Robbar

আন‘কমন’ ভারত

Published by: Robbar Digital
  • Posted:August 4, 2026 8:32 pm
  • Updated:August 4, 2026 8:38 pm  

জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় রুচিতে পালটেছে ক্রীড়া পরিকল্পনা ও প্রকল্পের নকশা। তবে সে সবই খুব যে উন্নত করতে পেরেছে জাতীয় ক্রীড়ামান তেমনটা নয়। তাই এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের সাফল্যকে সাময়িক বলে সন্দেহ প্রকাশ করা অমূলক নয়। তবে বাস্তবের দাবি, সন্দেহ বা সাফল্য নয়, বরং নেপথ্যের ক্রীড়া উন্নয়নকে প্রশ্রয় দেয়। 

পৌলমী ঘোষ

শেষ হল কমনওয়েলথ গেমস। ৭৪টি দেশ অংশগ্রহণ করেছিল। আন্তর্জাতিক ক্রীড়ামঞ্চে ভারতীয় সাফল্য নজর কেড়েছে। তবু দেশবাসীর নাক-শিটকানি গেল না। এ তো অলিম্পিক্স নয়। এশিয়ান গেমসও নয়। কমনওয়েলথ গেমস। ক’টা দেশই বা অংশ নেয়। তাতে আবার চতুর্থ! অথচ এই স্বদেশি ক্রীড়া-প্রেমীরাই হাতে গোনা ১২-১৪টা দেশের ক্রিকেট খেলা এবং তাতে জয়ী হওয়াকে বলে বিশ্ববিজয়!

এ বছর কমনওয়েলথ গেমসে বিগত তিনবারের থেকে আমাদের পদক সংখ্যা কম। তবুও এই প্রতিযোগিতা সাফল্যের। জ্যাভলিন থ্রো, দশ হাজার, পাঁচ হাজারের মতো লং ডিসটেন্স রানিং, ডেকাথেলন এবং প্যারা-অ্যাথলেটিক্সেও সাফল্যের ঝলক। ভারোত্তোলন, জুডো সর্বত্র আধিপত্য। আর বক্সিংয়ে তো রীতিমতো আগ্রাসন চালিয়েছে ভারত। তবে আমাদের নিশ্চিত বিজয়-ক্ষেত্র ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস, হকি, কুস্তি– এ বছর কমনওয়েলথ গেমস থেকে বাদ গিয়েছে। তা সত্ত্বেও ভারতের সাফল্য অন্য এক গোপন অভিযানের কথামুখ। এই সাফল্য পদক পরিসংখ্যানের তথ্যগত হিসাবে মিলবে না। এই বিকাশ অনুভবের; একটা গোটা দশকের ছোট ছোট প্রাপ্তি আর তৃপ্তি মিলে দেশের ক্রীড়া-সংস্কৃতির একটি দীর্ঘস্থায়ী রূপান্তরের আভাস। 

‘জয় নয়, অংশগ্রহণই আসল’: অলিম্পিক্সের মহাবাক্য যাই হোক না কেন, এখন সাফল্য বলতে ভারতীয়রা নিরীহ প্রচেষ্টাকে পাত্তা দেয় না। বোঝে পদক আর প্রতিষ্ঠা। ক্রিকেটীয় কৃতকার্য আমাদের বাস্তববোধকে নষ্ট করে তৈরি করেছে এই আকাঙ্ক্ষা। গত শতকে হকির ধারাবাহিক সুবর্ণ সাফল্য এদেশের ক্রীড়াকে গৌরবান্বিত করেছে। কিন্তু হকি অন্যান্য ক্রীড়ার অভিমুখ বন্ধ করে বিজয় মহাকাব্য লেখেনি। ফুটবল নির্ভর একটি সংস্কৃতি মজবুত ছিল দেশ জুড়ে। সেখানেও কোনও কৃত্রিমতা ছিল না। ছিল স্বতঃস্ফূর্ততা। অথচ বিগত সিকি শতকে ভারতীয় ক্রীড়ার সামাজিক আবেদনটিকেই বদলে দিয়েছে ক্রিকেট। দ্রুত গড়ে উঠেছে বাজার। সেই বাজারে এখন ক্রিকেটের প্যাড, ব্যাট, মাঠ, ম্যাচ, জয়, পরাজয়, সামাজিক ক্ষয়, প্রতিভা অথবা প্রতিষ্ঠা সবই বিপণনযোগ্য। তবে ক্রিকেটের মূল্যবান পণ্যটি হল কোটি কোটি দেশভক্ত ক্রিকেট পাগল জনতা। ক্রিকেটের ভারতায়নে দেশীয় ক্রীড়া-সংস্কৃতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। ক্রিকেটের ঠেলায় বিশ্ব ক্রীড়ায় আমাদের অবস্থান ক্রমশ মর্যাদা হারাচ্ছে। সত্যি বলতে, এতটাও ক্রীড়া-নৈপুণ্যহীন ছিল না এদেশ। 

পুরস্কার হাতে মীরাবাই চানু

ভারতীয় সভ্যতায় খেলা বরাবরের দৈনন্দিনতা। ব্রিটিশের ঔপনিবেশিক বিস্তারে ফুটবল হকি ক্রিকেট ভলিবল র‍্যাকেট স্পোর্টস রপ্ত করতে বেশি সময় লাগেনি ভারতীয়দের। দেশ জুড়ে চর্চা চলত সাঁতার, আর্চারি, বক্সিং, রেসলিং, ওয়েট লিফটিংয়ের মতো আরও কত কিছুর। এত বড় দেশের একেক অঞ্চলে একেকটি খেলার অঞ্চলিক আধিপত্য তৈরি হয়েছিল। এসব মূলত নির্ভর করত জলবায়ু বা ভৌগোলিক পরিবেশের উপর। খানিকটা সামাজিক প্রেক্ষাপট ও চাহিদাও ছিল কারণ। তবে এতে পরিচর্যা অনেক বেশি নিখুঁত ও নিবিড় হত। সম্ভাবনা খুঁজে বের করতেও সুবিধা হত। কিন্তু জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় রুচিতে পালটেছে ক্রীড়া পরিকল্পনা ও প্রকল্পের নকশা। তবে সে সবই খুব যে উন্নত করতে পেরেছে জাতীয় ক্রীড়ামান তেমনটা নয়। তাই এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের সাফল্যকে সাময়িক বলে সন্দেহ প্রকাশ করা অমূলক নয়। তবে বাস্তবের দাবি, সন্দেহ বা সাফল্য নয়, বরং নেপথ্যের ক্রীড়া উন্নয়নকে প্রশ্রয় দেয়। 

আসলে শুধুই ক্রিকেটের মাধ্যমে সার্বজনীনতা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। পারেওনি। খেলাটির মাধ্যমে একটা শ্রেণি শুধুমাত্র লাভের গুড় খেয়ে যাচ্ছে। যে ক্রিকেটকে আমরা এতদিন ভেবে এসেছি আমাদের সফট-পাওয়ার, আসলে তার মাধ্যমে ভারতকেই সফট টার্গেট করা হয়েছে। আমাদের দেশে যুবশক্তি বা আরও একটু প্রসারিত অর্থে মানব সম্পদের মতো প্রাকৃতিক ক্রীড়া সম্পদ রয়েছে অঢেল। জলবায়ুগত অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশে এই সম্পদের সঠিক ব্যবহারে ভারতের ক্রীড়া-সংস্কৃতি দীর্ঘকালীন এবং আকর্ষণীয় হতে বাধ্য। ক্রীড়ার মাধ্যমে ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠা করাও ভারতের মতো দেশের পক্ষে অবাস্তব চেষ্টা হবে না। একথা নিশ্চয়ই দেশের ক্রীড়ামন্ত্রক জানে। ক্রিকেটের আড়ালে তাই নিঃশব্দ আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে গত দশকের মাঝামাঝি থেকেই। ভারতীয় ক্রীড়া বিপ্লবের সেই সংকেতই দিল গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমস। 

জ্যাভেলিন থ্রোইং-এ রৌপ্যপদক হাতে নীরজ চোপড়া

ভারতের এই ক্রীড়া বিবর্তনে ‘খেলো ইন্ডিয়া’ ফ্লাগশিপ। প্রকল্পটি শুরু হয় ২০১৭ সালে। এই প্রকল্পের নানা ধারা-উপধারায় সারা দেশের ক্রীড়াভূমি প্লাবিত হচ্ছে। ক্রীড়া প্রতিভাকে খুঁজে বের করা এবং উপযুক্ত দক্ষতায় তার পরিচর্যা করা, পরিকাঠামোগত উন্নয়ন, স্থায়ী এবং রুচিশীল ক্রীড়া সংস্কৃতি তৈরি করা, শ্রেণি ও লিঙ্গগত সাম্য এবং অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। স্বাধীনতার পর থেকে নানা প্রকল্প ক্রীড়া ক্ষেত্রে গৃহীত হয়েছে। কোনওটিই অপ্রাসঙ্গিক ছিল না। কিন্তু ‘খেলো ইন্ডিয়া’ ব্যতিক্রমী প্রায়োগিক দিক থেকে। প্রকল্পটি ফি-বছর চারটি ভিন্ন ধরনের ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করছে। যুব গেমস, ইউনিভার্সিটি গেমস, উইন্টার গেমস এবং প্যারা গেমস। অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে অনুন্নতরা আসবে ক্রীড়াক্ষেত্রে, এ আমাদের গণপরিসারের অলিখিত প্রবণতা। তাই ‘খেলো ইন্ডিয়া’ প্রকল্পে সম্ভাবনাময় খেলোয়ারদের বার্ষিক আর্থিক সহযোগিতার জন্য বেশ কয়েকটি স্কিম রয়েছে। প্রতিটি রাজ্যে একটি করে আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া প্রশিক্ষণকেন্দ্র শুরু হয়েছে। প্রত্যেকটা জেলায় একজন করে সেই অঞ্চলের প্রাক্তন জাতীয় স্তরের ক্রীড়াবিদকে মেন্টর হিসাবে নিযুক্ত করা হচ্ছে। এ-ও এক ধরনের কর্মসংস্থান। সামগ্রিকভাবে এর সুফল বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ‘টার্গেট অলিম্পিক পডিয়াম স্কিম’ বা ‘টপস’। মূলত অলিম্পিক্স এবং প্যারা অলিম্পিক্সের কথা মাথায় রেখেই এই প্রকল্পের নকশা তৈরি করা হয়েছে। চালু আছে ‘খেলো ইন্ডিয়া রাইজিং ট্যালেন্ট আইডেন্টিফিকেশন’ বা ‘কীর্তি’। উদ্যোগটি ৯ থেকে ১৮ বছর বয়সিদের ক্রীড়া প্রতিভাকে পরিচর্যা এবং সামগ্রিকভাবে উৎসাহিত করার জন্য। এই প্রকল্পটি মূলত প্রযুক্তি-নির্ভর। ট্যালেন্ট অ্যাসেসমেন্ট সেন্টার, স্ট্যান্ডার্ডাইজড অ্যাসেসমেন্ট প্রোটোকল এবং ডাটা অ্যানালিটিক্সের ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি আছে ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতিকরণ। এই উদ্যোগটি ক্রীড়াবিশ্বে ভারতীয় বাণিজ্যের প্রতীক। সেইসঙ্গে দেশীয় ক্রীড়াসংগঠন ও ক্রীড়াবিদদের জন্য বাজেট-বান্ধব উন্নত ক্রীড়া সামগ্রীর সরবরাহকারী। সব মিলিয়ে এখানে ক্রীড়া সাফল্যের পাশাপাশি কর্ম সংস্থানের ক্ষেত্রটিও বিস্তৃত। শুধু খেলোয়াড়-প্রশিক্ষকই নয়, খেলার বাইরে অন্যান্য পেশার মানুষের জন্যও ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে ক্রীড়া ক্ষেত্র। 

এই প্রত্যেকটা বিষয় দেশ জুড়ে একইভাবে অনেকদিন ধরে সংঘটিত হচ্ছে। সুতরাং এগুলি এখন আর এলোমেলো ট্রায়াল রানের পর্যায় নেই। আর সেই জন্যই ক্রীড়া-সংক্রান্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অর্জন বা উপার্জন কোনও আকস্মিক প্রাপ্তি বা সাময়িক সাফল্য নয়। এই দৃঢ় ময়দানি সংকল্প আর ভরসায় প্রধান আন্তর্জাতিক ক্রীড়াক্ষেত্রগুলোতে ভারতের উপস্থিতি ক্রমশ ইতিময় হয়ে উঠছে। রিও, টোকিও এবং প্যারিস। যেন বিবর্তন গাথা। দু’টি পদক থেকে সাতটিতে পৌঁছন এবং তাকে ধরে রাখা। তবে প্যারা-অলিম্পিক্সের সাফল্য এদেশের ক্রীড়া পরিচর্যাকে অন্য মাত্রায় প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। রিওতে মাত্র চারটি, টোকিওতে উনিশটি এবং প্যারিসে ঊনত্রিশটি পদক। রচনা করেছে গর্বের ইতিহাস। এশিয়ান গেমস এবং কমনওয়েলথ গেমসেও সাফল্যের লেখচিত্র ঊর্ধ্বমুখী। 

প্যারালিম্পিকসে পুরস্কৃত শর্মিলা ধনখড়ে

আর এখন এই সাফল্যকে স্থায়িত্ব দিতে দরকার আরও প্রযুক্তিশীলতা, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন এবং মিডিয়ার সক্রিয়তা। দরকার আছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার। কারণ ক্রীড়ায় প্রথম সারির দেশগুলোর প্রস্তুতিপর্বের প্রায় পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করছে এআই মানিবল। তাই ভারতীয় পরিসরে এক্ষুনি প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করতে হবে। নইলে এ সাফল্যও ‘সাময়িক’ হয়ে পড়বে। কারণ আমরা যাদের সঙ্গে লড়ব তারাও নিজেদের নানাভাবেই প্রস্তুত করছে। কেউ বসে নেই। এসবের পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ হল স্থানীয় মানুষজনের মধ্যে ক্রীড়া সচেতনতা জাগিয়ে তোলা। রুচিশীল ক্রীড়া সংস্কৃতির কল্যাণেই টিকে যাবে এবং বিকশিত হবে প্রান্তিক ক্রীড়াগুলি। এই উদ্যোগটিও অবশ্য আমাদের দেশের ক্রীড়া-চিন্তকরা গ্রহণ করেছেন। আগামী কমনওয়েলথ গেমস অনুষ্ঠিত হবে আমেদাবাদে। ধারণা করা হচ্ছে ২০৩৬ সালের অলিম্পিক গেমস আয়োজনের দায়িত্ব পাবে ভারত। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে ২০২৯ সালে। এসবের কোনওটাই কাল্পনিক সত্য নয়। হয়তো আগামী আরও ১০ বছরে ‘কীর্তি’র লক্ষ্যপূরণ হবে; বিশ্বের প্রথম দশটি ক্রীড়াসফল দেশের তালিকায় সংযুক্ত হবে ভারতের নাম। আর স্বাধীনতার শতবর্ষে ক্রীড়ার বিশ্বমঞ্চে সেরা পাঁচে পৌঁছবে।