Hilsa Fish: Taste, Flavor and Sex Determination। Robbar
Robbar
  • ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
  • রবিবার
  • ৪ অক্টোবর ২০২৬

ছেলে ইলিশ, মেয়ে ইলিশ

প্রবাসে ‘ইলিশ উৎসব’-এ নানা টুকরো আলোচনায় উঠে আসে ছোট ইলিশ বড় ইলিশের স্বাদ। এই যে ‘খোকা ইলিশ’ সেটা কি আসলে বাচ্চা? এমনও হতে পারে, যেহেতু পুরুষ ইলিশ ছোট সাইজের এবং মেয়ে বড় সাইজের হয় তাই এই খোকা হয়তো খোকা নয়, প্রাপ্তবয়স্ক। গভীর সমুদ্রে জলের চাপের মধ্যে সাঁতার কেটে কেটে ওদের হয়তো ওরকম মেদহীন পেটানো চেহারা। মেয়ে মাছগুলো ডিম পাড়তে নদীতে ঢোকে বলেই সেগুলোই বেশি করে ধরা পড়ে আর আমরা পাই ডিমওয়ালা, স্বাদওয়ালা ইলিশ। তারই মধ্যে হঠাৎ একজন বলে উঠল, ও ইলিশের আবার মেয়ে-পুরুষ আলাদা হয় না কি? বুঝুন!

শেষ আপডেট: অক্টোবর ৪, ২০২৬, ১৮:৫৪   
Facebook WhatsApp Messenger

৩৫.

বাদলপক্ষের শেষ, পার্বণপক্ষের সূচনা। পরিবেশ সাজানো গোছানো কিংবা নিজেদের সাজগোজ ছাড়াও বাঙালির আবার যে কোনও সময় মন পড়ে থাকে খাবারের দিকে। এমন মন-ফুরফুরের সময়ে চলুন কোনও একটা খাবার নিয়ে আলোচনা করি। আর সেটা যদি ‘ইলিশ’ চর্চা হয়, তাহলে যে কোনও বাঙালিরই মুহূর্তে জিভ ভিজে উঠবে। ইলিশ, মরশুমি মাছ হলেও বারো মাসে তেরো পার্বণে বাঙালির পাতে তাকে চাই। অদ্ভুতভাবে বারোমাসে তাকে বাজারে পাওয়াও যায় আজকাল।

zoom
বাজারে রুপোলি শস্য– ইলিশ মাছ

ইলিশ নিয়ে সকাল সকাল লিখতে বসে আসলে আমারই এক্ষুনি ভাতের সঙ্গে ইলিশ খাওয়ার একটা প্রবল ইচ্ছে জাগল। সত্যি কথা বলতে কী, লেখা থামিয়ে মুম্বইয়ে যে বাংলা খাবার দাবারের দোকান আছে, সেখানে দু’-তিন জায়গায় খোঁজ করলাম, ইলিশের কেমন দরদাম যাচ্ছে। জোমাটো-তে ‘ওহ! ক্যালকাটা’র মেনুতে দেখলাম ঝোলের এক পিস ইলিশের দাম ৯১৫ টাকা! কাঁটা বেছে, অর্থাৎ বোনলেস ইলিশের ভাপার দাম ১,৪২৫ টাকা। জিভে হঠাৎ যেমন জল এসেছিল তেমনই আবার হঠাৎ-ই সেটা শুকিয়ে গেল। এক টুকরো ঝোলের ইলিশ হাজারখানেক আর হাজার দেড়েক টাকা লাগবে কায়দা করা ওই কাঁটা বাছা ভাপা খেতে!

zoom
ইলিশ ভাপা

ইলিশভক্ত বাঙালির ওই বোনলেস ইলিশে পোষাবে না। ঠিক যেমন কাঁকড়া খেতে গেলে বোনলেস কাঁকড়ার যদি একটা ‘গার্লিক বাটার ক্র্যাব’ অর্ডার করা হয়, তাহলে প্রথমেই সেটা দেখতে আতার পায়েস মনে হয়। তবে হ্যাঁ, ইলিশের আধুনিকীকরণ করতে গিয়ে যেমন, ইলিশ ফিশ ফিঙ্গার, ইলিশ কাটলেট, করমচা দিয়ে ইলিশ, চালতা দিয়ে অসমের ইলিশ, ইলিশ বিরিয়ানি ইত্যাদি পরীক্ষা-নিরীক্ষার এলাকায় এক-আধবার সেগুলোর স্বাদ নেওয়া যেতেই পারে। ‘ওহ! ক্যালকাটা’-র তেমনই একটা ডিশ আমার বেশ মনে ধরেছিল আর ওই রেঁস্তোরায় গিয়ে একাধিকবার সেটা খেয়েছি।

মোটামুটি একজনের মতো পরিষ্কার প্রায়সেদ্ধ সাদা ভাত একটি লাল রঙের পোড়ামাটির হাড়িতে। প্রথমে অর্ধেকটা পরিমাণ ভাত, তারপরে লাউপাতার মধ্যে ইলিশের গায়ে প্রয়োজনীয় মশলা মাখানো, অনেকটা ভাপা ইলিশের মতো করে। অর্থাৎ কাঁচালঙ্কা, সরষের তেল, সরষে বাটা ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে সঙ্গে শুধু তেলের জায়গায় আমতেল। এই সবকিছু লাউপাতার মধ্যে মুড়ে অর্ধেক ভাতের ওপর রেখে পরে আরও অর্ধেক সাদা ভাত দিয়ে ঢেকে মাটির সরা চাপা দিয়ে তার চারপাশে মাখা আটা। দম বিরিয়ানির মতো। এরপরে কিছুক্ষণ সেটাকে দমে রেখে হাড়িসুদ্দ কেতাদূরস্ত রেঁস্তোরার সাজানো টেবিলের মাঝখানে রাখা হয়। ঢাকনা খুলে যখন পরিবেশন করা হয়, তখন ওই খানিকটা ভাত আর লাউপাতায় আমতেল মশলা মাখা পাতুরি মার্কা ইলিশের অংশটার অদ্ভুত একটা দৃশ্য ঘটে। লাউপাতার গা ফেটে মশলা এবং আমতেলের কিছুটা অংশ সাদা ভাতের গায়ে লেগে একটা অগোছালো তেল-হলুদের রং ধরে। তাই দেখেই খাওয়ার ইচ্ছেটা দশগুণ বেড়ে যায়। সুসিদ্ধ লাউপাতা, মশলা ইলিশ মিলিয়ে ভাতের সঙ্গে মেখে খাওয়ার যে স্বাদ, পয়সা উশুল!

zoom
আমতেল ইলিশ

একটা গোটা ইলিশের দামটা যদি মোটামুটি সহ্য করা যায়, তাহলে বাড়িতে রান্না ইলিশের ব্যাপারটাই আলাদা। কারণ ইলিশ নিজেই তার রূপ, রস, গন্ধ আর শরীরের স্নেহের ভাগে একাই একশো। ইলিশ তার নিজের রান্নার ব্যবস্থা যেন নিজেই করে। সে একেবারেই গরিব বাড়িতেই হোক বা রাজার বাড়িতেই হোক– ইলিশের সঙ্গে কোনও পাঁয়তারা চলবে না। সমুদ্রে বা নদীতে যারা মাছ ধরতে যায়, তাদের নৌকোতে থাকে ছোট্ট একটি শিল ও নোড়া। সেখানে ইলিশের তেলেই ইলিশের রান্না। একটু গোটা জিরে বা কালোজিরে, একটু হলুদ, গুটিকয়েক কাঁচা লঙ্কা। আর একটু বেগুনের টুকরো কিংবা আলু অথবা এক টুকরো কুমড়ো। এসব থাকলেও হয়, না থাকলেও হয়। বলতে গেলে মশলাবাটার শিল-ধোয়া জল দিয়েই রান্না হয়ে যায়।

কখনও ইলিশ কাঁচা, কখনও আধভাজা। লক্ষ করবেন বিয়েবাড়িতে বা নেমন্তন্ন বাড়িতে যে ইলিশ পরিবেশন করা হয়, সেটাও কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খুব সাদাসিধে হয়। ইলিশ মাছ বেশি পরিমাণে রান্না করার সময় নাড়াচাড়াতে ভেঙে যায় বলে মাছটাকে একটু ভেজে হালকা শক্ত করে নিয়ে ট্রে-তে সাবধানে পাশাপাশি সাজিয়ে রাখা হয়। আর ওই কমন একটা প্রচুর পরিমাণে সরষে বাটা আর কাঁচালঙ্কা দেওয়া যে ঝোল, সেটা গরম গরম ভাজা মাছের ওপরে ঢেলে দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ঢেকে রেখে দিলেই হয়ে গেল। বাড়িতে অল্প পরিমাণে রান্না করার সময় কিন্তু উল্টো নিয়ম। অর্থাৎ ওই কাঁচা লঙ্কা, সর্ষের তেল, সরষে বাটা ইত্যাদির ঝোলটা ফুটলে তার মধ্যেই কাঁচা মাছ কিংবা ভাজা মাছটাকে দিয়ে দেওয়া হয়। এই মাছের ওপরে ঝোল কিংবা ঝোলের ওপর মাছ, জিভের যদি জ্ঞান থাকে তাহলে দুটোর স্বাদ আলাদা।

zoom
বেগুন দিয়ে ইলিশ মাছের ঝোল

এ তো গেল ইলিশের গল্প বলে একটা আবহ তৈরি। এখন অল্প বিজ্ঞান ছুঁয়ে যাই। প্রবাসে ‘ইলিশ উৎসব’ করার সুবাদে একটা খাওয়ার পাতে আড্ডা। নানা টুকরো আলোচনায় সেখানে উঠে আসে ছোট ইলিশ বড় ইলিশের স্বাদ। এই যে ‘খোকা ইলিশ’ সেটা কি আসলে বাচ্চা? এমনও হতে পারে, যেহেতু পুরুষ ইলিশ ছোট সাইজের এবং মেয়ে বড় সাইজের হয়, তাই এই ‘খোকা’ হয়তো খোকা নয়, প্রাপ্তবয়স্ক। গভীর সমুদ্রে জলের চাপের মধ্যে সাঁতার কেটে কেটে ওদের হয়তো ওরকম মেদহীন পেটানো চেহারা। মেয়ে মাছগুলো ডিম পাড়তে নদীতে ঢোকে বলেই সেগুলোই বেশি করে ধরা পড়ে আর আমরা পাই ডিমওয়ালা, স্বাদওয়ালা ইলিশ। তারই মধ্যে হঠাৎ একজন বলে উঠল, ও ইলিশের আবার মেয়ে-পুরুষ আলাদা হয় না কি? বুঝুন! আপনি কী বলবেন? শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী এবং বেশ বয়স্ক মানুষের কাছে এই কথা শুনলে আপনার কী মনে হতে পারে? তবে আমরা কেউ হো হো করে হাসতেও পারিনি বন্ধুর মুখ চেয়ে।

এখন প্রশ্ন হল, ইলিশ নিজে কী খায়? মূলত প্ল্যাঙ্কটন খেয়ে বেঁচে থাকে। তাই অন্যান্য মাছের মতো এদেরকে সারাক্ষণ চলতে হয়, সাঁতার কেটে খাদ্য সংগ্রহের ঝক্কি ঝামেলা অনেক। এমনকী যখন অন্যান্য মাছ যখন ঘুময় বা বিশ্রাম নেয়, তখনও ইলিশদের সাঁতার কাটতে হয়। কারণ, বেশিরভাগ মাছের মতো তাদের বায়ুথলি বা পটকা নেই। এর আগে আমার জানা ছিল হাঙরেরও পটকা নেই, তাই ভেসে থাকতে সব সময় তাদের সাঁতার কাটতে হয়। ঘুমনোর সময় নেই, জলের তলায় তলিয়ে যাবে। শুনেছি, জল থেকে বের করে আনলেই তারা না কি মারা যায়। আগে এটা গল্প ছিল, কিন্তু এখন প্রতিটি মাছ-ধরা নৌকার সঙ্গে সঙ্গে কোনও কিশোর বা যুবক তার মোবাইল ফোন নিয়ে যায়, ইলিশ ধরার ছবি তুলতে, ভিডিও করতে। দেখেছি সেটা সত্যি। এটা দুটো কারণে ঘটে। প্রথমত, ওরা আলো এবং তাপমাত্রার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল, তাই জল থেকে বের করে আনলে সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। দ্বিতীয় কারণটি হতে পারে যে, বেশিরভাগ মাছের মতো তাদের বায়ুথলি বা পটকা নেই, যা মাছকে ভাসতে এবং অক্সিজেন ধরে রাখতে সাহায্য করে। ইলিশ তাই সহজেই অক্সিজেনের অভাবে ভোগে।

zoom
জালবন্দি ইলিশ, মৎস্যজীবীদের নৌকায়

এখন ইলিশ সম্পর্কে জানা-অজানা কিছু তথ্যের কথা শুনি। তথ্যগুলো জানা থাকলেও এখানে বলা প্রয়োজন যে, এর সংস্কার ঘটেছে অতি সম্প্রতি। অর্থাৎ, তথ্যের আধুনিকীকরণ। সে-কথায় আসছি।

আমরা জানি, বিশ্বের বৃহত্তম ইলিশ সরবরাহকারী দেশ হল বাংলাদেশ। যারা এই মাছের উৎপাদনের ৭৬ শতাংশ সরবরাহ করে। এর পরেই রয়েছে মায়ানমার (১৫ শতাংশ) এবং ভারত (৪ শতাংশ)। সম্প্রতি, ২০২১ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৫ লক্ষ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদন করে, যা সে বছরের মোট আহরণের ৯৭.০১ শতাংশ। মনে রাখতে হবে, বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইলিশ শিল্পের উপর নির্ভরশীল। এই মাছের বাণিজ্যিক আহরণ থেকে বাংলাদেশ ২০২৪ সালে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয় করে।

বিশ্বের ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ মায়ানমারে উৎপাদিত হয়। মায়ানমারের ইরাবতী নদীর মোহনা এবং বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে এই ইলিশ প্রচুর পরিমাণে ধরা পড়ে। পশ্চিমবঙ্গ ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পদ্মার ইলিশের সংকট বা সরবরাহ কম থাকলে মায়ানমারের ইলিশ, যা বাজারে সাধারণত ‘বর্মি ইলিশ’ নামে পরিচিত, একটি বড় বিকল্প হয়ে ওঠে। তিনি আমাদের অসময়ের অতিথি। শীতশেষের মেছোবাজারে মিলতে পারে বর্ষার ভরা মরশুমের ছোঁয়া। বাজারে এই বর্মি-ইলিশ অবশ্য ‘বাংলাদেশের ইলিশ’ বলেই বিকোয়। আমদানিকারীদের হিসেব, দু’-এক দিন অন্তর উড়ানে একসঙ্গে দু’-আড়াই টন করে কাঁচা ইলিশ কলকাতার বাজারে ঢোকে। ওদের ইলিশের সব থেকে বড় ক্রেতা কলকাতাই।

zoom
পদ্মার ইলিশ, সঙ্গে বেগুনভাজা, বাংলাদেশের মাওয়াঘাটে

এবার আসি প্রকৃতির পরিহাসে। একবার গুয়াহাটি-শিলং রোডের কাজিরাঙার কাছাকাছি একটা জায়গায় রাস্তার পাশে জঙ্গলে বিশাল বিশাল গাছে অসংখ্য বড় বড় মৌচাক দেখেছিলাম। পরবর্তীকালে আর একবার ওই রাস্তায় যেতে গিয়ে অবাক হয়েছিলাম, গাছে গাছে সেই মৌচাকগুলো আছে কিন্তু একটিতেও মৌমাছি নেই। প্রকৃতিতে সাধারণত জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যাভাব, পরিবেশ দূষণ ইত্যাদির জন্য পরিযায়ী প্রাণীদের মাইগ্রেশন, মানে স্থানান্তর ঘটে। পরিযায়ী পাখিদের কথা কিংবা আফ্রিকার জন্তু-জানোয়ারের গ্রেট মাইগ্রেশনের গল্প আমাদের জানা। জলজ প্রাণীদের মধ্যে বিশাল সাইজের তিমিরাও দলে দলে স্থানান্তরিত হয়। ইলিশও পরিযায়ী প্রাণী।

……………………

zoom

……………………

এখনকার সবচেয়ে বড় খবর হল, গুজরাতের নর্মদায় ইলিশের বিপুল ফলন ভারতের মৎস্য মানচিত্র বদলে দিচ্ছে। খাদ্যাভাব নয়, প্রজনন-ক্ষেত্র সরে আসছে বাংলা থেকে। বর্ষাকালের স্রোতধারার পরিবর্তন এবং মোহনা অঞ্চলের অনুকূল পরিবেশের কারণে গুজরাতে গত চার বছর ধরে ইলিশের ফলন ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রচলিত বাণিজ্য ধারায় পরিবর্তন এসেছে এবং উৎসবের মরশুমের আগে পশ্চিমবঙ্গের বাজারের চাহিদা পূরণেও এর দারুণ ভূমিকা।

পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী ইলিশ, যা দীর্ঘকাল ধরে গঙ্গা-হুগলি ও পদ্মা নদীর অববাহিকার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত ছিল তা এখন গুজরাটের জলরাশিতে এক অপ্রত্যাশিত ও নতুন আস্তানা খুঁজে পেয়েছে। ২০২৫-’২৬ সালে এই পশ্চিমি রাজ্যে ইলিশের অভাবনীয় উৎপাদন বেড়েছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। মূলত নর্মদা নদীতে অভ্যন্তরীণ জলসীমায় ইলিশের এই নাটকীয় বৃদ্ধিই এর প্রধান কারণ। বর্ষাকালের গতিপ্রকৃতি ও মোহনার পরিবেশগত পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত এই পরিবর্তনটি কেবল স্থানীয় ২৫,০০০-এরও বেশি মৎস্যজীবীর জীবিকাই উন্নত করেনি, বরং ভারত-বাংলাদেশ ইলিশ বাণিজ্যের চিরাচরিত ধারাকেও উল্টে দিয়েছে। ভারতই এবার গুজরাতের নর্মদার ইলিশ পাঠাতে শুরু করল বাংলাদেশে। ২০২৬ সালে মাত্র দু’মাসে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন ডিমভরা গুজরাতি ইলিশ রপ্তানি হয়েছে।

zoom
বাংলাদেশে নর্মদার ইলিশ পাঠাচ্ছে ভারত

গুজরাতের ইলিশের এই ঘটনাটি থেকে একটি বার্তা স্পষ্ট, খাদ্যের ঐতিহ্যবাহী ভৌগোলিক বিন্যাস আর আগের মতো নেই। দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে জলবায়ুর পরিবর্তন নদীব্যবস্থাকে নতুন রূপ দিচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে যেকোনও ধরনের ধাক্কা যেন কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত সাফল্যকে মুছে ফেলতে না পারে, তার জন্য সতর্ক হওয়ার সময় হয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাম্প্রতিক কিছু প্রাকৃতিক ঘটনা তা আরও স্পষ্ট করল।

শ্রীলঙ্কা, অর্থনৈতিক বিষয়ে মূল লক্ষ্য স্থির করেছে– প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা ও অভিঘাত-সহনশীলতা গড়ে তোলা। ওখানকার বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়িক নেতারা এমন সব কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যা অভিঘাত-সহনশীলতা নিশ্চিত করবে। টানা মেঘলা আকাশ ও ভারী বৃষ্টির কারণে আগস্ট মাসে শ্রীলঙ্কার উচ্চভূমির চায়ের উৎপাদন ৩৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।

অন্যদিকে, হিমালয়ের হিমবাহগুলো দ্রুত সংকুচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এদের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা অদৃশ্য জৈব উপাদানগুলো আঞ্চলিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এক বড় পরীক্ষার বিষয় হয়ে উঠছে। হিমালয়ে বরফের ধস বা তুষার-ধসের বিপর্যয় দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃসীমান্ত জলবায়ু বিষয়ে জরুরি প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ৪০ বছরের কম বয়সি তরুণ প্যানেলিস্ট এবং প্রবীণ ব্যক্তিত্বরা একসঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন।

zoom
হিমালয়ে-অধ্যুষিত অঞ্চলে ধসে বিপর্যস্ত জনজীবন

২০১৭ সালের সেই গণ-অভিবাসন বা পলায়নের প্রায় এক দশক পরেও, রোহিঙ্গা সংকট বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ও দীর্ঘস্থায়ী সংকট হিসেবে রয়ে গিয়েছে বাংলাদেশে। বন্যার পরবর্তী পুনর্গঠন কাজের জন্য ভারতের সহায়তা চাইছেন নেপালের অর্থমন্ত্রী। দুর্যোগ-পরবর্তী প্রয়োজনীয়তার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। দেশটির এখন মূল মনোযোগ, নিরূপণ পর্যায় থেকে সরে এসে সুনির্দিষ্ট অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন।

মানবিক জরুরি অবস্থা এবং নানা সতর্কবার্তা থেকে মনটাকে সরিয়ে আনার জন্য চলুন আমরা বরং আর একবার ইলিশ প্রসঙ্গে যাই।

zoom
মৎস্য মারিব খাইব সুখে। কালীঘাট পটচিত্র

পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, ইলিশ মাছের জীবনচক্রে একটি বিস্ময়কর বিষয় হল– লিঙ্গ পরিবর্তন। জলের তাপমাত্রার পরিমাণ, লবণাক্ততার পরিমাণ, খাদ্যের পরিমাণ, ইত্যাদি পরিবেশগত বিশেষ কারণে ইলিশ মাছের লিঙ্গ পরিবর্তন ঘটে। অর্থাৎ, ইলিশ পুরুষ হয়ে জন্ম নিয়েও এই প্রক্রিয়ায় স্ত্রী হয়ে ডিম দিতে পারে!

শুরুতে বলা, মুম্বইয়ে আমাদের পাড়ার ইলিশ উৎসব মনে পড়ছে। আর মনে পড়ছে খাওয়ার টেবিলে সেই কৌতূহলী বন্ধুর প্রশ্নটি: ইলিশের আবার মেয়ে-পুরুষ আলাদা হয় না কি?

…………………..

পড়ুন অল্পবিজ্ঞান-এর অন্যান্য লেখা

…………………..

hilsa Hilsa Biology Hilsa Fish Varieties Hilsa Flavor Hilsa Food Culture Male and Female Hilsa Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar sex determination

Share this article on