Robbar

নন্দিনীর ওপেন রিলেশনশিপ!

Published by: Robbar Digital
  • Posted:February 14, 2026 7:16 pm
  • Updated:February 14, 2026 8:11 pm  

বিশু বুঝল দূরের পাওনার আকাঙ্ক্ষার মানুষী দুঃখ নিয়ে তাকে বাকি জীবন কাটাতে হবে। সে নন্দিনীকে ছোট শারীরিকতায় পাবে না, তার সঙ্গে তার নতুন জার্নি দুখজাগানিয়ার জার্নি। অন্য একটা ফর্মে জার্নিটাকে নিয়ে যেতে হবে। কমরেডশিপ। দু’জনে কোনও একটা আদর্শের জন্য লড়বে। নন্দিনীর জীবনে একপিঠে রঞ্জন অন্যপিঠে বিশু। খুব ফালতু লাগছে? মনোগ্যামি পলিগ্যামি এই সব মাথায় উঁকি দিচ্ছে? কিংবা, মনে হচ্ছে একালে যেমন লেখা থাকে ‘ওপেন-রিলেশনশিপ’ সেই রকম কিছু একটা।

বিশ্বজিৎ রায়

আচ্ছা নন্দিনী আর বিশুর গপ্‌পোটা ঠিক কী বলুন তো? ‘রক্তকরবী’-র কথা বলছি, রবীন্দ্রনাথের। শম্ভু মিত্রের করা নাটকটা না-হয় দেখার উপায় ছিল না, পরে জন্মেছেন, তবে নাটকের গল্পটা তো পড়তেও পারতেন। কী বললেন? রবীন্দ্র-নাটকে গপ্‌পো নেই। সাংকেতিক ভাব-টাব! শেক্সপিয়রের নাটকের মতো ঘটনার ঘনঘটা থাকে না। কথাটা পুরোপুরি সত্য নয়। ঘটনা থাকে, কিস্‌সা থাকে। এই ‘রক্তকরবী’র কথা-ই ভাবুন না। বেশ একটা প্রেমের কিস্‌সা। নন্দিনী নামের মেয়েটিকে সবাই পেতে চায়। তাই নিয়ে যুবকদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। নন্দিনীও ব্যাপারটা বেশ এনজয় করে, হালকা একটা ব্যাপার তার মধ্যে আছে। সেটা অস্বীকার করা যায় না। সেই সুন্দরীপনার উচ্ছ্বল ঢেউ ভাঙলে তবে ভেতরের অন্য মানুষটার খোঁজ মেলে।

রক্তকরবীর ছবি। শিল্পী: রতন থিয়াম

 

শস্যে সম্পন্ন বনে-নদীতে ঘেরা গ্রামের দুই ছেলে রঞ্জন আর বিশু নন্দিনীকে পাওয়ার জন্য লড়েছিল। রঞ্জনের দিকেই শেষ অবধি নন্দিনী ঢলে পড়ে। পড়বে নাই বা কেন! নন্দিনী বলেছে রঞ্জনের কীর্তিকলাপের কথা। ‘দুই হাতে দুই দাঁড় ধরে সে আমাকে তুফানের নদী পার করে দেয়; বুনো ঘোড়ার কেশর ধরে আমাকে বনের ভিতর দিয়ে ছুটিয়ে নিয়ে যায়; লাফ-দেওয়া বাঘের দুই ভুরুর মাঝখানে তীর মেরে সে আমার ভয়কে উড়িয়ে দিয়ে হা হা করে হাসে। আমাদের নাগাই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্রোতটাকে যেমন সে তোলপাড় করে, আমাকে নিয়ে তেমনি সে তোলপাড় করতে থাকে। প্রাণ নিয়ে সর্বস্ব পণ করে সে হারজিতের খেলা খেলে। সেই খেলাতেই আমাকে জিতে নিয়েছে।’

এই সব কিছুর দৃশ্যরূপ দিলে এক্কেবারে বলিউডি কি হলিউডি মুভি! পাক্কা। রঞ্জন তো নয়, এ যেন শাহরুখ খান। নদী আর বনের দৃশ্য কোথায় তোলা হবে? ঠিকঠাক লোকেশন চাই। আর বিশু? সে কী করল? নন্দিনী বলে বিশুকে, ‘একদিন তুমিও তো তার মধ্যে ছিলে, কিন্তু কী মনে করে বাজিখেলার ভিড় থেকে একলা বেরিয়ে গেলে। যাবার সময় কেমন করে আমার মুখের দিকে তাকালে বুঝতে পারলুম না–তার পরে কতকাল খোঁজ পাই নি। কোথায় তুমি গেলে বলো তো।’

‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকশিত রক্তকরবীর অলংকরণ। শিল্পী: গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

রঞ্জনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হেরে গিয়ে বিশু কোথায় গেল? ‘সাগর’ (১৯৮৫)-এর মতো হিন্দি-সিনেমার গল্প তো রবীন্দ্রনাথ বোনেননি। বিশু কমল হাসান নয় যে বিরহে প্রাণ দেবে! নন্দিনীর হৃদয় জয় করতে না-পেরে সে আরেকজনকে বিয়ে করেছিল। নাটকে সেই মেয়েটির নাম নেই, কাজের বর্ণনা আছে। সেই মেয়েটি বিশুকে বলেছিল খনি শহরে চাকরি নিতে। বিশু নিল সে চাকরি, নজরদারির কাজ। খনি শ্রমিক সে নয়, পড়াশোনা জানা ছেলে। খনি শহরের ম্যানেজমেন্ট তাকে খনি-শ্রমিকদের উপর নজর রাখার কাজ দিল। তথ্যের তো চিরকালই অনেক অনেক দাম। নজরদারির আর তথ্য সরবরাহের কাজের মোটা মাইনে ঢুকত বিশুর পকেটে। উপরের দিকের সর্দারদের বউদের পার্টিতে বিশুর বউয়েরও ডাক পড়ত। মদ, মুখোশ পরে আমোদ। তবে এই তথ্য-প্রযুক্তির কাজে, নজরদারিতে বিশু বেশিদিন লেগে থাকতে পারল না। চাকরি দিল ছেড়ে। মাইনে কাটা পড়ল। যেহেতু তার সঙ্গে তার বউয়ের সম্পর্ক সামাজিক চুক্তি, মোটা মাইনের চাকরিই তাদের বিবাহবন্ধনের কারণ, সুতরাং বিশু চাকরি ছাড়তেই দু’জনের ব্রেক-আপ। মেয়েটি চলে গেল। আর বিশু?

বউ হারা, চাকরিহারা বিশু কোনওক্রমে যক্ষপুরী নামের খনি শহরে মদ খেয়ে টিকে রইল। এই সময় সেখানে এলো নন্দিনী, জানা গেল রঞ্জনও আসবে। এই খনি শহরে নন্দিনীর সঙ্গে বিশুর আবার দেখা। কী করবে বিশু? না-চিনে মুখ ফিরিয়ে চলে যাবে? না, বিশু তা যায়নি। নন্দিনীর সঙ্গে তার সম্পর্কের নতুন একটা জার্নি শুরু হল। বিশু এই জার্নির নাম দিয়েছে ‘দুখজাগানিয়া’। কেন এমন নাম? নিজেই সে-কথা বলেছে সে। ‘কাছের পাওনাকে নিয়ে বাসনার যে দুঃখ তাই পশুর, দূরের পাওনাকে নিয়ে আকাঙ্ক্ষার যে দুঃখ তাই মানুষের। আমার সেই চিরদুঃখের দূরের আলোটি নন্দিনীর মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে।’ কী কথাটা মাথার উপর দিয়ে গেল? কাব্য-কাব্য লাগছে!। ভেঙে বললে আর লাগবে না। কাছের পাওনার বাসনায় নন্দিনীকে রঞ্জনের সঙ্গে লড়াই করে পেতে চেয়েছিল বিশু। পেল না। তখন পুরুষের অহং মেটাতে আরেকজনকে বিয়ে করল। সে বিয়ে টিকল না কারণ কাছের পাওনায় বিশুর মন ভরেনি। সে বুঝল দূরের পাওনার আকাঙ্ক্ষার মানুষী দুঃখ নিয়ে তাকে বাকি জীবন কাটাতে হবে। সে নন্দিনীকে ছোট শারীরিকতায় পাবে না, তার সঙ্গে তার নতুন জার্নি দুখজাগানিয়ার জার্নি। অন্য একটা ফর্মে জার্নিটাকে নিয়ে যেতে হবে। কমরেডশিপ। দু’জনে কোনও একটা আদর্শের জন্য লড়বে। নন্দিনীর জীবনে একপিঠে রঞ্জন অন্যপিঠে বিশু। কী খুব ফালতু লাগছে? মনোগ্যামি পলিগ্যামি এই সব মাথায় উঁকি দিচ্ছে? কিংবা, মনে হচ্ছে একালে যেমন লেখা থাকে ‘ওপেন-রিলেশনশিপ’ সেই রকম কিছু একটা। এআই ওপেন-রিলেশনশিপ বললেই লিখে দেবে, ‘is a form of ethical non-monogamy where partners in a committed, primary relationship mutually agree to allow sexual or romantic involvement with others. Based on transparency and trust, these relationships require established boundaries to manage jealousy and ensure both parties are fully consenting.’

‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকশিত রক্তকরবীর অলংকরণ। শিল্পী: গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ কী ভাবছিলেন? রবীন্দ্রনাথ ভাবছিলেন বোধহয় আরেকটু নিজের মতো করে। এই নাটকে খনি মজুরদের কাজ করিয়ে পৃথিবীর প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ একচেটিয়া ভাবে মুনাফা আদায়ের উপায় হিসেবে ব্যবহার করতে চায় যক্ষপুরীর প্রশাসন। পৃথিবীর উপর মুনাফার একচেটিয়া অধিকার দেওয়া চলবে না ম্যানেজমেন্টকে। এই নাটক সেই ব্যবস্থাকে ভাঙার নাটক। পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও যে একচেটিয়া অধিকারের সম্পর্ক নয় তাও বোঝা চাই। নন্দিনীর সঙ্গে দ্বিতীয়বার যখন বিশুর দেখা হল তখন এই সত্যই তারা বুঝেছে ও যাপন করতে চেয়েছে। নন্দিনী বিশুর গান শুনে বলেছিল, ‘পাগল, যখন তুমি গান কর তখন কেবল আমার মনে হয় অনেক তোমার পাওনা ছিল, কিন্তু কিছু তোমাকে দিতে পারি নি।’ উত্তরে বিশু বলে, ‘তোর সেই কিছু-না-দেওয়া আমি ললাটে পরে চলে যাব। অল্প-কিছু দেওয়ার দামে আমার গান বিক্রি করব না।’ একচেটিয়া অধিকারের সম্পর্কে দেওয়া-নেওয়ার হিসেব চলে, যে সম্পর্ক একচেটিয়া অধিকারের সম্পর্ক নয় তাতে দেওয়া-নেওয়ার হিসেব চলে না।

কী ‘রক্তকরবী’ নাটকটা একবার পড়া হবে নাকি?
প্রতিটি সম্পর্কের নিজত্ব থাকে। কোনওটি কোনওটির বিকল্প নয়। বিশু গান গায়। রঞ্জনের জন্য পথের ধারে অপেক্ষা করতে করতে নন্দিনী সে গান শোনে।

যুগে যুগে বুঝি আমায় চেয়েছিল সে।
সেই বুঝি মোর পথের ধারে রয়েছে বসে।
আজ কেন মোর পড়ে মনে, কখন্‌ তারে চোখের কোণে
দেখেছিলেম অফুট প্রদোষে।
সেই যেন মোর পথের ধারে রয়েছে বসে!

আর কথা নয়। সব কথা বলতে নেই। সব কিছু পেতেও নেই। পৃথিবীর সব কিছু পেতে চাওয়ার যে প্রযুক্তি-বাসনা, ক্ষমতা-সাধনা তারই চাপে মানুষের সভ্যতা দিশাহারা হয়ে যাচ্ছে। ভালোবাসা মানে না-পাওয়া, ভালোবাসা মানে কোথাও কারও মনে কেউ দুখজাগানিয়া। সে এক অন্য জার্নি।