সমকালীন শিল্প-ইতিহাসের আলোচনায় হোদাকা ইয়োশিদাকে ট্রান্সন্যাশনাল মডার্নিস্ট হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। তিনি শিল্পে পশ্চিমি আধুনিকতার ভাষা গ্রহণ করলেও কখনও সেই ভাষাকে অনুকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। বরং জাপানি নন্দনতত্ত্ব, লোকায়ত ভিজুয়াল ঐতিহ্য, ভ্রমণজনিত স্মৃতি এবং আন্তর্জাতিক শিল্প-প্রবণতাকে সংযুক্ত করে তিনি এমন এক শিল্পভাষা সৃষ্টি করেন– যা একইসঙ্গে ব্যক্তিগত, সাংস্কৃতিক এবং বিশ্বকে ধরে রেখেছে।
জাপানি ফাইন প্রিন্ট মেকার হোদাকা ইয়োশিদার এই বছর জন্মশতবর্ষ। তিনি ছিলেন জাপানের শিল্পভাবনার নতুন পথে এক আশ্চর্য কাণ্ডারি। চিরকালই তিনি চেয়েছিলেন ঐতিহ্যবাহী জাপানি উডব্লক প্রিন্টকে বিশ্ব-শিল্পের আধুনিকতার ভাষার সঙ্গে যুক্ত করতে। এবং হোদাকা ইয়োশিদা এমনভাবে সেই কাজ করেছিলেন, যেখান থেকে তিনি এক ধরনের নতুন ভিজুয়াল পরিসর নির্মাণ করতে সক্ষম হন।

হোদাকা ছিলেন জাপানের ইয়োশিদা শিল্প-পরিবারের সদস্য। কিন্তু তিনি তাঁর পিতা হিরোশি ইয়োশিদার শিন-হাঙ্গা শিল্পরীতির বাস্তববাদী ও প্রাকৃতিক দৃশ্যনির্ভর শিল্পভাষাকে অনুসরণ না করে, যুদ্ধোত্তর জাপানের পরিবর্তিত সাংস্কৃতিক পরিবেশের প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে এগিয়ে চলেছিলেন। স্বাভাবিক কারণেই তাঁর ছবিতে বিমূর্ততা একটা বিপুল সত্তা নিয়ে উপস্থিত হয়। এভাবেই আধুনিকতাবাদ এবং পরীক্ষামূলক প্রিন্টমেকিং হোদাকার শিল্পচর্চার প্রধান চরিত্র হয়ে ওঠে। গড়ে ওঠার প্রারম্ভিক সময়ে জীববিজ্ঞানে শিক্ষালাভ করলেও, শেষ পর্যন্ত তিনি চিত্রশিল্পকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং এই পথেই তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে উত্তরাধিকারকে সম্মান জানিয়েও শিল্পীসত্তা তার নিজের স্বাধীন পথ নির্মাণ করতে পারে।

ইয়োশিদার শিল্প রচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হল ক্রমাগত রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে নিজের অবস্থানকে স্পষ্ট করা। যে কারণে তাঁর কাজ কোথাও গিয়ে একটি নির্দিষ্ট শৈলীতে আটকে থাকেনি; বরং বলা যায় একাধিক শিল্প উপাদানের সংশ্লেষে তাঁর ছবি নিজস্ব ভাষায় নির্মিত হয়েছে। বিমূর্ত শিল্পের উপাদান থেকে শুরু করে কিউবিজমের বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টি যেমন তিনি ছবিতে সংযুক্ত করেছিলেন, আবার একইসঙ্গে সুররিয়ালিজমের অতিরিক্ত বাস্তবতা, লোকশিল্পের সারল্য, আদিম শিল্পরীতির জঙ্গমতা ও পপ আর্টের উপাদানকেও তিনি আত্মস্থ করেছিলেন এবং নিজের ছবির ভাষায় এক বহুমাত্রিক ভিজুয়ালের গুরুত্বকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৫০-এর দশকে মেক্সিকো সফরের সময় হোদাকা মায়া সভ্যতার শিল্প এবং প্রাক-কলম্বীয় সভ্যতার শিল্পের সঙ্গে পরিচিত হন। সেই পরিচয়ের নানা সূত্র তাঁর ছবির ওপরে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। তাঁর শিল্পে যুক্ত হয় প্রত্নতাত্ত্বিক স্মৃতি, টোটেমিক চিহ্ন, প্রতীকী রূপক এবং প্রাচীন সংস্কৃতির নান্দনিক নানা উপাদান ও সংকেত। যা তাঁর সৃষ্টিকে সময়ের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী করে তোলে। দেখতে দেখতে তাঁর চিত্রভাষা ক্রমশ এমন এক ভিজুয়াল আর্কিওলজিতে পরিণত হয়, যেখানে অতীত ও বর্তমান একই চিত্রপটে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

বিষয়গত ভাবনার সঙ্গে হোদাকা ইয়োশিদার শিল্প-অবদানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তাঁর মাধ্যমগত উদ্ভাবন। তিনি ঐতিহ্যগত কাঠখোদাই শিল্পকে শুধুমাত্র সংরক্ষণের মধ্যে আটকে না রেখে তার সীমাবদ্ধতাকে ভেঙে দেন। উডব্লক প্রিন্টের সঙ্গে ফোটোগ্রাফিক ট্রান্সফার, সিল্কস্ক্রিন, লিথোগ্রাফি, এচিং, কোলাজ এবং মিশ্র-মাধ্যমের কৌশলকে যুক্ত করে ছবির নতুন ভাষা উদ্ভাবনের দিকে অগ্রসর হন। এভাবেই তিনি জাপানি ফাইন প্রিন্টমেকিংকে প্রযুক্তিগতভাবে ও মাধ্যমগত বিন্যাসে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। যে কারণে তাঁর কাজ দেখা মানেও হল এক ধরনের চাক্ষিক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হওয়া। ফোটোগ্রাফি, টাইপোগ্রাফিক নানান উপাদান, বিমূর্ত জ্যামিতিক গঠন এবং কাঠের প্রকৃতি অর্জিত উদ্ভিজ্জ শিরা একসঙ্গে তার ছবিতে সহাবস্থান করে। ফলে হোদাকা ইয়োশিদার শিল্পকর্মে একইসঙ্গে আধুনিক নগর-সংস্কৃতির ছায়া ও ঐতিহ্যবাহী কারিগরির স্পর্শ অক্ষুণ্ণ রয়েছে।

এভাবেই হোদাকা জাপানের ঐতিহ্যবাহী উডব্লক প্রিন্টকে একটি স্বতন্ত্র আধুনিক শিল্পমাধ্যমের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। কাঠের স্বাভাবিক বুনন, দাগ, উদ্ভিজ্জ শিরা এবং উপাদানগত বৈশিষ্ট্যকে ছবির প্রযুক্তিগত অংশ হিসেবে না দেখে সেগুলিকে কম্পোজিশনের সক্রিয় নান্দনিক উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে তিনি একদিকে যেমন জাপানি মোকুহাংগা ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আধুনিকতাবাদের বিমূর্ত ও ধারণাভিত্তিক শিল্পচর্চার সঙ্গে তার সংযোগও স্থাপন করেন। সব মিলিয়ে দেখা যায়, তাঁর কাজের মধ্যে বস্তুগত সারফেস, স্তর, টেক্সচার, সাংকেতিক চিহ্ন এবং ঐতিহ্যের প্রতীকি নির্মাণ বারেবারেই ফিরে আসতে থাকে, যা তাঁকে সমকালীন ফাইন প্রিন্টমেকারদের মধ্যে বিশেষভাবে স্বতন্ত্র করে তোলে।

এসব কারণেই হোদাকা ইয়োশিদার শিল্পকে শুধুমাত্র জাপানি শিল্পের পরম্পরাগত ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপটে সীমাবদ্ধ রেখে মূল্যায়ন করা যায় না। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থে একজন বিশ্বশিল্পী। জীবদ্দশায় তিনি চল্লিশটিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী, প্রিন্ট বিয়েনালে ও শিল্প-আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। লুবলিয়ানা, ক্রাকো, রিয়েকা, টোকিও এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক শিল্পমঞ্চে তাঁর উপস্থিতি জাপানি ফাইন প্রিন্টের চর্চাকে বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। তাঁর শিল্পে ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে যুক্ত করার ব্যপারটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ বিভিন্ন দেশের গৃহ স্থাপত্য, রাস্তার চিহ্ন, শহুরে বস্তু এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে তিনি তাঁর নিজের শিল্পের উপাদানে রূপান্তর করতেন। এর ফলে তাঁর কাজ একটি আন্তঃসাংস্কৃতিক ভাষা অর্জন করে, যা স্থানীয় এবং বিশ্ব অভিজ্ঞতাকে একসাথে ধারণ করে।

সমকালীন শিল্প-ইতিহাসের আলোচনায় হোদাকা ইয়োশিদাকে ট্রান্সন্যাশনাল মডার্নিস্ট হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। তিনি শিল্পে পশ্চিমি আধুনিকতার ভাষা গ্রহণ করলেও কখনও সেই ভাষাকে অনুকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। বরং জাপানি নন্দনতত্ত্ব, লোকায়ত ভিজুয়াল ঐতিহ্য, ভ্রমণজনিত স্মৃতি এবং আন্তর্জাতিক শিল্প-প্রবণতাকে সংযুক্ত করে তিনি এমন এক শিল্পভাষা সৃষ্টি করেন– যা একইসঙ্গে ব্যক্তিগত, সাংস্কৃতিক এবং বিশ্বকে ধরে রেখেছে। তাই হোদাকা ইয়োশিদার কাজের মধ্যে পড়ে নেওয়া যায় স্মৃতি, পরিচয়, স্থান, ইতিহাস এবং দৃশ্যমান সংস্কৃতির জটিল সম্পর্কগুলির নানা সংকেতকে। আবার একইসঙ্গে তাঁর প্রিন্টগুলিকে আধুনিকতার বিকল্প মানচিত্র হিসেবেও পড়া যায়, যেখানে পশ্চিমকেন্দ্রিক শিল্প-ইতিহাসের বাইরে এক বহুসাংস্কৃতিক আধুনিকতার ধারণা প্রকাশ পেয়েছে।

আজ হোদাকা ইয়োশিদা শুধুমাত্র জাপানি আধুনিক প্রিন্টমেকিংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব নয়, তিনি বিশ্ব জুড়ে একজন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী হিসেবেই স্বীকৃত। জাপানের একাধিক মর্যাদাপূর্ণ সম্মান তাঁর শিল্পকৃতিত্বের স্বীকৃতি বহন করছে। তাঁর অবদানের গুরুত্ব শুধুমাত্র নতুন কৌশল উদ্ভাবনে নয়; বরং ঐতিহ্য ও আধুনিকতা, স্থানীয় চরিত্র ও বিশ্বজনীনতা এবং শিল্প ও প্রযুক্তির মধ্যে এক গতিশীল সংলাপ নির্মাণের কারণেও তিনি আজ বিশ্ববন্দিত। তাই আজ হোদাকা ইয়োশিদা শুধু ইয়োশিদা পরিবারের উত্তরসূরি নন, বরং বিশ শতকের ফাইন প্রিন্টশিল্পের ইতিহাসে এক মৌলিক এবং পথপ্রদর্শক শিল্পী।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved