Antonie van Leeuwenhoek: The Microscope Pioneer | Robbar
Robbar
  • ৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২৫ আগস্ট ২০২৬

অদৃশ্যের আবিষ্কার

অক্সিজেনের উপস্থিতি ছাড়াই অণুজীবরা বেঁচে থাকতে পারে এই বিষয়টি লুই পাস্তুর প্রথম লক্ষ করেছিলেন। কিন্তু তার বহু আগেই অ্যান্টনি ভ্যান লিউয়েনহুক এই বিষয়টি দেখেন। ১৬৮০ সালে ১৪ জুন রয়্যাল সোসাইটিকে লেখা তাঁর একটি চিঠিতে এর বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়। মুখবন্ধ মরিচ-জল মেশানো টিউবের মধ্যে অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে জীবন্ত অণুজীব আবিষ্কার করেন! একথা বলাই যায় যে, লিউয়েনহুকের আবিষ্কারটিকে লুই পাস্তুর নতুনভাবে আবিষ্কার করেছিলেন।

Published by: Robbar Digital

Posted:August 25, 2026 7:25 pm | Updated:August 25, 2026 7:25 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

আমস্টারডামের কাপড়ের দোকানে নবিশ হিসেবে কাজে যোগ দিলেন অ্যান্টনি ভ্যান লিউয়েনহুক। ততদিনে তাঁর বোর্ডিং স্কুলের শিক্ষা শেষ হয়ে গিয়েছে। নতুন নবিশটি তাঁর আতশকাচে কাপড়ের সুতোর গুণগত মান যাচাই করে দেখতেন। উত্তল লেন্স ব্যবহার করতেন তিনি। সেদিন কে-ই বা জানত তাঁর এই আপাতসাধারণ কাজ ভবিষ্যতে তাঁকে লেন্সের প্রতি আসক্ত করবে! নিজেরই উদ্ভাবনী ক্ষমতায় সরল এবং একক মাইক্রোস্কোপের মতো যন্ত্র আবিষ্কার করে ফেলবেন! মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে যে লিউয়েনহুক শুধু অণুজীবদের পর্যবেক্ষণ করতেন, তা-ই নয়, নানা পরীক্ষানিরীক্ষাও চালাতেন। তথাকথিত কোনও বিজ্ঞানশিক্ষা, বিজ্ঞানের পাণ্ডিত্য লিউয়েনহুকের ছিল না। কিন্তু ছিল অনুসন্ধিৎসা এবং পর্যবেক্ষণক্ষমতা। যা তাঁর বিজ্ঞানমনীষার পরিচায়ক। যদিও তাঁর এই বিজ্ঞান প্রতিভাকে অনেকেই ‘তুচ্ছজ্ঞান’ করতেন। তথাকথিত বিজ্ঞানশিক্ষার অভাবের জন্য লিউয়েনহুককে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এক্ষেত্রে অবশ্য লিউয়েনহুকের কর্মপদ্ধতি এবং পরীক্ষানিরীক্ষার গোপনীয়তা অনেকাংশেই দায়ী। নিজের আবিষ্কৃত মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে তিনি এমন এক অণুজীবজগৎ এবং সেই জগতের বাসিন্দা ‘অ্যানিম্যালকিউলস’ অর্থাৎ– অণুজীবদের সন্ধান পেয়েছিলেন, যা সমসাময়িক বিজ্ঞানীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল।

zoom
অ্যান্টনি ভ্যান লিউয়েনহুক (১৬৩২-১৭২৩)

১৬৫৪ সালে লিউয়েনহুক টেক্সটাইলের নবিশের কাজ শেষ করে নিজের ডেলফ্ট শহরে ফিরলেন। বারবারা-র সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হলেন। পাঁচ সন্তানের মধ্যে চারজন মারা যায়। ১২ বছর পর স্ত্রী বারবারার মৃত্যু হল। স্ত্রী ও সন্তানদের অকাল মৃত্যুতেও লিউয়েনহুক থামলেন না। ব্যক্তিগত জীবনের এমন দুর্ঘটনার মধ্যেও অণুজীবদের নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়ে গেলেন। ১৬৬০ সাল নাগাদ লিউয়েনহুক ডেলফ্ট শেরিফের চেম্বারলিন পদে যোগ দিলেন। এই কাজের নিয়ম মোতাবেক তাঁকে মিটিং হল দেখাশোনার কাজ করতে হত। তবে এই কাজটি লিউয়েনহুকের পক্ষে ছিল খুব সুবিধাজনক। কারণ তিনি অবশিষ্ট কয়লা বাড়ি নিয়ে আসতে পারতেন। এই কয়লাকে তিনি কাচ গলানোর কাজে ব্যবহার করতেন। মনে করা হয়, এভাবেই তিনি ৫০০-র বেশি একক-লেন্স মাইক্রোস্কোপ তৈরি করেছিলেন। যেগুলির মধ্যে মাত্র ৯টি বর্তমান সংগ্রহে আছে। লিউয়েনহুকের মাইক্রোস্কোপের বিবর্ধন ক্ষমতা ছিল ৬৯-২৬৬ গুণ। চিঠিতে লিউয়েনহুক একথাও লিখেছিলেন যে, তিনি ৪৮০ গুণ বিবর্ধন ক্ষমতার লেন্সও বানাতে পারতেন। লিউয়েনহুকের নির্মিত লেন্সের এই বৈচিত্র এবং বিবর্ধন ক্ষমতা ছিল অভূতপূর্ব! স্বাভাবিকভাবেই তৎকালীন গবেষকদের মধ্যে লেন্সের ক্ষমতার বিষয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিল। কারণ লেন্সের বিবর্ধন ক্ষমতার ব্যবহার সম্পর্কে কেউই জ্ঞাত ছিলেন না।

zoom
লিউয়েনহুকের তৈরি ৫০০র বেশি মাইক্রোস্কোপের মধ্যে মাত্র ৯টি অবশিষ্ট রয়েছে

২৮ এপ্রিল, ১৬৭৩ লিউয়েনহুক লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটিতে প্রথম চিঠিটি পাঠান। চিঠিটি রয়্যাল সোসাইটির ‘ফিলোজফিকাল ট্রান্সাকশনস’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। লিউয়েনহুকের প্রথম প্রকাশিত এই চিঠিটির ভূমিকা লিখেছিলেন রয়্যাল সোসাইটির সচিব এবং ‘ফিলোজফিকাল ট্রানজাকশনস’ পত্রিকার সম্পাদক হেনরি ওল্ডেনবার্গ। ডাচ চিকিৎসক, অ্যানাটমিস্ট রেগন ডি গ্রাফ-এর উদ্যোগে পাঠানো এই চিঠির মাধ্যমে পরিশ্রমী এবং বিজ্ঞানমনস্ক লিউয়েনহুকের গবেষণার সঙ্গে ওল্ডেনবার্গের পরিচিতি ঘটে।

ডাচ কূটনীতিবিদ, কনস্টানটাইন হিউগেনস এবং ওল্ডেনবার্গের মধ্যে নিয়মিত পত্রালাপ চলত। একে অপরকে বিজ্ঞান বিষয়ক আলোচনা এবং গবেষণা সংক্রান্ত খবরাখবর দিতেন। লিউয়েনহুকের বিজ্ঞান অনুসন্ধিৎসা এবং মেধার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে হিউগেনসও একটি চিঠি লেখেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, দু’-দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জেরে নেদারল্যান্ড ইংল্যান্ডের সঙ্গে নৌযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এই যুদ্ধ দীর্ঘদিন চলেছিল। দ্বিতীয় ইঙ্গ-ডাচ যুদ্ধের সময়ে ওল্ডেনবার্গ গ্রেফতার হন। তাঁকে লন্ডন টাওয়ারে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। সেই সময় ডাচদের সঙ্গে নিয়মিত পত্রালাপের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী চিঠিপত্র আদানপ্রদানের অভিযোগ ছিল। গুপ্তচরবৃত্তি এবং ইংরেজ নৌবাহিনীর দুর্বলতা প্রকাশের মতো মারাত্মক অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লসের মনে ওল্ডেনবার্গের এইসব কাজ বিরক্তির উদ্রেক করেছিল। তবে দু’-মাস পরে, ১৬৭৭ সালের ২৬ আগস্ট ওল্ডেনবার্গ মুক্তি পান। কিন্তু দু’-দেশের মধ্যে চলতে থাকা যুদ্ধ বা বৈরিতা বিজ্ঞান গবেষণার পথে কখনও অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি। দু’-দেশের উত্তপ্ত পরিস্থিতি হিউগেনসকে রয়্যাল সোসাইটির কিউরেটর রবার্ট হুককে চিঠি লেখা থেকে বিরত করতে পারেনি।

zoom
১৬৭৬ সালে ওল্ডেনবার্গকে লেখা লিউয়েনহুকের চিঠির প্রথম ও শেষ পাতা

তবে রবার্ট হুক অবশ্য ওল্ডেনবার্গের চিঠির ব্যাপারে অনেক দিন নিরুত্তর থেকেছেন। কোনও বিদেশির পাঠানো চিঠির উত্তর দেওয়ার ব্যাপারে হুকের এই উদাসীনতা সত্যিই বিস্ময়কর! হিউগেনস কিন্তু হাল ছাড়লেন না। সময় পেরিয়ে গেলেও চিঠির উত্তর না-আসায় তিনি এক সাহসী সিদ্ধান্ত নিলেন। চিঠির বিতর্ক খানিক উসকে দিতে তিনি রয়্যাল সোসাইটির দায়িত্বে থাকা আরেক সদস্য ওল্ডেনবার্গকে চিঠি লিখলেন। ওল্ডেনবার্গ সানন্দে হিউগেনসের চিঠির উত্তর দিলেন। নিজের চিঠিতে হুকের দুর্ব্যবহারের জন্যে ক্ষমা চাইলেন। দু’-পক্ষের মধ্যে চিঠি সংক্রান্ত যে জট ছিল, তা কেটে গেল। রয়্যাল সোসাইটির সঙ্গে লিউয়েনহুকের পত্রালাপের সম্পর্ক তৈরি হল। যা ছিল খুবই ফলপ্রসূ এবং দীর্ঘমেয়াদি। নথি থেকে জানা যায়– লিউয়েনহুকের সঙ্গে রয়্যাল সোসাইটির সম্পর্ক ১৬৭৩-১৭২৩ অর্থাৎ, ৫০ বছর মতো ছিল। এই সময়ের মধ্যে লিউয়েনহুক রয়্যাল সোসাইটিতে তাঁর গবেষণা এবং অন্যান্য বিষয়ে প্রায় ১৯০টি চিঠি লিখেছিলেন। এই চিঠিগুলি রয়্যাল সোসাইটির মহাফেজখানায় সংরক্ষিত করা আছে।

zoom
রয়্যাল সোসাইটির উদ্দেশে লেখা লিউয়েনহুকের লেখা ১৯০টি চিঠির একটি (২০ এপ্রিল ১৭০৬)

১৬৭৩ সালে রয়্যাল সোসাইটিতে পাঠানো প্রথম চিঠিতে লিউয়েনহুক ছত্রাকের গঠন ও বৃদ্ধি; মৌমাছির মুখের বিভিন্ন অংশ, হুল ও চোখ; উকুনের শুঁড়, পা এবং মুখের বিভিন্ন অংশ সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষণের কথা লিখেছিলেন। এই চিঠিতে লিউয়েনহুক রবার্ট হুকের ‘মাইক্রোগ্রাফিয়া’ বইয়ে উল্লিখিত ছত্রাক, মৌমাছির হুল এবং চোখের মতো বিষয়গুলির পর্যবেক্ষণকে পুনরায় লিপিবদ্ধ করে বিস্তারিত বর্ণনা করেন। ওল্ডেনবার্গ লিউয়েনহুককে আরও গবেষণায় উৎসাহিত করেন। রবার্ট হুকের ‘মাইক্রোগ্রাফিয়া’ বইটি এক দশক আগে প্রকাশিত হয়েছিল। এই বইটিতে রবার্ট হুক কর্কের গঠনে বাক্সের মতো যেসব প্রকোষ্ঠ দেখেছিলেন সেগুলিকে ‘সেল’(কোষ) বলে অভিহিত করেছিলেন। লিউয়েনহুকের প্রথমদিকের কয়েকটি চিঠি পড়লে বোঝা যায়, তিনি ‘মাইক্রোগ্রাফিয়া’ বইটি লন্ডনে ১৬৬৭ সালে দেখেছিলেন অথবা তার পরের বছর তাঁর চোখে পড়েছিল। কারণ সেই সময় বইটির জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে এবং বইটি ছিল ফ্যাশনের একটি অনুষঙ্গ।

zoom
তৎকালীন মুদ্রণে লিউয়েনহুক চিহ্নিত ‘অ্যানিম্যালকিউলস’-এর বহুবর্ণ ছবি

এরপরের ৪ বছরে ১৬৭৭ সাল নাগাদ লিউয়েনহুক রয়্যাল সোসাইটিতে পরিচিত একটি নাম হয়ে গিয়েছলেন। কিন্তু তাঁর পাঠানো চিঠির বিষয়গুলির ব্যাপারে রয়্যাল সোসাইটি মোটেই বিশ্বাসী ছিল না।

১৬৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে পাঠানো একটি চিঠিতে লিউয়েনহুক একটি হ্রদের জলের ব্যাপারে তাঁর পর্যবেক্ষণের কথা বর্ণনা করেন। সেই বর্ণনা অনুযায়ী হ্রদের জল শীতকালে স্বচ্ছ থাকে, কিন্তু গ্রীষ্মের মাঝামাঝি জল কিছুটা সাদা হয়ে যায় এবং সেই জলে সবুজ মেঘের মতো ভাসমান কিছু দেখেছেন। এই মেঘে সবুজ রঙের হালকা রেখা দেখা যায়, রেখাগুলি সাপের মতো প্যাঁচানো এবং সুবিন্যস্ত। যা ছিল ‘স্মপাইরোগাইরা’ নামের ছত্রাক। এইসব প্যাঁচানো রেখার মধ্যে ছোট ছোট জীবের উপস্থিতি লক্ষ করেন। এই সমস্ত অণুজীবেরা জলের মধ্যে খুব দ্রুত ওপর-নিচ নড়াচড়া করে। যা তাঁকে চমৎকৃত করেছিল। লিউয়েনহুক এইসব অণুজীবের নাম দিলেন ‘অ্যানিম্যালকিউলস’। তাঁর মতে তিনি সে যাবৎ যেসব ছোট ছোট জীব দেখেছিলেন এই সমস্ত অণুজীব ছিল তাদের থেকেও হাজার গুণ ক্ষুদ্র।

এই সময় পর্যন্ত ওল্ডেনবার্গ লিউয়েন হুকের প্রায় সব চিঠিই প্রকাশ করেছিলেন। তবে এবার তিনি থামলেন। লিউয়েনহুকের পাঠানো পরের ১২টি চিঠির মধ্যে মাত্র ৩টি চিঠি প্রকাশিত হয়েছিল। যেগুলির কোনওটিই ‘অ্যানিম্যালকিউলস’-এর সঙ্গে কোনওভাবে সম্পর্কিত ছিল না। লিউয়েনহুক কিছুটা আক্ষেপে থেকেই পরের বছর রবার্ট হুককে একটি চিঠিতে লিখলেন, ‘I suffer many contradictions and oft-times hear it said that I do but tell fairy tales about the little animals.’

zoom
লিউয়েনহুক অঙ্কিত ছবির প্রতিলিপি

ওল্ডেনবার্গ লিউয়েনহুকের নিরীক্ষণ ও গবেষণার ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে পড়েছিলেন। তবে ওল্ডেনবার্গ এবং তাঁর সহকারীদের এই সংশয় ছিল খুব স্বাভাবিক। কারণ লিউয়েনহুক ছাড়া আর কেউই এমন পৃথিবীর সন্ধান পাননি, যেখানে রেনফরেস্ট এবং প্রবাল প্রাচীরের মতোই জীববৈচিত্র রয়েছে। তাঁর এই পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞানের মুক্তমনা সংশয়বাদকে সম্যকভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিল।   

সংশয় এবং সন্দেহের এই প্রেক্ষাপটে ১৬৭৬ সালের ৯ অক্টোবর মাসে লিউয়েনহুক রয়্যাল সোসাইটিতে প্রোটোজোয়ার বিষয়ে (‘letter on protozoa’) একটি চিঠি পাঠালেন। এটি ছিল লিউয়েনহুকের পাঠানো ১৮ নম্বর চিঠি। যেটি অনুবাদ করে ওল্ডেনবার্গ ১৬৭৭ সালে প্রকাশ করলেন। লিউয়েনহুকের এই চিঠি শুধুমাত্র একটি বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষণের বর্ণনা ছিল না, এটি ছিল একটি বিস্ফোরণ। কারণ কিছুদিন ধরে মাটির পাত্রে জমিয়ে রাখা বৃষ্টির জলে তিনি জীবন্ত জীব আবিষ্কার করেছিলেন। এই সমস্ত ক্ষুদ্রাকার জীব জলের মাছিদের চেয়ে আকারে ছিল ১০,০০০ গুণ ছোট। লিউয়েনহুকের প্রোটোজোয়া নামের এককোষী অণুজীবের আবিষ্কার খুলে দিয়েছিল অণুজীব বিজ্ঞানের নয়া দিগন্ত। মানবদেহে রোগসৃষ্টিকারী জীবাণু হিসেবে এবং গবেষণার জন্য প্রোটোজোয়া অত্যন্ত আকর্ষণীয় জীব। এরা নিজেদের ক্ষুদ্র জগতে অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া সঙ্গে কীভাবে মিথস্ক্রিয়া করে এবং জীববিজ্ঞানীরা প্রোটোজোয়ার সঙ্গে কী কী উপায়ে মিথস্ক্রিয়া করতে পারে– এই দুই অন্বেষণ আজও অব্যাহত।

zoom
লিউয়েনহুকের লেখা চিঠি

লিউয়েনহুকের জন্মের ৩০০ বছর পর ক্লিফোর্ড ডোবেল তাঁর ১৯৩২ সালে প্রকাশিত Antony van Leeuwenhoek and His ‘‘Little Animals’’ তাঁর জীবনীমূলক বইতে উল্লেখ করেছেন যে, লিউয়েনহুকের চিঠির অনুবাদ ওল্ডেনবার্গ করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেই অনুবাদ যথাযথ ছিল না। কারণ তিনি ডাচ ভাষা জানলেও, জীবকূল সম্পর্কে তাঁর কোনও ধারণাই ছিল না। ডোবেল ছিলেন মাইক্রোবায়োলজিস্ট এবং রয়্যাল সোসাইটির সদস্য। যেহেতু তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ইনটেসটিনাল (অন্ত্র-সংক্রান্ত) প্রোটোজোয়া এবং প্রোটিস্টদের নিয়ে, সেহেতু তিনি লিউয়েনহুকের চিঠির প্রতি স্বাভাবিক কারণেই আকৃষ্ট হন। শুধু তাই নয়, ডোবেল নিজের চেষ্টায় ডাচ ভাষা শিখেছিলেন এবং লিউয়েনহুকের চিঠি সযত্নে অনুবাদ করেন। লিউয়েনহুক ‘ইউগ্লিনা’, ‘ভোর্টিসেলা’ এবং অন্যান্য প্রোটিস্ট এবং ব্যাকটেরিয়ার যে যথাযথ বর্ণনা করেছিলেন, তা ডোবেলর কাছে ছিল খুব উপভোগ্য।

zoom
ক্লিফোর্ড ডোবেলের লেখা বই (১৯৩২)

অক্সিজেনের উপস্থিতি ছাড়াই অণুজীবরা বেঁচে থাকতে পারে এই বিষয়টি লুই পাস্তুর প্রথম লক্ষ করেছিলেন। কিন্তু তার বহু আগেই লিউয়েনহুক এই বিষয়টি দেখেন এবং ১৬৮০ সালে ১৪ জুন রয়্যাল সোসাইটিকে লেখা তাঁর একটি চিঠিতে এর বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়। মুখবন্ধ মরিচ-জল মেশানো টিউবের মধ্যে অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে জীবন্ত অণুজীব আবিষ্কার করেন। একথা বলাই যায় যে, লিউয়েনহুকের আবিষ্কারটিকে লুই পাস্তুর নতুনভাবে আবিষ্কার করেছিলেন। ১৯১৩ সালে ডাচ মাইক্রোবায়োলজিস্ট মার্টিনাস বাইয়েরিঙ্ক আরেকবার লিউয়েনহুকের পরীক্ষাটি করে দেখেন। তিনি একটি মুখবন্ধ জলে ভেজা মরিচের টিউবে Clostridium butyricum নামের একটি অবায়বীয় ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পান।

zoom
রয়্যাল সোসাইটিতে পাঠানো চিঠির সঙ্গে মরিচ-জল পরীক্ষার সঙ্গে সংযুক্ত বৈজ্ঞানিক রেখাচিত্র

লিউয়েনহুকের অনেক চিঠিই রয়্যাল সোসাইটির অনেক অধিবেশনে বহুবার পড়া হত। তারপরেও সদস্যদের কাছে দুর্বোধ্য ঠেকত। কিন্তু মজার কথা হল, লিউয়েহুকের চিঠির আকর্ষণ ছিল অমোঘ। যা আবার অনেক সময় সদস্যদের উদ্বিগ্ন করে তুলত। ওল্ডেনবার্গ লিউয়েনহুককে তাঁর পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির কথা চিত্রসহ জানাতে অনুরোধ করেন, যাতে সদস্যরা লিউয়েনহুকের গবেষণা সম্পর্কে সহজে ধারণা করতে পারেন। রবার্ট হুক তাঁর যৌগিক আলোক মাইক্রোস্কোপ যন্ত্রের বিবরণ বিশদে লিখেছিলেন তাঁর ‘মাইক্রোগ্রাফিয়া’ বইতে। কিন্তু লিউয়েনহুক ওল্ডেনবার্গের অনুরোধ খারিজ করে দেন এবং কখনই তাঁর মাইক্রোস্কোপের ব্যাপারে কোনও তথ্য দেননি। পরবর্তী সময়ে লিউয়েনহুকের গোপনীয়তার মনোভাব কিছুটা নমনীয় হয়েছিল। তিনি একজন চিত্রশিল্পী নিয়োগ করেছিলেন।

zoom
লিউয়েনহুকের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার যন্ত্রপাতির নকশা

লিউয়েনহুকের গবেষণাপদ্ধতি, পর্যবেক্ষণপ্রণালী এবং তাঁর মাইক্রোস্কোপের কার্যপ্রণালী বরাবরই রহস্যময় থেকে গিয়েছে। ফলে ক্রিস্টিয়ান হিউগেনসের মতো সমকালীন অনেক বিজ্ঞানীই বারবার তাঁর কাজের প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন এবং গবেষণার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। রয়্যাল সোসাইটি বটানিস্ট গ্রিউকে লিউয়েনহুকের কাজকে পুনরায় করার দায়িত্ব দিল। কিন্তু গ্রিউ এ কাজে ব্যর্থ হলে ১৬৭৭ সালে রবার্ট হুক এই কাজে হাত দিলেন। লিউয়েনহুকের ব্যাপারে রবার্ট হুকের শুরুর দিকে যে উদাসীনতা ছিল, তার লেশমাত্র আর রইল না। প্রথম দু’-বার ব্যর্থতার পর তিনি সফল হলেন এবং লিউয়েনহুকের বর্ণিত মরিচজলের সেই অসংখ্য অ্যানিম্যালকিউলসের সন্ধান পেলেন। লিউয়েনহুকের পরীক্ষার ব্যাপারে আরও ভালোভাবে জানবেন বলে রবার্ট হুক পরবর্তীকালে ডাচ শিখেছিলেন। রয়্যাল সোসাইটির কিউরেটর পদে তাঁর মেয়াদ শেষ হলে রবার্ট হুক (১৬৭৭-১৬৮২) সোসাইটির সচিব পদে নিযুক্ত হন। এই সময় তিনি লিউয়েনহুকের সঙ্গে চিঠি আদানপ্রদানের অন্যতম মাধ্যম হয়ে ওঠেন। যার মধ্যে লিউয়েনহুকের ব্যাকটেরিয়ার বর্ণনার চিঠিটিও ছিল। ১৬৮০ সালে লিউয়েনহুক রয়্যাল সোসাইটির সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন।

zoom
প্রাচীন তৈলচিত্রে গবেষণারত লিউয়েনহুক

লিউয়েনহুক তাঁর পর্যবেক্ষণের উপর অবিচল ছিলেন, তিনি তাঁর ফলাফল পুনরায় প্রমাণ করার জন্য রবার্ট হুকের মতো বিজ্ঞানীকেও উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন। তাঁর এই নিরলস সাধনা, অধ্যবসায় এবং ধীশক্তি তাঁকে সপ্তদশ শতকের অণুজীববিজ্ঞানের পথিকৃৎ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। প্রথম দিকে লিউয়েনহুকের চিঠির ব্যাপারে রবার্ট হুকের নিরুত্তর থাকা তাঁর উদাসীনতার লক্ষণ ছিল, না কি লিউয়েনহুকের অভিনব বিজ্ঞান অন্বেষণ ও পর্যবেক্ষণকে সম্যকভাবে বুঝতে চেয়েছিলেন– এ ব্যাপারে বিতর্ক থাকতেই পারে। তবে একথা অনস্বীকার্য যে, অণুজীব বিষয়ে রবার্ট হুকের পর্যবেক্ষণ এবং সিদ্ধান্ত অণুজীবদের অস্তিত্বকে দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করেছিল। যা শুধুমাত্র লিউয়েনহুকের বিজ্ঞানপ্রতিভাকেই স্বীকৃতি দেয়নি, তাঁর অনন্যসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার বিশ্বাসযোগ্যতাকেও মান্যতা দিয়েছিল। না-হলে ‘ফাদার অফ মাইক্রোবায়োলজি’ হিসেবে লিউয়েনহুকের প্রতিষ্ঠা অধরাই থেকে যেত। রবার্ট হুক যদি মাইক্রোস্কোপের প্রতি পুনরায় আগ্রহী না-হতেন, তবে নিরলস লিউয়েনহুকের যাবতীয় গবেষণা হয়তো ব্যর্থ হত এবং তিনি হয়তো ‘ভণ্ড’ প্রমাণিত হতেন।

লেখার সঙ্গে ব্যবহৃত ছবি: রয়্যাল সোসাইটির সৌজন্যে

Antonie van Leeuwenhoek Archive Clifford Dobell Henry Oldenburg Letters Louis Pasteur Microbiology Microscope Pepper Water Experiment Robert Hooke Royal Society Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on