষ্মতম ও সুকুমার ব্যঞ্জনা তিনি খুঁজেছেন বাঙালি বাড়িতে বিধবা আত্মীয়ার নিজস্ব হেঁসেলে। নানারকম খাদ্যে সমাজ তাঁদের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপানোয় সে-রান্না হয়েছে ‘ভূষণরিক্ত ব’লে শুদ্ধ আর সুন্দর’। কুমড়োর বিচি, লাউয়ের খোসাও সেখানে পরিত্যক্ত নয়। তাই বলে কোনও আকাট পাঠক যেন না ভাবেন বুদ্ধদেব বৈধব্য প্রথার সমর্থক। হয়তো সেজন্যই বিধিবদ্ধ সতর্কতার মতো তাঁকে লিখতে হয়েছে– ‘হিন্দু বিধবার নিয়ম পালনের কাঠিন্য যে সম্প্রতি ভেঙে যাচ্ছে, এটা আমাদের সকলের পক্ষেই আনন্দের কথা। এই প্রথার সম্পূর্ণ তিরোধানের আশায় আমরা সাগ্রহে অপেক্ষা করছি।’ কিন্তু বাঙালির ভোজনতত্ত্বে এই রন্ধনশৈলীকে উপেক্ষা করবেন, এতটাও পলিটিক্যালি কারেক্ট থাকার দায় তাঁর ছিল না।

পুনশ্চ:

একুশ শতকের ভারতে, এমনকী কখনও বাংলাতেও বিশেষ রাজনৈতিক মদতপুষ্ট ব্যক্তিরা হুংকার ছাড়েন আমিষ বর্জনের। খবরে প্রকাশ, দেশের কোথাও-কোথাও না কি নবরাত্রির সময় (হায়! আমরা আগে রামনবমী নয়, অন্নপূর্ণা পুজো বলতাম) হপ্তাভর আমিষ খাওয়া নিষিদ্ধ। কলকাতায় চিকেন প্যাটিস বিক্রেতা রিয়াজুলকে হেনস্তার খবরও অজানা নয়। কিন্তু বু.ব.-র লেখায় পড়ছি স্বয়ং বাল্মীকি তাঁর কাব্যে বনবাসী রাম-লক্ষ্মণকে প্রায়ই দেখিয়েছেন মৃগয়ায় পাওয়া রাশিকৃত পশু নিয়ে ঘরে ফিরতে। গোসাপ, বুনো শুয়োর, নানা জাতের হরিণ। আর দু’-ভায়ের সঙ্গে শ্রীমতী সীতারও প্রিয় খাদ্য নাকি ছিল শল্যপক্ব মাংস। আজ্ঞে হ্যাঁ, আমরা যাকে ‘শিক কাবাব’ বলে চিনি।

… আরও পড়ুন উপাদেয় বই নিয়ে অন্যান্য লেখা…

৩. পানীয় সংবাদ

২. লীলাদিকে ‘রান্নার বই’ লিখতে বলেছিলাম আমিই

১. শ্যামল গাঙ্গুলির দেখা একেকটা বাজার আসলে একেকখানা উপন্যাস