

এথনিক আইডেন্টিটির ওপর ভিত্তি করে দেশীয় পরিচিতি তৈরি হওয়া, ভারতের মতো দেশের পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ এটি এক ভাষা, এক বর্ণ, এক ধর্মের দেশ নয়। যে কাস্টিস্ট বা জাতপাত নিয়ে বড়াই করে, সে নারীবিদ্বেষী কথা বলতে অভ্যস্ত। যারা ‘চায়নাম্যান’ বলে কলেজের একটি সুস্থ ছেলেকে দিনেদুপুরে হত্যা করতে পারে, তারাই আবার পাশের দেশের কুৎসায় অদ্ভুত আনন্দ পায়। এই প্রত্যেকটা গোঁড়ামি আসলে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
‘প্রভেদ আছে, প্রভেদ থাক। বৈচিত্র্যই সংসারের স্বাস্থ্য রক্ষা করে। পৃথিবীতে শীতাতপ সব জায়গায় সমান নয় বলিয়াই বায়ু চলাচল করে… ভিন্ন ভিন্ন আদর্শ আপন স্বতন্ত্র রক্ষা করিতে থাক, তাহলে সেই স্বাতন্ত্র্যে পরস্পরের নিকট শিক্ষার আদান-প্রদান হইতে পারে… ভেদ আছে স্বীকার করিয়া লইয়া বুদ্ধির সহিত, প্রীতির সহিত, সহৃদয়-বিনয়ের সহিত, তাহার অভ্যন্তরে যদি প্রবেশ করিবার ক্ষমতা না থাকে তবে খ্রিস্টীয় শিক্ষায় উনিশ শত বৎসর কী কাজ করিল? কামানের গোলায় প্রাচ্য দুর্গের দেওয়াল ভাঙিয়া একাকার করিবে না চাবি দিয়া তাহার সিংহদ্বার খুলিয়া ভিতরে প্রবেশ করিবে?’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘স্বদেশ’ প্রবন্ধমালায় এই কথাগুলি লেখেন ১৯০৮ সালে। অপরত্বকে স্বীকার করে নেওয়ার মধ্যে যে কোনও পরাজয় নেই, বরং এই শিক্ষার আদানপ্রদান সমাজে কতটা জরুরি, সেকথাই লিখতে চেয়েছিলেন কবি। প্রকৃতির মধ্যে যে সহজাত বৈচিত্র আছে, যা নিশ্চিত করে প্রাণের প্রকাশ, সেই প্রভেদ যখন মনুষ্যসৃষ্ট সমাজেও দেখা যায়, তখন তাকে কামানের গোলা দিয়ে নিঃশেষ না-করে বুদ্ধি ও প্রীতির সহিত গ্রহণ করা উচিত– এই ঔদার্যকে সামনে এনেছিলেন তিনি। যদিও এমন প্রভেদের উদাহরণ টানতে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ফারাকই দেখিয়েছেন রবিঠাকুর। কারণ, এই প্রবন্ধের রচনাকাল বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ঠিক পরেই। এমন মনে হতে পারে যে, ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে রচিত এই নিবন্ধ, বুঝি তার সমস্ত সদর্থকতা হারিয়েছে বর্তমানে।

‘স্বদেশ’ নামক এই প্রবন্ধমালা মুদ্রণের ১০০ বছর অতিক্রান্ত; ভারত তার ৮০তম স্বাধীনতা দিবস পালন করল সম্প্রতি। কিন্তু আজও এই প্রভেদের কথাগুলি বারবার ফিরে পড়তে ইচ্ছে করে। মনে হয় ব্রিটিশ রাজত্বে লেখা এই রচনা আজও কি প্রাসঙ্গিক নয়? অপরত্বকে অস্বীকার শুধু নয়, তার প্রতি ক্রমাগত বিষোদ্গার; জাত, ধর্ম, লিঙ্গ, যৌনতা: এই সবক্ষেত্রেই প্রভেদকে ঘুচিয়ে একটিমাত্র জাতি, ধর্মাচার ও ভাষার প্রতিপত্তি কায়েমের চেষ্টা কি আমরা এখনও দেখি না? এই প্রবন্ধে সেই প্রবল দর্প নিয়েই কথা হবে। স্বাধীনতার ৮০ বছর পেরিয়ে এই লেখা খানিক আত্মসমালোচনামূলক মনে হতে পারে, কিন্তু নিজের মুখে আরশি ধরা ছাড়া উপায় নেই।

সমাজবিজ্ঞানী আশিস নন্দী বলেছিলেন, ভারতে সুদূর কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর অবধি মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়, শুধুমাত্র কমার্শিয়াল সিনেমা আর ক্রিকেটের জোরে। তবে এখন সম্ভবত আরও একটি নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে। আমাদের দু’-ধারের প্রতিবেশীকে দু’বেলা নিয়ম করে গালমন্দ না-করলে নিজেকে ‘দেশপ্রেমিক’ ঘোষণা করা যায় না। সমাজমাধ্যমে প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে নিয়ে তৈরি কুৎসা বা মিমেই মেলে সর্বাধিক সমর্থন। একটু তলিয়ে ভাবলে বোঝা যায়, অপরকে চূড়ান্ত ভর্ৎসনা করার মধ্য দিয়েই এখানে আত্মপরিচিতি গড়ে উঠছে। আমার দেশ তৈরি হচ্ছে অন্যের প্রতি দ্বেষ প্রকাশের মাধ্যমে। আত্ম-অনুসন্ধান, একতাবোধ বা সম্প্রীতি এখানে যতটা না জরুরি, তার থেকে বেশি কদর অপরকে নাকচ করার মধ্যে। সুতরাং, বিষয়টা শুধু প্রভেদ বা আমি-তুমি বিতণ্ডায় থেমে থাকছে না, সবকিছু ছাপিয়ে উঠে আসছে ক্ষমতার প্রশ্ন। আমি শ্রেষ্ঠ, বাকি দুই দেশ হীন: এই অহমিকাবোধই কি সাম্রাজ্যবাদ, ফ্যাসিবাদ বা দাসত্বপ্রথার মতো ভয়াবহ ইতিহাসের মূলে নয়?

ঐতিহাসিক বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন বলছেন, নেশন-স্টেট এর ধারণা ‘এক্সক্লুসিভিটি’র ওপরেই গড়ে উঠেছে, গত ২০০-৩০০ বছর ধরে। ‘এক্সক্লুসিভ’ অর্থে একটি ‘লিমিটেড’ বা সীমাবদ্ধ অবস্থা, যেখানে সবাই দেশের নাগরিক হওয়ার সুযোগ পায় না। কারা রাষ্ট্রের নাগরিক হবে, সেই সদর্থক বিষয়টি নির্ভর করে কারা নাগরিকত্ব পাবে না, সেই নঞর্থক প্রেক্ষিতের ওপর। তাই অন্তর্ভুক্তির ধারণা (inclusion) আসছে একটি বহিষ্কারের (exclusion) বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েই। আধুনিক রাষ্ট্র উৎপত্তির এই তত্ত্ব মাথায় রাখা খুব জরুরি। শুধু সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক নয় বরং একটা পৃথক হওয়ার প্রবণতা থেকেই জাতি-রাষ্ট্রের জন্ম হচ্ছে। প্রশ্ন উঠতে পারে: তাহলে পার্শ্ববর্তী দেশকে তিরস্কার করলে অসুবিধা কোথায়? পৃথকীকরণের কথা তো সংজ্ঞাতেই উঠে এল। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সমাজবিজ্ঞানীরা ন্যাশনাল আইডেন্টিটিকে (দেশীয় সত্তা) নানাভাবে ভাগ করেছেন। একটি হল– ‘সিভিক আইডেন্টি’; অর্থাৎ নাগরিকত্ব, দেশের সীমানা, সংবিধান বা পার্লামেন্ট থেকে আমরা যে জাতি-পরিচিতি নিয়ে নিজেদের মধ্যে একাত্মবোধ করে থাকি। আমার ওপর যে আইন লাগু হবে, সুদূর কেরলের গ্রামেও সেটাই প্রযোজ্য, এই একতা আমাদের বাঁধে।

এর পাশাপাশি আরেক ধরনের দেশীয় পরিচিতি হল– ‘এথনিক আইডেন্টিটি’; যেমন ধর্ম, বর্ণ, বংশ বা কুলের ধারণা থেকে একরূপতা তৈরি হওয়া। বলা বাহুল্য যে, সিভিক আইডেন্টিটি যেমন একটি দেশকে গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ পথে নিয়ে যেতে পারে, তেমন এথনিক আইডেন্টিটি অনেক ক্ষেত্রে মানবাধিকার বা গণতন্ত্রের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে সক্ষম (হবেই এমন নয়, কিন্তু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে)। বলতে কোনও দ্বিধা নেই যে, আজকের ভারতে সিভিক আইডেন্টিটির তুলনায় এথনিক পরিচিতি অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, আর সেই জন্যই ধর্মের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে ভর্ৎসনা করা স্বাভাবিক হয়ে পড়েছে।

এথনিক আইডেন্টিটির ওপর ভিত্তি করে দেশীয় পরিচিতি তৈরি হওয়া, ভারতের মতো দেশের পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ এটি এক ভাষা, এক বর্ণ, এক ধর্মের দেশ নয়। তাই অপরত্বকে অস্বীকার করার প্রবণতা শুধু প্রতিবেশী দেশকে গালমন্দ করেই থেমে থাকে না; এ প্রবৃত্তি খুঁজে খুঁজে বের করে যে, দেশের অভ্যন্তরেও কে আমার ধর্মের নয়, জাতির নয়, বর্ণের নয়, ভাষার নয়। তাকে অপদস্থ করা, প্রয়োজনে গণপ্রহারের দৃষ্টান্তও আমাদের সামনে রয়েছে অগুনতি। যেমন বর্ণ নিয়ে বৈষম্যের কথাই যদি ওঠে তাহলে গত ডিসেম্বরে ত্রিপুরার অধিবাসী অ্যাঞ্জেল চাকমার মৃত্যুর কথা মনে পড়ে যায়। ২৪ বছরের অ্যাঞ্জেলকে ছুরি ও রড দিয়ে যারা আক্রমণ করে তাদের মধ্যে ছিল দু’জন নাবালকও। অ্যাঞ্জেলের নাক, চোখ, মুখ পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের মানুষের সঙ্গে মেলে বলে এই হত্যার কারসাজি, তাকে দেশের নাগরিক হিসেবে সন্দেহের চোখে দেখা। সুতরাং, এখানে ‘আমি’ ও ‘অপরের’ ধারণা রাষ্ট্রের সীমানা অনুযায়ী নির্ধারিত হল না।

নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য দেখে বিচার হল কে আমার মতো, আর কে নয়। অপরকে শুধু অবমাননা নয়, তাকে গণপ্রহারে চিরতরে বিদায় করার মতো ভয়ংকর দৃষ্টান্ত দেখা গেল গত বছরেই। বর্ণ ছাড়া এবার কাস্ট বা জাতি পরিচিতির দিকে তাকানো যাক। গত সপ্তাহে, স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে, দেশের অন্যতম শীর্ষ নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে এফআইআর করেন যে, তিনি উত্তরাখণ্ডে একটি সভা করার পর, কিছু লোক সেখানে এসে শুদ্ধিকরণের যজ্ঞ করে। জাতিতে দলিত হওয়ার জন্যই এই ‘purification ritual’। প্রশ্ন উঠছে এমন নামকরা নেতার যদি এই অবস্থা হয়ে থাকে, তাহলে দেশের সাধারণ দলিত ঘরের ছেলেমেয়েরা ঠিক কতটা অবমাননার শিকার হন? এখানে ‘আমি’ ও ‘অপরের’ প্রশ্ন শুধু প্রভেদে আটকে নেই, বরং বেঁচে থাকার অধিকার, জল-জমির মতো মৌলিক অধিকারগুলোও খর্ব করছে প্রতিদিন।
ধর্মের দিক দিয়ে অপরত্বকে নাকচ করার বিষয় আজ সবথেকে বেশি চর্চিত। এই সংক্রান্ত প্রচুর তথ্য, প্রতিবেদন বা সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ রয়েছে, সেগুলির আর পুনরাবৃত্তি না করে বরং ‘গোরা’ উপন্যাসের কয়েকটি লাইন এখানে উদ্ধৃত করা যাক:
“গোরা বলিয়া উঠিল, ‘পরেশবাবু, আমার কোনো বন্ধন নেই… আমি হিন্দু নই… মিউটিনির সময়কার কুড়োনো ছেলে, আমার বাপ আইরিশ্ম্যান।
আপনার (পরেশবাবুর) কাছেই এই মুক্তির মন্ত্র আছে… আপনি আমাকে আজ সেই দেবতারই মন্ত্র দিন, যিনি হিন্দু, মুসলমান, খৃস্টান, ব্রাহ্ম সকলেরই– যাঁর মন্দিরের দ্বার কোনো জাতির কাছে, কোনো ব্যক্তির কাছে, কোনোদিন অবরুদ্ধ হয় না– যিনি কেবলই হিন্দুর দেবতা নন, যিনি ভারতবর্ষের দেবতা।”

এই বিখ্যাত কথাগুলির ব্যঞ্জনা আজকের দিনে নতুন করে ভাবায়। আগেও যা বলা হয়েছে যে, ধর্মের ওপর ভিত্তি করে অপরকে নস্যাৎ করার অহং শুধু পাশের দেশকে গাল পেড়েই ক্ষান্ত হয় না; সেই উগ্রতা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী নিজের পাড়ার লোকটিকেও ভিটেমাটিহীন করতে উদ্যত হয়। ধর্ম, বর্ণ ও জাতি-পরিচিতি ছাড়া এই আমিত্বের বড়াই আমরা দেখতে পাই যৌনতার ক্ষেত্রেও। সারা পৃথিবী যখন গ্রহণ করেছে যে, সেক্সুয়ালিটি আদতে একটি ‘স্পেকট্রাম’ অর্থাৎ তাকে স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক, মুখ্য-গৌণ, মেইনস্ট্রিম-অল্টারনেটিভে ভাগ করা যায় না, তখন ভারতের অধিকাংশ মানুষ তা মানতে নারাজ। ‘স্পেকট্রাম’ কথাটা বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায় একটি বিস্তৃত বর্ণালী; অনেক রং থাকবে সেখানে এবং তার পরিধিও হবে ব্যাপ্ত।

যৌনতার এই ব্যাখ্যা আজ মনোবিজ্ঞান, মেডিক্যাল সোশিয়োলজি বা আরও নানা ধারায় প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এ দেশের বেশিরভাগ লোকের কাছে যৌনতা শুধুমাত্র একগামী বৈবাহিক সম্পর্কের (Monogamous Conjugality) মধ্যে আবদ্ধ হয়ে বংশবৃদ্ধি ঘটানোর প্রক্রিয়ামাত্র। এই সংকীর্ণ সংজ্ঞা ব্যতীত আর কোনও ব্যাখ্যা তারা শুনতে রাজি নন। নিজেদের গতানুগতিক যৌন পরিচিতি বাদ দিয়ে আর অন্য কোনও যৌনতার প্রতি সহনশীলতা দেখানো হয় না। অর্থাৎ, এখানেও অপরের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার প্রবণতা দেখতে পাই। উল্টোদিক থেকে যুক্তি আসে যদি এলজিবিটি সম্প্রদায় বৈজ্ঞানিক ভাবে যুক্তিযুক্তই হয়, তাহলে ‘গোপন রোগের’ মতো শুধু কিছু মানুষই এর আওতায় পড়ে কেন? কেন তারা সংখ্যালঘু? ভারতের মতো দেশে যেখানে প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষ হওয়ার সঙ্গে জুড়ে যায় স্টিগমা বা কলঙ্কের ধারণা, পরিবার থেকে বহিষ্কৃত হওয়া বা ‘কারেক্টিভ রেপের’ মতো ভয়াবহ বিষয়, সেখানে অনেকেই সর্বসমক্ষে নিজেদের যৌন পরিচিতি জানাতে ভয় পাবেন, এটা স্বাভাবিক। আবারও বলা যে, শুধুমাত্র অন্য যৌনতার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া নয়, বরং তাকে নির্মূল করার চেষ্টা, ধর্ষণের মতো হিংস্রতাকে ইন্ধন দেওয়া এই মর্মে যে, এমন পাশবিক কাজ নাকি ‘বিপথগামীকে মূলস্রোতের জীবনে’ ফিরিয়ে আনে, এইসব কুযুক্তি আমাদের দেশে বিরল নয়।

অবশেষে মনে হয় যে, এই সমস্ত অসহিষ্ণুতা: অপরের ধর্ম, বর্ণ, জাত, যৌনতাকে অগ্রাহ্য করা বা প্রয়োজনে হিংসার পথ বাছা, এগুলো যেন একে অপরকে প্রশ্রয় দেয়। অর্থাৎ একটু লক্ষ করলেই দেখা যায়, যে মানুষ অন্যের ধর্মের প্রতি বিষোদ্গার করে, সেইই আবার যৌনতা নিয়ে রক্ষণশীল। যে কাস্টিস্ট বা জাতপাত নিয়ে বড়াই করে, সে নারীবিদ্বেষী কথা বলতে অভ্যস্ত। যারা ‘চায়নাম্যান’ বলে কলেজের একটি সুস্থ ছেলেকে দিনেদুপুরে হত্যা করতে পারে, তারাই আবার পাশের দেশের কুৎসায় অদ্ভুত আনন্দ পায়। এই প্রত্যেকটা গোঁড়ামি আসলে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। এখানে শুধু অপরকে প্রত্যাখ্যান করার বিষয় থাকে না, বরং জরুরি হয়ে পড়ে ক্ষমতার শিখরে ওঠা।

অপরত্বকে নস্যাৎ করে যদি নিজে কিছু অযাচিত সুবিধা পাওয়া যায়, তার জন্য হত্যা, হিংসা, দ্বেষ সবই সঙ্গত। সমাজে তৃণমূলস্তরে অন্যকে ঘৃণ্য বলে দাগিয়ে, হিংসার ঘটনা মাথাচাড়া দিলে আইন-আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়, এটাই নিয়ম। এই ‘টপ-ডাউন অ্যাপ্রোচে’ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির হাতে ক্ষমতা দেওয়া হয়, যাতে দাঙ্গা বা গণপিটুনির মতো বর্বর ঘটনা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই পদ্ধতির পাশাপাশি ‘বটম-আপ অ্যাপ্রোচও’ জরুরি। যেখানে উপর থেকে শুধু চাপিয়ে দেওয়া নয় বরং গ্রাসরুট লেভেলে সচেতনতা বৃদ্ধি, নানা ইনক্লুসিভ কর্মশালা বা শিক্ষাবিস্তার প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যবশত, এই দুই পদ্ধতির মধ্যে কোনওটাকেই বিশেষ আমল দেওয়া হয় না আজকাল। তাই ‘আমিত্ব’ থেকে বেরিয়ে এসে ‘আত্মোপলব্ধির’ পথে হাঁটা, এই সময় দাঁড়িয়ে একপ্রকার অসম্ভব। হয়তো কোনও অদূর ভবিষ্যতে এই অহমিকার আখ্যান পাল্টাবে, সেদিকে তাকিয়ে থেকে আশাবাদী হওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।
…………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন সম্প্রীতি চক্রবর্তী-র অন্যান্য লেখা
…………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved