
একটা মোটামুটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হল, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতে ‘ক্রেডিবল্’ বা বিশ্বাসযোগ্য। না হলে এই মধ্যবর্তী সরকারের অপদার্থতা আরও স্পষ্ট হত, হয়তো দেশের মানুষও চাইছিল এই নির্বাচন, এবং মোট প্রকাশিত ২৯৭ সিটের (বাংলাদেশ সংসদের সিট ৩০০) তারেক রহমান পরিচালিত বাংলাদেশ জাতীয় দল বা বিএনপি পেল ২০৯টি সিট, আর জামাতিরা অপ্রত্যাশিতভাবে ৬৮টির বেশি আসনে এগতে পারল না। বলা বাহুল্য ভোট পড়েছে ষাট শতাংশেরও কম, মোট ৫৯.৪৪। তাতে আওয়ামী সমর্থকদের উদাসীনতা বোঝা যায়। কিন্তু তাদের আড়ালে নিরন্তর প্রচার সত্ত্বেও মানুষ নির্বাচন থেকে বিমুখ হয়নি; তার কারণ স্পষ্ট, তারা মরিয়া হয়ে এই অরাজক অবস্থার পরিবর্তন চাইছিল।
কোনও প্রতিবেশী দেশের নির্বাচন নিয়ে আমাদের মতো সাধারণ ভারতীয় নাগরিকের মাথাব্যথার কোনও যুক্তি নেই। পাকিস্তান, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার নির্বাচন আমাদের কাছে, এক-এক দেশের ক্ষেত্রে এক-এক রকম হলেও, কিছুটা অ্যাকাডেমিক কৌতূহলের বেশি কিছু উদ্রেক করে না, সংবাদপত্রে দেখার পরদিনই তা ভুলে যাই। কিন্তু বাংলাদেশ হল বাংলাদেশ, আমাদের বাঙালিদের বৃহত্তর অংশ সেখানে বাস করে শুধু নয়, আমাদের মতো অনেক বৃদ্ধের সেখানে জন্ম, আমাদের স্মৃতি-ব্যাকুলতার আশ্রয়ে এখনও প্রচুর আত্মীয়স্বজন এবং হিন্দু-মুসলমান বন্ধুবান্ধব সেখানে বাস করেন, টেলিফোনে ফেসবুকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে, সুখদুঃখ আনন্দ-উদ্বেগের কথা আদানপ্রদান হয়। কাজেই স্বাভাবিক অবস্থাতেও তার নির্বাচন নিয়ে আমাদের উদ্বেগ ও উৎসাহ তৈরি হয়।

আর এ নির্বাচন তো হল এক অস্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে। গত ২০২৪-এর তথাকথিত জুলাই বিপ্লব ঘটল; তখন এই লেখক নিজেই (১৮-২২ জুলাই) আমন্ত্রিত হয়ে বাংলাদেশে। কিন্তু আমন্ত্রণে গিয়ে কর্তব্যকর্ম করার আর অবকাশ ঘটল না, লেখক দরজা-জানলা বন্ধ ফ্ল্যাটে, রাস্তায় পুলিশের গুলি আর টহলদার ভ্যানের আওয়াজ শুনতে শুনতে, প্রভাবশালী বন্ধুদের সহায়তায় কোনওক্রমে প্লেনের একটা অগ্রিম টিকিট জোগাড় করে পালিয়ে এল, তারপরেই ওই ‘বিপ্লব’ শুরু হয়ে গেল। যে মুক্তিযোদ্ধা-কোটা-ব্যবস্থার অপসারণের জন্য বিপ্লব, আদালত তার সমাধান করা সত্ত্বেও সে কারণ কোথায় আকাশে মিলিয়ে গেল, আর তার জায়গা নিল তখনকার প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার ওল্টানোর জন্য ব্যাপক অরাজকতা। তার পরে, কেউ যা স্বপ্নেও সম্ভব বলে বিশ্বাস করতে পারেনি তাই অবিশ্বাস্য দ্রুত লয়ে ঘটতে থাকল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিলেন, ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়ি ধুলোয় মিশিয়ে গেল, শেখ মুজিবের মহামহিম মূর্তি, তাঁর ও মুক্তিযুদ্ধের নানা চিহ্ন নিঃশেষে ধ্বংস করা হল। প্রায় এক অরাজক অবস্থার মধ্যে (বীভৎস পুলিশ খুন, নারীধর্ষণ, সম্পত্তি লুঠ, সংখ্যালঘুদের হত্যা ও নির্যাতন– কী নয়?) এককালে শেখ হাসিনার আমলে পীড়িত আর শান্তির নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস ছাত্র আর অন্যান্য বিক্ষোভকারীর মধ্য থেকে বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা গ্রহণ করে নিজে মুখ্য উপদেষ্টা হয়ে বাংলাদেশ শাসনের সাময়িক দায়িত্ব নিলেন। আমাদের প্রথমে মনে হয়েছিল যে, ওই বিপ্লব একটা স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ, কিছুই তার সংগঠিত নয়, কিন্তু ইউনুস বললেন যে, ওই বিপ্লব নাকি ‘মেটিকিউলাসলি ডিজাইন্ড’ অর্থাৎ অতি সূক্ষভাবে পূর্ব-পরিকল্পিত। আমরা জানি না, বিশ্বগুরু মার্কিনদেশে বসে কেউ বা কারা এই ‘সূক্ষ্ম পূর্ব-পরিকল্পনা’ করেছিল কি না, গোপনে কারা এই উপদেষ্টা আর মহাউপদেষ্টা চিহ্নিত করেছিল। বা তাতে কোন বিশ্বশক্তির ভূমিকা কী ছিল। যাই হোক, অশান্ত, শৃঙ্খলাহীন, মব-শাসিত বাংলাদেশে, যথেচ্ছ অনাচারের আবহে একটি অস্থায়ী শাসন চলতে লাগল, যে শাসন কিছুই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি, শুধু এই আশ্বাসটুকু ভাসিয়ে দিয়েছিল যে, একটা নির্বাচন হবে ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে, শেষে ঠিক হয় এ মাসের ১২ তারিখে। নির্বাচন হলে স্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, উপদেষ্টা সম্প্রদায় আর প্রধান উপদেষ্টাও সরে যাবেন। সম্ভবত, কারণ আমরা এখনও জানি না ইউনুস ঠিক কী করবেন।

কিন্তু, অদ্ভুত কথা, এই নির্বাচন হবে তাঁদের শর্তে। তাঁদের চিহ্নিত ভিলেন হল আওয়ামী লীগ, সেই দল, এখনও দেশের সবচেয়ে বেশি সম্ভাব্য জনসমর্থন যাদের পিছনে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। এটা কি তা হলে ‘বৈধ নির্বাচন’ বলে গণ্য হবে? এই প্রশ্ন মাথায় নিয়েই শেষপর্যন্ত বাংলাদেশের নির্বাচন হল যথানির্দিষ্ট তারিখে। সুখের কথা যে, এর মধ্যে ওদেশের বা বিদেশের কোনও শক্তি এই নির্বাচনকে বানচাল করার চেষ্টা করেনি। করেনি যে, তার একটা কারণ সম্ভবত এই যে, সকলেই ভেবেছিল নির্বাচনের ফলাফল এবার, আওয়ামি লীগকে নিষিদ্ধ করার ফলে সুস্পষ্টভাবেই জামাতি-জেহাদিদের পক্ষে যাবে, কারণ উপদেষ্টা আর সক্রিয় পথ-রাজনৈতিকদের মধ্যে তাদের উপস্থিতি আর দাপটই সবচেয়ে বেশি ছিল। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নগুলির নির্বাচনে জামাতিদের জয়ও সেই দিকে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছিল। ফেসবুকে পথ-চলতিদের (সবজিবিক্রেতা, রিকশোচালক) ইন্টারভিউ থেকেও যেন সেইরকম বিশ্বাস উৎসাহ পাচ্ছিল। নারীদের পোশাক, শিক্ষা, চাকরি ইত্যাদি সম্বন্ধে নানা উচ্চারণ, তার সঙ্গে, হয়তো, নানা জায়গায় বিচ্ছিন্ন, কিন্তু অব্যাহত সংখ্যালঘু নিধনও সেই নির্দেশ বহন করেছে।

২
যাই হোক, একটা মোটামুটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হল, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতে ‘ক্রেডিবল্’ বা বিশ্বাসযোগ্য। না হলে এই মধ্যবর্তী সরকারের অপদার্থতা আরও স্পষ্ট হত, হয়তো দেশের মানুষও চাইছিল এই নির্বাচন, এবং মোট প্রকাশিত ২৯৭ সিটের (বাংলাদেশ সংসদের সিট ৩০০) তারেক রহমান পরিচালিত বাংলাদেশ জাতীয় দল বা বিএনপি পেল ২০৯টি সিট, আর জামাতিরা অপ্রত্যাশিতভাবে ৬৮টির বেশি আসনে এগতে পারল না। বলা বাহুল্য ভোট পড়েছে ষাট শতাংশেরও কম, মোট ৫৯.৪৪। তাতে আওয়ামী সমর্থকদের উদাসীনতা বোঝা যায়। কিন্তু তাদের আড়ালে নিরন্তর প্রচার সত্ত্বেও মানুষ নির্বাচন থেকে বিমুখ হয়নি; তার কারণ স্পষ্ট, তারা মরিয়া হয়ে এই অরাজক অবস্থার পরিবর্তন চাইছিল।

এই ফলাফল উপমহাদেশের পক্ষে নিশ্চয় স্বস্তির। উগ্র জামাতি-জেহাদিরা ক্ষমতায় এলে যে পরিবর্তনগুলি ঘটত সেগুলির একটি তালিকা এই রকম–
১. বাংলাদেশ একটি ইসলামের বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখা (‘মুসলিম হ্যায় হম্, ওয়াতন্ হ্যায় সারে জাহাঁ হামারা) পুরোপুরি ইসলামি রাষ্ট্রে পরিণত হত, উপমহাদেশে পাকিস্তানের দোসর।
২. তার ফলে আঞ্চলিকভাবে ভারতের সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও খারাপ হত (যদিও অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা তার খানিকটা রাশ টেনে রাখত), তবে ভারতের পক্ষে তা ছোটখাটো কাঁটার অস্তিত্ব তৈরি করত। ভারত সম্বন্ধে ‘এই করেঙ্গা, সেই করেঙ্গা’ (চিকেন’স নেক দখল, মেঘালয় বা কলকাতা দখল) ইত্যাদি অবিশ্বাস্য ও হাস্যকর বাগাড়ম্বর থামত না। পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদী কাজে এই রাষ্ট্রকে ব্যবহার করত।
৩. নারীদের পোশাক-আশাক, বাইরে বেরনো আর চাকরি করা, শিক্ষা ইত্যাদি নিয়ে সম্ভব-অসম্ভব বিধিনিষেধ উচ্চারিত হত।
৪. হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সংখ্যালঘুদের, বিশেষত হিন্দুদের অবস্থা আরও বিপন্ন হত। সরকারি নীতির ফলে না হোক, ব্যক্তিগত লোভ ও হিংসার ফলে।
৫. বাংলা ভাষার চরিত্র বদলানোর চেষ্টা হত, এবং দুই বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতির সমলয়ের অগ্রগতি ব্যাহত হত।
৬. গান, নাটক, চিত্রকলা ইত্যাদির সৃষ্টি, শিক্ষা আর প্রদর্শন-অভিকরণ সম্বন্ধে বাধা নেমে আসত এবং বাংলাদেশকে একটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন মধ্যযুগীয় ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা হত। ভারতেও শিক্ষাকে সেই ভাবেই নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা হচ্ছে।
৭. বাংলাদেশের নাম, জাতীয় সংগীত, তার সংস্কৃতিতে রবীন্দ্রনাথের অবস্থান– সবই আক্রমণের মুখে পড়ত।

৩
তাই আমরা বিএনপির দিকে কিছুটা আশা নিয়ে তাকিয়ে আছি। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক, মুজিব হত্যা আর শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টার সঙ্গে তাদের যোগ থাকলেও তাদের বাংলাদেশে নির্বাচিত শাসনকর্মের একটি ঐতিহ্য আছে। তারেকের আর্থিক দুর্নীতির ইতিহাসও তার পাশাপাশি আছে। তবু, আশার বিরুদ্ধে আশা করে বলা যায়, বিএনপি একটি সংগঠিত ও রাজনৈতিক শৃঙ্খলাপূর্ণ দল, হয়তো তাদের অভিজ্ঞতাই তাদের মধ্যপথে থাকতে বাধ্য করবে। জানি না, ৩২ নম্বর ধানমন্ডি, শেখ মুজিবের মূর্তি বা মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত বিধ্বস্ত চিহ্ন পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব হবে কি না, কিন্তু আমরা বাংলাদেশকে আমরা আবার একটি শান্ত ও অগ্রমুখী রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাই, শেখ হাসিনার আমলে তার যা সাধারণ চরিত্র ছিল।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved