availability of paid leaves & the practical scenario in india | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তারে ধরি ধরি মনে করি

নিজের ছুটি নেওয়ার দৌড়ে প্রতিবেশী দেশগুলির থেকে এত পিছিয়ে আছি কেন আমরা? বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ছুটি নেওয়ার ইচ্ছেয় প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ভয়, আত্মগ্লানি এবং কিছু মিস করে যাওয়ার আশঙ্কা দিয়ে তৈরি হওয়া এক মিশেল। কর্মব্যাকুলতার যুক্তি এক্ষেত্রে ধোপে টেকে না। বদলে যাওয়া এইচআর-এর ব্যাকরণ বই এখন হার্ড ওয়ার্কের থেকে স্মার্ট ওয়ার্কের উপরে জোর দেয়, অন্তত কাগজে-কলমে। তুমুল প্রতিযোগিতার বাজারে মনের মধ্যে যে প্রশ্নের উদয় হয় তা হল– টানা সাত দিন অফিসে না এলে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ব না তো?

শেষ আপডেট: জুন ৮, ২০২৬, ১৫:৩০   
Facebook WhatsApp Messenger

বেশি আগের কথা নয়। মার্চ মাসের ৩১ তারিখ। আমার পাশে বসা সহকর্মী হঠাৎ ফুঁপিয়ে কাঁদতে আরম্ভ করলেন। ইতস্তত দুঃখ যতনে টেনে নিচ্ছিল ওয়েট টিস্যু পেপার। গোপন সে কান্না। দিনে দশ ঘণ্টার সঙ্গী মানুষটির মনখারাপ আমাকেও বিষণ্ণ করেছিল। প্রবল কাজ করে বিপুল সুনাম কুড়িয়েছেন তিনি এ বছর। কর্পোরেটের জমানায় বছর মানে তো ফিনান্সিয়াল ইয়ার। আর্থিক বছর। এপ্রিল থেকে মার্চ। অফিস জুড়ে সবাই জানে, তাঁর প্রমোশন পাওয়া আর মাত্র কয়েকদিনের অপেক্ষা। কানাঘুষোয় শোনা গিয়েছে, স্টার পারফর্মার অফ দ্য ইয়ারের মেমেন্টো-সার্টিফিকেট-মোটা গিফট ভাউচারও তাঁর পকেটে ঢুকল বলে। এমন আনন্দ সংবাদে প্রাণে খুশির তুফান ওঠার কথা যে মানুষটির, তিনি কাঁদছেন কেন? কোম্পানির এইচআর পোর্টালটি খুলছেন। দেখছেন। চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে কয়েক ফোঁটা জল। পোর্টালের উইন্ডোটি মিনিমাইজ করছেন। নিজেকে সামলাচ্ছেন। ফের খুলছেন সেই উইন্ডো। নেমে আসছে অশ্রুধারার পরবর্তী কিস্তি। ঘামছেন।

–কোনও সমস্যা হয়েছে অবিনাশ? বাড়িতে সব ঠিক আছে তো?

–তারে ধরি ধরি মনে করি..।

–বুঝলাম না ঠিক। কিছু চুরি-টুরি হল না কি? 

–ধরতে গেলেম আর পেলেম না।

–থানায় জানিয়েছ? কী চুরি হল? লুকিও না আমার কাছে। বলো প্লিজ।

–হয়নি এখনও, তবে চুরি হবে কাল। প্রাণ ভরে দেখি নিই জমানো জঞ্জাল।

–মানে?

–জমিয়ে রাখা হাসি, কাল হবে বাসি।

–ও অবিনাশ! একটু খোলসা করে বলো না। কেন করছ এরকম?

–কী দেখছি এইচআর পোর্টালে তুমি তো জানো।

–হ্যাঁ। তোমার লিভ ব্যালেন্স। মানে ক’টা ছুটি নিলে, আর কটা বাকি… আর কী!

–ক’টা নিয়েছ?

–দ্যাখো, ভালো করে দ্যাখো। শূন্য হাতে ফিরি হে। লোকানোর কিছু নেই।

–সেকি অবিনাশ! সিক লিভ সাতটা প্রাপ্য। পড়ে আছে সাত। ক্যাজুয়াল লিভ ছ’টা প্রাপ্য। পড়ে আছে ছয়। আর্নড লিভ ১২০। কাল থেকে তো আবার সেটা ৯০ হয়ে যাবে। মাসে আড়াইটা করে দেয়। ৯০-এর উপরে জমানো যায় না।

–লিভ টেকেন কলামটা ভালো করে দেখেছ?

–দেখলাম তো। 

–কী দেখলে?

–শূন্য। সারা বছরে তুমি একটাও ছুটি নাওনি?

নতুন টিস্যু বের করে এবারে অবিনাশ নিজের দু’ চোখ চেপে ধরে। দু’ দিকে মাথা নাড়াতে থাকে প্রবল। আমি বলি, ‘স্টার পারফর্মারদের কষ্ট পেতে নেই।’ কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধতার পরে অবিনাশ বলে ওঠে, ‘দুঃখ পাচ্ছি না। আমার কাছে এ আবার নতুন কথা কী! প্রতি বছর এক অবস্থা। তোমার এইচআর পোর্টাল না দেখেও বলতে পারি, তোমারও একই অবস্থা বন্ধু। সবারই এক।’ বলি, ‘তাহলে কাঁদছ কেন?’ অবিনাশ উত্তর দেয়, ‘কাল সব শূন্য হওয়ার আগে আজ বড় মায়া হয় গো। এপ্রিল থেকে ছুটির আবার নতুন খাতা। একটা বছর কেটে গেল। এ বছরের খাতায় সামান্য আঁচড়ও পড়ল না।’ সামনে পড়ে থাকা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফি এক চুমুকে খেয়ে নিল অবিনাশ। বলল, ‘ছাড়ো! আর সময় নষ্ট করব না। মান্থ এন্ড। এমনিতেই কখন বেরতে পারব ঠিক নেই।’

লিভ ব্যালেন্স দেখানো ল্যাপটপের পর্দায় একবার খুব মায়াময় হাত বুলিয়ে নেয় অবিনাশ। আর মিনিমাইজ নয়, এবারে ঝপ করে বন্ধ করে দেয় ওই পোর্টাল। খুলে যায় এক্সেল। রংবেরংয়ের জটিল গ্রাফের ওঠানামা দেখতে থাকে ফের। মরা রূপকথা ছুটি নেয়। জেগে ওঠে বাস্তব।

মানবসম্পদ নিয়ে কাজ করা একটি নামজাদা অসরকারি সংস্থার সাম্প্রতিক সমীক্ষায় উঠে এসেছে কিছু বিস্ময়কর তথ্য। সংস্থাটির নাম ‘ডিল’। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতীয় কর্মীদের ছুটির পাতে বিবিধ আয়োজন থাকা সত্ত্বেও তা গ্রহণ করার হার অত্যন্ত সীমিত। প্রাপ্য ছুটি ব্যবহারের নিরিখে এশীয়-প্যাসিফিক দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে ভারত। বছরে যতগুলো সবেতন ছুটি পাওয়া যায়, তার পুরোপুরি ব্যবহার করেন মাত্র ১৭.২ শতাংশ ভারতীয় কর্মী। অবিনাশের বিষয়টি ঐশ্বরিক। স্টার পারফর্মার হতে গেলে দম থাকতে হয় বইকি! তবে এ দেশের একজন কর্মী বছরে ছুটি নেন মাত্র ১২টি। সিক-ক্যাজুয়াল-প্রিভিলেজ সব যোগ করলে যে কোনও সংস্থাতেই বছরে প্রাপ্য সবেতন ছুটির সংখ্যা অন্তত ৪০ ছাড়ায়। নিজেদের প্রাপ্য ছুটি নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের দৈন্যদশার কথাই প্রকট হয়েছে এই সমীক্ষায়। ‘এ বার ভ্রমণ সবার জন্য’ কিংবা ‘সাধ্যের মধ্যেই সাধপূরণ’ শীর্ষক পাতাজোড়া বিজ্ঞাপনগুলো দিনের শেষে কাদের ডাক দিয়ে যায় জানি না। সেভেন নাইট এইট ডেজ অথবা দশ রাত এগারো দিনের সফর সাধারণ ভারতীয় কর্মীদের কাছে স্বপ্ন এখনও। আর্থিক সংগতি থাকলেও পথ অবরোধ করে দাঁড়ায় লম্বা ছুটি নেওয়ার মানসিকতা। আমাদের প্রলম্বিত ছুটি, অর্থাৎ লং, এক্সটেন্ডেড ভ্যাকেশনের মেয়াদের কথা শুনলে সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা মালয়েশিয়ার মানুষরা বেজায় হাসবেন। আমাদের দেশে ২০২৫ সালে বছরে টানা দু’ দিন ছুটি নিয়েছেন মাত্র ৪৮.৪ শতাংশ মানুষ! সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া এবং মালয়েশিয়ায় বছরে প্রাপ্য ছুটি পুরোপুরি লুটেপুটে নিয়েছেন যথাক্রমে ৫৭.২ শতাংশ, ৫৩.৩ শতাংশ এবং ৫০.৮ শতাংশ মানুষ। ৫৭-র পাশে ১৭ বড় বেমানান।

স্কুল-জীবনের কথা মনে পড়ে। পেনসিলবক্স থেকে কোনও বন্ধু যদি একটা পেন নিত, হুঙ্কার দিয়ে, ‘এটা আমার’ বলে তা ছিনিয়ে নিতাম। বড় হয়ে সেই আমি, নিজের কাছেই এত অচেনা হয়ে গেলাম কী করে? অবিনাশের থেকে কিছুটা দূরে হলেও সেই লাইনে আছি আমিও। এখানে আমি-র অর্থ আমি একা নই। নিজের সামনে আয়না রাখি। দেখি, সেখানে কিলবিল করছে অজস্র মাথা। মিশছে দিগন্তে। প্রথম সারির কলেজ থেকে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট পড়া এক বন্ধুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল সম্প্রতি। এখনও এক বহুজাতিক সংস্থার মানবসম্পদ বিভাগের শীর্ষপদে। হেসে বলল, ‘কাউকে নিয়োগ করার সময় টাকাপয়সার পরেই সবচেয়ে বেশি যা কাজ দেয় তা হল লিভ পলিসি। বছরে এতগুলো ছুটির কথা শুনলেই ক্যান্ডিডেটের সে কি একগাল হাসি! জিজ্ঞেস করে, এত্তো? আমি বলি, হ্যাঁ, এত। বলে, নিতে পারব তো? আমি বলি, তোমার হকের ছুটি তুমি নেবে, সাধ্য কার বাধা দেওয়ার? নির্ভেজাল মিথ্যে বলি। হয়তো সেভাবে বাধা দেবে না কেউ। কিন্তু জানি, এই ছুটির সিকিভাগও নেবে না আমাদের কর্মীরা।’ এক নাগাড়ে এতগুলো কথা বলে উচ্চপদস্থ বন্ধুটি থামল কিছুক্ষণ। ফের বলল, ‘ছুটির ব্যাপারটা অনেকটা ভার্চুয়াল হ্যাপিনেসের মতো বুঝলি। আছে জানতে পারলে মনের মধ্যে তৃপ্তি খেলে বেশ। খুশির বুদবুদ ওড়ে। তবে এটাও জানি, ওই সুখ সইবে না।’

নিজের ছুটি নেওয়ার দৌড়ে প্রতিবেশী দেশগুলির থেকে এত পিছিয়ে আছি কেন আমরা? বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ছুটি নেওয়ার ইচ্ছেয় প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ভয়, আত্মগ্লানি এবং কিছু মিস করে যাওয়ার আশঙ্কা দিয়ে তৈরি হওয়া এক মিশেল। কর্মব্যাকুলতার যুক্তি এক্ষেত্রে ধোপে টেকে না। বদলে যাওয়া এইচআর-এর ব্যাকরণ বই এখন হার্ড ওয়ার্কের থেকে স্মার্ট ওয়ার্কের উপরে জোর দেয়, অন্তত কাগজে-কলমে। তুমুল প্রতিযোগিতার বাজারে মনের মধ্যে যে প্রশ্নের উদয় হয় তা হল– টানা সাত দিন অফিসে না এলে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ব না তো? কত যে মেল করার আছে বাকি! ছুটি প্রসঙ্গে এক ব্যক্তি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘এক জটিল ম্যাজিক সমীকরণের সন্ধান দিই বন্ধুরা। ছুটি নেওয়ার কথা ভাবলেই কেন গর্জন বেড়ে যায় ইমেলের? না কি এ আমার মনের ভুল? না না, বাড়ছে তো। ওঃ, নাহ। আমারই ভুল হচ্ছে। কী মুশকিলে যে পড়লাম! কাল ছুটি নিয়েছি। কিছুতেই শেষ হচ্ছে না কাজ।’ চাকরির খোঁজখবর দেওয়া অন্য একটি সামাজিক মাধ্যমের প্ল্যাটফর্মে এক জবরদস্ত প্রশ্নোত্তর-পর্ব চোখে পড়ল। এক গোবেচারা চাকরিপ্রার্থী ও কোনও সংস্থার এইচআর হেড।

–সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ায় এত ছুটি পায় কী করে স্যর?

–বলব। তার আগে বলো, তোমার মনের মধ্যে ফুরফুরে ফ্যাক্টর কত?

–বুঝলাম না, স্যর।

–ওই জন্যই ছুটি পাও না।

সমস্যা যে আসলে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে রয়েছে কোথায়, তা জানতে বড় শখ হয়। এ শহরেরই একটি মাঝারি সংস্থার অন্দরমহলের কথা বলে শেষ করা যাক। পাঁচ-ছ’ বছর আগের কথা। কালীপুজোর দিন বিকেলবেলা। ৫০ জনের কাছে ইমেল যায়। চিফ ম্যানেজারবাবু মিটিং ডেকেছেন। ‘ইমার্জেন্সি। অফিসে চলে আসুন। সন্ধে সাতটা।’ 

ভ্রু জোড়া দ্বিতীয় বন্ধনীর মতো করে ৪৫ জন পৌঁছে যান, যথাসময়ে। বাকি পাঁচ জন ইমেল দেখেননি। ছুটির দিন। জয়ত্তারা। 

পরের মাসে লে অফ হয়। ওই পাঁচজনের চারজন জানতে পারেন, অদ্য শেষ রজনী।

ওই আর কী! ধরতে গেলেম আর পেলেম না।

paid leave Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on