

আশি হল– সময়ের এমন সন্ধিক্ষণ, যখন খেলার দুনিয়া সবেমাত্র পা বাড়িয়েছিল বাণিজ্যের রঙিন রাজ্যে, ঘরের মধ্যে এসে হাজির হচ্ছিল যাবতীয় খেলা আর খেলার বাইরের সিনেমার মতো নানা দৃশ্য, ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছিল একদিনের ক্রিকেট তার রংচঙে পোশাক নিয়ে। কলকাতার ময়দানে বাড়ছিল বিদেশিদের আনাগোনা, বদলে যাচ্ছিল মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের জার্সির নকশা, ধ্রুপদিয়ানা ক্রমে সরে গিয়ে জায়গা নিচ্ছিল সমকালের চাহিদা। এত বেশি দেখা যাচ্ছিল খেলোয়াড়দের, আর তাঁদের ছবি কেটে রাখার দরকারই পড়ল না! শেষপর্যন্ত হারিয়েই গেল স্বপ্নভরা সেই পিচবোর্ডের বাক্সটা আর ব্যক্তিগত ঘরের দেওয়ালে সেঁটে রাখা আটের দশকের সেই রঙিন পোস্টারগুলো!
২৫ জুন সকালের খবরের কাগজ। ‘যুগান্তর’-এর প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছিল সাদা-কালোয় দু’জনের ছবি। একজনের মুখে চওড়া অনাবিল হাসি, অন্যজন মুখ তাঁর স্বভাবমাফিক গম্ভীর। ছবির তলায় ছিল তাঁদের ছোট্ট বক্তব্য, এক লাইনে। অনাবিল হাসির লোকটি বলেছিলেন, ‘আমরা জিতবই’, গম্ভীর মুখ বলেছিলেন, ‘ছেড়ে দেব না’। যে পাঠক পড়ছিল সেদিনের ‘যুগান্তর’, ১৯৮৩ সালে তার বয়স আট। কয়েকদিন ধরেই দেখছে বাড়ি আর পাড়ার বড়রা ঈষৎ উত্তেজিত, আশানিরাশায় প্রহর গুনছে তারা। খবরের কাগজে এই ছবি আর কথাগুলো থেকে কী যেন তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ল তার মনে। এমন হাসি আর এমন আত্মবিশ্বাসভরা মন্তব্য যাঁর, তিনি কখনও খালি হাতে ফিরতে পারেন না। বুঝতেই পারছেন, এই দু’জন হলেন দুই দেশের দুই অধিনায়ক, কপিলদেব আর ক্লাইভ লয়েড।

গঙ্গাতীরবর্তী সেই মফস্সলের পাড়ায় তখন টেলিভিশন আছে বড়জোর দুটো কি তিনটে। সেখানেই ভিড় জমায় ছেলে-ছোকরার দল। আর ঘরে ঘরে বাজতে থাকে রেডিও। তার বাড়িতে রয়েছে কোনার্ক রোহিনী ডিলাক্স মডেলের সাদা-কালো একটা টেলিভিশন, যার শাটার খুলে যায় অনুভূমিকভাবে। দুপুর থেকেই আসতে শুরু করেছে লোকজন, এসে গিয়েছে তার পাড়ার বন্ধুরাও। মনে তার খুব আনন্দ, কিন্তু খেলা শুরু হতেই সেই আনন্দ মিলিয়ে যেতে লাগল। মাত্র ১৮৩ রানে শেষ হয়ে গেল ভারতের ব্যাটিং! বড়রা বলে গেল, এই রান একাই তুলে দেবে ভিভ রিচার্ডস, অন্যরা বলল, গ্রিনিজ-হেনস যথেষ্ট, ভিভকে নামতেই হবে না। বলে গেল বটে, কিন্তু পাড়ার মোড়ে চা খেয়ে গুটিগুটি পায়ে ফিরে এল সবাই। প্রথম আকাশ ফাটানো চিৎকার শোনা গেল, বলবিন্দার সিং সাঁধুর বলে যখন বোল্ড হলেন গ্রিনিজ। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেননি গ্রিনিজ-সহ গোটা বিশ্ব। তাড়াতাড়ি ফিরে গেলেন হেনস-ও। কিন্তু নেমেই তাণ্ডব শুরু করলেন রিচার্ডস। দিশেহারা ভারতীয় টিম, মনের দুঃখে টিভির সামনে থেকে উঠে যাচ্ছে একজন-দু’জন। এমন সময়ে হঠাৎ চিৎকার, বোধহয় তা শোনা গেল মঙ্গল গ্রহ থেকেও– আউট ফিরে যাচ্ছেন ভিভ। তারপরের কথা আমরা সবাই জানি, সে তো ইতিহাস, কিন্তু সেই ইতিহাস গড়ে উঠতে দেখেছিল সেই আট বছরের বালক।

আজ এত বছর পরে সে ভাবে, ভাগ্যিস! সে জন্মেছিল আট দশকের কিঞ্চিৎ আগে, তবেই না সে হাত পেতে নিয়ে চেটেপুটে খেল আশির মাঠ-ময়দানের রোমাঞ্চকর মুহূর্তগুলো!
পিছিয়ে যাওয়া যাক, একটিমাত্র বছর। তার জীবনে দেখা প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবল। সেই দশকেরও। অল্প অল্প বুঝতে শিখছে ফুটবলের নিয়মকানুন, কলাকৌশল। শিক্ষক সেই পাড়ার দাদা-কাকারা। তাদের কথা গোগ্রাসে গেলে সে। শুনল, ফুটবলের রাজা পেলে, ফুটবলের দেশ ব্রাজিল। আর এই মুহূর্তে সবার নিজের দেশ ব্রাজিল, আর ব্রাজিল জিতবেই। কারণ ব্রাজিলের হয়ে ফেলবেন জিকো, যাকে বলা হচ্ছে ‘সাদা পেলে’। বাঙালির বাইনারি-বাইনারি খেলায় তখনও আসেনি ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা, তখন শুধুই ব্রাজিল। আর সেই ব্রাজিলই কি না হেরে গেল! মন খারাপ সবার। ততদিনে বাড়িতে আসে ছোট সাইজের ‘আনন্দমেলা’, আজও তার চোখে ভাসে আনন্দমেলায় প্রকাশিত গোটা ব্রাজিল দলের একটা ছবি, নিচে ক্যাপশন: ‘শক্তি অসামান্য, সাফল্য কম’।
পাঠকের সন্দেহ হলে আর্কাইভে গিয়ে মিলিয়ে দেখে নিতে পারেন। এর চার বছর পর আবার বিশ্বকাপ। গোটা ফুটবল-বিশ্ব দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেল– যাঁরা ছিয়াশির বিশ্বকাপ দেখেছেন আর যাঁরা দেখেননি। সে-কথায় পরে আসছি।

আপনারা যদি ভাবেন যে, ফুটবল দেবতারা থাকেন শুধু ইউরোপে আর লাতিন আমেরিকায়, তাহলে ভাবনায় একটু ভুল থেকে যাবে। আমাদের ময়দানেও তখন ফুটবল-দেবতাদের আনাগোনা। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মহামেডান জুড়ে সব রূপকথার নায়ক। গোটা দশক জুড়ে দাপিয়ে বেড়ালেন সুরজিৎ সেনগুপ্ত, শ্যাম থাপা, প্রসূন ব্যানার্জী, সাবির আলি, সুব্রত ভট্টাচার্য, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, তরুণ দে, গৌতম সরকার, প্রশান্ত ব্যানার্জী, খানিক পরে সুদীপ চ্যাটার্জী, বিকাশ পাজি, কৃশানু দে। গোলে শিবাজী ব্যানার্জী, ভাস্কর গাঙ্গুলী, অতনু ভট্টাচার্য। এই তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে যাবে। ততদিনে এসে গিয়েছেন মজিদ বাসকর, জামশেদ নাসিরি আর ময়দানের মণি– চিমা ওকোরি। মোহনবাগানে কোনও বিদেশি খেলায় না, এই গর্ব তখন ছিল মোহনবাগানিদের বুকে। তখন ভারতীয় ফুটবল মানেই বাঙালি, বাঙালির ফুটবল। ছিলেন অমল দত্ত-পিকে-নঈম কোচ হিসেবে। ভারতীয় ফুটবলের গৌরবজনক অধ্যায়ের শেষ দশক ছিল আশি।

আটের দশকের মফস্সল হলেও সেই পাড়ায় কোনও মাঠ ছিল না, মাঠ বলতে ছিল একজনের বাড়ি লাগোয়া একটা ছোট্ট জমি। সেটাই শীতকালের লর্ডস, গরমকালের মারকানা। কিন্তু সেটা কোনওভাবেই উইম্বলডনের সেন্ট্রাল কোর্ট নয়। লন টেনিস এমন একটা খেলা, ভারতের মতো দেশে সে খেলা দ্যাখে বা মাথা ঘামায় অনেকে, কিন্তু খেলে না প্রায় কেউ। সেই বালক যখন এই দশকেই বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছে গেল, প্রথম প্রেমে পড়ার আমেজ টের পেল– তখন কিন্তু সেই প্রেম কোনওভাবেই পাড়া বা সেই অঞ্চলের বালিকা বিদ্যালয়গুলির কেউ নয়, সেই প্রেম দেশ বা মহাদেশের সীমানা পেরিয়ে পৌঁছেছিল একেবারে জার্মান দেশে। তবে এই অভিজ্ঞতা যে শুধু তার ব্যক্তিগত তা নয়, তার ক্লাসের অনেকের। যেকোনও খেলার পত্রিকায় স্টেফি গ্রাফ-এর ছবি থাকলেই হল, ক্লাসের বন্ধুদের হাতে হাতে ঘুরত সেই ছবি।

আপনারা যদি ভাবেন, এ নিতান্ত হুজুগ, অল্পবয়সের মোহ, তাহলে আপনি বোঝেন না আশির সেই সময়টা, যখন সোনালি চুল উড়িয়ে কোর্টের মধ্যে হরিণীর মতো ছুটে চলেন স্টেফি! নব্বইয়ের মাঝামাঝি সময়ে ছবিভরা যে পিচবোর্ডের ‘বাক্সো’টা সে একদিন ফেলে দিয়েছিল, তার পুরোটাই বোঝাই ছিল স্টেফির ছবিতে। মনখারাপ হলে এই বাক্সই ছিল তার জীবনের সুধা। তবে এখানেও বাঙালির সেই বাইনারি। স্টেফির সঙ্গে উঠে এল আর-এক নাম। আর্জেন্টিনার তরুণী, কালো চোখের আর কালো চুলের গ্যাব্রিয়েলা সাবাতিনি। বালিকা বিদ্যালয়ের অবস্থাও তখন তথৈবচ, সেখানেও জার্মানি।

এই দশকের শুরুটা হয়েছিল বদরাগী ম্যাকেনরো-কে দিয়ে। কিন্তু হঠাৎ-ই এক সতেরো বছরের বিস্ময়বালক হাজির হলেন এই দশকের ঠিক মাঝখানে। ১৯৮৫ আর ১৯৮৬ সালে পর পর দু’বছর উইম্বলডন জিতে নিলেন বরিস বেকার, গোটা বিশ্বকে মুগ্ধ করে। আর সেই বালকে মজল বালিকা বিদ্যালয়গুলি।

সেই যে ১৯৮৩ সালে বিশ্বকাপ জিতল ভারত, তারপর তো এল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। প্রতিশোধস্পৃহায় একেবারে ছিঁড়ে ফেলেছিল ভারতকে। পাঁচটা টেস্টের মধ্যে তিনটে টেস্টে জিতে গেল, জিতে গেল সবকটা একদিনের ম্যাচে। পেসের আগুনে পুড়ে গেল ভারত, দেখল ম্যালকম মার্শাল নামের খর্বকায় এক ভয়ংকর বোলারকে। কিন্তু এর মধ্যেই জাহান্নামের আগুনে বসিয়া পুষ্পের হাসি হাসলেন আর-এক খর্বকায়, সুনীল গাভাসকর। এই সিরিজেই টপকে গেলেন ডন ব্র্যাডম্যানের সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় করা সেঞ্চুরির রেকর্ড। এর কিছুদিন পরে তিনি হয়ে উঠবেন বিশ্বের প্রথম ব্যাটার যিনি টপকে যাবেন ১০,০০০ রানের সীমা।
সেদিনের সেই কিশোর আজ ৫০ অতিক্রান্ত, স্বভাবতই জীবনে নানা ওঠাপড়া এসেছে, কিন্তু যখনই কোনও কঠিন সময় আসে, তখনই সে ফিরে যায় তার সেই আশিতে। সে দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পায়, বিপদ যেন ম্যালকম মার্শালের মতো ছুটে আসছে, আর সে চাইছে গাভাসকর হয়ে উঠতে। গাভাসকর ক’টা সেঞ্চুরি করেছিলেন বা কত রান করেছিলেন, আজ আর তা তেমন কোনও ব্যাপার নয়, আজ গাভাসকর আসলে জীবনের একটা শিক্ষা, ধৈর্যের দর্শন, মনোবিজ্ঞানের নায়ক।

কয়েকদিন আগে সে-দিনের সেই কিশোর গিয়েছিল টি-টোয়েন্টির খেলা দেখতে ইডেনে। বিরাট কোহলিকে নিয়ে ইডেন উত্তাল। বিরতির সময় দেখা গেল হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে মাঠে নেমেছেন গাভাসকার। ইডেনের কেউই প্রায় তাঁকে নিয়ে ভাবিত নয়। কিন্তু তার মনে হল, এই যে চর্মচক্ষে দেখতে পাচ্ছে গাভাসকারকে, এটাই তো তার বেঁচে থাকার পুরস্কার।
আশি মানেই কি গাভাসকারের মতো ‘ভার্টিক্যালি চ্যালেঞ্জড অ্যান্ড হরাইজনটালি ব্লেসড’-দের গাথাকাব্য? যেকোনও খেলার নিরিখে সবচেয়ে আলোচ্য, সবচেয়ে আদরের, সবচেয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব খর্বকায় দিয়েগো মারাদোনা। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ ছিল দূষণমুক্ত আকাশের মতো তারকাখচিত। সেবারেও খেলেছিলেন জিকো, সক্রেটিসরা, ছিলেন প্লাতিনি, রুমেনিগে। সেই বিশ্বকাপের একটি ম্যাচেই হল সবচেয়ে বিতর্কিত গোল, যে গোলের জন্য আজও খলনায়ক মারাদোনা এবং একইসঙ্গে হল শতাব্দীর সেরা গোল, যে গোলের জন্য রূপকথায় জায়গা পেলেন মারাদোনা। প্রায় একার কৃতিত্বে বিশ্বকাপ এনে দিলেন তিনি। তারপর হাজির হলেন ইতালির এমন একটি ক্লাবে, যে ক্লাব কখনওই লিগ টাইটেল পায়নি। ১৯৮৭ আর ১৯৯০ সালে সেই সম্মান এনে দিলেন তিনি। মারাদোনা যে শুধু নাপোলি ক্লাবের জন্য ফুটবল খেললেন তা নয়, নাপোলি শহরের মধ্যে ছড়িয়ে দিলেন এক গভীর আত্মবিশ্বাস, মিলান বা তুরিন বা রোমের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা যে-শহর ভাবতেই পারত না, মারাদোনা বিশ্বফুটবলের মানচিত্রে প্রতিষ্ঠা দিলেন তাকেই।

জীবনযাপনে, খেলার ধরনে কোথাও মিল নেই এই দুই খর্বকায় মানুষের, শুধু যাবতীয় শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে মর্যাদার লড়াইয়ে সব সময় বেছে নিয়েছেন দুর্বলের সঙ্গ, নিজেকে শানিয়ে নিয়েছেন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তারপর খেলার মাঠের গণ্ডি টপকে মিথ হয়ে গেলেন।

আসলে আশি হল– সময়ের এমন সন্ধিক্ষণ, যখন খেলার দুনিয়া সবেমাত্র পা বাড়িয়েছিল বাণিজ্যের রঙিন রাজ্যে, ঘরের মধ্যে এসে হাজির হচ্ছিল যাবতীয় খেলা আর খেলার বাইরের সিনেমার মতো নানা দৃশ্য, ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছিল একদিনের ক্রিকেট তার রংচঙে পোশাক নিয়ে। কলকাতার ময়দানে বাড়ছিল বিদেশিদের আনাগোনা, বদলে যাচ্ছিল মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের জার্সির নকশা, ধ্রুপদিয়ানা ক্রমে সরে গিয়ে জায়গা নিচ্ছিল সমকালের চাহিদা। এত বেশি দেখা যাচ্ছিল খেলোয়াড়দের, আর তাঁদের ছবি কেটে রাখার দরকারই পড়ল না! শেষপর্যন্ত হারিয়েই গেল স্বপ্নভরা সেই পিচবোর্ডের বাক্সটা আর ব্যক্তিগত ঘরের দেওয়ালে সেঁটে রাখা আটের দশকের সেই রঙিন পোস্টারগুলো!
………………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন ঋত্বিক মল্লিক-এর অন্যান্য লেখা
………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved