

গ্রন্থ-সম্পাদনা, গ্রন্থ-প্রচার, সমালোচনার পাশাপাশি সমকালীন সময়ের দাবি মেটাতে তার মুখামুখি হয়েছেন, আর সেই সমস্ত সংলাপ উপস্থিত হয়েছে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অথবা সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে, বহুবিধ রূপে। রবীন্দ্রনাথ সেই অপরিসীম মূলধন, যাকে ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্নভাবে। তবে সব ক্ষেত্রে ফল ইতিবাচক হয় না। বিভিন্ন সময়ে আহত হতে হয়েছে রবীন্দ্রনাথকে, দিতে হয়েছে বিশ্বাসের মূল্য। প্রতারিত হতে হয়েছে স্বদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতেই। এই বই বাঙালি সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতিতে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য রবীন্দ্রচিহ্নের এক অভাবনীয় সমাবেশ।
রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’ গ্রন্থের বসুমতী সাহিত্য মন্দির-প্রকাশিত (১৯০৭) সংস্করণের বিজ্ঞাপনে লেখা হয়েছিল,
অতি শীঘ্র এই উপন্যাস পাঠ করুন। নরনারী, যুবক-যুবতী, বিবাহিত-অবিবাহিত, যাঁহারা নূতন বিবাহ করিয়াছেন, যাঁহাদের বিবাহ পুরাতন হইয়াছে, যাঁহাদের প্রেমে ভাঁটা পড়িতেছে, যাঁহারা স্ত্রীকে মনের মত করিয়া চাহেন, যাঁহারা সুখের দাম্পত্যপ্রেম চাহেন, তাঁহারা “চোখের বালি” নিশ্চয়ই পাঠ করিবেন।
বইয়ের স্বার্থে সেসময়ে এইধরনের মুখরোচক গদ্যবহুল বিচিত্র বিজ্ঞাপন তাঁকে মেনে নিতে হয়েছিল। তবে তিনি যখন তাঁর নিজের বই ছাপার এবং বিজ্ঞাপন দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তখন তাঁর নিজস্ব রুচি দিয়ে বিজ্ঞাপনগুলিকে সাজিয়েছেন।
১৯৩৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ‘বিবিধ সংবাদ’ শিরোনামে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় একটি খবর প্রকাশিত হয়:
বিবিধ সংবাদ
শান্তিনিকেতন সংবাদ– বিশ্বভারতীর প্রকাশন বিভাগ এবার নানারূপ সুন্দর সুন্দর নমুনার বিজয়া-অভিনন্দন কার্ড বাহির করিবেন বলিয়া স্থির করিয়াছেন। ঐ সকল কার্ডে কবিবর রবীন্দ্রনাথ, শ্রীযুক্ত নন্দলাল বসু ও শান্তিনিকেতনের অন্যান্য চিত্রশিল্পীর অঙ্কিত চিত্র থাকিবে। শিল্পের দিক হইতে কার্ডগুলিকে যতদূর সম্ভব চিত্তাকর্ষক করার চেষ্টা হইতেছে। উহার মূল্যও যাহাতে বেশী না হয় সেদিকেও দৃষ্টি রাখা হইয়াছে।
বইয়ের বস্তুরূপ অর্থাৎ পাতা, হরফ, মুদ্রণ, সংস্কৃতি, বইয়ের বিজ্ঞাপন ও বিপণন সমস্তকিছুর সম্পর্কে এক ধারাবাহিক স্বচ্ছতা বজায় রেখেছেন বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকা সমস্ত মানুষ।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিজ্ঞাপনের এই বহুমাত্রিক, বিচিত্রধর্মী সম্পর্ককে শ্রীহিরণ্ময় মাইতি তাঁর গ্রন্থ ‘রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞাপন ও সেইসময়’–এ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরেছেন।

তিন খণ্ডের এই সমগ্র বইতে রয়েছে মোট ২৬টি অধ্যায়। ২৬টি অধ্যায় বিন্যস্ত হয়েছে চারটি পর্বে। প্রথম খণ্ডের দু’টি পর্বে রয়েছে ১১টি অধ্যায়। দ্বিতীয় খণ্ডের একটি পর্বে রয়েছে ১০টি অধ্যায়। প্রত্যেক অধ্যায়ের শেষে রয়েছে বিজ্ঞাপন-সহ অন্যান্য বিপুল ছবির সাদা-কালো ও রঙিন প্রতিলিপি, যেগুলি ছাপা হয়েছে আর্ট পেপারে।
প্রথম খণ্ডের প্রথম পর্বে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর সমকালের সম্পর্কের টুকরো টুকরো খবর। সেই সময় এবং সম্পর্কের ইতিহাস। পরের পর্বে একদিকে আছে স্বদেশি পণ্যের বিজ্ঞাপনপগুলি এবং তারই সঙ্গে দেখানো হয়েছে কীভাবে তিনি বিজ্ঞাপন জগতের উল্লেখযোগ্য সম্পদ হয়ে উঠলেন। প্রতিটি অধ্যায়ের নামগুলির থেকে বিষয়বস্তু সম্বন্ধে একটি সুস্পষ্ট আন্দাজ পাওয়া যায়। প্রথম অধ্যায় ‘সকল কাঁটা ধন্য করে’-তে লেখক ব্যবহার করেছেন ৭৮টি সাদাকালো এবং ১১টি রঙিন ছবি। দ্বিতীয় অধ্যায় ‘সেই সব দীর্ঘশ্বাস’-এ যথাক্রমে ১১৩টি সাদা-কালো এবং ১৫টি রঙিন ছবির প্রতিলিপি ব্যবহৃত হয়েছে; এইভাবে তিনটি বইয়ের প্রতিটি অধ্যায় ভরে উঠেছে লেখা এবং সাদাকালো ও রঙিন ছবিতে। লেখা এবং ছবির সঙ্গে ক্রমাগত উঠে এসেছে রবীন্দ্রনাথ-সহ আরও অজস্র লেখকের গ্রন্থের প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি। এসেছে দুষ্প্রাপ্য চিঠি, খবরের কাগজের প্রতিবেদনের অংশ। বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠায় লেখকের আন্তরিক পরিশ্রম স্পষ্ট হয়ে আছে। সেইসঙ্গে প্রতি খণ্ডের শেষে রয়েছে অতি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ এবং পত্রিকাপঞ্জি এবং কিছু বিশেষ তথ্য। এই বই উৎসাহী পাঠক এবং ভবিষ্যৎ-গবেষকদের পাঠ-আগ্রহ এবং প্রয়োজন, সমস্ত চাহিদাই পূরণ করতে সক্ষম।

এবার প্রথম খণ্ডের ছবিগুলি নিয়ে আরও কয়েকটি কথা বলা প্রয়োজন। রবীন্দ্রনাথের দুষ্প্রাপ্য ফোটোগ্রাফ থেকে শুরু করে তাঁর মৃত্যুর পরে এদেশে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রথম বা উল্লেখযোগ্য পৃষ্ঠা মুদ্রিত হয়েছে। পূর্বে প্রকাশিত তাঁর স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত অন্যান্য খবরের প্রতিলিপিও ব্যবহৃত হয়েছে এখানে। দেওয়া হয়েছে পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্য-বন্ধু ও পরিচিতদের ছবি, তাঁর বিভিন্ন মানুষকে লেখা চিঠি এবং হাতের লেখার প্রতিলিপিও। রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে এই বই আবর্তিত হলেও, লেখা হয়েছে বাংলা বিজ্ঞাপনের ইতিহাস।
একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে দাঁড়িয়ে এই পুরনো-বিজ্ঞাপন-পরিক্রমা একইসঙ্গে বিস্মিত এবং বিষণ্ণ করে। একদা মুদ্রিত বাংলা বিজ্ঞাপনের গৌরবোজ্জ্বল দিন বর্তমানে পর্যবসিত হয়েছে মূলত ফোটোগ্রাফ-ধর্মী, ঝলমলে অথচ অতিশয় খারাপ বা বিভিন্নক্ষেত্রে এমনকী, ভুল-গদ্যবহুল বাংলা ভাষার উপস্থাপনে। বিজ্ঞাপনগুলি দেখলে বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথ-কেন্দ্রিক বিজ্ঞাপনকে কয়েকটি প্রাথমিকভাগে ভাগ করা যায়। একদিকে যেমন রবীন্দ্রনাথের বইয়ের বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হচ্ছে, প্রকাশিত হচ্ছে তাঁর নিজস্ব প্রকাশনা-সংস্থার নানান অসামান্য গ্রন্থের বিজ্ঞাপন, তেমনই অন্যদিকে সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য এবং শংসাপত্র ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপনে। এর সঙ্গেই খাদ্যদ্রব্য থেকে রেলওয়ে, বিজ্ঞাপনের প্রায় সর্বক্ষেত্রে বিষয়োপযোগী গান, কবিতা এমনকী প্রবন্ধের অংশও ব্যবহৃত হচ্ছে। লেখক এই তিনটি খণ্ডে সেই বিচিত্রধর্মী প্রায় সমস্ত বিজ্ঞাপনকে একত্রিত করেছেন।

এবার কয়েকটি নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপনের কথা উল্লেখ না করলেই নয়, ‘ডাঃ উমেশচন্দ্র রায়ের জগদ্বিখ্যাত পাগলের মহৌষধ’-এর কপিটি অতীব চিত্তাকর্ষক, এই বিজ্ঞাপনটি পরিচিত হলেও প্রতিবারই কিঞ্চিৎ বিস্ময়ের উদ্রেক করে, যেখানে ‘ডাঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ বলছেন, “…আমি ইহার উপকারিতা বহুকাল যাবৎ জ্ঞাত আছি”, প্রায় সবকটি বিজ্ঞাপন আলাদা করে উল্লেখের দাবি রাখে, তবু স্বল্প পরিসরে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে ইচ্ছে করে ‘টাটা ষ্টীল’-এর বিজ্ঞাপনগুলির কথা, ছবিতে-কপিতে সেগুলি চমৎকার হয়ে উঠেছে।
দ্বিতীয় খণ্ডের ১০টি অধ্যায় জুড়ে রয়েছে স্বদেশি সাবান, প্রসাধন সামগ্রী, ছবি, ফোটো এনগ্রেভিং, কটন মিল, কালি-কলম, বাদ্যযন্ত্র প্রস্তুতকারক সংস্থা, কাগজবিক্রেতা, ইলেকট্রিক দ্রব্য প্রস্তুতকর্তাদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, যারা কোনও না কোনওভাবে রবীন্দ্র-সাহচর্যে ধন্য হয়েছেন। তাঁর এই স্নেহাশিস পেয়েছে বাংলার গহনা বড়ি অথবা অতি অল্প পরিচিত পাটনার পিন্টু হোটেল পর্যন্ত।
তৃতীয় খণ্ডের চতুর্থ পর্বের নাম ‘চিরস্মরণীয়েষু’। এই পর্বের ৫টি অধ্যায় জুড়ে সুবিন্যস্তভাবে ছড়িয়ে আছে তাঁর বইয়ের প্রথম প্রকাশ থেকে শুরু করে নানা বিজ্ঞাপন ও ‘পুস্তক পরিচয়’, সাময়িকপত্রের জনপ্রিয় রবীন্দ্রনাথ, রেকর্ড ও চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপন, কপিরাইটের জন্য তাঁর লড়াইয়ের তথ্য ও ইতিহাসের মধ্যে ‘রবীন্দ্রচিহ্ন’-এর সন্ধান। একেবারে শেষ অধ্যায়ে রয়েছে তাঁকে নিয়ে বানানো রঙ্গ-ব্যঙ্গ ও কার্টুনের কিছু কথা ও পরিচয়।

বইটি দুষ্প্রাপ্য সব তথ্য, ছবি এবং বিজ্ঞাপনের সমাবেশ তো বটেই, তার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক সময়কে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় এই বই থেকে। লেখক যত গভীর অন্বেষণের দিকে এগিয়েছেন, যত তাঁর কাছে গড়ে উঠেছে রবীন্দ্রনাথের এক আশ্চর্য নতুন পরিচয়; ঠিক সেইভাবেই পাঠকের কাছেও খুলে যেতে পারে জানার নতুন দিক। তিনি ছিলেন স্বদেশি শিল্পের গভীর সমর্থক। জাহাজের ব্যবসা থেকে জলযোগের মিষ্টি, ডোয়ার্কিনের হারমোনিয়াম থেকে কুন্তলীনের প্রসাধন, ভোটপ্রার্থী থেকে সাময়িকপত্রের সম্পাদক– সকলেই রবীন্দ্রনাথের স্নেহপূর্ণ প্রশ্রয় পেয়েছেন। গ্রন্থ-সম্পাদনা, গ্রন্থ-প্রচার, সমালোচনার পাশাপাশি সমকালীন সময়ের দাবি মেটাতে তার মুখামুখি হয়েছেন, আর সেই সমস্ত সংলাপ উপস্থিত হয়েছে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অথবা সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে, বহুবিধ রূপে। রবীন্দ্রনাথ সেই অপরিসীম মূলধন, যাকে ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্নভাবে। তবে সবক্ষেত্রে ফল ইতিবাচক হয় না। বিভিন্ন সময়ে আহত হতে হয়েছে রবীন্দ্রনাথকে, দিতে হয়েছে বিশ্বাসের মূল্য। প্রতারিত হতে হয়েছে স্বদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতেই। এই বই বাঙালি সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতিতে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য রবীন্দ্রচিহ্নের এক অভাবনীয় সমাবেশ।
লেখক দীর্ঘ বছরের পরিশ্রম, সাধনা এবং আন্তরিকতায় গড়ে তুলেছেন এই মনোজ্ঞ সংকলন। তিন খণ্ডের বইতে ব্যবহৃত হয়েছে হাজারের বেশি সাদা-কালো ছবি এবং দুশোরও বেশি রঙিন ছবি। গ্রন্থটি সুলিখিত এবং তথ্যসমৃদ্ধ তো বটেই, তারই সঙ্গে এই প্রায়-দুষ্প্রাপ্য ছবির সংকলন বইগুলিকে চমৎকার মনোগ্রাহী করে তুলেছে। প্রতিটি বই বোর্ড-বাঁধাই এবং পাঠোপযোগী। বইয়ের বিন্যাস সুন্দর এবং ছাপা ছবির মান অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভালো ও স্পষ্ট। তিনটি খণ্ডে বিভক্ত হওয়ায় লেখকের কাজের বিপুলতা সুষমভাবে ভাগ হয়েছে। এই সুবিশাল আয়োজন খানিক মূল্যবান হবে, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবু এর মূল্য সাধারণ পাঠকের পক্ষে কিছুটা আয়ত্তের বাইরে মনে হতে পারে। সেক্ষেত্রে এহেন প্রয়োজনীয় এবং সুখপাঠ্য গ্রন্থের একটি সুলভ সংস্করণের কথা প্রকাশক ভেবে দেখতে পারেন।
গ্রন্থ-সমালোচনায় কিছু রহস্য রাখা প্রয়োজন। যাঁরা ইতিমধ্যে বইগুলি পাঠ করেছেন, তাঁরা তো জেনেছেন; যাঁরা আগামিদিনে পড়ার অপেক্ষায় রয়েছেন, তাঁদের জন্য এর বেশি কথা প্রকাশ না-করাই যথাযথ কাজ হবে। কেবল পরিশেষে এই কথা বলা যায়, হিরণ্ময় মাইতি রচিত ‘রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞাপন ও সেইসময়’ একইসঙ্গে পড়া এবং দেখে উপভোগ করার যুগপৎ আয়োজন। এই বইয়ের নিবিড় পাঠ পাঠকের কাছে একটি সুচারু সময়যান হিসাবে পৌঁছে যেতে পারে।
গ্রন্থঋণ: চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় (সম্পাদিত), রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ, আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ১৯৯৬।
……………………..
রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞাপন ও সেইসময়
হিরণ্ময় মাইতি (তিন খণ্ড একত্রে)
দে বুক স্টোর
প্রথম দে বুক স্টোর সংস্করণ: সেপ্টেম্বর, ২০২৫
৫০০০্
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved