

কোন ছোটবেলায় ছড়া বড়বেলায় দুরন্ত গরমে ফিরে ফিরে আসে। তীব্র গরমে রাজা ইটের পাঁজার উপরে বসে ‘ঠোঙা ভরা বাদাম ভাজা/ খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না’-র দৃশ্যকল্প আমাদের ছেড়ে যায় না। বৃষ্টি না এলে কিচ্ছু মিলবে না, তবু সেই অসহায় অবস্থাতেও রাজার সঙ্গী হয়ে থাকে বাদাম। ঠিক যেমন বেকার যুবকের ট্যাঁক খালি থাকে। তাকেও সঙ্গ দেয় সেই বাদামই। অর্থাৎ রাজা থেকে বেকার, বাদাম সকলেরই। খোসা ছাড়ালেই চুকচুকে চেহারার এই খাদ্যবস্তুটি আমাদের সাহিত্যেও কীভাবে ছায়া ফেলেছে এই প্রসঙ্গ এই বইয়ে না এলে যেন বইটি সম্পূর্ণ হত না।
একটা ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকে লেখাটা শুরু করা যাক। প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে ঘুরতে বেরিয়েছি। তখন পকেটের অবস্থা ভালো নয়, সময় কিন্তু অঢেল। স্রেফ লোকাল ট্রেনে দূর থেকে দূরে চলে যাওয়া। ঘুরে বেড়ানো। আবার ফেরা। সেই কম বাজেটের সফরের এক অনন্য সঙ্গী ছিল বাদাম। ট্রেনে বসে বাদামের প্যাকেটে বাইরের সবুজ মিশিয়ে নিতাম আড্ডার আবহে। সেই বাদাম, প্রিয় বাদাম আজও আমার, আমাদের ‘হামসফর’। কাজের জটিলতায় বা প্রিয় বইয়ের পাশে যাকে দিব্যি মানিয়ে যায়। কিন্তু সবসময়ের চেনা সঙ্গীকে নিয়ে কে আর আলাদা করে ভাবে! ভাগ্যিস, মহীন গুপ্ত ভেবেছিলেন। তাই এমন একটা বই নির্মাণ সম্ভব হয়েছে। ‘বাদাম: স্বাদ। সাহিত্য। সংস্কৃতি’ এক চমৎকার গ্রন্থ। আড়াইশো পাতারও বেশি আয়তনের এই ঝকঝকে বইটি হাতে তুলে নিলে মন ভালো হয়ে যায়। কেননা বাদাম আমাদের প্রত্যেকেরই বড় আপনজন।

শুরুতেই তুলে দিই এই বইয়ের পিছনের মলাটের ব্লার্বের একটি অংশ। পাঠক সহজেই বুঝতে পারবেন বাদামকে সঙ্গে নিয়ে কতদূর পৌঁছে গিয়েছেন লেখক– ‘একটি ছোট্ট দানার খোলস ভাঙতেই উন্মোচিত হয় মহাদেশ পেরিয়ে আসা সভ্যতার পদচিহ্ন, উপনিবেশের দীর্ঘশ্বাস, শ্রমজীবী মানুষের ঘাম, প্রেমের নীরব ভাষা, চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিস্ময় এবং মানুষের অনন্ত অভিযাত্রার কাহিনি।’ সেই হিসেবে এই বইটি আমাদের কাছে এক অন্যতর ভ্রমণও করায়। শুরুতে যেমনটা বলছিলাম, সেরকমটা নয়। এক অন্যতর ভ্রমণ। বলা চলে ‘বিশ্বভ্রমণ’। বাদামের রকমফের ধরে ধরে তৈরি হয়েছে একেকটি অধ্যায়। চিনাবাদাম, কাজুবাদাম, আখরোট, পেস্তাবাদাম ইত্যাদি। সেই সঙ্গেই সাহিত্য ও ভিন্ন সংস্কৃতিতে বাদাম কিংবা স্রেফ বাদামের ফেরিওয়ালাদের নিয়েও পৃথক পৃথক অধ্যায়। গোটা বইটাই লেখা হয়েছে এক চমৎকার পরিকল্পনা থেকে। শেষোক্ত অধ্যায়ে অবধারিত ভাবেই উঠে এসেছেন ভুবন বাদ্যকর। বছর পাঁচেক আগের সেই ‘কাঁচা বাদাম’– কে না শুনেছে! তিনি ভাইরাল হয়েছিলেন। খ্যাতির বিড়ম্বনাও সয়েছেন। কিন্তু এই গল্প তো আমাদের জানা। কিন্তু শান্তিপুরের ফুলিয়া স্টেশনের পূরবী নাম্নী সেই বৃদ্ধা? ভোররাতে যাঁর বাদাম ভাজার গন্ধে আকুল হয়ে ওঠে পাড়া। এরপর তিনি পৌঁছে যান স্টেশনে। সেখানেই দিনভোর চলে বাদামের বিকিকিনি। স্টেশনের চা-ওয়ালা বলেন, ‘এই স্টেশনের প্রাণ উনিই।’ পড়তে পড়তে ইচ্ছে করে একদিন সময় করে ফুলিয়া ঘুরে আসি। ওই বৃদ্ধার সঙ্গে গল্প করি। তাঁর থেকে বাদাম কিনি। যার স্বাদের গভীরে লুকিয়ে মমত্বের প্রগাঢ় জলছাপ।

এই বই বিখ্যাত ভুবন থেকে অখ্যাত পূরবীকে ছুঁয়ে আরও দূরে নিয়ে যায় আমাদের, ‘সম্প্রতি ইজরায়েলে একটি প্রত্নতাত্ত্বিক খননে প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, প্রায় ৭ লক্ষ ৮০ হাজার বছর আগে মানুষের খাদ্যের একটি বড়ো অংশ ছিল বাদাম। সেখানে সাতরকম প্রজাতির বাদামের সঙ্গে বাদাম ভাঙার জন্য ব্যবহৃত পাথরের সরঞ্জামও পাওয়া গেছে, যা একটি জলাভূমির গভীরে চাপা ছিল।’ কিংবা ১৭ হাজার বছর আগে গুহাচারী মানুষের সময়েকার এক দেওয়াল… ফ্রান্সের সেই গুহার দেওয়ালে আখরোটের প্রথম চিহ্ন আজও রয়ে গিয়েছে। ভাবা যায়? আবার ইতিহাস থেকে আমরা পৌঁছে যাই মহাকাব্যের জগতে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ চলছে। উদুপির রাজা শ্রীকৃষ্ণকে ক্ষীর পরিবেশন করছেন। আর সেই ক্ষীরের মধ্যে থাকা বাদামের কতগুলি তিনি খাচ্ছেন, সেই সংখ্যা দেখে বুঝে নিচ্ছেন সেদিনের যুদ্ধে কত হাজারের মৃত্যু হবে! আসলে তিনি, শ্রীকৃষ্ণ আগেই অর্জুনকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, যুদ্ধের ভবিতব্য তিনি আগেই ঠিক করে রেখেছেন। সেকথাই মনে পড়ে যায় এই বাদামের অংশে।

কাজুবাদাম ইউরোপের মাটি থেকে ‘দক্ষিণ আমেরিকার তপ্ত সূর্যালোকে’ কীভাবে ঘর খুঁজে পেল সেকথাও আমাদের শোনান লেখক। জানতে পারি একসময় দেমাকি মার্কিন বড়লোকরা চিনাবাদামকে ‘ক্রীতদাসের খাবার’ মনে করত। সার্কাস, শ্রমজীবী মানুষের বিনোদনের সঙ্গে একে যুতে দেওয়া হয়েছিল। এ-ও জানা যায় শ্রমজীবী মানুষেরও আগে একে ভাবা হত শূকরের খাদ্য। যে চিনাবাদামের ঠোঙায় বাঙালির কত প্রেম, আড্ডা, মানভঞ্জন লেখা আছে তাকে সেখানে পৌঁছনোর আগে কতটা পথ পেরিয়ে আসতে হয়েছিল ভাবলে অবাক লাগে। আবার বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে বাদামের সম্পর্কের কথাও আমাদের শোনান লেখক– ‘প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যখন বন্দুক গর্জে ওঠে, চিনাবাদাম নীরবে পৌঁছে যায় সৈন্যদের ঝোলায়। সে ছিল ভরসা, সে ছিল খাদ্য। যুদ্ধ-পরবর্তী বিস্ফোরণের সময়, চিনাবাদাম যেন হয়ে ওঠে প্রতিটি বাড়ির খিদের সঙ্গী। রাস্তায় ঠেলাগাড়িতে, সার্কাসের ডাকে, বেসবলের মাঠে- চারদিকে শুধু বাদামের কচকচে আওয়াজ।’ এভাবেই এসে পড়ে বাদামের নানা প্রকারভেদ, তাদের উৎপত্তি, ইতিহাস, তাদের ঘিরে থাকা অর্থনীতি– কত কী!

চেনা বাদামের চৌহদ্দি পেরিয়ে ম্যাকাডামি বাদাম কিংবা কোলা বাদামের গল্পও এনে হাজির করেছে শ্রীগুপ্ত। ৪০ হাজার বছর বছর আগের কথা। ম্যাকাডামি বাদামের গল্প শুরু সেই সময় থেকে। ‘এই বাদামের খোঁজ ছিল মূলত নারীদের হাতে। অস্ট্রেলীয় আদিবাসী নারী যার এক হাতে ছিল সন্তান, আর অন্য হাতে পাথরের হাতুড়ি, চোখে ছিল বাদামের খোঁজ। তারা গাছের নীচে আগুন জ্বালাত– না, ধ্বংসের জন্য নয়, বরং খোলা পথের আহ্বানে। আগুনে পুড়ে যেত নিচু জাতের গাছপালা, সহজ হত বাদাম সংগ্রহ। বাদামের সবুজ খোল খুলে, তারা পাথরের গর্তে রাখত তাকে, তার উপর সমতল পাথর বসিয়ে আর-এক পাথর দিয়ে আঘাত করত। সজোরে শব্দ হত আর জন্ম নিত ভাঙা বাদাম।’ পড়তে পড়তে দৃশ্যগুলি জন্ম নেয় মনের অন্দরে। ক্রমে তা এসে পড়ে ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারীদের হাতে। জন ম্যাকাডামের নামে সেই বাদামের নামকরণও হয়ে যায়। লেখকের তীর্যক টিপ্পনী– ‘যদিও এই জন ম্যাকাডাম নিজে হয়তো এই বাদামের স্বাদ নেননি…’ আবার পশ্চিম আফ্রিকার গহীন অরণ্যে জন্ম নেওয়া কোলা বাদাম চমকে দিয়েছিল পর্তুগিজ পর্যটকদের। স্থানীয় মানুষের কাছে এই বাদাম যে স্রেফ খাদ্য নয়, তা যেন ‘আত্মিক জলপান’! আমরা এরপর খুলে বসি লোককথার ঝুলি। দেখি লেখক সেখানে সাজিয়ে রেখেছেন এক নিবিড় আখ্যান। সে এক অলীক সময়, যখন একই আকাশের নিচে বসবাস করে মানুষ ও আত্মারা! এই পরিসরে সেই গল্পটি শোনাচ্ছি না। বরং এমন চমৎকার এক গল্প তোলা রইল পাঠকের জন্য। কীভাবে কোলা বাদাম ধারণ করে রেখেছে পূর্বপুরুষের স্মৃতি, আত্মার ছোঁয়া… হয়ে উঠেছে এক পবিত্র বন্ধন, তা ভাবতে ভাবতে মনে হতেই পারে আমাদের চেনা বাদাম যে এতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত করে রেখেছে নিজেকে, কে জানত!

অবশ্য সেই বিস্তার কিন্তু আরও অনেক দূর পর্যন্ত। ১৯৬৪ সালের ২৮ জুলাই বিজ্ঞানী ডিক ওয়ালেস তাঁর সহকর্মীদের টেনশন কমাতে বাদামের বাটি হাজির হয়েছিল। আসলে সেদিন চাঁদের উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছিল নাসার মহাকাশযান। প্রথম ছ’বার তার উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হয়েছিল। সপ্তম বার সে পাড়ি দিতে সক্ষম হয়। নাসা সেই প্রথম চাঁদে স্বয়ংক্রিয় যান পাঠাল। যে সাফল্য পরবর্তী সময়ে অ্যাপলো মিশনকে পথ দেখিয়েছিল। সেই থেকে নাসার বিজ্ঞানীদের কাছে বাদাম হয়ে ওঠে ‘লাকি’। সৌভাগ্য বয়ে এনে নাসার এক অন্যতর ‘জ্বালানি’ হয়ে উঠেছিল ‘লাকি পিনাটস’।

এতদূর চলে এসেও ফিরে যেতে হবে নিজের নিভৃত অবসরে। কোন ছোটবেলায় ছড়া বড়বেলায় দুরন্ত গরমে ফিরে ফিরে আসে। তীব্র গরমে রাজা ইটের পাঁজার উপরে বসে ‘ঠোঙা ভরা বাদাম ভাজা/ খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না’-র দৃশ্যকল্প আমাদের ছেড়ে যায় না। বৃষ্টি না এলে কিচ্ছু মিলবে না, তবু সেই অসহায় অবস্থাতেও রাজার সঙ্গী হয়ে থাকে বাদাম। ঠিক যেমন বেকার যুবকের ট্যাঁক খালি থাকে। তাকেও সঙ্গ দেয় সেই বাদামই। অর্থাৎ রাজা থেকে বেকার, বাদাম সকলেরই। খোসা ছাড়ালেই চুকচুকে চেহারার এই খাদ্যবস্তুটি আমাদের সাহিত্যেও কীভাবে ছায়া ফেলেছে এই প্রসঙ্গ এই বইয়ে না এলে যেন বইটি সম্পূর্ণ হত না। বাদাম চাকতি থেকে বাদামের প্যান্ডেল– সর্বত্র সচেতন ঘড়ির সতর্ক কাঁটার মতো সরে সরে গিয়েছে লেখকের কলম। আর চিত্রবিচিত্র আঙ্গিকে বাদাম আমাদের চোখের সামনে ভেসে ভেসে বেড়াতে থাকে। এই বই শেষাবধি স্বাদু… পড়তে পড়তে নাকে এসে ঠেকে শুকনো খোলায় ভাজা বাদামের খোশবাই… চমৎকার মলাট, ঝকঝকে ছাপা ইত্যাদি সহযোগে বাদামের মতোই আপনার সঙ্গী হতে পারে এই বই। তবে বইয়ের ভিতরের সাদা-কালো ছবিগুলি (এছাড়া উপায়ই বা কী, রঙিন ছবি দিতে গেলে দাম হাতের বাইরে চলে যাবে একলাফে) কোনও কোনওটি আরও খানিক সম্পাদনা প্রয়োজন ছিল। এটুকু ছাড়া এই বইয়ে আক্ষেপের জায়গা বিশেষ নেই। ঠিক যেন একঠোঙা বাদামের মতোই তা স্রেফ মনোরঞ্জনই করে না, ভাবায়, আনমনাও করে দেয়।
বাদাম: স্বাদ। সাহিত্য। সংস্কৃতি
মহীন গুপ্ত
বইদেশিক
৪৫০্
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved