Puja Memories: Travel Diaries, Film Making and Beyond | Robbar
Robbar
  • ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ১২ অক্টোবর ২০২৬

সিনেমার গল্প বাবা খুঁজতেন পুজোর ছুটিতেই

ছয়ের দশকে লেক টেম্পল রোডের বাড়িতে থাকাকালীন পুজোর ছুটিতে দার্জিলিং যাওয়া হয়েছে বেশ কয়েকবার। পুরী এবং দার্জিলিং দুইই ছিল বাবার খুব প্রিয়। বিশেষত দার্জিলিং ঠান্ডা বলে পুজোর স্পট হিসেবে ছিল আমাদের প্রথম পছন্দ। বড়দিনের ছুটিতে অবিশ্যি পুরী একেবারে মাস্ট আর দু’-একবার গোপালপুরেও যাওয়া হয়েছে। একবার আমরা পুজোর সময় দিল্লিও গিয়েছিলাম, কী অকেশন তা মনে নেই। দিল্লি থেকে আগ্রা, ফতেপুর সিকরি সবই ঘোরা হয়েছিল সেবারে।

ছবি সৌজন্য: রায় সোসাইটি, সন্দীপ রায়ের প্রতিকৃতি: দীপঙ্কর ভৌমিক

শেষ আপডেট: অক্টোবর ১২, ২০২৬, ১৯:৪৪   
Facebook WhatsApp Messenger

বাঙালির কাছে পুজো মানেই একটা নস্টালজিক ব্যাপার। আমার অবিশ্যি পুজো বলতে ঠাকুর দেখা, হইচই, খাওয়াদাওয়া, আড্ডার পাশাপাশি ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর প্রথম দৃশ্যে পটুয়া শশীবাবু আর রুকুর অসমবয়সি গপ্পের কথা অবধারিতভাবেই মনে পড়ে। মা দুগ্গার তেজে অসুরের বুকে ঘ্যাচাং করে বর্শা বিঁধে গিয়েছে, আর গ্যালগ্যাল করে রক্ত! দুর্গাপুজো ঘিরে শিশুমনের এই উত্তেজনা, তার পাশাপাশি বাঙালির মনমর্জির অলিগলি– বাবা অসম্ভব ভালো বুঝতেন! ‘পথের পাঁচালী’ থেকে শুরু করে ওঁর শেষ ছবি ‘আগন্তুক’ অবধি দুর্গাপুজোর অনুষঙ্গ কিন্তু বারবার ফিরে ফিরে এসেছে!

zoom
‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর প্রথম দৃশ্য

আমাদের ছোটবেলায় ‘থিম’ পুজো সেভাবে ছিল না। তখন রাস্তা থেকেই সব ঠাকুর দেখতে পাওয়া যেত। রাত্রিবেলা বন্ধুবান্ধব মিলে গাড়ি করে বেরলে নামতেও হত না, সমস্ত ঠাকুর গাড়িতে বসেই দিব্যি চোখে পড়ত। অন্তত পাঁচের দশকের শেষ থেকে সাতের দশক অবধি এটাই দস্তুর ছিল। এখন কিন্তু প্যান্ডেলের পরিধি বেড়ে যাওয়ায় এটা আর প্র্যাকটিকালি সম্ভব না। যাই হোক, খুব হইহই করে তখন আমাদের মতো ছেলেপুলেরা ঠাকুর দেখত, তবে বাবা বা মা কোনও দিন আমাদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিলেন বলে মনে পড়ে না। আমরা ওই কয়েকজন স্কুলের বন্ধু, অমিত(কুমার), আরও জনাকয়েক মিলে একটা কারওর একটা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম, একদিন হয়তো সাউথটা দেখলাম, একদিন হয়তো নর্থ, এরকম একটা ব্যাপার ছিল। রাস্তায় ভিড় হলেও অতটা যানজট ছিল না, কাজেই অনেকটা এরিয়া কভার করা যেত। বাড়িতে একটু ভালোমন্দ খাওয়াদাওয়া তো হতই। তবে পুজোর আগে বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন মিলিয়ে নানাদিক থেকেই নতুন জামাকাপড় পাওয়া যেত। সেটার জন্য ওই বয়সে নিঃসন্দেহে একটা বাড়তি আকর্ষণ তো ছিলই।

zoom
বালিগঞ্জ কালচারালের প্রতিমা, ১৯৬০। সৌজন্য: সুপ্রতিম চক্রবর্তী

পুজো মানেই আরেকটা বিরাট ব্যাপার ছিল ‘পুজো সংখ্যা’। তখন কত কাগজ, কত পত্রপত্রিকা যে আসত! নতুন পর্যায়ের ‘সন্দেশ’ শুরু হওয়ার (১৯৬১) পর থেকেই বাবাকে দেখতাম, শুটিংয়ের শত ব্যস্ততার মধ্যেও পুজোর আগে সন্দেশের জন্য রোজদিনই সময় বের করে আঁকছেন, লিখছেন, নয়তো সম্পাদনার কাজ করছেন। আর পরের দিকে তো নিয়ম করে ‘দেশ’-এর শারদীয় সংখ্যায় ‘ফেলুদা’ আর ‘আনন্দমেলা’ পূজাবার্ষিকীতে ‘প্রোফেসর শঙ্কু’ বাঁধাধরা কাজ হয়ে গেল। তখন পুজোর আগে বাবা আর কোনও ফুরসত পেতেন না। ওদিকে আমাদের বেজায় এক্সাইটমেন্ট হত এই ভেবে যে, জিনিসটা তৈরি হচ্ছে, এটা ছেপে বেরবে এবং তার আগে আমরাই (প্রথমে মা, পরে আমি) হব প্রথম পাঠক! বাড়তি আগ্রহ ছিল গল্পের ছবি। ফেলুদার জন্য মূলত কালিকলমে অলংকরণ করতেন বাবা, কিন্তু শঙ্কুর জন্য তো রঙিন ইলাস্ট্রেশন! ফলে দেখা বা পড়া সবটা মিলিয়ে অন্য পাঠকদের আগে হয়ে যাওয়ার ফলে একটা থ্রিল থাকত! যদিও শুটিংয়ের ব্যস্ততার দরুন কয়েকবার বাবা ছবি আঁকতে পারেননি এমনও হয়েছে। তখন সমীরদা (সরকার) ছবি এঁকেছেন। সেই ট্রিটমেন্টও ভীষণ ইন্টারেস্টিং! এ বাদে অন্যান্য পুজোসংখ্যার জন্য আগ্রহ তো ছিলই।

zoom
নিজের কাজের ঘরে ছবি আঁকছেন বাবা, আনন্দমেলায় বাবার আঁকা প্রফেসর শঙ্কুর কঙ্গো অভিযানের হেডপিস (১৯৮১)

তখন যেসব ফিল্মের ম্যাগাজিন বেরত– ‘জলসা’, ‘উল্টোরথ’, ‘প্রসাদ’, ‘ঘরোয়া’ ইত্যাদি; পুজোর সময় তারা নিয়ম করে একটা পেল্লায় সংখ্যা বের করত। সে একেবারে থান ইটের মতো সাইজ! আমাদের বাড়িতে বিশেষ করে ওই ‘জলসা’ এবং ‘উল্টোরথ’-টা প্রতিবারই কেনা হত, কারণ তাতে বাবার ফিল্মের এবং শুটিংয়ের নানারকম প্রোমোশন, ফিল্ম-স্টিলস্-সহ টলিউডের অন্যান্য সিনেমার জিনিসপত্রও থাকত। এই ঢাউস পুজোসংখ্যাগুলোয় একটা টেকনিকাল ইস্যু ইনভ্যারিয়াবলি চোখে পড়ত– কভারটা ঠিক থাকছে, কিন্তু ব্যাক কভারটা ছোট! আসলে কতগুলো বিজ্ঞাপন আসবে এবং সেই দরুন পাতার সংখ্যা বেড়ে বইয়ের থিকনেস বা স্পাইনের নির্দিষ্ট মাপ কত হবে, এটা আন্দাজ করতে বোধহয় গোলমাল হত। ফলে ব্যাক কভারটা দেড় দুই ইঞ্চি ছোট আর স্পাইনে লেখাটাও একটু অফ সেন্টার হয়ে যেত! প্রতিবার বই উল্টে ওই ব্যাক কভার দেখে খুব মজা হত মনে আছে। তখন ফুটপাথে অনেক বইয়ের দোকান ছিল যেখানে সব ডাঁই করে পুজোসংখ্যা বিক্রি হত। এখন এইসব ছোট ছোট ডিটেইলস থেকে ‘পুজো আসছে’ ব্যাপারটা কম টের পাওয়া যায়।

zoom
বাবাকে নিয়ে প্রকাশিত ঘরোয়া-র দু’টি বিশেষ সংখ্যা।

পুজোর ছুটিতে মাঝে মাঝে বেরনো হত আমাদের। বিশেষত বাবার যখন কাজের চাপ কম থাকত, বা পুজোর সময় বাবার সঙ্গে সবাই মিলে আউটডোর শুটিংয়ে চলে গিয়েছি এমনও হয়েছে বেশ কয়েকবার। এটা আমি বহু জায়গায় বলেছি যে, বাবা অনেক সময়ই চাইতেন আমরা যাতে থাকি শুটিংয়ে। সে কারণে উনি হিসেব করে ওই গরমের ছুটি বা পুজোর ছুটির সময়ই শুটিংগুলো ফেলতেন। বিশেষ করে আউটডোর শুট। আমার পরিষ্কার মনে আছে যে, ১৯৬১-র পুজো পুরোটাই কেটেছিল দার্জিলিংয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার (১৯৬২) আউটডোরে। ছবির গোড়ার দিকের শুটিংয়ে আমি ছিলাম, কিন্তু পরের দিকে স্কুল খুলে যাওয়ায় আমায় ফিরে আসতে হয় মাঝপথেই। কেভেন্টার্সের উল্টোদিকে ছিল ‘ক্যাপিটাল’ সিনেমাহল। সে হল উঠে গিয়েছে বহুদিন আগেই, কিন্তু স্ট্রাকচারটা এখনও রয়েছে। শুটিং চলাকালীন ওই হল-এ কাঞ্চনজঙ্ঘার রাশেজ (রাশ প্রিন্ট) দেখা হত। এটা একটা খুব মজার ব্যাপার ছিল, বম্বে থেকে রাশেজগুলো প্রসেস হয়ে আসত একটা প্লেনে করে। এখান থেকে ফিল্মটা যেত পার্সেলে, তারপর কলকাতা হয়ে বম্বে (অধুনা মুম্বই) পৌঁছতে ক’দিন সময় লাগত। তারপর ওখান থেকে প্রসেস হয়ে আমাদের এখানে আসতে আসতে সপ্তাহ ঘুরে যেত। যেহেতু দু’-তিন দিন শুট হওয়ার পর একটা লট চলে যেত, ফলে কাজের কোনও অসুবিধে হত না। এই গোটা ব্যাপারটা পুজোর মধ্যে চলেছে বলে আরওই মনে পড়ে। পুরনো চিঠির তাড়া ঘেঁটে দেখেছি যে, সেবার অক্টোবরে শুটিং শুরু হয়েছিল, আর নভেম্বরে দিন চার-পাঁচেকের কাজ বাকি থাকতেই আমি মায়ের সঙ্গে কলকাতায় ফিরে আসি। বাবার লেখা চিঠিগুলোয় শুটিংয়ে ‘এই হল, ওই হল’-র বিবরণ ভরপুর। এই সময় নিউজিল্যান্ডের বিখ্যাত ফোটোগ্রাফার ব্রায়ান ব্রেক দার্জিলিংয়ে বাবার প্রচুর ছবি তুলেছিলেন, আর আমিও বাবার দেওয়া একটা ছোট মুভি ক্যামেরায় ৮ মিলিমিটারে কাঞ্চনজঙ্ঘা-র মেকিংয়ের ভিডিও শুট করেছিলাম। দুঃখের বিষয় সেই ফিল্ম রিলগুলি হারিয়ে গিয়েছে।

zoom
কাঞ্চনজঙ্ঘা-র আউটডোরে বাবা, ছবি: ব্রায়ান ব্রেক

ছয়ের দশকে লেক টেম্পল রোডের বাড়িতে থাকাকালীন পুজোর ছুটিতে দার্জিলিং যাওয়া হয়েছে বেশ কয়েকবার। পুরী এবং দার্জিলিং– দুই-ই ছিল বাবার খুব প্রিয়। বিশেষত দার্জিলিং ঠান্ডা বলে পুজোর স্পট হিসেবে ছিল আমাদের প্রথম পছন্দ। বড়দিনের ছুটিতে অবিশ্যি পুরী একেবারে মাস্ট আর দু’-একবার গোপালপুরেও যাওয়া হয়েছে। একবার আমরা পুজোর সময় দিল্লিও গিয়েছিলাম, কী অকেশন তা মনে নেই। দিল্লি থেকে আগ্রা, ফতেপুর সিকরি সবই ঘোরা হয়েছিল সেবারে।

zoom
বাবার সঙ্গে গুপী গাইন বাঘা বাইনের সেটে (১৯৬৮)

কলকাতায় থাকলে পুজোর দিনগুলোতে একজন অতিথির আগমন আমাদের বাড়িতে একেবারে বাঁধাধরা ছিল, তিনি হলেন বিখ্যাত শিল্পী ও লেখক ময়ূখ চৌধুরী। ওঁর ভালোনাম ছিল প্রসাদ রায়। আমার প্রসাদকাকা। বাবা তো বটেই, আমিও ভীষণ ভক্ত ছিলাম ওঁর কমিকসের। প্রসাদকাকা ভবানীপুরের ইন্দ্র রায় রোডে থাকতেন, সেই এলাকায় মাইক-টাইক ইত্যাদির দাপটে উনি একেবারে পাগল হয়ে যেতেন। শব্দদানবের হাত থেকে নিস্তার পেতে আমাদের বাড়ি চলে আসতেন পুজোর সময়টায়। এটা বিশপ লেফ্রয় রোডে বিশেষ করে, কারণ লেক টেম্পল রোডের দিকে মুদিয়ালি-সহ আরও বেশ কিছু বড় পুজো থাকায় হই-হট্টগোল সেখানেও নেহাত কম ছিল না। তাই আমরা বিশপ লেফ্রয়ে উঠে আসায় প্রসাদকাকা খুব খুশি হয়েছিলেন, কারণ এ পাড়া থেকে ওঁর বাড়ি অনেকটাই কাছে। পুজো মানেই প্রসাদকাকা রোজ চলে আসতেন এবং এসে আমার ঘরে বসে কমিকসের সংগ্রহ উল্টেপাল্টে দেখা, খাওয়াদাওয়া এবং ফাঁকেফোকরে বাবা একটু ফ্রি থাকলে একটু আড্ডা-টাড্ডা হত। আদারওয়াইজ উনি সারাদিন মানে আমার ঘরেই পড়ে থাকতেন। প্রসাদকাকা কোনও দিন কাউকে নিজের ছবি তুলতে দিতেন না, যে কারণে ওঁর কোনও ছবি পাওয়াও যায় না। ওঁর একটি এবং সম্ভবত একমাত্র ছবিটি আমি কোনও এক বছর পুজোর মধ্যেই তুলেছিলাম আমাদের বাড়িতে। কমিকসের পাতা উল্টোতে মগ্ন থাকায় প্রসাদকাকা জানতেও পারেননি যে, আমি ছবি তুলছি। ভাবতে অবাক লাগে ওঁর ছবি বলতে আজ সেদিনের ওই ফ্রেমটুকুই কেবল রয়েছে আমাদের কাছে!

zoom
আমার ক্যামেরায় প্রসাদ কাকা (ময়ূখ চৌধুরী)

পুজোর সময় বাবার রুটিন ছিল দেখার মতো। শুটিং না থাকলে বাবা বাড়িতে বসে পুজোসংখ্যাগুলো থেকে নাওয়া-খাওয়া ভুলে গল্প-উপন্যাস পড়তেন। ওঁর মাথায় সবসময় এইটা চলত যে, কোন গল্প থেকে ভালো ছবি হয়! ফিল্মের জন্য গল্প খুঁজছেন-পড়ছেন, উল্টেপাল্টে দেখছেন, বেশ কিছু গল্প দু’পাতা পড়ে ছেড়ে দিচ্ছেন, কোনওটা ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে পুরোটা পড়ছেন। এমনটা অনবরত হত। তারপরে যেটা সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার, যেসব লেখক অন্যান্য পুজোসংখ্যার পাশাপাশি সন্দেশেও লিখেছেন তাঁদেরকে বাবা সরাসরি ফোন করে জিজ্ঞেস করতেন যে, ‘এবার আপনার কোন লেখাটা পড়ব?’ কোনও কোনও লেখক এমনও বলতেন যে, ‘একটাও পড়বেন না, এবার কোনওটাই জমেনি!’

zoom
ছুটির মেজাজে বাবা

পুজো নিয়ে বাড়তি আতিশয্য না থাকলেও, বাবার লেখা এবং ছবিতে পুজোর প্রসঙ্গ বারবার ফিরে এসেছে। যে কথা গোড়াতেই বলেছি। ‘দেবী’ (১৯৬০) বা ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ (১৯৭৯) ছবির একদম ওপেনিং সিকোয়েন্স থেকেই পুজোর দৃশ্য জড়িয়ে গিয়েছে। সাবেক প্রতিমা এবং চিরাচরিত উদযাপনের মধ্যে একটা জাঁকজমকপূর্ণ ব্যাপার আছে, সেটা ওঁকে খুব টানত। একচালার ঠাকুর সবসময় প্রেফার করতেন। যবে থেকে আলাদা চালচিত্রের চল হল, তখন উনি খুব একটা খুশি হননি। ইনফ্যাক্ট ‘নায়ক’-এ (১৯৬৬) যখন শংকরদার উক্তি, ডাকের সাজ, ড্যাবড্যাবে চোখ না হলে ভক্তি হয় না, এটা আসলে বাবারই মনের কথা। সেই জায়গা থেকেই আমার মনে হয় যে, আজকের সেলিব্রেশনের মধ্যে হয়তো উনি সেভাবে ইনভলভড হতেন না। থিম পুজোর ক্ষেত্রে আমি জানি না ওঁর কী রিয়্যাকশন হত! ওঁর পুজো মূলত বইপত্র পড়েই কাটত, আর পুজোর পর বিজয়া দশমীতে প্রচুর লোকজন ওঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন।

zoom
দাঁ বাড়ির পুজো

এখন পুজোর দিনগুলো অন্যরকম হয়ে গিয়েছে। বিভিন্ন শারদ সম্মান এবং প্রতিযোগিতায় নানা সংস্থার ব্র্যান্ডিং অবধারিত। তেমনই একটি নামকরা প্রতিযোগিতায় আমায় বারদুয়েক বিচারক হয়ে যেতে হয়েছে। বাবার কাছেও পুজো উদ্বোধন ইত্যাদির জন্য বহু অনুরোধ আসত, উনি খুব ভদ্রভাবে এড়িয়ে যেতেন। আমারও এই জাজমেন্ট করাটা এমনিতেই খুব একটা পছন্দের জিনিস নয়, কেউ কোনও বিভাগে দশে দুই পেল, আর কেউ দশে আট; এইগুলো খুবই অদ্ভুত। যাই হোক, কিছু উদ্যোক্তাকে সরাসরি ‘না’ করা যায় না বলে, দু’-তিন বছর আমায় এতে জড়িয়ে পড়তে হয়েছে। গোটা ব্যাপারটাই খাটুনির। প্যান্ডেলে নামতে হবে ফিজিক্যালি, তারপর ভিড়ভাট্টা পেরিয়ে জাজমেন্ট করে ফেরা। টাইমিংও সচারাচর ডিনারের পর বেরিয়ে প্রায় ভোররাত অবধি প্যান্ডেল হপিং। বিষয়টায় আমি খুব একটা আনন্দ পাইনি। তবে একটা কথা বলব, আমি একবার দু’বার অন্যান্য কাজে বেরিয়ে দেখেছি যে, পুজোর সময় ট্রাফিক কন্ট্রোলিংটা খুব ভালো হয়ে যায়, যেটা অন্যসময় তেমন চোখে পড়ে না। পুজোর দিনগুলোয় গত বেশ কয়েক বছর ধরে বাড়িতেই থাকি। সিনেমা দেখি, বইপত্তর পড়ি আর পুজোর যে কোনও একটা দিন উত্তর কলকাতায় নরসিংহ চন্দ্র দাঁ-দের বাড়ির পুজোয় আমরা যাই। ওঁদের খ্যাতি মূলত বন্দুকের ব্যবসায়ী হিসেবে। খুবই বনেদি পরিবার, সেই টিপিক্যাল একচালার ঠাকুর, বাড়িতে করিন্থিয়ান পিলারের পাশাপাশি কাস্ট আয়রনের খিলান ভিজ্যুয়ালি এত ইন্টারেস্টিং যে, খুব ভালো লাগে। সেই ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’-র (১৯৭৭) সময় থেকে ওঁদের দোকানে আমাদের যাতায়াত। যদিও ফিল্মে ব্যবহৃত বাবার পছন্দসই ফ্লিন্ট পিস্তল জোড়া এসেছিল পুলিশ ট্রেনিং স্কুল থেকে; কিন্তু এন সি দাঁ-র দোকানে পরবর্তী সময়ে আমরা বহুবার গিয়েছি, নানারকম সহযোগিতা পেয়েছি, ফলে একরকম আত্মীয়তাই তৈরি হয়ে গিয়েছে।

zoom
‘গুপী বাঘা ফিরে এলো’-র (১৯৯২) বুকলেট

থিম পুজো সেভাবে যাওয়া হয় না দেখতে। তবে সম্প্রতি উত্তর কলকাতায় সুকুমার রায় থিম নিয়ে যে অনবদ্য মণ্ডপসজ্জা হয়েছিল, সেটা দেখতে গিয়েছিলাম। পুজো ঘিরে আরেকটা মজার স্মৃতি অবিশ্যি জড়িয়ে আছে আমার নিজের ফিল্মের শুটিংয়ের সঙ্গে। ‘গুপী বাঘা ফিরে এলো’-র (১৯৯২) ১৬ দিনের ইনডোর শুটের একটা লম্বা পর্ব ছিল একেবারে ১৯৮৯ সালের পুজো পর্যন্ত। ছবির ১২ জন ‘বিক্রম’-ই ছিল আমার স্কুল পাঠভবনের ক্লাস ফাইভ-সিক্সের ছাত্র। নাগাড়ে অতদিন ব্রহ্মানন্দ আচার্যের সম্মোহন এবং গুপী বাঘার জাদু দেখে ষষ্ঠীর দিন প্যাক আপ হতেই ছেলের দলের আবদার, ‘কাকু, আমাদের ঠাকুর দেখতে নিয়ে চলো!’ যেমন কথা, তেমন কাজ। আমি আর বুনি (ললিতা রায়) মিলে ওদের সকলকে নিয়ে একটা বাস ভাড়া করে গোটা উত্তর কলকাতা ঘুরে ঠাকুর দেখে এসেছিলাম! সক্কলে বেজায় খুশি! সেইসব দিনের স্মৃতি এখনও পুজোর সময়টাকে ভারি নস্টালজিক করে তোলে!

Amit Kumar Durga Puja Film Magazines goopy gyne bagha byne Kanchanjungha Mayukh Chowdhury N.C. Daw Pandal hopping Sandip Ray Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Satyajit Ray Satyajit Ray's Film Shatranj Ke Khiladi

Share this article on