Robbar

‘টাইম ট্রাভেলার’ বৈভব ফেরালেন নস্টালজিক ভারতকে

Published by: Robbar Digital
  • Posted:February 7, 2026 5:26 pm
  • Updated:February 7, 2026 5:26 pm  

একদিকে যেমন সেই মেশিনে চেপে কেউ ফিরে যাচ্ছেন কপিল দেবের আটের দশকে, কেউ ফিরে যাচ্ছেন নিজের ১৫ বছর বয়সের স্মৃতিতে, অন্যদিকে কেউ কল্পনার জাল বুনে এগিয়ে যাচ্ছেন কয়েক বছর, যেখানে তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন সিনিয়র জাতীয় দলে বৈভব সূর্যবংশীকে– আমাদের একঘেয়ে ক্রিকেট যাপনের মাঝে এই মারকাটারি সেঞ্চুরি কেবলই এক বিস্ময় ইনিংস নয়, বৈভব সূর্যবংশীর সবচেয়ে বড় উপহার বোধহয় এই সময়যানটিই।

অর্পণ গুপ্ত

সময়যান। টাইম ট্রাভেলার। কৈশোরের বিস্ময় যন্ত্র। পৃথিবীটা যেখানে থমকে আছে, সেখান থেকে কয়েক শতাব্দী এগিয়ে-পিছিয়ে যেতে কে না চেয়েছে? এই ধিকিধিকি ছাইচাপা ইচ্ছেদের খানিক উসকে দিয়েছিল ডোরেমন। বাইশ শতক থেকে যে টাইম ট্রাভেল করে ফিরে এসেছিল আমাদের কৈশোরে। আর সেই কবেই হারিয়ে যাওয়া ডোরেমনের মতো টাইম ট্রাভেল করার ইচ্ছে নিয়ে ক্রিকেট খেলতে শুরু করেছিল একজন।

আরে, বুঝলেন না? মোটামুটি নিউজ-প্রিন্টে দিস্তে দিস্তে কাগজ-কালি খরচ করে যে সংখ্যাটা গতকাল থেকে লেখা হয়ে চলেছে– ১৭৫, তার পাশেই তো বসে আছে ৪৩ বছর পিছিয়ে যাওয়ার টাইম ট্রাভেল মেশিন। কপিল দেব। জিম্বাবোয়ে। ১৯৮৩। বিশ্বকাপ। আর একটা আস্ত দেশকে স্মৃতির সেপিয়া বিকেলে হাত ধরে ঘুরিয়ে আনলেন ডোরেমনের অন্ধভক্ত বৈভব সূর্যবংশী।

বৈভব সূর্যবংশী

একটা পরিসংখ্যান। তার দিকে তাকিয়ে বিস্মিত গোটা দেশ। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালে ১৭৫ রানের এই ইনিংসের ঘোর কাটিয়ে সংবাদমাধ্যম যখন স্কোরবোর্ড থেকে তুলে আনছে একের পর এক বোমা– মানে ধরা যাক, অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ইতিহাসে ফাইনালে সর্বোচ্চ স্কোর, এক ইনিংসে সর্বাধিক ১৫টি ছক্কা ইত্যাদি পেরিয়ে আরও একটি পরিসংখ্যান বেশ ভাবাল। বৈভব সূর্যবংশী গত আইপিএলেই সেঞ্চুরি করেছেন, তা নিয়ে হইহুল্লোড়ও কম হয়নি। কিন্তু শুধু আইপিএল না; বৈভব মাত্র ১৪ বছর বয়সে ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় টেস্ট দলের হয়ে অভিষেকেই সেঞ্চুরি করেছেন, ৩৬ বলে সেঞ্চুরি করেছেন বিজয় হাজারে ট্রফিতে, ৬১ বলে সেঞ্চুরি করেছেন সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে। অর্থাৎ, রনজি ট্রফি বাদে প্রায় প্রতিটি ঘরোয়া টুর্নামেন্ট, আইপিএল এবং বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের হয়ে ব্যাট হাতে সেঞ্চুরি করা হয়ে গিয়েছে তার। সোশাল মিডিয়ায় মজা করে অনেকে বৈভবের ১৪ বছর বয়সে এই বিস্ময়কীর্তির কথাপ্রসঙ্গে চালু করেছেন নতুন ট্রেন্ড– ‘What were you doing during your 14?’ এটাও তো একপ্রকার স্মৃতিতে ফেরানোই বটে! ১৪ বছরে কেউ ছিলেন মাধ্যমিকের বাধ্য ছেলে, তো কেউ ভাগ করে নিচ্ছেন প্রথম সুখটানের স্মৃতি!

সবুজ ঘাসে চেনা গল্প

বৈভব সূর্যবংশীর ক্রিকেটার হিসেবে উঠে আসার গল্পখানাও কিন্তু উপমহাদেশের ওই ‘rags to riches’– টেমপ্লেট মেনেই। বিহারের সমস্তিপুর থেকে লম্বা পথ পেরিয়ে ট্রেনিং, অনূর্ধ্ব-১৬ জেলা স্তরে ট্রায়াল– খরচ চালাতে বাবার জমি বিক্রি, মানে খানিক মতি নন্দীর উপন্যাসের চরিত্রের মতোই গল্পখানা জনপ্রিয় হওয়ার সমস্ত সম্ভাবনা নিয়ে দাঁড়িয়ে। আর এখানে শুধু তো বৈভব না, কমল গুহকে চিনে ফেলার জহুরির চোখ নিয়ে পল্টুদাও উপস্থিত। ভারতীয় ক্রিকেটের গুরু দ্রোণ– রাহুল দ্রাবিড়।

রাজস্থান রয়্যালস ফ্র্যাঞ্চাইজির ডাকে ট্রায়ালে এসেছিলেন বৈভব, বছর দুয়েক আগে। প্রথম দেখাতেই প্রতিভা চিনতে ভুল করেননি ব্যাটিং কোচ বিক্রম রাঠোর ও রাহুল দ্রাবিড়। এমনকী, নিজের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে মুগ্ধ দ্রাবিড় লিখেও ছিলেন বৈভবকে ট্রায়ালে দেখে তিনি অভিভূত! এই মুগ্ধতাই নিলামের মঞ্চে তাঁর নামের পাশে বসিয়েছিল চড়া প্রাইস ট্যাগ। আর কে না জানে, বৈভবের এই দেশব্যাপী বিস্ময় হয়ে ওঠার শুরুটা খানিক ওই আইপিএল সেঞ্চুরির পর থেকেই।পৃথিবীর জনপ্রিয়তম ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট টুর্নামেন্টে সেঞ্চুরির আগেও বৈভবের ঘরোয়া ক্রিকেটের লিস্ট-এ রেকর্ড ঈর্ষণীয় ছিল। আইপিএল তাকে দিল সেই পরিচিতি।

গুরু-শিষ্য সংবাদ: রাহুল দ্রাবিড়ের সঙ্গে বৈভব সূর্যবংশী

হারারে-তে অনূর্ধ্ব-১৯ ফাইনালের বিস্ময় ইনিংসের পর ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের তরফে টুইট: ‘Cometh the hour, cometh Vaibhav Sooryavanshi’। এই মোক্ষম সময়ে মোক্ষম প্রতিভার জ্বলে ওঠার ইতিহাসে ভারতীয় ক্রিকেটে যে নামগুলি প্রথম সারিতে আসে, যেমন, শচীন তেণ্ডুলকর, যুবরাজ সিং– তাঁদের পাশেই উচ্চারিত হল ১৪ বছরের বৈভবের নামও। এক্ষেত্রে জরুরি বিষয়, ভারতের সিনিয়র জাতীয় দলের টি-২০ স্কোয়াডে কবে দেখা যাবে এই প্রতিভাকে? অঙ্কের বিচারে সময় প্রয়োজন। কয়েকটা বছর তো বটেই। ভারতের জাতীয় টি-২০ সিনিয়র স্কোয়াডটি, আজ যারা নামছে বিশ্বকাপের মঞ্চে, সেই স্কোয়াডের দিকে তাকালে বোঝা যায়, গত কয়েক বছরে টি-২০ ফরম্যাটে ভারত কী বিপুল পরিমাণে প্রতিভা তুলে আনতে পেরেছে। অভিষেক শর্মার দিকে তাকিয়ে তামাম ক্রিকেট প্রাজ্ঞরা মেনেই নিয়েছেন, প্রথম আট ওভার যদি অভিষেক টিকে যান, তাহলে ম্যাচ ভারতের পকেটে। সঞ্জু স্যামসনের অফ ফর্ম থাকলেও ব্যাপকভাবে ফিরে এসেছে ইশান কিষাণ। মিডল অর্ডারে ঝোড়ো রান তোলায় সিদ্ধহস্ত তিলক বর্মা– লোয়ার মিডিল অর্ডারে শিবম দুবে, রিঙ্কু সিং কিংবা হার্দিক পান্ডিয়ার মতো টি-২০ স্পেশালিস্টের নাম ইতিমধ্যেই ভারতকে এই বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট তকমা দিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে কেউ কেউ লিখছেন, এই দলে যেদিন আসবেন বৈভব, সেদিন কী ঘটবে? বৈভব-অভিষেক একসঙ্গে ক্রিজে থাকলে রানের ঝড় কেমন হতে পারে, তা নিয়ে আগাম ভবিষ্যদ্বাণী করে ফেলছেন নেটিজেনরা। কেউ মজা করে লিখছেন, বৈভব-অভিষেক শর্মার কাল্পনিক জুটি ব্যাট করলে সমর্থকদের হেলমেট পরে মাঠে যাওয়ার নিয়ম চালু করুক আইসিসি।

যোগ্য দোসর: বৈভবের সঙ্গে অভিষেকের জুটি ভারতীয় ওপেনিংয়ের ভবিষ্যৎ

তবে, একথা সত্যি– অতীতে উন্মুক্ত চাঁদের মতো প্রবল সম্ভবনাময় তারকার পাদপ্রদীপের আলো থেকে একেবারে হারিয়ে যাওয়া নিয়েও সিঁদুরে মেঘ দেখছেন অনেকে। বৈভব সূর্যবংশী ভারতের সিনিয়র দলে এলে, এবং ভারত যদি তাঁদের টি-২০ স্কোয়াডের স্পিন বোলিং বিভাগটিকে আরেকটু শক্তিশালী করতে পারে, তবে আগামী তিন-চার বছর বিশ্বক্রিকেটে তাঁদের অপ্রতিরোধ্য হয়ে যাওয়ার কথা, অন্তত খাতা-কলমের হিসেব তা-ই বলছে। বৈভবের কোচ সৌরভ কুমার তো বলেই দিয়েছেন, বৈভব সিনিয়র দলে সুযোগ পেলে ভারত ২০ ওভারে ধারাবাহিকভাবে ৩০০ রান অনায়াসে করবে।

এই সমস্ত সম্ভাবনা-তত্ত্ব, পরিসংখ্যান, বিস্মিত-নিমেষহত হয়ে পড়া জনতার বিপ্রতীপে বৈভব রেখে গেল সেই টাইম মেশিনটি। একদিকে যেমন সেই মেশিনে চেপে কেউ ফিরে যাচ্ছেন কপিল দেবের আটের দশকে, কেউ ফিরে যাচ্ছেন নিজের ১৫ বছর বয়সের স্মৃতিতে, অন্যদিকে কেউ কল্পনার জাল বুনে এগিয়ে যাচ্ছেন কয়েক বছর, যেখানে তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন সিনিয়র জাতীয় দলে বৈভব সূর্যবংশীকে– আমাদের একঘেয়ে ক্রিকেট যাপনের মাঝে এই মারকাটারি সেঞ্চুরি কেবলই এক বিস্ময় ইনিংস নয়, বৈভব সূর্যবংশীর সবচেয়ে বড় উপহার বোধহয় এই সময়যানটিই।

……………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন অর্পণ গুপ্ত-র অন্যান্য লেখা

……………………….