Durga Puja Special: Exploring the Many Cuisines | Robbar
Robbar
  • ৩১ আশ্বিন ১৪৩৩
  • রবিবার
  • ১৮ অক্টোবর ২০২৬

পুজোর আমিষ রান্না

নবমীর দিন আজও কলকাতার মাংসের দোকানে লাইন দেখলে বোঝা যায় পাঁঠার মাংসের প্রতি বাঙালির দুর্বলতা। সে যতই মাংসের দাম আকাশ ছোঁয়া হোক না কেন! বিজয়ার খাওয়া প্রসঙ্গে দেবযানী জানিয়েছিলেন, তাঁদের বাড়িতে সমানতালে আমিষ আর নিরামিষ রান্না একসঙ্গে হত। নিরামিষ আলুরদম যেমন হচ্ছে, তেমন খাসির চর্বি দিয়ে আলুরদম ও রান্না হচ্ছে। মাংসের শিঙাড়া, সদ্য নতুন ওঠা ফুলকপি দিয়ে শিঙাড়া বাড়ির মা জেঠিমারা অবলীলায় বানিয়ে চলেছেন। 

শেষ আপডেট: অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ১৮:০৪   
Facebook WhatsApp Messenger

‘আশ্বিনের মাঝামাঝি উঠিল বাজনা বাজি
পূজার সময় এলো কাছে
মধু বিধু দুই ভাই ছুটাছুটি করে তাই
আনন্দে দু-হাত তুলি নাচে।’

এই বাজনা শোনার জন্য বাঙালি সারাবছর অপেক্ষা করে থাকে। পুজোর চারদিন পড়াশোনা, অফিসের কাজ, দৈনন্দিন থোড়বড়িখাড়া থেকে ছুটি। শুধুই প্রাণ খুলে প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ আর পেটপুজো। ভেবে দেখুন, আমাদের ১২ মাসে ১৩ পার্বণের প্রত্যেকটা পরবে খাওয়াদাওয়া কিন্তু ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। কোন উৎসবে আমিষ খাব, আর কোন উৎসবে নিরামিষ খাব– এই নিয়ে কোনওদিন আমাদের মধ্যে কোনও দ্বন্দ্ব বা বিভ্রান্তি নেই। তার একটা বড় কারণ, আমরা বাঙালিরা জন্ম থেকেই বড্ড খাদ্যরসিক, খাবারের সমঝদার জাত।

zoom
উৎসবে আমিষ বা নিরামিষ নিয়ে কোনওদিন বাঙালির কোনও দ্বন্দ্ব নেই

গিরি এবার আমার উমা এলে

আসলে ঠাকুর-দেবতার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা ঘরের লোকের মতোই সহজ, সেখানে ভক্তি বা ভয়ের উর্ধ্বে গিয়ে অকপটে শুধু ভালোবাসাই বেরিয়ে পড়ে যে! শ্রীরামকৃষ্ণদেবের মা কালীকে তুইতোকারি সম্বোধন থেকে শুরু করে, রামপ্রসাদী গানে মা মেনকার প্রত্যাশা, রবীন্দ্রনাথের পূজা পর্যায়ের গান, তারপর জয় গোস্বামীর ‘ঈশ্বর ও প্রেমিকের সংলাপ’ সবই তার জ্বলন্ত উদাহরণ। তাই বোধহয় মা দুর্গাকে আমরা ঘরের মেয়ে হিসেবে বা বলা ভালো, কন্যারূপে পুজো করে আসছি। এক বছর পর মেয়ে তার বাপের বাড়ি মর্তে আসবে। তাঁকে ঘিরে আমাদের এক বছরের উচ্ছ্বাস জমতে থাকে। কত কত মানুষের আশা, আয়, স্বপ্ন জড়িয়ে থাকে সর্বজনীন এই উৎসবের সঙ্গে। কবে কোন জামা পরব, কোনদিন কোন প্যান্ডেলে গেলে ভিড় কম হবে, ফিরে এসে কোন বন্ধুর গ্রুপের সঙ্গে আড্ডা দেব– এগুলো আমাদের ছক কষা হয়ে গিয়েই থাকে। এই সবকিছুর মধ্যে কেন্দ্রীয় চরিত্রটি হল খাবার। কোনদিন ইলিশ হবে আর কোনদিনই বা পাঁঠা হবে? এই কথা অস্বীকার করার কোনও জায়গাই নেই যে, আমাদের রোজকার ভাতের থালায় নিরামিষ পদের আধিক্য থাকলেও, আমরা আদতে একটি আমিষ-প্রিয় জাত। মাছের মুড়োটা, পাঁঠার নলিটা, মুরগির ঠ্যাংটা, ইলিশের ডিমটা– পুজোর সময় ব্যক্তিগত রোগব্যাধিকে দূরে সরিয়েই জব্বর খ্যাঁটন চলতে থাকে। আমার পিসির কাছে শুনেছি, পুজোর ক’দিন আমার ঠাকুমারা সারা সকাল রান্না করে কোনওরকমে নতুন শাড়ি পরে তারপর অঞ্জলি দিতে ছুটতেন।

zoom
ঠাকুর-দেবতার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা সহজ

ব্যঞ্জনপদাবলি

পুজোর রান্নাবান্না আর খাওয়াদাওয়া নিয়ে যদি সেকাল আর একাল ভাগাভাগি করি, তাহলে প্রায় সব বাড়িতেই সেকালের চিত্রটা পিসির বলা কথাগুলোর মতোই। কিন্তু বাঙালিবাড়িতে আজকের পুজোর চিত্রটা ঠিক কেমন? ‘গৃহকর্মে নিপুণা’-মহিলাদের ক্ষেত্রে সমাজের বেঁধে দেওয়া এই তিনটে শব্দের গণ্ডি পেরিয়ে আমরা অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছি। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলা এ জীবনে আজকের দিনে মহিলা-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই পুজোতে আনন্দ করবে। এই চারদিন বাড়ির রান্নাঘর থেকে মা-মাসিপিসিদের ছুটি। পিতৃতান্ত্রিকতার চোখরাঙানিকে একরকম উপেক্ষা করেই আজকাল আর কেউ এই নিয়ে প্রশ্ন করে না। তাই তো সব রেস্তোরাঁয় পুজোর নতুন মেনুর রমরমা, প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে নানান খাবারের স্টল। হোম ডেলিভারি, ক্যাটারিং, হোম শেফদের এটাই ব্যবসার মোক্ষম সময়। এলোঝেলো, নাড়ু, ছাপা সন্দেশ বানাতে যা পরিশ্রম! কেউ যদি অর্থের বিনিময় এগুলো বানিয়ে দেয়, তাহলে তো পোয়া বারো বটেই! এর একটা ভালো দিক অবশ্যই আছে, এই যে লোকে ‘হারিয়ে যাওয়া পুজোর রান্না’ বলে হা-হুতাশ করে, এই হোম-শেফেরা সেসব রান্না খুব নিষ্ঠা নিয়ে শিখছে এবং মানুষের কাছে নস্টালজিয়া বা তথাকথিত ‘হারিয়ে যাওয়া রান্নার’ স্বাদ পৌঁছে দিচ্ছে।

আমার ছোট্ট কলোনির পাড়ায় ২০০৩ সালে প্রথম পুজো শুরু হল, সে বছর থেকেই সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এই তিন দিন পাড়ায় খাওয়া হত। দৈনন্দিন রান্নার থেকে পাড়ার কাকিমা, জেঠিমা সব্বার মুক্তি। ধরাবাঁধা মেনুতে সপ্তমীর দিন পোলাও আলুর দম ছানার কোপ্তা, অষ্টমীর দিন খিচুড়ি, লাবড়া, পায়েস আর নবমীর দিন ভাত, ডাল, আলু ভাজা, আলু দিয়ে পাঁঠার মাংস। এখন কলকাতা এবং কলকাতার বাইরের শহুরে গেটেড কমিউনিটির পুজোগুলোতেও হুবহু এই ছবিটা দেখা যায়।

zoom
পুজোর খাওয়াদাওয়া

বিস্কুট, লজেন্স আর অসুরের বড়া

অভিজ্ঞ ফুড রাইটার দেবযানী চ্যাটার্জি ভোগ প্রসঙ্গে তাঁর মায়ের একটি কথা বলেছিলেন– ‘আমরা নিজেরা খাব বলে ভোগ রান্না করি, সত্যিই যদি দেবতারা ভোগ খেতেন তাহলে আমাদের রান্না করার মানসিকতা থাকত তো?’ এই কথাগুলো বড্ড ফিলোজফিকাল!

উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটের আরবেলিয়া গ্রামে ভট্টাচার্যদের বসতভিটা। গ্রামের ডাকনাম আরবেলে। বাড়ির মেয়ে দীপান্বিতা চৌধুরী বললেন– ‘আমাদের এক শরিকের বাড়ির পুজোর বয়স ৩০০ বছর। আমাদের ঠাকুমার ইচ্ছে হয়েছিল ওদের থেকে আলাদা হয়ে পুজো করার। আমাদের পুজোর বয়স ১০৯ বছর। শুনেছিলাম প্রথম বছর একথালা বিস্কুট আর লজেন্স দিয়ে মায়ের পুজো হয়েছিল।’

প্রসন্ন ভট্টাচার্যের আমলের এই পুজোর ভোগের বিশেষ এক রীতি হল মা’কে ‘অসুরের বড়া’ উৎসর্গ করা। পাকা কলা, আটা দিয়ে মেখে বড়ার আকারে ভেজে তৈরি করা হয় এই ভোগ। সোনার ফসলের দেশে মা’কে প্রতিদিন ‘রচনা’ ভোগও দেওয়া হয়। পাথরের গ্লাসে এক গ্লাস জল, একটা ডাব, খই, মুড়কি, চিঁড়ে, বাতাসা এই সব কলাপাতায় একত্র করে তাকে ‘রচনা’ বলে। চারদিন মা-কে চার রকম ডালের খিচুড়ি ভোগ দেওয়া হয়। বিউলি, অড়হর, মুগ আর মটর ডালের খিচুড়ি হয়। বাপের বাড়িতে মেয়ের যেন কোনও অযত্ন না-হয়, সেদিকে ভট্টাচার্য বাড়ির সদস্যদের কড়া নজর থাকে। মাঠের সোনার ফসলের পাশাপাশি নদীর ফসলও সমান গুরুত্ব পায়। এ বাড়ির পুজোয় মা’কে মৎস্যভোগ দেওয়ার চলও বহু পুরনো। দীপান্বিতা বললেন যে– সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, দশমী এই চারদিনই সধবা মেয়ে তার বাপের বাড়ি এসে মাছ খায়। অনেক ছোটবেলায় দীপান্বিতা দেখেছেন বাড়ির পুকুরের মাছ দিয়েই ভোগ রান্না হতে। সময়ের সঙ্গে সে নিয়ম পাল্টে গেছে। এখন বাজার থেকেই নানান মাছ আসে। বাড়ির লোক যেমন খায়, মেয়ের জন্যও তেমনভাবে রান্না হয়। ভোগের আমিষ রান্না, আমিষ হয়েও নিরামিষ। একথা সকলেরই জানা যে, আমিষ ভোগ পেয়াঁজ রসুন ছাড়া রান্না করা হয়ে থাকে। কখনও আদা জিরেবাটা দিয়ে, কখনও সর্ষে পোস্ত বাটা দিয়ে, কখনও বা নারকেলের দুধ দিয়ে মায়ের মৎস্যভোগ রাঁধা হয়। দশমীর দিন থাকে পান্তাভোগ, সঙ্গে ছোলা নারকোল দিয়ে কচুর শাক, কুঁচো চিংড়ি ভাজা আর চালতার টক। আগের দিন রাতে সব রান্না করে, পান্তা ভিজিয়ে রাখা হয়। সকালে বাসি ভোগ খেয়ে মেয়ে কৈলাসের পথে রওনা দেয়। বাড়ি ফিরে মহাদেবকে যদি গল্প করে যে, বাপের বাড়ি গিয়ে সে খুব ভালোমন্দ খেয়েছে, সেই শুনে মহাদেব যদি পরের বছর আর বাপের বাড়ি আসার অনুমতি না দেন, তখন কী হবে? তাছাড়া বাড়ির মেয়ে চলে যাবে, আবার এক বছর পর দেখা হবে। তাই বাড়ির সবার মনই ভারাক্রান্ত, রান্নাবান্নায় মোটেও মন নেই।

zoom
নারকেল দিয়ে কচু শাক

অবিভক্ত বঙ্গ প্রদেশের ভূপ্রকৃতি ও নদনদী মানুষের ভাতের থালার ওপর কতখানি প্রভাব ফেলতে পারে, শাক্ত পুজোয় মাছভোগ তারই এক অপূর্ব নিদর্শন বলে আমার মনে হয়। আজ, পুজোয় আমিষ খাব না নিরামিষ খাব– হালে এই সব ধুন্ধুমার হলেও, শাক্তপুজোয় মাছ ভোগ এইসব অস্থায়ী পাগলামিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমাদের পুজো-পার্বণের সংস্কৃতিতে যুগ যুগ আগে থেকে জায়গা দখল করে বসে আছে। আসলে মানুষের বিশ্বাস আর ভালোবাসাই আসল, এই যেমন ট্যাংরায় চাইনিজ কালী মন্দিরে চাউমিন ভোগ কি আজকের?

zoom
ট্যাংরায় চাইনিজ কালী মন্দির

ওপেন হাউসে পুজোর হইহুল্লোড়

সারা পৃথিবী জুড়ে বাঙালি ডায়াসপোরা ছড়িয়ে আছে। পুজোর সময় তাদের একবার হলেও ঘরে ফেরার কথা মনে পড়ে। কিন্তু ‘ফিরব বললে ফেরা যায় না কি?’ পৃথিবীর যে প্রান্তেই বাঙালি থাকুক না কেন, পুজোর সময় খাওয়াদাওয়ার মধ্যে দিয়েই সে পুজো উদযাপন করবে। খাদ্য গবেষক পৃথা সেন তাঁর শৈশবের স্মৃতির সুর ধরে দিল্লিতে ওঁর বাড়িতে বহুদিন ওপেন হাউস রাখতেন। সেদিন ওঁর বাড়িতে অবারিত দ্বার, খাবার টেবিলে সবার অধিকার। সব বন্ধুরা তাদের নিজেদের বন্ধুদের নিয়ে ওঁর বাড়িতে নাচ, গান, আড্ডার আসর বসাত। প্রতি বছর এই বন্ধুদের গণ্ডি বড় হত। পৃথা তাদের জন্য বড় কড়াইয়ে কখনও পার্সি ধানসাগ বানাতেন, কখনও আবার গ্যাস তন্দুরে ব্যাচে ব্যাচে চিকেন তন্দুরি। একথা ভীষণ সত্যি যে, খাবারের মাধ্যমেই মানুষের সঙ্গে আত্মীয়তা তৈরি হয়। যখন জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি টানা ২৫ বছর ধরে এই ওপেন হাউসের আয়োজন করে গিয়েছেন?’ তখন ওঁর পুজোর স্মৃতির ঝুলি হাতড়ে ছোট্ট শহর খড়্গপুরের কথা বললেন, যেখানে ওঁর বাবা রেলের অফিসার ছিলেন। দিল্লি, কলকাতা, খড়্গপুর মিলিয়ে ওঁর পুজো কেটেছে। কলকাতার যোধপুর পার্কের পুজোয় মোড়া পেতে তাবড় তাবড় শিল্পীদের অনুষ্ঠান দেখা, দিল্লিতে বাড়ির তৈরি নানাবিধ খাবার নিয়ে পুজোর আনন্দমেলা আর খড়্গপুরে সেন সাহেবের (ওঁর বাবা) বাড়ির বিজয়া সম্মিলনীর কথা লেখা আছে ওঁর পুজোর ডায়েরিতে। ওঁদের বাড়িতে দু’দিন ২০০ জন নিমন্ত্রিত নিয়ে বিজয়া সম্মিলনী হত। আতশকাচের মতো ওঁর মা ডালপুরি বেলতেন, আতশকাচের উদাহরণ দিলাম তার কারণ, ডালপুরি ভাজার পর ভিতরের স্বচ্ছ ডালের পুর দেখা যেত। ২০০ জন লোকের জন্য ৫০০ ডালপুরি ভাজা হত। সঙ্গে আলুর দম, নারকোল দেওয়া ঘুগনি, ছানার পোলাও, এলোঝেলো, কুঁচো নিমকি, পান্তুয়া থাকত।

zoom
নারকোল দেওয়া পুজোর ঘুগনি

কোনটা আগে? প্রণাম না খ্যাঁটন?

পৃথা সেনের স্মৃতির রেশ টেনেই বলি, বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিজয়ার প্রণাম করার তখন এক ধুম ছিল। কার বাড়িতে গেলে কেমন খাবার পাওয়া যাবে, সেইটা বিশেষ জরুরি আলোচনা ছিল। আমি বলছি ছয়ের দশকের কথা, ব্রিটিশরা দেশ থেকে বিদায় নিলেও তখনও তাদের আদব-কায়দার রেশ থেকে গিয়েছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। তাই বোধহয় হাই টি বা ‘চায়ে এসো’ এই বৈঠকগুলো সেখানে ভীষণ প্রচলিত ছিল। বিজয়া করতে গেলে কারওর বাড়িতে চায়ের সঙ্গে থাকত মাংসের চপ, কারওর বাড়িতে প্রন কাটলেট, বা কারওর বাড়ির বিজয়া সম্মিলনীর নেমন্তন্নে রাতে গরগরে মাংসের ঝোল, তখনও কষা মাংসের চল তেমন ছিল না। এখনকার বিজয়া দশমী বা বিজয়া সম্মিলনীর কাঠামোটা আবার অন্যরকম। ক্লাব বা গেটেড কমিউনিটিরা জনাপ্রতি মূল্য ধরে নিয়ে ছিমছাম বিজয়া সম্মিলনীর আয়োজন করে। বিজয়া দশমী আর ঘুগনি, এই দুই যেন একে অপরের পরিপূরক। আমার মামাবাড়িতে মাংসের কিমার ঘুগনি খাওয়ার বাসনা নিয়ে পাড়ার লোক বিজয়া করতে আসত। তখন মধ্যবিত্ত বাড়িতে কিমার ঘুগনি হওয়া একটা বেশ এলিট ব্যাপার ছিল। তবে গড়পড়তা মধ্যবিত্ত বাঙালি বাড়িতে বিজয়া বলতে যে খাবারগুলোর ছবি ভেসে ওঠে, সেগুলো সবই তখন কমবেশি সবার বাড়িতেই হত। আমার দাদাবাবার হাতে জিভেগজা খাওয়ার কথা কেউ ভুলতে পারে না। আমার মা-মাসিরাও সেই জিভেগজা বানানোর কৌশল আয়ত্ত করতে পারেননি। বাঙালপাড়ায় বরিশাল, নোয়াখালি থেকে আসা পরিবারগুলোতে হত ‘ইচার মাথা’ অর্থাৎ চিংড়ির মাথার আকারে গড়া নারকেলের এক মিষ্টি, সঙ্গে হত নারকেলের চিঁড়া– সে ছিল এক শিল্প, শ্বেত শুভ্র চিকন-কাটা চিঁড়াগুলোর দিকে শুধু তাকিয়ে থাকতে হয়। নাড়ু, নারকোল ছাপা আর চন্দ্রপুলি তো ছিলই।

zoom
চন্দ্রপুলি হল পুজোর অন্যতম সেরা মিষ্টি

ষষ্ঠীর ময়দা আর নবমীর মাংস

দেবযানী চ্যাটার্জির বাড়িতে ষষ্ঠীর দিন ‘ময়দা’ হয়। মধ্য কলকাতার এদেশীয় বা ঘটি বাড়িতে এই ‘ময়দা হওয়া’টা এক বিশেষ ব্যাপার তো বটেই! মানে, বাড়ির মহিলারা ষষ্ঠী করে লুচি খাবেন। সপ্তমীর দিন থাকে পাকা মাছের কালিয়া। নবমীর মাংসের কথা বলতে গিয়ে দেবযানী তাঁর মায়ের গ্রাম মলুটির কথা বললেন। বীরভূম সীমান্তে ঝাড়খণ্ড রাজ্যে এই গ্রাম। সেখানে মা মৌলিক্ষার মন্দির, অষ্টকালী মন্দির। মা মৌলিক্ষাকে সাধক বামাখ্যাপা ছোট মা জ্ঞানে পুজো দিতেন। অষ্টকালীর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর সাঁওতালদের কালী, তাঁর কাছে একটি মহিষ বলি হয়। দেবযানীর দিদিমা জল দিয়ে মাংস ধোওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না, কারণ তাতে মাংসের স্বাদ নষ্ট হয়, কলাপাতা দিয়ে ঘষে ঘষে মাংসের প্রতিটা টুকরো পরিষ্কার করতেন। বলিপ্রথা আজ অনেক জায়গাতেই বন্ধ হয়ে গেলেও কালীঘাটের বলির মাংস বিক্রির রমরমা কিন্তু আজও রয়েছে। সেই মাংস রান্না হবে পেয়াঁজ রসুন ছাড়া। গল্পের ছলেই দেবযানী বললেন, ‘আজকের রিলের যুগে কোনও কিছুই আমাদের অজানা নয়। ভাইরাল নিরামিষ মাংস, বা নবমীর মাংস যে যা নামে ডাকে। তবে আমাদের বাড়িতে আগে উনুনের নিভুনিভু আঁচে আলু দিয়ে নবমীর মাংস রান্না হত। সঙ্গে দেরাদুন চালের ঘি ভাত। বউবাজারের কমলা ভাণ্ডারের ঘিয়ের সঙ্গে মরশুমের সবজি মিশিয়ে এই ঘি ভাত হয়।’

zoom
উনুনের নিভুনিভু আঁচে আলু দিয়ে রান্না করা নবমীর মাংস

নবমীর দিন আজও কলকাতার মাংসের দোকানে লাইন দেখলে বোঝা যায় পাঁঠার মাংসের প্রতি বাঙালির দুর্বলতা। সে যতই মাংসের দাম আকাশ-ছোঁয়া হোক না কেন! বিজয়ার খাওয়া প্রসঙ্গে দেবযানী জানিয়েছিলেন, তাঁদের বাড়িতে সমান তালে আমিষ আর নিরামিষ রান্না একসঙ্গে হত। নিরামিষ আলুরদম যেমন হচ্ছে, তেমন খাসির চর্বি দিয়ে আলুরদমও রান্না হচ্ছে। মাংসের শিঙাড়া, সদ্য নতুন ওঠা ফুলকপি দিয়ে শিঙাড়া বাড়ির মা জেঠিমারা অবলীলায় বানিয়ে চলেছেন।

আমি ছোট থেকে দেখে আসছি যে, নবমীর দিন আমার মামাবাড়িতে দিদিমা আমাদের সব্বাইকে নিমন্ত্রণ করতেন। নানা রকমের মাছ আর পাঁঠার মাংস দিয়ে মামা মাসি মেসোরা মিলে জোরদার ভোজ হত।

zoom
মাংসের শিঙাড়া

সেকাল একালের টানাপোড়েন

সেকালের সঙ্গে একালের পুজোর খাওয়া দাওয়ার তুলনা করলে দেখা যায়, আমাদের খাবার রকমসকম কিন্তু একই রকমের আছে। শুধু পুজোর চারদিন বাড়িতে সেই চিরাচরিত খাবারগুলো না-খেয়ে হোম ডেলিভারি বা রেস্তোরাঁয় গিয়ে খাওয়া এমনভাবেই পুজোর খাওয়াদাওয়ার ধারা বদলাচ্ছে। রোল, চাউমিন, মোমো, চপ, কাটলেট ভাজাভুজির পাশে শাওয়ার্মা, পিৎজা, বার্গারও দিব্যি জায়গা করে নিয়েছে। পুজো আসলে সামাজিক গণ্ডি অনেকটা আলগা করে দেয়। সেই গণ্ডির বাইরে গিয়ে মানুষ আনন্দে মাতে। একটা পুজো চলে গেলে আবার এক বছরের অপেক্ষা, পুজোর পেটপুজোর ধারা এভাবেই আবর্তিত হতে থাকে।

Chinese food cuisine Dashami Khichuri Luchi Mutton Nabami Puja Special Restaurant Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Singara tangra

Share this article on