memories with jogen chowdhury by samir mondal | Robbar
Robbar
  • ৮ কার্তিক ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২৬ অক্টোবর ২০২৬

কাছের যো, দূরের যোগেনদা

যোগেনদাকে মধ্যমণি করে দুবাইয়ের সমুদ্রে ছোট কাঠের জাহাজ ভাড়া করে সমুদ্র বিহারের আয়োজন করেছিলেন উদ্যোক্তারা। সেখানে অনেক রাত অবধি আমরা ভালো ভালো খাবার দাবারের সঙ্গে নানা আলোচনা করছিলাম। যোগেনদার সঙ্গে হালকা আড্ডার ছলে অনেকটাই শিল্পের কথা হয়েছিল। রাতের অন্ধকারে সমুদ্রের কালো জল থেকে শহরের আলো ঝলমল সেই রূপকথার মতো জায়গাটার কথা আজ আবার মনে পড়ছে।

শেষ আপডেট: অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ০৮:৫৩   
Facebook WhatsApp Messenger

যোগেন চৌধুরী আর নেই। খবরটা শোনার পর থেকেই স্বাভাবিকভাবে মনে পড়ছে অনেক কথাই। মানুষ চলে গেলে তাঁর কাজের কথা, তাঁর কৃতিত্বের কথা অনেকেই বলবেন, অবশ্যই বলা দরকার। কিন্তু আমার মনে আজ বারবার ফিরে আসছে মানুষ যোগেন চৌধুরীর কথা। তাঁকে কাছ থেকে দেখার, তাঁর সান্নিধ্যে আসা– কিছু পুরনো দিনের স্মৃতি, কিছু অভিজ্ঞতার কথা।

একজন বড় শিল্পীকে নিয়ে লিখতে গেলে শুধু তাঁর ছবির বৈশিষ্ট্য, তাঁর পুরস্কার, তাঁর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা লিখলেই হয় না। তিনি অন্য মানুষের মনে কেমন জায়গা করে নিয়েছিলেন, তাঁর সামনে দাঁড়ালে কেমন অনুভূতি হত, তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে কতটা দূরত্ব আর কতটা শ্রদ্ধা মিশে থাকত– সেই কথাগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

zoom
যোগেন চৌধুরী। ছবি: রাম রহমান

অন্য বয়স্ক শিল্পীদের সঙ্গে যেমন বন্ধুর মতো মিশতে পারতাম, যোগেন চৌধুরীর সঙ্গে তেমন পারতাম না। তাঁর সামনে একটা সমীহ আপনা-আপনি তৈরি হয়ে থাকত। সেটাই যেন সবচেয়ে মূল্যবান লাগছে এখন। এর একটা কারণ ছিল। আমরা যখন আর্ট কলেজে পড়তাম, তখন আমাদের শহরের প্রদর্শনীতে কোনও অনুষ্ঠানে, কলেজে, বড় শিল্পীদের সঙ্গে মেলামেশা করার একটা সুযোগ ছিল। যোগেনদা সেই সময় থাকতেন দিল্লিতে। উনি তখন রাষ্ট্রপতি ভবনে ওখানকার আর্ট গ্যালারির কিউরেটর হিসেবে কাজ করছিলেন। তাই সচরাচর দেখা হত না। কখনও কখনও কলকাতায় এলে দেখা হত, কথা হত না।

আমাদের সময়ে কলকাতার শিল্পজগতে যে বেশ কয়েকজন বড় মাপের শিল্পী ছিলেন, যাঁদের আমরা আমাদের পথপ্রদর্শক বলতে পারি, যোগেন চৌধুরী তাঁদের অন্যতম। স্বাধীনতার পর, বিশেষ করে ছয়ের দশকে ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার যে নিজস্ব ভাষা তৈরি হচ্ছিল, তার মধ্যে বাংলার শিল্পীদের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। শুধু যোগেন চৌধুরীর ছবি নয়, তাঁর ব্যক্তিত্বও তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখত।

zoom
ব্রোঞ্জ কাস্টিং, যোগেন চৌধুরী

বয়সে বড় অনেক শিল্পীর সঙ্গে আমার বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তাঁদের সঙ্গে সহজভাবে কথা বলা যেত, আড্ডা দেওয়া যেত, নানা বিষয়ে মতের আদানপ্রদান করা যেত। কিন্তু যোগেন চৌধুরীর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা যেন একটু অন্যরকম ছিল। তাঁর আচরণে, কাজকর্মে, পোশাক-আশাকে, চলন-বলনে এমন একটা স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব ছিল, যার সামনে নিজেকে একটু সংযত রাখতেই ইচ্ছে করত। একটা দূরত্ব যেন এমনিতেই তৈরি হয়ে থাকত।

এরপর যোগেন চৌধুরী যখন কলকাতায় ফিরে এলেন ঠিক সেই সময় কলকাতা ত্যাগ করলাম। আমার প্রবাসজীবন শুরু হল। দূরত্ব তৈরি হলেও, আমাদের মেলামেশার এক নতুন পরিসর তৈরি হল সেই সময়ে। তখন শিল্পক্ষেত্রে নতুন একটা দিক, দেশে-বিদেশে শিল্পের কর্মশিবির। সেই সুবাদে বেশ কয়েকটা কর্মশিবিরে বিদেশে যোগেনদার সঙ্গে একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ হল, আর সময় হল ওঁর কাছাকাছি আসার, কথা বলার। অচিরেই স্নেহভাজন হলাম এবং যোগেন চৌধুরী হলেন ‘যোগেনদা’।

zoom

আমি ওঁর খুব কাছের বন্ধু ছিলাম, এমন দাবি করতে চাই না। বরং আমার স্মৃতিতে তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের যে বিশেষ ধরনটি রয়ে গিয়েছে, সেটাকেই স্বীকার করতে চাই। তাঁর সামনে আমার মধ্যে যে সমীহ কাজ করত, সেই অনুভূতিও আমার নিজের অভিজ্ঞতার অংশ। আজ সেই দূরত্বের কথা মনে করেও এক ধরনের নিজস্ব অনুভূতি হচ্ছে। কারণ, মানুষকে সবসময় বন্ধুর মতো কাছে পেলেই যে তিনি আপন হয়ে ওঠেন, তা নয়। কখনও কখনও দূরত্ব রেখেও কেউ মনের মধ্যে স্থায়ী জায়গা করে নেন।

দুবাইয়ের এক শিল্পশিবিরের কথা আজ খুব মনে পড়ছে। বিভিন্ন বয়সের শিল্পীরা একসঙ্গে গিয়েছিলাম। কাজের ফাঁকে আড্ডা, এদিক-ওদিক ঘুরে দেখা। সব মিলিয়ে বেশ আনন্দে সময় কাটছিল। সেই সূত্রেই একদিন জিপে করে মরুভূমির বালিয়াড়ি দেখতে যাওয়া। তিন-চারটে জিপ মিলিয়ে আমাদের দল।

zoom

সেখানে গিয়ে ঘটল একটা মজার অথচ বেশ অস্বস্তিকর ঘটনা। বালিয়াড়ির ছোট ছোট ঢিবি বেয়ে উঠতে নামতে গিয়ে বিপত্তি ঘটল। যোগেনদার জিপটা গেল উলটে, ডুবে গেল বালিতে। তাঁর কাঁধে ঝোলানো ক্যামেরার ব্যাগের মধ্যে ঢুকে গেল মরুভূমির বালি। শুধু ব্যাগে নয়, ক্যামেরার খোলা লেন্স-টেন্সের মধ্যেও বালি ঢুকে গিয়ে আঁচড় কেটে সেগুলোর ক্ষতি করেছিল। জামার পকেটেও ঢুকে পড়েছিল বালি। কিন্তু আজ এত দিন পরে ঘটনাটা মনে পড়লে শুধু ক্যামেরার ক্ষতির কথা মনে হয় না। মনে পড়ে সেই সফর, একসঙ্গে ঘুরে বেড়ানো, কাজের বাইরের সেই সময়টুকু। 

দুবাইয়ের আরও একটা ঘটনা মনে পড়ছে। প্রতিদিন সন্ধেবেলা আমাদের খাদ্য-পানীয় সমেত বসত আলোচনা সভা। সেইখানে কোনও কোনও সময় শিল্পীরা নিজেদের কাজ সম্বন্ধে বলতেন, কখনও আবার একজন শিল্পী অন্য শিল্পীর কাজ সম্পর্কেও কথা বলতেন তাঁর মতো করে। সেবারে দলে ছিলেন যোগেনদার কলেজের বন্ধু– আমাদের প্রিয় সুনীলদা, সুনীল দাস। 

zoom
সুনীল দাস

এমনই একদিন যোগেনদা আর সুনীলদার কাজ নিয়ে বলার পালা আমার। মনে পড়ছে, যোগেনদার কাজের সহজ রেখাচিত্রের কালো এবং সাদার মধ্যে যে নেগেটিভ এবং পজিটিভ ইমেজ তৈরি হয় সে বিষয়ে, আর কাগজকে কী করে ধরে রাখতে হবে ওই আকার আর অবয়বের সমাবেশে– তাই নিয়ে ভয়ে ভয়ে দু’-চার কথা বলেছিলাম। পরে মজা হল সুনীলদার বেলায়। সুনীলদা কী করে ঘোড়ার শক্তি আর তার দ্রুততা আঁকতেন সেইটা আমি বলতে বলতে মাইম করে, মানে অভিনয় করে, লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে দেখিয়েছিলাম। অন্যদের সঙ্গে সেটাও বেশ উপভোগ করেছিলেন যোগেনদা।

যোগেনদাকে মধ্যমণি করে দুবাইয়ের সমুদ্রে ছোট কাঠের জাহাজ ভাড়া করে সমুদ্র বিহারের আয়োজন করেছিলেন উদ্যোক্তারা। সেখানে অনেক রাত অবধি আমরা ভালো ভালো খাবার দাবারের সঙ্গে নানা আলোচনা করছিলাম। যোগেনদার সঙ্গে হালকা আড্ডার ছলে অনেকটাই শিল্পের কথা হয়েছিল। রাতের অন্ধকারে সমুদ্রের কালো জল থেকে শহরের আলো ঝলমল সেই রূপকথার মতো জায়গাটার কথা আজ আবার মনে পড়ছে।

zoom

 

মনে পড়ছে আরও এক গভীর রাতের রাতচরার কাহিনি। সে রাতে আমরা অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে। জনাদশেক মিলে গিয়েছিলাম মধ্যরাতে ডান্সিং গার্ল দেখতে। সেই নিষিদ্ধ নাচ দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল পৃথিবীবিখ্যাত বড় বড় শিল্পী কত না অকুস্থলে যাতায়াত এবং সেই সমস্ত নাচ-গান-নাটক অদ্ভুতভাবে এসেছে তাঁদের কাজে, তাঁদের শিল্পে। আমাদের দলে সে রাতে ছিলেন বয়স্কদের মধ্যে দিল্লি থেকে নীরেন সেনগুপ্ত, গুজরাতের অমিত আম্বালাল এবং মনু পারেখ। আমাদের কাছাকাছি বয়সের অতুল দোদিয়া, জীতিশ কাল্লাত, আদিত্য বসাক, অশোক ভৌমিক এরকম আরও কেউ কেউ আর যোগেনদা ।

মনে পড়ছে মরিশাসের কথা, মনে পড়ছে ব্যাংককে বুদ্ধমন্দিরগুলো দেখতে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর বিখ্যাত সেই সবচেয়ে বিশাল সাইজের শায়িত বুদ্ধ দর্শন, যোগেনদার সঙ্গে।

গতকাল তাঁর চলে যাওয়ায় মনে হচ্ছে, আমরা শুধু একজন বিখ্যাত শিল্পীকে হারালাম না। আমাদের সময়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকেও হারালাম। দেশভাগের অভিঘাত থেকে শুরু করে স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের শিল্পের নানা পরিবর্তন, কলকাতা ও শান্তিনিকেতনের শিল্পচর্চা, নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের উঠে আসার মতো অনেক কিছুর সঙ্গে তাঁর জীবন জড়িয়ে ছিল।

যোগেনদা, আপনাকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। সেই স্মৃতিটুকুই আজ আমার প্রাপ্তি।

Jogen Chowdhury obituary Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar যোগেন চৌধুরী

Share this article on