সারাজীবন যা যা চেয়েছি। যা যা কিছু প্রার্থনা করেছি। সেই সমস্ত আশা। ইচ্ছে। তাকিয়ে আছে। ‘আজি বিজন ঘরে নিশীথরাতে আসবে যদি শূন্য হাতে’। কোনও হাতকে আলাদাভাবে শূন্য তখনই মনে হয়, যখন সে-হাতের পাত্রে আমরা কিছু পাওয়ার ইচ্ছে পোষণ করি। আমি যা যা চেয়েছি। সেই সমস্ত চাওয়ার প্রতিফল নিয়ে ঈশ্বর এসেছেন আজ আমার কাছে। ঈশ্বরের দুই হাত– শূন্য! ঠিক এইখানে, গানের সুরকে রবীন্দ্রনাথ অতলে নামিয়ে আনেন।
আমার জীবনে সে এসেছে চারবার। সে, মানে প্রেম। তার আসামাত্র জন্ম হয়েছে আমার। জন্ম হলে, তার মৃত্যু হবেই।
শরীর মরে একবার। মন মরে আস্তে আস্তে। রোজ একটু একটু করে মনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি খসে যায়। আমরা বুঝতে পারি। কিন্তু কিছুই করতে পারি না।
যার জন্য ঘটছে এই অপঘাত, তাকে মাঝেমাঝে জানাই। লিখে। মুখে বলে। কেঁদে। আরও বিভিন্ন উপায়ে। বোঝানোর চেষ্টা করি যে, তোমার জন্যই ছড়ে যাচ্ছে আমার মনের ত্বক। রক্ত পড়ছে অবিরত। জ্বালা হচ্ছে।
ছোটবেলায় খেলতে-খেলতে রাস্তায় পড়ে গিয়ে আমার হাঁটু ছড়ে যেত যখন, দিদি একটা কোনও গাছের পাতা এনে কাটা জায়গায় মাখিয়ে দিত। বলত, এটা ওষুধ। ঠিক হয়ে যাবে। হয়েও যেত। কই? এখন যে রক্ত পড়ছে মনের ভেতর, তোমার সঙ্গে কথা বলতে-বলতে হোঁচট খাচ্ছি আর ছিঁড়ে-ছিঁড়ে যাচ্ছে প্রেমের শিরা-উপশিরাগুলি, কেউ তো ছুটে আসছে না?

আসবে কী করে? কেউ তো জানেই না এই রোগ। এই যন্ত্রণা। মনুষ্য মাংসের ভেতর চাপা পড়ে থাকা এই অসম্ভব চিৎকার। এমনকী আমি নিজেও তো নিজের জন্য নিয়ে আসছি না কোনও ঔষধি গাছের পাতার শুশ্রূষা। ভেতরে-ভেতরে শান্ত করতে পারছি না নিজেকে।
কেন পারছি না? বেড়ালরা মারা যাওয়ার আগে না কি বুঝতে পারে। ফ্রিজের পাশে। খাটের তলায়। খাওয়ার টেবিলের নিচে। বাড়ির সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, রাত্রে, সে বেরিয়ে যায় বাগানে। একটা আড়াল খুঁজে নেয়। তারপর অপেক্ষা করে। মৃত্যুর জন্য এক নিশ্চিন্ত অপেক্ষা।
সম্পর্কের পরিস্থিতি। বিষাক্ত আচরণ। মনকে যখন মনেরই মৃত্যুর অপেক্ষার কাছে নিয়ে যায়, প্রয়োজন হয় আড়ালের। দূরত্বের। একা থাকার।
এমনই এক একা-থাকার সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে মাথা নিচু করে দিন কাটছে তখন। যোগাযোগের যতগুলো রাস্তা ছিল, খুন করে ফেলেছি নিজেই। ফেসবুক, ব্লক। ওয়াটসঅ্যাপ, ব্লক। আরও যা যা আছে। সব। সমস্তই। যাবতীয় পথ উড়িয়ে দিয়েছি। এমনকী ফোন নম্বর অবধি ডিলিট। এইবার। এই এখন থেকে একটা হু-হু করা শীতকাল শুরু হল রক্তের ভেতর। এই এখন থেকে বিছানায় পড়ে থাকা ফোনকে মনে হচ্ছে মৃত জন্তু। যে জন্তুর আর কোনও কামড় দেওয়ার ক্ষমতা নেই। সে এখন ঘুমন্ত!

ফোন কীভাবে কামড়াতে পারে? কেন? ফোনে কথা বলার সময়ই তো তোমার কাছ থেকে প্রথম একদিন। দ্বিতীয় একদিন। তৃতীয়। চতুর্থ। পঞ্চম। কত-কতবার ভেঙেচুরে যাওয়া! সে-ও কি কামড় নয়, বলো?
প্রথম প্রথম অন্যের মাধ্যমে তার খবর নিচ্ছি। পরিচিতদের ফোন থেকে ঝুঁকে দেখছি তার ফেসবুক। ওয়াটসঅ্যাপ। ডিপি চেঞ্জ হলে তাকিয়ে থাকছি তার পোশাকের দিকে। দেখছি, শরীর। যেখানে ছবিটা তোলা, সেই ঘরটাকে ঈর্ষা করছি। বারবার, ঘুরে-ফিরে খুঁজতে চাইছি একটাই কথা– ও কি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইছে? জানতে চাইছে আমার অবস্থা?
না, চাইছে না। এই বাক্যটি যেদিন, যখন, যে-মুহূর্তে জীবনে প্রবেশ করল, বুঝতে পারলাম, এবার সত্যিই আমি একা। কারণ দূরত্বে থাকা, আড়ালে থাকাও কিন্তু এক প্রকারের থাকা। এক ধরনের সংযোগ। সেই সংযোগের ইচ্ছেও একটা সময় মরে যায়। এরপর যে-একাকিত্ব শুরু হয়, তা শ্মশানচারীর গায়ে-মাখা ছাইয়ের মতো শুদ্ধ এবং নিঃস্পৃহ।
শ্মশানে কী হয়? মৃতদেহকে ঘিরে পরিজনরা অপেক্ষা করেন। তারপর চুল্লির ভেতর শান্ত হয় সেই অপেক্ষা। এক্ষেত্রে আমি নিজেই নিজের সেই পরিজন। আর আমার মন, মৃতদেহ। পার্থক্য একটাই। চুল্লির ভেতর আগুনের ক্ষুধার্ত জিভ লাশকে খেতে সময় লাগায় কয়েক ঘণ্টা। কিন্তু শরীরের মধ্যে, মনের মৃতদেহকে বহন করে চলতে হয় বহু-বহু দিন। আমি কথা বলছি। রাস্তায় হাঁটছি। লোকজনের সঙ্গে মিশছি। কেউ দেখতে পাচ্ছে না আমার ভেতরেই শায়িত রয়েছে একটা মরা।

এই মরার সঙ্গে যাঁরা ঘর করছেন তাঁদের একটা অভিজ্ঞতা হামেশাই হয়। এই যেমন কয়েকদিন আগে আমার হল। বাবা অসুস্থ। নার্সিংহোমে ভর্তি। সেদিন বাড়ি ফিরবেন। ভোরবেলা ঘুম ভাঙল। দেখলাম, এসি থেকে ঝরঝর করে জল পড়ছে। নিচে বিছানা। ভেজা।
ওই জলের আওয়াজ। ভেজা বিছানা। ভেতরে ছুরির মতো এসে লাগল। আমি আটকানোর চেষ্টা করলাম। অনেক জোর খাটালাম। পারলাম না। তোমার বাড়ির এসি দিয়ে মাঝরাত্রে ঠিক এইভাবে জল পড়ত। আর তুমি উঠে-উঠে বিছানায় ওপর প্লাস্টিক দিয়ে ঢেকে দিতে। আমিই ডেকে দিতাম তোমায়। আমার কেবল, কেবলই, মনে পড়তে থাকল শুধু এই দৃশ্যটা।
কী বললাম এক্ষুনি? মনে পড়তে থাকল? তার মানে, ওই দৃশ্যটা অগ্নিস্রাবের মতন ঝরে পড়ছে তখন। কোথায় পড়ছে? আমার মনের ভেতর। কিন্তু তোমাকে ঘিরে যে-মন, সে তো ততদিনে মরা। তবে কি সে পুরোপুরি মরেনি এখনও? এই প্রশ্ন জাগছে কোথায়? যে আমাকে বোঝাচ্ছে এই কথা যে, আমার মন মারা যাচ্ছে ক্রমশ– সে-ও তো আরেকটা মন-ই। কিন্তু সে-মন নিরপেক্ষ। তোমার থেকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য কোনও অস্তিত্ব।
আমি কী করলাম? যন্ত্রণা সহ্য করলাম অনেকক্ষণ। তারপর, সেই অন্য কোনও ‘মন’-এর সাহায্য নিতে শুরু করলাম। সত্যি কথা বলছি। চেম্বারে গিয়ে, আমি অনুত্তমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের থেরাপি নিইনি কখনও। তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু তিনি আমায় দান করেছেন। অবলীলায়। অনুত্তমাদি আমাকে কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘অনুভূতি প্রবহমান অভিরূপ। তোমার কষ্ট হচ্ছে কেন, এটা ভাবো।’

–ওর জন্য কষ্ট হচ্ছে অনুত্তমাদি।
–সত্যিই কি তাই? তোমার ওর জন্য যন্ত্রণা হচ্ছে? না কি তোমার অন্য একটা মন বুঝতে পারছে– ওই এসি থেকে জল ঝরে পড়ার মুহূর্তটি তোমার জীবনে আর কোথাও নেই? মুহূর্তটি মারা গেছে। এবং সেই মুহূর্তে ভেতর অবস্থানকারী ‘তুমি’-ও আর এ-পৃথিবীতে কোথাও নেই। হয়তো এটা ভেবেই তোমার মৃত্যুযন্ত্রণা হচ্ছে অভিরূপ। এই যন্ত্রণা, তোমার নিজের জন্য। প্রিয়জনের সঙ্গে কাটানো ওই মৃত মুহূর্তের জন্য, এই যন্ত্রণা!
আমি মেনে নিয়েছিলাম ওঁর কথা। অনুত্তমাদি আরও একটা কথা বলেছিল এরপর। হয়তো এভাবেই একটা ওষুধ লিখে দিয়েছিল আমার মনে। বলেছিল, ‘এমন অজস্র স্মৃতি বারবার ফিরে-ফিরে আসবে। ছুরি মারবে বুকে। যখন ছুরিটা বুকে বিঁধছে, ওই স্মৃতিমুহূর্তের দিকে একভাবে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করো, সে-মুহূর্তটি তোমার থেকে আসলে কী চায়?’
যে কোনও অনুভূতি-ই প্রবহমান। যন্ত্রণা-ও তাই। সেই যন্ত্রণাকে সরাসরি প্রশ্ন করুন। জিজ্ঞেস করুন, সে কী চাইছে? কেন চাইছে? আত্মহত্যা শুধু শরীরের ক্ষেত্রেই সত্য নয়। আমরা আমাদের মনকে যখন মেরে ফেলি, বা অন্যের আচরণে যখন মন মরতে থাকে, আমরা অসহায় হয়ে কিছুই করতে পারি না– সেটাও কিন্তু হত্যাই। মনের আত্মহত্যা। আর, হত্যা মাত্রই তা অপরাধ।
এইসব মৃত্যু। রক্তপাত। ভেতরে-ভেতরে সম্পর্কের মরা শরীরকে বয়ে বেড়ানো। স্মৃতি। পরপর ঘটে চলেছে যখন। এই তো, ক’দিন আগেই আঁকড়ে ধরলাম একটি গানকে। আমি আজীবন যখনই অসম্ভব যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে গিয়েছি, একটা করে গান আমার সঙ্গী হয়ে পাশে থেকেছে। এবার পেলাম ‘আজি বিজন ঘরে নিশীথরাতে’। প্রায় সকলেই শুনেছেন এই গান। শুনে আসছি আমিও। বহুদিন ধরেই। কিন্তু এই প্রথম গানটির প্রারম্ভ লাইনগুলি আমাকে কয়েকটি কথা জানিয়ে গেল।

সারাজীবন যা যা চেয়েছি। যা যা কিছু প্রার্থনা করেছি। সেই সমস্ত আশা। ইচ্ছে। তাকিয়ে আছে। ‘আজি বিজন ঘরে নিশীথরাতে আসবে যদি শূন্য হাতে’। কোনও হাতকে আলাদাভাবে শূন্য তখনই মনে হয়, যখন সে-হাতের পাত্রে আমরা কিছু পাওয়ার ইচ্ছে পোষণ করি। আমি যা যা চেয়েছি। সেই সমস্ত চাওয়ার প্রতিফল নিয়ে ঈশ্বর এসেছেন আজ আমার কাছে। ঈশ্বরের দুই হাত– শূন্য! ঠিক এইখানে, গানের সুরকে রবীন্দ্রনাথ অতলে নামিয়ে আনেন।
এবং তারপরই সুর উঠতে থাকে উপরের দিকে। এক বিশ্বাসের দিকে, নির্ভরতার দিকে আমাকে পুনর্বার নিয়ে চলতে শুরু করে শূন্য হাতের গহ্বর থেকে ঊর্ধ্বমুখে। আশ্চর্য ক্ষমতাকে সারা গায়ে মেখে গানটি বলে, ‘আমি তাইতে কি ভয় মানি!/ জানি জানি, বন্ধু, জানি–/ তোমার আছে তো হাতখানি।।’ কয়েকটি শব্দের ব্যবধানে আবারও ‘হাত’ কথাটি ব্যবহার করলেন রবীন্দ্রনাথ। আমার সমস্ত চাওয়ার সামনে ঈশ্বর নিয়ে এসেছে তার শূন্য দুই হাত। কিন্তু সেই হাত শূন্য হলেও, তোমার হাত দুটো তো তুমি এনেছ। আঁকড়ে ধরার জন্য সেটাই কি যথেষ্ট নয়?
আমার কাছে ওই হাত দুটো আজ আমার মন। একমাত্র বন্ধু, সে-ই। আমি আমার মনের পাশে থাকতে চাই। মনের হাত দুটো ধরে তাকাতে চাই বিভিন্ন যন্ত্রণার দিকে। মুহূর্তের অতীতকে স্থিরভাবে জিজ্ঞেস করতে চাই তাদের চাওয়া-পাওয়া?
কিন্তু আমার মনকে মেরে ফেলতে চাই না কিছুতেই।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved