

একজন অভিনেতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন একটি সংলাপ বলেন বা কোনও একটি বিশেষ শব্দ উচ্চারণ করেন, তাঁর অন্তর্লীন অর্থ এবং সেই চরিত্রের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার নিরিখে সেই শব্দকে অনিবার্য করে তোলার বা সত্যকে প্রতিভাত করার যে প্রক্রিয়া– সেদিন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ দ্বিজেনদা আমাদের সামনে রেখেছিলেন। মূল্যায়ন করা সম্ভব নয় কখনও-ই, তবু যদি দ্বিজেনদার অভিনয় নিয়ে এককথায় বলতে হয়, তাহলে বলব, পার্থিব কোলাহলমুখরতা পেরিয়ে এক অপার্থিব অলৌকিকতার নিঃসঙ্গ সত্যে পৌঁছনোর অভিজ্ঞতা হয় ওঁর অভিনয়ের মাধ্যমে।
কিছু কিছু স্বপ্ন আছে,
যা সারাজীবন সঙ্গে থাকে।
কিছু কিছু ভালোবাসা আছে
যা রক্তের সঙ্গে, চোখের জলের সঙ্গে
মিশে থাকে।
আজীবন, সমস্ত জীবন।
কিছু কিছু সামান্য সঞ্চয়
লেবুর পাতা ছিঁড়ে পুরনো দিনের গন্ধ
নদীর ঢেউয়ে ডুবতে ডুবতে ভেসে যাওয়া চাঁদ
কিছু কিছু পুরনো স্বপ্ন
কিছু কিছু ভালোবাসা
আজীবন, সমস্ত জীবন।
[আজীবন, সমস্ত জীবন / তারাপদ রায়]
‘পুতুল নাচের ইতিকথা’য় কুমুদ যখন শশীকে আচ্ছন্ন করতে চায় তার বেপরোয়া জীবনের রোম্যান্টিক উচ্ছ্বাসের সাবলীলতায়– তখন তার পারিপার্শ্বিক নানা জটিলতায় কাতর আগামী জীবনের বিবর্ণতায় ডুব দেওয়ার অনিবার্যতায় বিধ্বস্ত শশী যেন বৈরাগ্যের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চায়। কুমুদকে অস্বীকার করার জোর তার নেই– আবার স্বীকার করলে তার সামাজিক ও ব্যক্তি-পরিসরের যে ঝুঁকি– সেই স্পর্ধাও সে গড়ে তুলতে পারে না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যসৃষ্টির নেপথ্যে যে অনুভূতির বয়ান, তা এইরকম– ‘আমি যেমনভাবে জীবনকে জেনেছি তারই সামান্য ভগ্নাংশ, অন্যকে ভাগ দেওয়ার তাগিদে লিখেছি।’
আমার থিয়েটার জীবনের প্রারম্ভে দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায় যে অভিজ্ঞতার মুহূর্ত দিয়ে আমার হৃদয়ের গভীরে অভিঘাত তৈরি করেছিলেন, তা উল্লিখিত মানিক-কৃত আখ্যানের জীবন-বৃত্তান্ত। যদিও আমার থিয়েটার পথে দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়কে আগে দেখেছি, আরও অনেকটা পথ হেঁটে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসের পাতায় কুমুদকে পেয়েছি– শ্রদ্ধেয় অরুণ মুখোপাধ্যায়ের সান্নিধ্যে। কিন্তু এই দুই কালখণ্ডের যোগসূত্র তৈরি হওয়ার অনুভূতি আমার শিল্পচর্চার অমূল্য সংগ্রহ।

অশোক মুখোপাধ্যায়ের ‘বেলা অবেলার গল্প’ নাটকটিতে পরিবর্ত হিসেবে একটি চরিত্রে সদ্য সুযোগ পেয়েছি। অ্যাকাডেমি মঞ্চের দুপুরের অভিনয় শেষে কুণ্ঠা নিয়ে বাইরে বেরিয়েছি। দেখি ‘যখের ধন’ নামক টিভি সিরিয়ালের ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন, সঙ্গে জনাকয়েক এবং এক অদ্ভুত ভঙ্গিতে ধূমপান করছেন। তাঁর ‘মানিকবাবু ভাই’ সংলাপটি তখন আমার মফস্সলি জীবনের প্রাত্যহিকতায় ব্যবহার করি যখন-তখন। এতটাই জনপ্রিয় ছিল সেই সংলাপ এবং তাঁর বলার ভঙ্গিমা। আমি বিহ্বল হয়ে মাথা নিচু করে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছি। শুনতে পেলাম এক কণ্ঠস্বর– ‘তোমার বাচিক অভিনয় খুব ভালো লেগেছে, মডিউলেশনও চমৎকার’– আমি তাকালাম ওঁর দিকে। হ্যাঁ, উনিই তো বলছেন? ওঁর পুরু কাচের চশমা পেরিয়ে চোখের ভাষা বুঝতে চেষ্টা করছি, উত্তেজনায়– আবার বললেন, ‘মঞ্চের আড়ষ্টতা আস্তে আস্তে কেটে যাবে’। তখন পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার অভ্যাস ছিল না আমার। সেদিন পারিনি, পরে আর কোনওদিন হয়ে ওঠেনি!
পরের দিন দলের রিভিউ মিটিং-এ বললাম– সবাই মুচকে হাসলেন। যেন নীরদ চৌধুরী কোনও অর্বাচীনকে বলছেন– ‘ইংরেজিটা ভালোই বলেছ।’ মাস্টারমশাই অশোক মুখোপাধ্যায় বললেন, ‘দ্বিজেনের অভিনয় দেখেছিস!’ আমি বললাম– ‘মঞ্চে দেখিনি’। ‘যত তাড়াতাড়ি পারিস দেখে নে, হতভাগা!’ কয়েকদিনের মধ্যেই কাগজে বিজ্ঞাপন দেখলাম। ‘নীলাম নীলাম’ নাটকটির। দোতলার সিটের একেবারে সামনের সারিতে বসে দেখতে থাকলাম আর ডুবে যেতে থাকলাম! প্রযোজনা, অভিনয়– সব কিছু মিলিয়ে এই মফস্সল শিল্পচর্চার রক্তাল্পতায় ভোগা দুর্বল আমি যেন এক অলৌকিকতার সম্মুখীন হলাম।

একটি মুহূর্তে ভাই-রূপী দ্বিজেনদা উত্তেজনাময় বাক্-বিতণ্ডার শেষে মঞ্চের ডাউন-লেফট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন, হঠাৎ দাঁড়িয়ে ঘুরে অ্যাক্টরস্-রাইটের অফ সেন্টারে চেয়ারে বসে থাকা দাদা-রূপী অসিত মুখোপাধ্যায়কে বললেন– ‘আমি তোমাকে ঘেন্না করি’ বলে বেরিয়ে যান। মানুষ যখন মানুষকে ‘ঘেন্না’ করে– তার যে বীভৎস রূপ এবং হিংস্রতা শরীরের ভেতরে ক্রিয়া করে, শব্দগত বহিঃপ্রকাশের মধ্য দিয়ে সেটা যখন একজন অভিনেতা উচ্চারণ করেন মঞ্চে– ‘ঘেন্না’– তা আদিমতম জান্তব অনুভূতির কাছে আমাকে পৌঁছে দেয়। শিল্পচর্চার একজন সিসৃক্ষু হিসেবে দ্বিজেনদার অভিনয়ের উৎকৃষ্টতা সেদিন আমি প্রথম আবিষ্কার করলাম।
একজন অভিনেতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন একটি সংলাপ বলেন বা কোনও একটি বিশেষ শব্দ উচ্চারণ করেন, তাঁর অন্তর্লীন অর্থ এবং সেই চরিত্রের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার নিরিখে সেই শব্দকে অনিবার্য করে তোলার বা সত্যকে প্রতিভাত করার যে প্রক্রিয়া– সেদিন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ দ্বিজেনদা আমাদের সামনে রেখেছিলেন। মূল্যায়ন করা সম্ভব নয় কখনও-ই, তবু যদি দ্বিজেনদার অভিনয় নিয়ে এককথায় বলতে হয়, তাহলে বলব, পার্থিব কোলাহলমুখরতা পেরিয়ে এক অপার্থিব অলৌকিকতার নিঃসঙ্গ সত্যে পৌঁছনোর অভিজ্ঞতা হয় ওঁর অভিনয়ের মাধ্যমে।

আমার দেখা দ্বিজেনদার অধিকাংশ চরিত্রই চারপাশের বাস্তবতার ভিড় থেকে উঠে আসা মানুষ। তারা কেউই কাল্পনিক নয় বা পুরাণাশ্রিত নয়। এই সমাজের ভিন্ন ভিন্ন পরিসরে তাদের যাপন। দ্বিজেনদা সেই চরিত্রগুলোর আপাত বাস্তবতার আড়াল সরিয়ে বাস্তবোত্তীর্ণ জীবন-সত্যের অনন্য অভিজ্ঞতা গড়ে তোলেন মঞ্চে, যা একই সঙ্গে গভীর ও শিল্প সংবেদনে উৎকৃষ্ট।
দ্বিজেনদার মতো অভিনেতার ট্র্যাজেডি হচ্ছে, আমাদের পরিকাঠামোয় অন্তত ওঁদের সময়কালে সেভাবে এই গ্রুপ-থিয়েটারি আবহাওয়ায় সম্পূর্ণ পেশাদার অভিনেতা হিসেবে টিকে থাকা দুষ্কর। এটা শুধু অর্থনৈতিক কারণে নয়, শিল্পগত জায়গা থেকেও একটা সংকটের জায়গা। এখন, তবুও অনেক উদাহরণের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট দেবশঙ্কর হালদার আছেন। যাঁর বর্তমান দলহীন অস্তিত্ব, তাঁর অভিনয় জীবনকে সংকটে ফেলেনি, বরং আরও সমৃদ্ধ করেছে। দ্বিজেনদার সময়ে এই চর্চা ততটা প্রসারিত হয়নি, বা হলেও দ্বিজেনদার সেই অভিলাষ ছিল না হয়তো।

প্রথম পর্বে নীলকণ্ঠদা (যে পর্বের কথা আমি শুনেছি, কিন্তু দেখিনি), তারপর ‘শূদ্রক’ (সে পর্বটিও শোনা), তারপর শেষে নিজের দল ‘সংস্তব’ প্রতিষ্ঠা করলেন ১৯৮২-তে। আমি নয়ের দশকে কলকাতা-কেন্দ্রিক থিয়েটারে যোগ দিই। তার পরবর্তী সময় থেকে যতদিন মঞ্চে সক্ষম ছিলেন, তাঁর বেশিরভাগ নাটক আমার দেখা হয়ে ওঠেনি বা দেখিনি। যে নাটক বা অভিনয়গুলি আমার স্মৃতিতে আমৃত্যু গেঁথে থাকবে– পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমির প্রযোজনায় বিভাস চক্রবর্তীর নির্দেশনায় ‘বলিদান’, সংস্তবের ‘মুষ্ঠিযোগ’, ‘স্পর্ধাবর্ণ’, ‘ছাড়িগঙ্গা’, ‘ধ্বনিস্তম্ভ’, সমবেত প্রয়াসের ‘গিরিগিটি’, রঙরূপের ‘যে জন আছে মাঝখানে’ এবং পরবর্তী সময়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ‘প্রাণতপস্যা’ থেকে যে যাত্রা শুরু, প্রাচ্যের ‘তৃতীয় অঙ্ক, অতএব’ পর্যন্ত। পরবর্তী কোনও কাজ আমার দেখা হয়ে ওঠেনি।

সৌমিত্রবাবু একবার কথাচ্ছলে আমি, সুপ্রিয় দত্ত এবং দ্বিজেনদার সঙ্গে, সম্ভবত তার ‘দাদাসাহেব ফালকে’ সম্মানিত হওয়ার জন্য মেয়ে পৌলমীর উদ্যোগে ঘরোয়া পার্টিতে বলেছিলেন– ‘দ্বিজেনের অভিনয়ে চরিত্রের সম্পূর্ণ জীবনচরিত গড়ে ওঠে।’ আমার অক্ষম বোধগম্যতার জন্যই জিজ্ঞেস করি: ‘একটু গুছিয়ে বলবেন?’ আমার অজ্ঞতার প্রতি বিন্দুমাত্র তাচ্ছিল্য না দেখিয়ে নরম আদরে শব্দগুলো বললেন– ‘নাটকে চরিত্রের তো একটা নির্দিষ্ট সময়কাল থাকে যে, সেই ঘটনার আবর্তে ঘুরপাক খায়, তার পশ্চাদ এবং অগ্রভাগ সবসময় বর্ণিত হয় না। কিন্তু দ্বিজেন যে চরিত্রে অভিনয় করে, আমি যেন সেই চরিত্রের পুরো জীবনটাই দেখতে পাই।’ প্রায় আধো-অন্ধকার চাতালে জানলা থেকে যে আলো এসে পড়েছিল সেই আবছায়ায় দ্বিজেনদার মুখ আমি দেখতে পেয়েছিলাম। ওই লজ্জা, কৃতজ্ঞতা এবং দুর্লভ প্রাপ্তির আনন্দমিশ্রিত মুখ আমি কোনওদিন ভুলব না– ওই মুহূর্ত শুধুমাত্র অনুভূত হয়, ছোঁয়া যায় না। যেমন শশী তার ভিতরে যৌবনের সেই আকাঙ্ক্ষাগুলোর মৃত অস্তিত্বের মধ্যে বসে কুমুদের জীবন সম্পর্কে উদার রোম্যান্টিক বোহেমিয়ানিজমকে ছুঁতে পারেনি।

দ্বিজেনদা তাঁর অভিনয়-জীবনের পরিক্রমায় বিভিন্ন ধারা খুব সুচারুভাবে মিলিয়েছেন। যখন নিখাদ অভিনেতা হিসেবে কোনও প্রযোজনায় যুক্ত হয়েছেন, সেই পরিচালক বা সহ-অভিনেতার সঙ্গে শিল্প-সংক্রান্ত আদানপ্রদানে নিজের ‘আমিত্ব’ পরিহার করেছেন। আবার নিজের দলের প্রযোজনায় দলের বোঝা স্বচ্ছন্দে কাঁধে নিয়ে ‘আমি’ নামক ব্যক্তিত্বকে অনেক বড় করে প্রতিভাত করতে হয়েছে। পরবর্তীতে সৌমিত্রবাবুর সঙ্গে যখন কাজ করছেন, তখন সৌমিত্রীয় অভিনয় ধারাকে মান্যতা দিয়েই নিজের অভিনয় শৈলীকে বাস্তবোত্তীর্ণ বাস্তবতার এক বিরল উদাহরণ তৈরি করেছেন। তাঁর এই শব্দচয়নের বৈচিত্র এবং তার সঙ্গে দৈহিক আচরণ মিলিয়ে তথাকথিত ‘শব্দই ব্রহ্ম’ নামক আপ্তবাক্যকে কিছুটা অগ্রসর করে ‘শব্দ ব্রহ্ম শরীর বিষ্ণু’-র মিলন ঘটিয়েছেন।
তাঁর একেবারে শেষের দিকের নাটক ‘স্পর্ধাবর্ণ’।
৩৪ বছর মুছে দিয়ে, আগামী ১৫ বছরের এবং আরও বহু বছরের নারকীয় অভিজ্ঞতার সাক্ষী থাকবে এ বাংলা। সেই ৩৪-এর অন্তিমে দাঁড়িয়ে, চেক নাটককার এবং পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী ভাস্লাভ হাভেল-এর নাটকের শ্রদ্ধেয় চন্দন সেন-কৃত অসাধারণ বঙ্গীকরণ এই নাটকে দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায় যে নৈঃশব্দ্যের মঞ্চপাঠ করেন, তার উদাহরণ রঙ্গমঞ্চে আমি কোনওদিন অনুভব করিনি। ওই পালাবদলের সময়ে একনিষ্ঠ বাম রাজনীতিতে বিশ্বাসী এই শিল্পী প্রতিবাদের হাতিয়ার করেছিলেন ‘নৈঃশব্দ্য’কে।

কালের নিয়মে উনি সশরীরে আর মঞ্চের প্রাত্যহিকতায় নেই– কিন্তু রেখে গিয়েছেন এই কালো অন্ধকার সময়ে প্রতিবাদের বা প্রতিরোধের আর এক অমোঘ শিল্পবয়ান– ‘নৈঃশব্দ্য’।
[আলোকচিত্র: কঙ্কাবতী বন্দ্যোপাধ্যায়]
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved