
জীবনানন্দ দাশের পূর্বপুরুষদের আদিনিবাস ছিল ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের গাউপাড়া গ্রামে। বর্তমানে মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার গাউপাড়া। যে গ্রাম প্রায় ১৫০ বছর আগে পদ্মাগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। জীবনানন্দের পিতা সত্যানন্দ ও পিতামহ সর্বানন্দ দাশের কর্মস্থল ছিল বরিশাল। সর্বানন্দ দাশ ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হয়ে বরিশালে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। এবং ‘অপ্রয়োজনীয় বোধে’ ‘দাশগুপ্ত’ পদবির ‘বৈদ্যত্বের চিহ্নস্বরূপ’ ‘গুপ্ত’ বর্জন করে শুধুই ‘দাশ’ ব্যবহার করেন।
২৪.
জীবনানন্দের ডাকনাম ছিল মিলু। বাল্যকাল থেকেই জীবনানন্দের প্রবল হাঁটার নেশা। বগুড়া রোডের বাড়ি থেকে বেড়িয়ে কখনও একা, অথবা সঙ্গে অনুজ অশোকানন্দ দাশকে নিয়ে বরিশাল মাঠে, প্রান্তরে, কীর্তনখোলা নদীতীর, জাহাজঘাটা, কালিবাড়ি, আলেকান্দা হেঁটে বেড়ান। জীবনানন্দের ৫৫ বছরের জীবনে ২৯ বছর কেটেছে বরিশালে।

কলকাতার সিটি কলেজের চাকরি চলে যাওয়ার পর খুলনার বাগেরহাট কলেজে (প্রফুল্লচন্দ্র কলেজ) ৩ মাস অধ্যাপনা করেন। এরপর দিল্লির রামযশ কলেজে কিছু সময় অধ্যাপনা করেন। একটানা ১১ বছর অধ্যাপনা করেন বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে। একসময় এই ব্রজমোহন কলেজের ছাত্র ছিলেন জীবনানন্দ দাশ।

বরিশালের বগুড়া রোডে জীবনানন্দের পৈতৃক বাড়ি। বাড়ির নাম ‘সর্বানন্দ ভবন’। বর্তমানে বগুড়া রোডের নাম কবি জীবনানন্দ দাশ সড়ক। সর্বানন্দ ভবনের নাম রূপান্তরিত হয়ে হয়েছে ‘ধানসিড়ি’। জীবনানন্দ দাশের ভিটের ওপরে নতুন মানুষের বাড়িঘর উঠেছে। বাড়ির একটা বড় অংশে গড়ে উঠেছে সরকারি দু’টি প্রতিষ্ঠান। আর জীবনানন্দের স্মৃতিতে গড়ে উঠেছে ‘কবি জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি মিলনায়তন ও পাঠাগার’।

রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ। যার নামের সঙ্গে জীবন যোগ আনন্দ– একসঙ্গে মিলে জীবনানন্দ। জীবনানন্দের কবিতায় যে বাংলার সঙ্গে পরিচয় ঘটে, তা সমগ্র বাংলার। জীবনানন্দ দাশ জীবদ্দশায় ছিলেন নিভৃতে। আজ জীবনানন্দ প্রভাকরের ভূমিকায়। জীবদ্দশায় কবিতা বাদে অন্য সব প্রকাশের দরজায় স্থায়ী খিল এঁটে দিয়েছিলেন। গল্প-উপন্যাস লিখেছেন, প্রকাশ করেননি। ট্রাঙ্ক বন্দি করে রেখে দিয়েছিলেন কয়েকশো গল্পের পাণ্ডুলিপি। আবার হারিয়েও ফেলেছেন পাণ্ডুলিপি-সহ ট্রাঙ্ক। দেশভাগের আগের বছর কলকাতায় যাওয়ার সময় বরিশালে ফেলে যান পাণ্ডুলিপি ভর্তি একটি ট্রাঙ্ক। হয়তো হারিয়ে যাওয়া ট্রাঙ্কটি এখনও ধানসিড়ি নদীর গর্ভে রয়ে গেছে। ধূসর পাণ্ডুলিপি ভর্তি হারিয়ে যাওয়া ট্রাঙ্কের খোঁজে জীবনানন্দ ফিরে আসবেন তাঁর প্রিয় নদী ধানসিড়িটির তীরে।

জীবনানন্দের মৃত্যুর পর কবিতার পাশাপাশি গল্প-উপন্যাস প্রকাশিত হতে থাকে। শুরু হয় জীবনানন্দ শতাব্দী। এক বিপন্ন বিস্ময় শতাব্দীর। জীবনানন্দ দাশ আত্মজীবনী লেখেননি। তাঁর গল্প-উপন্যাস, চিঠিপত্র ও ডায়েরিতে রয়েছে জীবনীর উপাদান। জীবনানন্দ দাশের ‘বাসমতীর উপাখ্যান’ ও ‘জলপাইহাটি’ উপন্যাসের মানচিত্র বরিশাল। এই দুই উপন্যাসে বরিশাল বাসের অধ্যাপনাকালের জীবনকথা প্রতিফলিত হয়েছে। উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্রদের হৃৎস্পন্দনে পাওয়া যায় জীবনানন্দের নাড়ির টান।

২০ বছর বয়সে জীবনানন্দ দাশের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। ‘ব্রহ্মবাদী’ পত্রিকার বৈশাখ ১৩২৬ সংখ্যায়। কবিতার নাম ‘বর্ষ-আবাহন’। জীবনানন্দ দাশের প্রথম গদ্য প্রকাশিত হয় তাঁর ২৬ বছর বয়সে সেই ‘ব্রহ্মবাদী’ পত্রিকাতেই। প্রবন্ধটির নাম ‘স্বর্গীয় কালীমোহন দাশের শ্রাদ্ধবাসরে’। বর্তমানে জীবনানন্দের বয়স ১২৬ বছর। মাসিক ‘ব্রহ্মবাদী’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন জীবনানন্দ দাশের পিতা সত্যানন্দ দাশ। বরিশালের ব্রাহ্মসমাজ ও ব্রাহ্ম মতের প্রচারের জন্য ‘ব্রহ্মবাদী’ সাহিত্যপত্রটি প্রকাশিত হত।

বিশ শতকের শুরুতে ঢাকা থেকে হাতে লেখা ‘প্রগতি’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। পত্রিকা অফিসের ঠিকানা ৪৭ পুরানা পল্টন লাইন। জীবনানন্দ দাশের ‘বোধ’ কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল বুদ্ধদেব বসু ও অজিতকুমার দত্ত সম্পাদিত এই ‘প্রগতি’ পত্রিকায়।

বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে জীবনানন্দ দাশের প্রথম দেখা হয় জীবনানন্দ ও লাবণ্যর বিবাহ-সন্ধ্যায় ঢাকার ব্রাহ্মসমাজ প্রাঙ্গণে। ব্রাহ্মরীতি অনুসারে ১৯৩০ সালের ৯ মে ঢাকা ব্রাহ্মমন্দিরে জীবনানন্দ দাশের বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। বিয়ের সময়কালে জীবনানন্দ ছিলেন দিল্লির রামযশ কলেজের অধ্যাপক। লাবণ্য দাশ ছিলেন ঢাকার ইডেন মহিলা কলেজের ছাত্রী। ব্রাহ্মরীতি অনুসারে এই বিয়ের অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন জীবনানন্দের পিসেমশাই মনমোহন চক্রবর্তী। ঢাকায় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর নববিবাহিত দম্পতি জীবনানন্দ ও লাবণ্য দাশ বুড়িগঙ্গা নদীর স্টিমার ঘাট থেকে লঞ্চযোগে বরিশালের উদ্দেশে যাত্রা করেন।

লাবণ্যপ্রভার জন্ম খুলনা জেলার সেনহাটি গ্রামে। জন্মের কিছুকাল পর বাবা-মাকে হারিয়ে অকৃতদার জেঠামশাইয়ের কাছে প্রতিপালিত হন। লাবণ্যর মা সরযূ গুপ্ত ছিলেন যশোর জেলার ইতনা গ্রামের মেয়ে। লাবণ্যর বাবা রোহিণীকুমার গুপ্ত ছিলেন খুলনার বৈদ্যপ্রধান অঞ্চলের সেনহাটি গ্রামের কুলীন বৈদ্য সন্তান। রহস্য-উপন্যাস লেখক নীহাররঞ্জন গুপ্ত ছিলেন লাবণ্য গুপ্তর মামা। বিয়ের পর লাবণ্য গুপ্ত হন লাবণ্য দাশ। জীবনানন্দ ও লাবণ্যর বিয়ের সময়ে লাবণ্য দাশের কাছে জীবনানন্দের কবি পরিচয় ছিল অজানা।

জীবনানন্দ দাশের পূর্বপুরুষদের আদিনিবাস ছিল ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের গাউপাড়া গ্রামে। বর্তমানে মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার গাউপাড়া। যে গ্রাম প্রায় ১৫০ বছর আগে পদ্মাগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। জীবনানন্দের পিতা সত্যানন্দ ও পিতামহ সর্বানন্দ দাশের কর্মস্থল ছিল বরিশাল। সর্বানন্দ দাশ ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হয়ে বরিশালে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। এবং ‘অপ্রয়োজনীয় বোধে’ ‘দাশগুপ্ত’ পদবির ‘বৈদ্যত্বের চিহ্নস্বরূপ’ ‘গুপ্ত’ বর্জন করে শুধুই ‘দাশ’ ব্যবহার করেন।

বিক্রমপুরে দাশগুপ্ত পরিবারের জমিদারি ছিল। পরিবারের সদস্যরা সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলেন। এবং দাশগুপ্ত পরিবারের পূর্বপুরুষেরা ‘মুন্সি’ উপাধি পেয়েছিলেন।
জীবনানন্দ দাশের পিতা-মাতা দুই দিকের পরিবারেই ছিল সাহিত্যের পরিবেশ। জীবনানন্দ দাশের মা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন কবি। মাতামহ চন্দ্রনাথ দাশ ছিলেন কবি। বাবা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন ‘প্রবাসী’, ‘তত্ত্বকৌমুদী’ প্রভৃতি পত্রিকার নিয়মিত লেখক।

বরিশালের ভূপ্রকৃতি, জলাভূমি, নদী, নিসর্গ জীবনানন্দের চেতনাজগৎ জুড়ে ছিল। তাঁর একান্ত আপন শহর ছিল বরিশাল। দেশ-বিভাগের বিয়োগান্ত নাটকের শুরুতেই; তৎকালীন মফস্সল শহর বরিশালের ‘সর্বানন্দ ভবন’ ছেড়ে ফিরে যান মহানগর কলকাতায়।
জীবনানন্দ যত দূরে গিয়েছেন তাঁর পিছে পিছে হামাগুড়ি দিয়ে পৌঁছে গেছে বরিশাল।
আলোকচিত্র: কামরুল হাসান মিথুন
… দ্যাশের বাড়ি-র অন্যান্য পর্ব …
পর্ব ২৩: বাংলার ১৩০০ নদীর জল নির্গত হয় ঋত্বিকের ক্যামেরায়
পর্ব ২২: দেওয়ালচিত্র দেখেই শিল্পে আগ্রহী হয়েছিলেন সোমনাথ হোর
পর্ব ২১: কলকাতায় যখন বোমা পড়েছিল পরিবার-সহ ‘দ্যাশের বাড়ি’তে আশ্রয় নিয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
পর্ব ২০: বাঙাল ভাষা রপ্ত না হলেও ‘দ্যাশের বাড়ি’র প্রতি জ্যোতি বসুর টান ছিল অতুলনীয়
পর্ব ১৯: সমরেশ বসুর ‘দ্যাশের বাড়ি’ বেঁচে রয়েছে তাঁর সৃষ্টিতে, তাঁর গল্পে, উপন্যাসে
পর্ব ১৮: পাসপোর্ট-ভিসা করে জন্মভূমিতে ফিরতে হবে, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে তা ছিল অপমানের
পর্ব ১৭: ফরিদপুর শহরে জগদীশের সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলেন এক জেলখাটা দুর্ধর্ষ ডাকাত
পর্ব ১৬: দেশভাগের পরও কলকাতা থেকে পুজোর ছুটিতে বানারীপাড়া এসেছিলেন শঙ্খ ঘোষ
পর্ব ১৫: আমৃত্যু ময়মনসিংহের গ্রাম্য ভাষায় কথা বলেছেন উপেন্দ্রকিশোর
পর্ব ১৪: পাবনার হলে জীবনের প্রথম সিনেমা দেখেছিলেন সুচিত্রা সেন
পর্ব ১৩: নদীমাতৃক দেশকে শরীরে বহন করেছিলেন বলেই নীরদচন্দ্র চৌধুরী আমৃত্যু সজীব ছিলেন
পর্ব ১২: শচীন দেববর্মনের সংগীত শিক্ষার শুরু হয়েছিল কুমিল্লার বাড়ি থেকেই
পর্ব ১১: বাহান্ন বছর পর ফিরে তপন রায়চৌধুরী খুঁজেছিলেন শৈশবের কীর্তনখোলাকে
পর্ব ১০: মৃণাল সেনের ফরিদপুরের বাড়িতে নেতাজির নিয়মিত যাতায়াত থেকেই তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার জীবন শুরু
পর্ব ৯: শেষবার বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার আগে জানলায় নিজের আঁকা দুটো ছবি সেঁটে দিয়েছিলেন গণেশ হালুই
পর্ব ৮: শীর্ষেন্দুর শৈশবের ভিটেবাড়ি ‘দূরবীন’ ছাড়াও দেখা যায়
পর্ব ৭: হাতে লেখা বা ছাপা ‘প্রগতি’র ঠিকানাই ছিল বুদ্ধদেব বসুর পুরানা পল্টনের বাড়ি
পর্ব ৬ : জীবনের কালি-কলম-তুলিতে জিন্দাবাহারের পোর্ট্রেট এঁকেছিলেন পরিতোষ সেন
পর্ব ৫ : কলাতিয়ার প্রবীণরা এখনও নবেন্দু ঘোষকে ‘উকিল বাড়ির মুকুল’ হিসেবেই চেনেন
পর্ব ৪ : পুকুর আর বাঁধানো ঘাটই প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের দেশের বাড়ির একমাত্র অবশিষ্ট স্মৃতিচিহ্ন
পর্ব ৩ : ‘আরতি দাস’কে দেশভাগ নাম দিয়েছিল ‘মিস শেফালি’
পর্ব ২: সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় শৈশবের স্মৃতির নন্দা দিঘি চিরতরে হারিয়ে গেছে হাজীগঞ্জ থেকে
পর্ব ১: যোগেন চৌধুরীর প্রথম দিকের ছবিতে যে মাছ-গাছ-মুখ– তা বাংলাদেশের ভিটেমাটির
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved