war on iran and khamenei’s death global geopolitical fallout| Robbar
Robbar
  • ৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২৫ আগস্ট ২০২৬

আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ কোন পথে?

আফগানিস্তানে বিশ বছর কাটিয়ে, অজস্র ডলার খরচ করেও, তাকে বদলাতে পারেনি আমেরিকা। তার আগে ইরাকের অভিজ্ঞতাও সেরকম। ভিয়েতনাম তো এখনও তাদের দুঃস্বপ্নে তাড়া করে ফেরে। আর সুবিশাল ইরান দেশটার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া বোধকরি তার চাইতে অনেক কঠিন। সেটা আমেরিকা জানে না, তাও নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প মানেন কিনা, সেটাই প্রশ্ন। ইরান আক্রমণ শানিয়ে চলেছে আপাতত। তবে আমেরিকা-ইজরায়েলের– কিংবা তাদের যে যে মিত্র দেশ জড়িয়ে পড়বে যুদ্ধে তাদের– মিলিত শক্তির সঙ্গে কতদিন চোখে চোখ রেখে যুঝতে পারবে ইরান?

Published by: Robbar Digital

Posted:March 5, 2026 3:12 pm | Updated:March 5, 2026 3:26 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

তিনটে দিন সবে কেটেছে আমেরিকা-ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের তথাকথিত যুদ্ধের। বিগত ৩৭ বছর ধরে যিনি ইরানের ‘সুপ্রিম লিডার’, সেই আয়াতোল্লা আলি খামেইনি-কে হত্যার পরে কেটে গিয়েছে দুটো দিন। যুদ্ধের দামামা যেন তীব্রতর হচ্ছে ক্রমশ। কোন পথে চলেছে যুদ্ধ? কী এর পরিণতি? এবং কীভাবে বদলে যাচ্ছে দুনিয়ার রাজনীতি, তার শক্তির বিন্যাস? কীভাবে বদলে বদলে যায় বৈশ্বিক রাজনীতির শতরঞ্জের নিয়মকানুন?

zoom
যুদ্ধবিদ্ধস্ত ইরানের ছবি

গত জুনেও ইরান আক্রমণ করেছিল আমেরিকা-ইজরায়েল। সেবারের যুদ্ধবিরতির পর থেকে আলোচনার টেবিলে বসেছে ইরান আর আমেরিকা। এই তো গত শুক্রবারই জেনিভাতে হয়েছে একপ্রস্থ আলোচনা। এ সপ্তাহে ভিয়েনাতে আবার আলোচনা হওয়ার কথা ছিল তারপর থেকে। মধ্যস্থতাকারী কাতারের বিদেশমন্ত্রী কিন্তু বলেছেন যে আলোচনা এগচ্ছিল ইতিবাচক দিকেই। এর মধ্যেই আমেরিকা এবং তার সহযোগী ইজরায়েল আক্রমণ করল ইরান। আসলে ডোনাল্ড ট্রাম্প বোধকরি খানিক অধৈর্য হয়ে পড়ছিলেন। আগের সপ্তাহে তিনি দশ দিনের সময় দেন ইরানকে। সেই সময়সীমা পেরনোর আগেই আক্রমণ করা হল ইরানকে। হিসেব করলে দেখা যাবে, এটাও বোধহয় ট্রাম্পের একটা প্যাটার্ন।

zoom
মিসাইল, ড্রোন আর বোমারু বিমানই এ যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র

যাই হোক, এ যুদ্ধ বা আক্রমণ– হচ্ছে মূলত মিসাইল, ড্রোন আর বোমারু বিমান দিয়ে। ইরানের প্রতি-আক্রমণও ছুটল ইজরায়েলের দিকে। সেটা অপ্রত্যাশিত নয়। কিন্তু ইজরায়েলের জমাটি আয়রন ডোমের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙে মারাত্মক কিছু করা কঠিন বইকি। জুনেও তাই হয়েছে। আর আমেরিকা তো আটলান্টিকের ওপারে। তাদের মস্ত সুবিধে এই যে ইউরোপ কিংবা এশিয়াতে ঘটতে থাকা যুদ্ধের মিসাইল, বোমা তাদের ভূখণ্ডে পৌঁছয় না। অন্যের মাটিতে বা আকাশে যুদ্ধ করাই তাদের অভ্যেস। কিন্তু এখানেই দেখা গেল তাদের হিসেবে মস্ত গলদ হয়েছে। ইউরোপ আর এশিয়াতে আমেরিকা যুদ্ধ চালায় তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলি থেকে। ইরান এবার আক্রমণ করল সেইসব সামরিক ঘাঁটি, এমনকী গাল্‌ফের যেসব দেশে সেই ঘাঁটিগুলি রয়েছে, তাদেরও বিভিন্ন অংশে। প্রাথমিকভাবে হতভম্ব হয়ে গেল সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সৌদি আরব, বাহরিন, কাতার, কুয়েত, জর্ডন, ওমানের মতো দেশগুলি। এমনটা তারা ভাবেনি একেবারেই। সোজা কথা, ইরান বলতে চাইল যে আমেরিকার সৈন্যঘাঁটি যেসব দেশ থেকে অস্ত্র হানাচ্ছে তাদের উপর, তারা যেন আমেরিকারই বর্ধিত অংশ। যুদ্ধটা তাই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল মধ্যপ্রাচ্যে।

zoom
ইরানের মৃত্যুমিছিল বেড়েই চলেছে

এর প্রভাব একেবারেই নেই, তেমনটা বলা যাবে না। স্পেন দ্রুত ঘোষণা করেছে যে তাদের মাটিতে অবস্থিত আমেরিকান সৈন্যঘাঁটি থেকে ইরানের উপর আক্রমণ করতে দেবে না তারা। তবু যুদ্ধটা কিন্তু দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে ইউরোপেও। ইরানের যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হবে। ইরান বন্ধ করে দিয়েছে অতি-গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী। ফলে দুনিয়ার তেলের জোগানে টান পড়বে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম হুহু করে বাড়ার সম্ভাবনা। ফলে এর প্রভাব পড়বে দুনিয়া জুড়ে। সদ্য ভেনিজুয়েলার তেলের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া মার্কিন তেল কোম্পানিগুলি এর ফলে কতটা সুবিধা পাবে, সে বিষয়টাও তুলেছেন কেউ কেউ। আসলে একটা যুদ্ধ এবং সংঘর্ষের ভিতরেও থাকে অনেকগুলি স্তর।

zoom
খামেইনি নিহত হওয়ার পর ইরানের রাস্তায় প্রতিবাদ মিছিল

কীভাবে বদলাবে বিশ্ব-রাজনীতি? যুদ্ধ শুরুর সময় মার্কিনরা ঘোষণা করেছিল ইরানে ক্ষমতার বদল ঘটানো তাদের উদ্দেশ্য। খামেইনির মৃত্যুতে তীব্র শোক আর রাগ প্রকাশ করেছে ইরানের এবং দুনিয়ার বহু মানুষ। আবার উল্লাস প্রকাশ করেছে অনেকে। কিন্তু এটা নিশ্চিত যে, ইরানের মহিলাদের– মাহসা আমিনি কিংবা নার্গেস মোহাম্মদী-দের– মুক্ত জীবনের সন্ধান দেওয়ার মহৎ উদ্দেশ্যে মার্কিন এবং ইজরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র ছুটছে না– যতই বৃহত্তর জনসমর্থন পাওয়ার উদ্দেশ্যে সেই বিষয়গুলিকে সামনে আনা হোক না কেন। মোট কথা, তাদের বোমারু বিমান ইরানিদের গণতন্ত্র কিংবা মুক্তি উপহার দেওয়ার লক্ষ্যে বোমা ফেলছে না। আমেরিকা এবং ইজরায়েল নিজেদের নিরাপত্তার দোহাই দিয়েছে– ইরানের পরমাণু কর্মসূচি থামানোই তাদের উদ্দেশ্য। বার্নি স্যান্ডার্স অবশ্য মনে করিয়েছেন যে, এই ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্র ধ্বংস করেছেন এমন দাবি তো করেছিলেন। তাহলে এখন আবার পরমাণু অস্ত্রের দোহাই আসছে কোথা থেকে। আসলে সেই যে জুনিয়র বুশ দাবি করেছিলেন ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের কাছে রয়েছে ‘ওয়েপন অব মাস ডেসট্রাকশন’– আর সে অজুহাতেই আমেরিকা জড়িয়ে পড়ল ইরাক যুদ্ধে, শ্মশান করে দেওয়া হল ইরাককে– কিন্তু পাওয়া গেল না এমন কিছু মারাত্মক অস্ত্র। ইরানের ক্ষেত্রেও সেই একই আশঙ্কা কাজ করে বইকি।

zoom
বিধ্বংসী যুদ্ধে আমেরিকা এবং ইসরায়েলের যৌথ-আক্রমণ (এআই নির্মিত ছবি)

এমনিতে মার্কিন দেশে এবার আবার মিডটার্ম ভোট। ট্রাম্প এবং রিপাবলিকানদের জনপ্রিয়তা পড়তির দিকে। আবার এপস্টাইন ফাইলের ঝাপটায় বেশ অপ্রস্তুত ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও। কংগ্রেসের অনুমতি না নিয়ে এই যুদ্ধ ঘোষণার বৈধতা নিয়েও সেদেশে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প আর কবে এসবের ধার ধারেন। প্রাথমিক সমীক্ষায় অবশ্য দেখা যাচ্ছে যে, আমেরিকার সিংহভাগ জনতাই ভালো চোখে দেখছে না ইরানের সঙ্গে এভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়াকে। ট্রাম্প এবং তাঁর সহযোগীরা অথবা বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা কীভাবে এই জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে আগামিদিনে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ অবশ্যই। এই যুদ্ধের প্রভাব কীভাবে অতি-গুরুত্বপূর্ণ মিডটার্ম-নির্বাচনে পড়বে, তার একটা পর্যলোচনা নিশ্চয়ই হবে। সেটাও কিন্তু বিশ্ব-রাজনীতিতে এই যুদ্ধের প্রভাব।

zoom
ইরান এক মৃত্যু উপত্যকা

ইরান আক্রমণ শানিয়ে চলেছে আপাতত। খামেইনির উত্তরসূরিরা কিন্তু আপাতত মাথা নোয়াবার কোনও লক্ষণ দেখাননি। তবে আমেরিকা-ইজরায়েলের– কিংবা তাদের যে যে মিত্র দেশ জড়িয়ে পড়বে যুদ্ধে তাদের– মিলিত শক্তির সঙ্গে কতদিন চোখে চোখ রেখে যুঝতে পারবে ইরান? তাদের অস্ত্রের রসদ শেষ হয়ে আসবে। ট্রাম্প ইতিমধ্যে ৪-৫ সপ্তাহ কিংবা তারও বেশি সময়ের যুদ্ধের বা ধ্বংসলীলার কথা বলেছেন। সেটা অবশ্য আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে, যদি কোনও পর্যায়ে জড়িয়ে পড়ে রাশিয়া কিংবা চিন। আসলে যুদ্ধ যে কী রূপ নিতে পারে, এখনই তা অনুমান করা একেবারেই অসম্ভব। আমেরিকা কিন্তু ইতিমধ্যেই তাদের গোলপোস্ট বদলে ফেলেছে। রেজিম পরিবর্তন করার উদ্দেশ্য থেকে সুর এখন ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মূলে আঘাতে পরিণত হয়েছে। যদিও প্রথমদিকে ‘রেজিম চেঞ্জ’ কথাটা বারবার শোনা যাচ্ছিল। আসলে এটা পরিষ্কার বোঝা গিয়েছে যে ইরানের সিস্টেমটা বেশ পোক্ত। কয়েকজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতাকে হত্যা করেই সেই সিস্টেমটা বদলানো যায় না। ইরান আর যাই হোক, ভেনিজুয়েলা নয় যে এক মাদুরোকে উঠিয়ে নিয়ে এসে গোটা সিস্টেমটা বদলে দেওয়া যাবে, দখল নেওয়া যাবে তাদের তেলের ভাণ্ডারের।

আফগানিস্তানে বিশ বছর কাটিয়ে, অজস্র ডলার খরচ করেও, তাকে বদলাতে পারেনি আমেরিকা। বলা ভালো, তাকে নিজেদের সুবিধেমতো ছাঁচে ফেলতে পারেনি। তার আগে ইরাকের অভিজ্ঞতাও সেরকম। ভিয়েতনাম তো এখনও তাদের দুঃস্বপ্নে তাড়া করে ফেরে। আর সুবিশাল ইরান দেশটার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া বোধকরি তার চাইতে অনেক কঠিন। সেটা আমেরিকা জানে না, তাও নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প মানেন কি না, সেটাই প্রশ্ন।

zoom
বিশ্ব রাজনীতির বদল আসবে কোন পথে?

সেই সঙ্গে বদলে গিয়েছে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিও। সোভিয়েত থাকাকালীন যে দ্বিমেরুর দুনিয়া ছিল, ঠান্ডা লড়াই সত্ত্বেও তার ছিল একটা অদ্ভুত ভারসাম্য। সেই ভারসাম্যের অভাবটা যেন প্রকটভাবে চোখে পড়ছে আজ। এর আগেও বহুবার এক দেশের সরকার ফেলার চেষ্টা করেছে অন্য দেশ– কিন্তু সেটা মূলত দেশের মধ্যেকার বিরোধীদের রসদ জুগিয়ে। কোনও দেশের শীর্ষনেতাদের মারার চেষ্টা অন্য দেশ আগেও করেছে– কিন্তু মূলত সেটা গুপ্তঘাতকের সাহায্যে। ঝাঁকে ঝাঁকে বিমান এবং সেনা পাঠিয়ে কোনও দেশের প্রধানকে আমেরিকায় উঠিয়ে নিয়ে এসে কোর্টে তাঁর বিচার করাটা নতুন ট্রেন্ড। হলিউড ছবি করার নতুন রিয়েল লাইফ গল্প পেয়েছে, বলাই যায়। তেমনি শান্তি আলোচনা চলাকালীন ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আক্রমণ, বোমারু বিমানের বোমায় আলোচনায় অংশগ্রহণকারী দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যাও একটা নতুন ট্রেন্ড। সেটা ভালো হোক কিংবা মন্দ, কিংবা যা হোক একটা কিছু। মোটের উপর বিশ্ব-রাজনীতি তাই বদলাচ্ছে।

গ্রিনল্যান্ড, কিউবা, মেক্সিকোর– বা আরও কিছু দেশের–  ভয় তাই বাড়তেই থাকে এই নিউ নর্মাল দুনিয়ায়।

Ali Khamenei Gulf War Iran Israel Palestine-Israel Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on