প্রদীপ্তর চলচ্চিত্র নির্মাণ সাধারণ মানুষের, তাদের বন্ধনের, রাজনীতির কথা বলেছে নানা ভাবে। আর কবিতার উপস্থিতি তার প্রথম ছবি ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ থেকেই। প্রদীপ্ত নিজের ছবি বার বার নিয়ে গিয়েছেন মানুষের কাছে। তবে এই সময়ে তৈরি এক অন্যতম সেরা বাংলা চলচ্চিত্র দেখানো হয়েছে নানা থিয়েটারের মঞ্চে, বিতরণ ব্যবস্থার এই অস্বচ্ছতাকে আমি চলচ্চিত্র আন্দোলনের বড় সাফল্য হিসেবেই দেখব। আর যা আমাকে আনন্দ দিয়েছে, নির্দেশক হিসেবে প্রদীপ্তর যাত্রা পথে বহু মানুষের সঙ্গে তাঁর সখ্য গড়ে ওঠা। এই গণ পরাঙ্মুখ সময়ে শিল্পী যে একা নন, এ এক বড় ভরসা।
এক অনির্দেশ্য বেদনা নিয়ে যদি কোনও ছবি দেখে ফিরে আসি, যদি তার কোনও হদিশ না পাই চোখের সামনে দিয়ে পার হয়ে যাওয়া নানা দৃশ্যের মধ্যে, বরং বুকের গভীর থেকে বারবার উঠে আসতে চায় হাহাকার– যার উৎসকে ‘যন্ত্রণা’ বলেও চিহ্নিত করতে পারি না, তখন মনে হয় হয়তো দৈনন্দিনের মধ্যে চিরন্তনের মুখ দেখে ফেলেছি; আর ভুলতে পারছি না এই দ্বেষ হিংসা ও অকারণ ঘৃণার পরিসরে বেঁচে থাকার বাস্তব। কী হবে তোর নধর? এই গান বলে আমাদেরই কথা। সত্যি, কী হবে আমাদের? জল নাই মাছ নাই নদীর বুক জুড়ে ক্ষুধা। তবে আর ভেলায় ভেসে কী লাভ হল? বেহুলার ভেলায় ভাসতে চেয়েছিল নধর। মনে হয়, একা নয়। সঙ্গে বেহুলা থাকবে। সার্কাসের বেহুলা, মানে শ্যামা। যার দিকে তাকিয়ে লাঞ্ছনার পর তার ঠোঁট ফেটে বেরিয়ে আসবে ‘মা’। অন্তরে প্রত্যয় ছিল, নৌকার সঙ্গে সংযোগ কেউ কেটে দেবে না।

আশ্রয় ছিল একদিন, ভালোবাসার। ছায়া ছিল নিবিড়, মা যখন ছিল। বড় গাছের নিচে টিনের ঘর। কোনও কাজের অনুপযুক্ত নধরের উপর দেবত্ব আরোপ করে গ্রামের মানুষ, মা সেই দেবত্বকে প্রতিষ্ঠা করার কাজ করেন রোজ। তবু দু’বেলা খাবার জোগাড় করার জন্য বিধবা মায়ের বাসন মাজা, হোটেল থেকে নধরের খাবার চেয়ে আনা। ভর্ৎসনা শুনে চেয়ে আনা দু’টি ডিম আর ঝোল, ছড়ানো-ছিটানো ভাতকে প্রথম ধরে ক্যামেরা, তারপর পায়ে পায়ে খেতের মাটি পেরিয়ে ধরে মৃত্যুর অনিবার্য রূপকে। নধর মাকে পোড়াতে চায়নি। শেষ পর্যন্ত আগুন জ্বলে ফুলকি ওড়ে সেই অন্ধকার মাঠে। যার পাশেই সার্কাসের তাঁবু। সার্কাস। সার্কাস এক নিষ্পেষণের যন্ত্র। কিন্তু সার্কাসের সঙ্গে জড়িয়েছে মায়ের জীবন, নধরেরও। ‘টেরাপিজে’র খেলা দেখাতে গিয়ে বাবার মৃত্য। তবু সার্কাসের নাম শুনে নধরের মায়ের মুখে চোখে আলো জ্বলে ওঠে। হায়, সে তো জানেই না নধরের কী দুর্দশা হবে সার্কাসের চক্রব্যূহে ঢুকে। এবড়োখেবড়ো নিষ্প্রাণ মাটি, গ্রামের বাইরে সার্কাসের তাঁবু। মৃতপ্রায় নদীটি মানুষের যাবতীয় প্রতারণা লাঞ্ছনা যাতনার সাক্ষী। তাকে বাঁচানোর জন্যও চলে এক আন্দোলন। সে-ও মানুষের লোভের শিকার। সার্কাসের দল যেন এক আধুনিক শাসনের ছবি। তার মধ্যে নানা চক্র। একের মধ্যে আর এক। কেউ বেরতে পারে না ক্রূর হারাধনের ব্যবস্থাপনার মধ্যে থেকে। কোনও একদিন মুক্তি আসবে তার জন্য অন্তহীন নিষ্পেষণের দিন কাটায়।

পৃথিবীকে চালায় বাজার। তার দুর্দান্ত গতি। তীব্র প্রতিযোগিতা। ধনতান্ত্রিক শোষণের বিপরীতে নধরের শ্লথতা এক নিঃশব্দ প্রতিরোধ। এখানেই তার সাফল্য। দুর্জ্ঞেয় নধরের মন। সে মন কোনদিকে কখন যাবে, কেউ জানে না। তার শরীরের গতিবেগ সম্পর্কে ধারণা থাকলেও তার মনের দিকনির্দেশ অসম্ভব। অমিত সাহার নধরের ভাষা নেই, গতি নেই, দু’-একটি কথা আর দু’-একবার দৃষ্টির বদল। এখানেই হারাধনের মতো অত্যাচারীর পরাভব। সে শোষণ করতে পারে সার্কাসের শ্যামাকে, রূপার দালাল হতে পারে, ভেঙে দিতে পারে ভালুর নির্দোষ প্রেম প্রেম খেলা, পাবলিককে লেলিয়ে দিতে পারে নির্বাক অসহায়ের দিকে। অত্যাচারে মৃতপ্রায় তার নিজের স্ত্রী দু’টি চোখ হয়ে তাকে সর্বদা দেখে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যা পাকে পাকে উন্মোচিত হয় তা হারাধনের ভঙ্গুর অসহায়তা। নির্মম মার, গালিগালাজ, চাকরি খেয়ে নেওয়ার ভয়– এইসব কিছু নিঃশেষ হতে থাকলে হারাধনের ভয় ঘনায়। তার জল খাওয়ার, পান খাওয়ার মুদ্রাদোষ চিনিয়ে দেয় তাকে। ফ্যাসিবাদী শাসকের পরিণতি হয় হারাধনের, তবে শেষ প্রত্যাঘাত কোথা থেকে আসবে, সে নিজেও জানে না।

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য। ফিল্ম তৈরির কোনও আদর্শ ইনস্টিটিউটে তাঁর প্রথম পাঠ নয়। তবে রূপকলা কেন্দ্র তাঁকে শিখিয়েছিল মানুষের সঙ্গে সংযোগের কথা আর ছবি নিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার গেরিলা টেকনিক। রূপকলা কেন্দ্রর সেই ‘আদি যুগে’ (যা সভ্যতার প্রভাবে অধুনা অবলুপ্ত) আমরা ছবির রিল নিয়ে দেখাতে গিয়েছি স্কুলে, মাঠে, গাছতলায়। যেখানে ছবি তৈরি হয়েছে, সেখানকার মানুষ আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন রূপকলা কেন্দ্রর সমাজ সংযোগ চলচ্চিত্র উৎসবে।

প্রদীপ্তর চলচ্চিত্র নির্মাণ সাধারণ মানুষের, তাদের বন্ধনের, রাজনীতির কথা বলেছে নানাভাবে। আর কবিতার উপস্থিতি তার প্রথম ছবি ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ থেকেই। প্রদীপ্ত নিজের ছবি বারবার নিয়ে গিয়েছেন মানুষের কাছে। তবে এই সময়ে তৈরি এক অন্যতম সেরা বাংলা চলচ্চিত্র দেখানো হয়েছে নানা থিয়েটারের মঞ্চে, বিতরণ ব্যবস্থার এই অস্বচ্ছতাকে আমি চলচ্চিত্র আন্দোলনের বড় সাফল্য হিসেবেই দেখব। আর যা আমাকে আনন্দ দিয়েছে, নির্দেশক হিসেবে প্রদীপ্তর যাত্রা পথে বহু মানুষের সঙ্গে তাঁর সখ্য গড়ে ওঠা। এই গণ পরাঙ্মুখ সময়ে শিল্পী যে একা নন, এ এক বড় ভরসা।

কেমন সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা! লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দিয়ে নির্বাচন ঘটে যায়। ফল প্রকাশের অব্যবহিত পরেই ঢুকে আসে বুলডোজার। যেন হকার আর রাস্তার মানুষের ঝুপড়ি ভাঙাই নির্বাচিত সরকারের প্রাথমিক কর্তব্য। নধরের ভেলা দেখে ফেরার সময় বিকেলের আলোয় দেখি সরকারের নিজের প্রতিষ্ঠানে বোতল ছোড়া আর আক্রমণ চলেছে, পুলিশের স্বর্ণালী নীরবতায়।
সংগীত পরিচালক সাত্যকি বন্দ্যোপাধ্যায় আগেও পরিচালনা করেছিলেন প্রদীপ্তর রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্তের সংগীত। কিন্তু নধরের ভেলার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে আলাদা। সরোদ ছেড়ে ছাত্রজীবনে তুলে নিয়েছিলেন দোতারা। আর তার সঙ্গে কণ্ঠসংগীত। গান লেখা হয়েছে, সংগীত তৈরি হয়েছে ফিল্ম তৈরির সমান্তরালে। সাত্যকির মনে হয়েছে, শুকিয়ে যাওয়া অবরুদ্ধ জলঙ্গি নদী যেন অধর, তার ঘুলিয়ে তোলা পাঁক থেকে উঠে আসে সার্কাস আর সার্কাসের দর্শকরা। নধরের মৌন, অজ্ঞেয় শ্লথতার জন্য সে বিকৃত উল্লাসের শিকার।

প্রদীপ্তর অন্য ছবি ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্তের’ মতো এখানেও গান আবহসংগীত হয়ে গিয়েছে। তবে এর অভিঘাত আরও অনেক তীব্র, মর্মস্পর্শী। গানগুলি নধরের ভেলার কাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে এক অপরূপ অন্তরঙ্গতায়। কথায়, সুরে, স্বরে। সার্কাসে বেহুলার অভিনয় করে শ্যামা, সাত্যকির বেহুলা শ্যামারই যাত্রা। বাংলার নদীমাঠ ভাঁটফুল যার পায়ে কেঁদেছিল, শ্যমা সে বেহুলা নয়। সম্পৃক্তার তেজস্বী কণ্ঠে সতী বেহুলা ঘাটে ঘাটে ঘুরতে কলঙ্কিনী হয়ে যায়, কিন্তু সে তবু ‘পুতুল খেলা’র খেলা হবে না। শ্যামার কাছে বেহুলার পালা প্রাণ, দর্শকের অভাবে সে নাটক হারাধন বন্ধ করতে চাইলেও বেহুলা শোনে না। রোজকার নিগৃহীত লাঞ্ছিত জীবনে অভিনয় তাকে বাঁচার ইচ্ছে দেয়।
ঋত্বিক চক্রবর্তীর হারাধন এই সব কিছু ভেঙেচুরে নষ্ট করতে চায়। সে রূপার নাচ বোঝে, শ্যামার শিল্পী হওয়ার আকুলতা তার কাছে অর্থহীন। সে জানে বাজার। গ্রামেও এসে গিয়েছে টিভি সিরিয়াল, সার্কাসের অভিনয় টিভির দর্শকদের টানে না। দর্শক কমছে। কমছে লাভ। তাদের টানে নাচ, আর তার সঙ্গে হারাধন শিল্পরুচিহীন দর্শকদের হাতে ধরিয়ে দেয় নধরের লাঞ্ছনার উপকরণ।

হারাধন একজন প্রকৃত ফ্যাসিস্ট, অভিব্যক্তির নিষ্পেষণের নানা টেকনিক তার খেলা। সে ভালুকে, শ্যামাকে দমন করে, তার স্ত্রী হয়ে গিয়েছে যেন মনোহীন মূক কিন্তু নধরের মৌন তার বোধের অতীত। এখানেই ক্ষমতার লৌহবাসরে ছিদ্র।

চিত্র পরিচালক হিসেবে, প্রদীপ্তর ‘স্ট্রাকচার’-এর সীমাবদ্ধতায় স্বস্তি পান না। জীবনের মধ্যে ঢুকে তিনি ছবি করতে পছন্দ করেন। অন্যত্র তিনি বলেছেন, ‘সিনেমা শুধু বিনোদনের উপকরণ নয়। মানুষের তৈরি ছবি মানুষের কাজে লাগার কথা। আনন্দে, বিরহে, প্রতিবাদে, কান্নায়, অবসাদে, শিক্ষায়, প্রতিরোধে।’
তাই, ক্ষুধার জলহীন মাছহীন নদীতে নধরের ভেসে যাওয়ার দিকচিহ্নহীনতাই প্রকৃতপক্ষে ছবির শেষ নয়। আমরা দেখেছি নধরের ভেলার দড়ি কেটে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্যামার সবুজ নদীতে ঝাঁপ, আর এন্ড টাইটেলের দৈর্ঘ্য ও পূর্ণকাল জুড়ে তার চাপা কান্নার শব্দ। হারাধন পরাজিত। ভালোবাসা জিতে গিয়েছে। প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যর কাহিনি ও চিত্রনাট্য মরণের মুখ থেকে টেনে আনে কারণহীন প্রেমকে; প্রতিদিনের বাস্তবের ভিতর থেকে ‘মরণ হতে’ গানের সুরে জাগার আকিঞ্চন।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved