
পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া এবং বর্ধমান (বর্তমানে পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান) জেলার আদিবাসী পল্লিগুলোতে হুদুড় দুর্গাকে কেন্দ্র করে এই প্রথা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। বিশেষ করে রাঢ়বঙ্গের মাটিতে যেখানে সাঁওতাল ও কুর্মি জনজাতির বসবাস বেশি, সেখানে দুর্গাপুজোর সময়টা আনন্দের বদলে শোকের আবহ নিয়ে আসে। বহু আদিবাসী গ্রাম এখনও আছে যেখানে দুর্গাপুজোর দিনগুলোয় প্রদীপের আলো জ্বালানো হয় না, বা মাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ থাকে।
দুর্গাপুজোর ঢাকের আওয়াজ আর অকালবোধনের আবহে যখন চারদিক মুখরিত হয়, ঠিক সেই সময়ই পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহল থেকে শুরু করে ঝাড়খণ্ডের বিস্তীর্ণ মালভূমি অঞ্চলে এক ভিন্ন স্বরের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। যেখানে শক্তিরূপিনী দেবী দুর্গা নন, বরং পূজিত বা স্মরিত হন মহিষাসুর– যাকে আদিবাসী সাঁওতাল ও কুর্মি-সমাজ চেনে তাদের বীর রাজা ‘হুদুড় দুর্গা’ হিসেবে। তা কেবল একটি ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং আর্য-অনার্য দ্বন্দ্বের এক দীর্ঘ ইতিহাসের মৌখিক পরম্পরা।

হুদুড় দুর্গা কে? সাঁওতালি লোকগাথা ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে ‘হুদুড়’ শব্দের অর্থ হল প্রচণ্ড শক্তিশালী বায়ুপ্রবাহ বা ঝড়। আর ‘দুর্গা’ শব্দটি এখানে কোনও নারীদেবতার প্রতীক নয়, বরং এটি একটি উপাধি, যা ‘দুর্ভেদ্য’ বা ‘অপরাজেয় রক্ষক’কে বোঝায়। সাঁওতালদের আদিপুরুষ ও বীরযোদ্ধা হিসেবে ‘হুদুড় দুর্গা’ তাদের কাছে এক দেবতুল্য চরিত্র।
গবেষকদের মতে, মহিষাসুর বা হুদুড় দুর্গা ছিলেন খেড়ওয়াল (সাঁওতালদের প্রাচীন জাতিগোষ্ঠী) জাতির এক অসীম সাহসী রাজা। তিনি ছিলেন তাঁর প্রজারক্ষক এবং কৃষিজীবী অনার্য সমাজের পথপ্রদর্শক।

ভারতবর্ষের ইতিহাস ও পুরাণ পাঠের ক্ষেত্রে, আমরা সাধারণত একটি আধিপত্যকামী বয়ান শুনতে অভ্যস্ত। যেখানে দেবতারা সুসভ্য, ধার্মিক এবং অসুররা অন্ধকারচ্ছন্ন, অত্যাচারী। কিন্তু এই বয়ানের সমান্তরালে প্রবহমান আদিবাসী লোকগাথা আমাদের এক সম্পূর্ণ ভিন্ন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। বিশেষ করে রাঢ়বঙ্গ ও জঙ্গলমহলের সাঁওতাল ও খেরওয়াল জনগোষ্ঠীর কাছে মহিষাসুর বা ‘হুদুড় দুর্গা’ কোনও দানব নন, বরং তিনি ছিলেন তাদের মহান রাজা, রক্ষাকর্তা এবং এক বীর শহীদ। আর্য ও অনার্য সংস্কৃতির এই সংঘাতের প্রেক্ষাপটে হুদুড় দুর্গার আখ্যানটি কেবল একটি লোককথা নয়, বরং এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় রক্ষার লড়াইয়ের দলিল।

নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিকদের মতে, আর্যদের ভারত আগমনের সময় এদেশের আদি বাসিন্দা বা অনার্যদের সঙ্গে তাদের দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষ হয়েছিল। আর্যরা ছিল পশুপালক ও যাযাবর, অন্যদিকে অনার্যরা ছিল কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় অভ্যস্ত। আর্যরা যখন সিন্ধু অববাহিকা থেকে গাঙ্গেয় উপত্যকার দিকে অগ্রসর হতে থাকে, তখন তারা স্থানীয় শক্তিশালী রাজাদের বা গোষ্ঠীপ্রধানদের বাধার মুখে পড়ে।
পুরাণে যাদের ‘অসুর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, তাঁরা আসলে ছিলেন স্থানীয় ভূমিপুত্র বা আদিবাসী জনজাতি। ‘অসুর’ শব্দটি সংস্কৃত ‘অ’ এবং ‘সুর’ (দেবতা নয় যারা) থেকে এলেও, আদিবাসী নৃতত্ত্ব অনুযায়ী, তাঁরা ছিলেন অজেয় শক্তির অধিকারী যোদ্ধা। হুদুড় দুর্গা এমনই এক অনার্য বীর, যিনি আর্যদের সাম্রাজ্য বিস্তারে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

সাঁওতালি লোকগাথা অনুযায়ী, হুদুড় দুর্গা ছিলেন খেরওয়াল জাতির অতি জনপ্রিয় রাজা। তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ এবং তাঁর শাসনামলে প্রজারা অত্যন্ত সুখে ছিল। তাঁর শারীরিক শক্তি ও সমরকৌশল এতই উন্নত ছিল যে, আর্য দেবতারা সম্মুখ সমরে তাঁর কাছে বারবার পরাজিত হচ্ছিলেন। সাঁওতালদের বিশ্বাস অনুযায়ী, হুদুড় দুর্গা শব্দটি এসেছে ‘হুদুড়’ (প্রচণ্ড শক্তিশালী ঝড়) এবং ‘দুর্গা’ (দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা) থেকে। অর্থাৎ, তিনি ছিলেন এমন এক শাসক যাকে পরাজিত করা ছিল অসম্ভব। আর্যরা যখন বুঝতে পারে যে, গায়ের জোরে বা যুদ্ধের ময়দানে এই বীরকে হারানো যাবে না, তখন তারা কূটকৌশলের আশ্রয় নেয়।
পৌরাণিক কাহিনিতে, দেবী দুর্গা দেবতাদের তেজোরাশি থেকে সৃষ্ট এক মহাশক্তি। কিন্তু আদিবাসী পাঠে এই চিত্রনাট্য বদলে যায়। সাঁওতালদের লোকসংস্কৃতি অনুযায়ী, আর্যরা হুদুড় দুর্গার একটি বিশেষ দুর্বলতা খুঁজে পায়। অনার্য সমাজ, বিশেষ করে খেরওয়াল বা সাঁওতালদের মধ্যে নারীর সম্মান অত্যন্ত উচ্চে। তাঁদের সামাজিক নীতি অনুযায়ী, কোনও পুরুষ কোনও নারীর ওপর অস্ত্র তুলতে পারেন না, এমনকী আত্মরক্ষার খাতিরেও নয়। এই নীতিকে হাতিয়ার করে আর্যরা এক সুন্দরী নারীকে (যাঁকে পুরাণে দেবী দুর্গা বলা হয়েছে) হুদুড় দুর্গার রাজ্যে পাঠায়। সাঁওতালি পরম্পরা দাবি করে, সেই নারী হুদুড় দুর্গার সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করে এবং বিশ্বাস অর্জন করে। কেউ কেউ বলেন, বিবাহের প্রস্তাব বা মৈত্রীর আড়ালে এই নারী রাজার অন্তঃপুরে প্রবেশ করেছিল। আর্যদের নির্দেশিত এই কৌশলের মূল লক্ষ্য ছিল, রাজাকে নিরস্ত্র অবস্থায় আক্রমণ করা।

ষষ্ঠী থেকে দশমী– যখন বাঙালির ঘরে ঘরে উৎসবের ঢল, আদিবাসী সমাজে তখন বিষাদের ছায়া। লোকগাথা বলে, যুদ্ধের এক পর্যায়ে যখন সেই নারী হুদুড় দুর্গার সামনে যুদ্ধংদেহী মূর্তিতে অবতীর্ণ হন, তখন রাজা হুদুড় দুর্গা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। তিনি দেখলেন, তাঁর সামনে এক নারী অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে। সাঁওতাল জাতির চিরন্তন সংস্কার অনুযায়ী, নারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা কাপুরুষতা। হুদুড় দুর্গা জানতেন, তিনি যদি অস্ত্র ধরেন, তবে তিনি জয়ী হবেন, কিন্তু তাতে তাঁর জাতির আদর্শ লুণ্ঠিত হবে। নিজের নীতি এবং জাতির সম্মান-রক্ষার্থে তিনি হাতে থাকা ঢাল-তলোয়ার ত্যাগ করেন। পৌরাণিক চিত্রে আমরা দেখি, দুর্গা মহিষাসুরকে ত্রিশূল দিয়ে বিদ্ধ করছেন, কিন্তু অনার্য-বয়ান বলে– এটি কোনও যুদ্ধ ছিল না, এটি ছিল নিরস্ত্র বীরের ওপর, এক নারীর মাধ্যমে আর্যদের সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
হুদুড় দুর্গা নিহত হওয়ার পর অনার্য সমাজ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। তাদের ভূমি দখল করে নেওয়া হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষ তাদের প্রিয়-রাজার মৃত্যু মেনে নিতে পারেনি। তাদের মনে এক ক্ষীণ আশা ছিল যে, রাজা হয়তো মারা যাননি, তিনি শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে বনের গভীরে বা গুহায় আত্মগোপন করেছেন। এই ‘নিখোঁজ রাজা’কে খুঁজে বের করার প্রচেষ্টাই কালক্রমে ‘দাঁশাই নাচ’-এ রূপ নিয়েছে।

দাঁশাই নাচের সময় পুরুষরা কেন নারীর পোশাক পরেন? এর কারণ হল, আর্য সৈন্যরা পুরুষদের দেখলেই হত্যা করত। তাই আর্যদের চোখে ধুলো দিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামে নিখোঁজ রাজাকে খুঁজে বের করার জন্য অনার্য পুরুষরা নারীর ছদ্মবেশ ধারণ করেছিলেন।
হাতে ভুয়াং (এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র) নিয়ে তাঁরা যখন নাচেন, তখন প্রতিটি গানের আগে বলেন ‘হায় রে হায় রে’। এই ‘হায় রে’ শব্দটির মাধ্যমে তাঁরা তাঁদের হারিয়ে যাওয়া বীর রাজার জন্য বিলাপ করেন। এটি কোনও আনন্দের নাচ নয়, এটি একটি করুণ অনুসন্ধানের পদযাত্রা।
পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া এবং বর্ধমান (বর্তমানে পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান) জেলার আদিবাসী পল্লিগুলোতে এই প্রথা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। বিশেষ করে রাঢ়বঙ্গের মাটিতে যেখানে সাঁওতাল ও কুর্মি জনজাতির বসবাস বেশি, সেখানে দুর্গাপুজোর সময়টা আনন্দের বদলে শোকের আবহ নিয়ে আসে। বহু আদিবাসী গ্রাম এখনও আছে যেখানে দুর্গাপুজোর দিনগুলোয় প্রদীপের আলো জ্বালানো হয় না, বা মাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ থাকে।

সাম্প্রতিক কালে, হুদুড় দুর্গার আখ্যানটি দলিত ও আদিবাসী পরিচিতি রাজনীতির (Identity Politics) এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এটি মূলধারার হিন্দু পৌরাণিক বয়ানের বিপরীতে একটি ‘বিকল্প ইতিহাস’ (Alternative History) হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। নৃতাত্ত্বিকদের মতে, ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সভ্যতা এবং যাযাবর পশুপালক আর্যদের মধ্যকার সংঘাতই এই উৎসবের মূল উৎস। মহিষাসুর শব্দটির মধ্যে ‘মহিষ’ যুক্ত থাকা ইঙ্গিত দেয় যে, তিনি সম্ভবত কোনও মহিষ-পালক উপজাতির প্রধান ছিলেন। বৈদিক আর্যদের ইন্দো-ইউরোপীয় সংস্কৃতির সঙ্গে স্থানীয় প্রাগৈতিহাসিক সংস্কৃতির যে টক্কর হয়েছিল, হুদুড় দুর্গার আখ্যান তারই এক বিবর্তিত রূপ।
হুদুড় দুর্গা বা মহিষাসুর বন্দনা প্রমাণ করে যে, ভারতবর্ষের সংস্কৃতি একরৈখিক নয়। এখানে একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিজয় এবং শোকের দুটি সমান্তরাল ধারা বয়ে চলেছে। বাংলার লোকসংস্কৃতিতে হুদুড় দুর্গা কেবল এক হারিয়ে যাওয়া রাজার গল্প নয়, বরং প্রান্তিক মানুষের নিজস্ব কণ্ঠস্বর এবং তাঁদের শেকড়ের সন্ধানের এক অনন্য দলিল। যখন মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীর আরাধনা হয়, তখন জঙ্গলমহলের নির্জন কোনও আখড়ায় ভুয়াং-এর শব্দে বেজে ওঠে এক চিরন্তন হাহাকার– নিজের মাটিকে রক্ষা করতে গিয়ে পরাজিত হওয়া এক মহানায়কের জন্য।
তথ্যসূত্র
সাঁওতালি লোকসংস্কৃতি ও দাঁশাই নাচ, মহাদেব হাঁসদা, কলকাতা (২০১২)।
ভারতের আদিবাসী সমাজ ও ইতিহাস, কুণাল চট্টোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ।
রাঢ়বঙ্গের লোকদেবতা ও সমাজভাবনা, অলক সরকার, লোকসংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র।
The Mahishasur Movement: আদিবাসী ও দলিত চিন্তাবিদদের দ্বারা সংগৃহীত মৌখিক ইতিহাসের নথিপত্র।
সাঁওতালি লোকগাথা: ‘খেরওয়াল বংশ ধরম পুথি’ (মাঝি রামদাস টুডু রেস্কা)।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved